নিকাব বিতর্কে নিজের বক্তব্য জানালেন ঢাবি শিক্ষক তাসনীম সিরাজ

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব।  ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে নিয়ে মন্তব্যের ঘটনায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। শনিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, ওই ছাত্রীকে নিকাব খুলতে, পোশাক পরিবর্তন করতে কিংবা ক্লাস ছেড়ে যেতে বলেননি। চোখ দেখা না যাওয়ায় শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করা ও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে অসুবিধার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

গত ৭ অক্টোবর ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্স ফাইনাল সেমিস্টারের ক্লাসে এ ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও লিখিত অভিযোগের পর ৮ অক্টোবর তাসনীম সিরাজ মাহবুবকে তার সব কোর্স থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ। তার পড়ানো কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

ভিডিও বার্তায় তাসনীম বলেন, সেদিন পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা থাকায় এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করা কঠিন হচ্ছিল। এতে পাঠদানের সময় তিনি অস্বস্তি বোধ করছিলেন। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে পাঠদানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন বলেই বিষয়টি নিয়ে ওই ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, এ নিয়ে ওই ছাত্রীর সঙ্গে কোনো বিতর্ক হয়নি। তবে ছাত্রীর পক্ষে কথা বলা আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে পোশাকের স্বাধীনতা, পরিচয় শনাক্তকরণ ও শ্রেণিকক্ষে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতবিনিময় হয়।

নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে এই শিক্ষক বলেন, তিনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করেন। প্রায় ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীরা তার বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আচরণ সম্পর্কে জানেন। কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস বা পোশাককে অবমাননা করার প্রশ্নই আসে না বলে দাবি করেন তিনি।

তাসনীম জানান, আলোচনার সময় পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে শালীনতা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন সীমিত রাখার নির্দেশের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ক্লাসে বোরকা পরা অন্য দুই ছাত্রীর উদাহরণ দিয়ে নিজের বোঝাপড়া অনুযায়ী মুখমণ্ডল দৃশ্যমান রেখেও শালীন পোশাকে পর্দা করা যায় বলে মত দেন। নিজের হজ পালনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ইহরাম অবস্থায় নারীদের নিকাব না পরার বিষয়ে হাদিসের কথাও বলেন তিনি।

তার দাবি, সেদিন ক্লাসে হিজাব ও বোরকা পরা আরও অনেক শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁদের চোখ দৃশ্যমান থাকায় শনাক্ত করতে অসুবিধা হয়নি এবং তাঁদের পোশাক নিয়ে কোনো মন্তব্যও করেননি। সংশ্লিষ্ট ছাত্রীকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করা, নিকাব খুলতে বলা, ক্লাস ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া কিংবা ধর্মীয় পোশাকের কারণে শাস্তি দেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে তাঁর ক্লাসে আসতেও নিষেধ করেননি বলে জানান তাসনীম।

ঘটনার পর ছাত্রীটি কষ্ট পেয়ে ক্লাস ছেড়ে গেছেন জানতে পেরে তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন বলেও ভিডিও বার্তায় দাবি করেন তাসনীম। তিনি বলেন, সহপাঠীদের মাধ্যমে তিনবার খবর পাঠিয়েছিলেন এবং করিডরে প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করেছিলেন। তবে ছাত্রীটি বেরিয়ে না আসায় সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের একজন গুরুতর অসুস্থ সদস্যের অস্ত্রোপচারের কারণে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

তাসনীমের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তার বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়েই বিভাগ তাঁর সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। এ ছাড়া বেনামি ফোন, ই-মেইল, আপত্তিকর বার্তা ও হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে, ঘটনার পর ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্স ফাইনাল সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সুমি আক্তার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ভিন্ন বর্ণনা দেন। তার দাবি, শিক্ষক নিকাব পরা ছাত্রীকে উদ্দেশ করে পর্দা, মুখ খোলা রাখা এবং হাত-পা ঢাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মন্তব্য করেন। ওই ছাত্রীর নিকাবের কারণে তিনি ‘আনকম্ফোর্টেবল’, ‘আনসেইফ’ ও ‘ডিস্ট্র্যাক্টেড’ বোধ করছেন বলেও জানান। সুমি লেখেন, এর প্রতিবাদ জানালে শিক্ষক তর্কে জড়ান এবং একপর্যায়ে ওই ছাত্রীসহ আরও দুজন শিক্ষার্থী ক্লাস ছেড়ে চলে যান।

৮ অক্টোবর নারী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে পাঁচ দফা দাবি জানান। একই দিন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তাসনীমের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও অভিযোগের ভিত্তিতে সেদিনই তাঁকে ক্লাস থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ইংরেজি বিভাগ।

এদিকে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে তাসনীম সিরাজ মাহবুবের পক্ষে অবস্থান নেয়। সংগঠনটির দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রচারণা, অপতথ্য ও বিদ্যায়তনিক পরাধীনতার শিকার হয়েছেন। শ্রেণিকক্ষের আলোচনা জনপরিসরে ছড়িয়ে দিয়ে ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের ভাষ্য, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা, মতবিরোধ ও ভুল-বোঝাবুঝি হতে পারে, যা সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি সংগঠনটির। তাসনীমকে ক্লাস থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্তকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধানের পরিপন্থী উল্লেখ করে সংগঠনটি অনুমতি ছাড়া শিক্ষকের বক্তব্য ধারণ ও খণ্ডিতভাবে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement