
এম ডি মাসুদ খান

ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। অধিকাংশ সময় ইতিহাস লেখা হয় ক্ষমতার ভাষায়— রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে, বিজয়ীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। এ প্রক্রিয়ায় অনেক কণ্ঠ হারিয়ে যায়, বিশেষ করে সেইসব মানুষ, যারা ক্ষমতার সঙ্গে আপস করতে অস্বীকার করেছিলেন। রাষ্ট্র যখন নিজেকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, তখন প্রশ্ন তোলাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ। আর ঠিক সেখানেই জন্ম নেয় এমন কিছু নাগরিক— যারা অস্ত্র বহন করেন না, বরং বহন করেন প্রশ্ন।
এই লেখা তেমনই এক নাগরিক কণ্ঠকে নিয়ে— বিপ্লবী শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি। তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির তালিকায় নাও থাকতে পারেন, কিন্তু তার চিন্তা ও উচ্চারণ রাষ্ট্রকে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
রাষ্ট্র যখন ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে এবং মানুষ পরিণত হয় কেবল পরিসংখ্যানে, তখন নাগরিক পরিচয় ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। নাগরিক তখন আর রাষ্ট্রের অংশীদার নয়, সে হয়ে ওঠে শাসনের বিষয়বস্তু। রাষ্ট্র নিজেকে সেবাদাতা হিসেবে না দেখে নিয়ন্ত্রক ও প্রয়োজনে দমনকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ওসমান বিন হাদি একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন—
রাষ্ট্র কাদের জন্য? ক্ষমতার জন্য, না মানুষের জন্য?
ওসমান হাদি ক্ষমতার বলয়ে বেড়ে ওঠেননি। বরং ক্ষমতার অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেই তিনি ন্যায়ের আলো খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট— রাষ্ট্র কেবল একটি ভৌগোলিক কাঠামো নয়; রাষ্ট্র হলো মানুষের সম্মান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। এই ধারণাই তাকে ক্ষমতার প্রচলিত ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল।
যখন সার্বভৌমত্ব আপসের টেবিলে আলোচ্য হয়ে ওঠে, যখন ‘বাস্তবতা’র নামে ন্যায়ের প্রশ্নকে চাপা দেওয়া হয়, তখন তিনি দাঁড়িয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চে। এটি কোনো দলীয় বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এটি ছিল বিবেকের মঞ্চ— যেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল নাগরিক অধিকারের, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ও ক্ষমতার সীমারেখা নিয়ে।
ইনকিলাব মঞ্চে ভয় প্রবেশ করতে পারেনি, কারণ সেখানে কথা বলেছিল সত্য। সেখানে কোনো ক্ষমতার পতাকা ছিল না; ছিল নাগরিক প্রশ্ন। সেখান থেকেই উচ্চারিত হয়েছিল সেই ঘোষণা—
‘এই দেশ কারও দয়া নয়; এই দেশ আমাদের অধিকার।’
এই উচ্চারণ রাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কারণ এটি রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিকানার ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল।
বিপ্লবী হাদি বিশ্বাস করতেন— ইনসাফ কেবল আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়। ইনসাফ মানে রাষ্ট্রের আচরণ, ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং নাগরিক মর্যাদার স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো— অনেক রাষ্ট্রই নীরবতাকে পুরস্কৃত করে, সুবিধাবাদকে উৎসাহ দেয় এবং প্রশ্নকারীকে অস্বস্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করে। এই সমাজে নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষ নয়; নীরবতা প্রায়শই শক্তিশালীদের পক্ষেই অবস্থান নেয়। এই সত্য উপলব্ধি করেই তিনি নীরব থাকেননি।
এই পথ সহজ ছিল না। হুমকি আর নেপথ্যের নানা চক্রান্ত তার অগ্রযাত্রাকে বারবার থামিয়ে দিতে চেয়েছে। অবশেষে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতায় তাকে শহিদ হতে হয়। শহিদ হওয়া তার লক্ষ্য ছিল না, কিন্তু সত্য উচ্চারণের পরিণতি হিসেবেই শহিদ হওয়া তার নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই ভূখণ্ডে সত্য বলার মূল্য এখনো অনেক সময় রক্তে পরিশোধ করতে হয়।
রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এটি নতুন নয়। যখনই কেউ ক্ষমতার সীমা প্রশ্ন করে, তখনই তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সক্রিয় হয়।
আজ বিপ্লবী শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি শারীরিকভাবে উপস্থিত নন, কিন্তু তিনি অনুপস্থিত নন। তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি প্রশ্নে, প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি ন্যায়বিচারের দাবিতে। তিনি বেঁচে আছেন সেইসব তরুণ কণ্ঠে, যারা রাষ্ট্রের কাছে জবাব চায়। তিনি আছেন সেইসব নাগরিকের চিন্তায়, যারা মাথা নিচু করে বাঁচতে রাজি নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি কেবল একজন শহিদ নন, তিনি আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক স্থায়ী অস্বস্তি। তিনি সার্বভৌমত্বের পক্ষে এক অমোচনীয় শপথ। তিনি ইনকিলাবের— একটি অসমাপ্ত অধ্যায়।
লেখক: ব্যবসায়ী ও কলাম লেখক

ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। অধিকাংশ সময় ইতিহাস লেখা হয় ক্ষমতার ভাষায়— রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে, বিজয়ীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। এ প্রক্রিয়ায় অনেক কণ্ঠ হারিয়ে যায়, বিশেষ করে সেইসব মানুষ, যারা ক্ষমতার সঙ্গে আপস করতে অস্বীকার করেছিলেন। রাষ্ট্র যখন নিজেকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, তখন প্রশ্ন তোলাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ। আর ঠিক সেখানেই জন্ম নেয় এমন কিছু নাগরিক— যারা অস্ত্র বহন করেন না, বরং বহন করেন প্রশ্ন।
এই লেখা তেমনই এক নাগরিক কণ্ঠকে নিয়ে— বিপ্লবী শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি। তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির তালিকায় নাও থাকতে পারেন, কিন্তু তার চিন্তা ও উচ্চারণ রাষ্ট্রকে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
রাষ্ট্র যখন ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে এবং মানুষ পরিণত হয় কেবল পরিসংখ্যানে, তখন নাগরিক পরিচয় ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। নাগরিক তখন আর রাষ্ট্রের অংশীদার নয়, সে হয়ে ওঠে শাসনের বিষয়বস্তু। রাষ্ট্র নিজেকে সেবাদাতা হিসেবে না দেখে নিয়ন্ত্রক ও প্রয়োজনে দমনকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ওসমান বিন হাদি একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন—
রাষ্ট্র কাদের জন্য? ক্ষমতার জন্য, না মানুষের জন্য?
ওসমান হাদি ক্ষমতার বলয়ে বেড়ে ওঠেননি। বরং ক্ষমতার অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেই তিনি ন্যায়ের আলো খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট— রাষ্ট্র কেবল একটি ভৌগোলিক কাঠামো নয়; রাষ্ট্র হলো মানুষের সম্মান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। এই ধারণাই তাকে ক্ষমতার প্রচলিত ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল।
যখন সার্বভৌমত্ব আপসের টেবিলে আলোচ্য হয়ে ওঠে, যখন ‘বাস্তবতা’র নামে ন্যায়ের প্রশ্নকে চাপা দেওয়া হয়, তখন তিনি দাঁড়িয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চে। এটি কোনো দলীয় বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এটি ছিল বিবেকের মঞ্চ— যেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল নাগরিক অধিকারের, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ও ক্ষমতার সীমারেখা নিয়ে।
ইনকিলাব মঞ্চে ভয় প্রবেশ করতে পারেনি, কারণ সেখানে কথা বলেছিল সত্য। সেখানে কোনো ক্ষমতার পতাকা ছিল না; ছিল নাগরিক প্রশ্ন। সেখান থেকেই উচ্চারিত হয়েছিল সেই ঘোষণা—
‘এই দেশ কারও দয়া নয়; এই দেশ আমাদের অধিকার।’
এই উচ্চারণ রাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কারণ এটি রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিকানার ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল।
বিপ্লবী হাদি বিশ্বাস করতেন— ইনসাফ কেবল আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়। ইনসাফ মানে রাষ্ট্রের আচরণ, ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং নাগরিক মর্যাদার স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো— অনেক রাষ্ট্রই নীরবতাকে পুরস্কৃত করে, সুবিধাবাদকে উৎসাহ দেয় এবং প্রশ্নকারীকে অস্বস্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করে। এই সমাজে নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষ নয়; নীরবতা প্রায়শই শক্তিশালীদের পক্ষেই অবস্থান নেয়। এই সত্য উপলব্ধি করেই তিনি নীরব থাকেননি।
এই পথ সহজ ছিল না। হুমকি আর নেপথ্যের নানা চক্রান্ত তার অগ্রযাত্রাকে বারবার থামিয়ে দিতে চেয়েছে। অবশেষে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতায় তাকে শহিদ হতে হয়। শহিদ হওয়া তার লক্ষ্য ছিল না, কিন্তু সত্য উচ্চারণের পরিণতি হিসেবেই শহিদ হওয়া তার নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই ভূখণ্ডে সত্য বলার মূল্য এখনো অনেক সময় রক্তে পরিশোধ করতে হয়।
রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এটি নতুন নয়। যখনই কেউ ক্ষমতার সীমা প্রশ্ন করে, তখনই তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সক্রিয় হয়।
আজ বিপ্লবী শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি শারীরিকভাবে উপস্থিত নন, কিন্তু তিনি অনুপস্থিত নন। তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি প্রশ্নে, প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি ন্যায়বিচারের দাবিতে। তিনি বেঁচে আছেন সেইসব তরুণ কণ্ঠে, যারা রাষ্ট্রের কাছে জবাব চায়। তিনি আছেন সেইসব নাগরিকের চিন্তায়, যারা মাথা নিচু করে বাঁচতে রাজি নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি কেবল একজন শহিদ নন, তিনি আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক স্থায়ী অস্বস্তি। তিনি সার্বভৌমত্বের পক্ষে এক অমোচনীয় শপথ। তিনি ইনকিলাবের— একটি অসমাপ্ত অধ্যায়।
লেখক: ব্যবসায়ী ও কলাম লেখক

কেউ কেউ বলেছেন, শেখ মুজিব হেয়ালি পরিহার করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় যদি সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তাহলে পাকিস্তানের অপ্রস্তুতির সুযোগ নিয়ে আমরা আরও কম জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুর বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম। কী হতো জানি না, তবে বিতর্ক না বাড়িয়ে অনুমান করা যায়— এটি হতো হঠকারী আচরণের নব সংযোজন এবং তার
৪ দিন আগে
এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও বৈদেশিক আয় কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে আঞ্চলিক যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত, ভিসা নবায়নে জটিলতা, প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রত্যাবাসনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্র
৪ দিন আগে
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময়গুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বড় যুদ্ধের সময়কাল মিলে গেছে, যার প্রভাব দেশের কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে অনুভূত হয়েছে। ফলে এসব সংকটকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।
৬ দিন আগে
বেলুচরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও স্বাধীনচেতা। ইংরেজ আমলেও তাদের শাসন করা হতো পরোক্ষ স্বাধীনতা বা সমঝোতার মাধ্যমে। এই পরোক্ষ স্বাধীনতার অর্থ ‘পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন’ও হতে পারে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কালে তার মর্যাদা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের। কিছুদিন পর একে অনেকটা বলপূর্বক পাকিস্তানের অংশ করে নেওয়া
৬ দিন আগে