কুসংস্কার

উটপাখি কি সত্যিই বালুতে মুখ লুকায়?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
উটপাখি বালুতে মুখ লুকায় না। ছবি: সংগৃহীত

উটপাখি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাখি। এরা আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে ছুটে বেড়ায়, শক্তিশালী পা দিয়ে ঘণ্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। বিশাল ডানার ঝাপটায় হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে হিংস্র প্রাণীকেও ভয় দেখাতে পারে। কিন্তু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটা অদ্ভুত ধারণা পোষণ করে এসেছে—উটপাখি নাকি বিপদে পড়লেই মাথা বালুর নিচে ঢুকিয়ে রাখে। যেন চোখে শত্রুকে না দেখলেই বিপদ কেটে যাবে। এই ধারণা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে অনেক ভাষায় উটপাখিকে ভীরু প্রাণীর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি ইংরেজি ভাষায় “Ostrich Policy” কথাটিও প্রচলিত আছে, যার মানে হলো—বড় সমস্যাকে অস্বীকার করে মুখ গুঁজে থাকা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি উটপাখি এমন কাজ করে? প্রকৃতপক্ষে গবেষণা বলছে, এই বিশ্বাস আসলে ভুল। উটপাখি কখনোই বালুর নিচে মুখ ঢুকিয়ে রাখে না। বরং মানুষের ভুল বোঝাবুঝি আর কিছু অদ্ভুত অভ্যাস মিলেই এই কল্পকাহিনি জন্ম নিয়েছে।

প্রথমেই আসা যাক উটপাখির ডিম ফোটানোর ব্যাপারে। উটপাখিরা ডিম দেয় মাটির ওপর তৈরি অগভীর গর্তে। ডিমগুলোকে গরম রাখতে কিংবা উল্টেপাল্টে দিতে মা বা বাবা উটপাখি মাঝে মাঝে মাথা নিচু করে ডিমের দিকে মনোযোগ দেয়। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, পাখিটি বালুর ভেতর মাথা ঢুকিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেটি কেবল ডিম দেখাশোনা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাণীবিজ্ঞানী ড. ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “উটপাখির মাথা ডিমের কাছে নামানো হলে দূর থেকে মনে হয় যেন পাখিটি বালুর মধ্যে ঢুকে গেছে। কিন্তু আসলে তা নয়, এ কেবল ডিম উল্টে দেওয়া বা পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া।”

আরেকটি কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। উটপাখি শত্রুর চোখে পড়লে কখনো কখনো মাথা নিচু করে মাটির কাছাকাছি শুয়ে পড়ে। তাদের পালকের রঙ মাটির সঙ্গে মিশে যায়। তখন শিকারী প্রাণী সহজে আলাদা করতে পারে না। এভাবে তারা নিজেদের আড়াল করে। কিন্তু এটিও মাথা বালুতে ঢুকিয়ে রাখার মতো নয়। ব্রিটিশ প্রাণীবিদ ড. কলিন ফার্নসওয়ার্থ মন্তব্য করেছেন, “উটপাখি মাটিতে মাথা গুঁজে রাখে না। তারা দৌড়ে পালায়, লড়াই করে, কিংবা শরীর মাটির সমান করে লুকিয়ে পড়ে। এই আচরণকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেই বালুতে মাথা লুকানোর মিথ জন্ম নিয়েছে।”

তাহলে এই মিথ বা ভুল ধারণা শুরু হলো কীভাবে? ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন রোমান লেখক প্লিনি দ্য এল্ডার তার ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ বইতে লিখেছিলেন যে উটপাখি শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে শরীর নিচু করে রাখে। হয়তো সেখান থেকেই ধীরে ধীরে মানুষের কল্পনায় পাখিটি বালুর নিচে মাথা ঢুকিয়ে রাখে—এমন ধারণা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ইউরোপীয় সাহিত্যে ও কথোপকথনে এই কল্পচিত্র আরও ছড়িয়ে পড়ে।

আধুনিক বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ অবশ্য ভিন্ন ছবি দেখায়। আফ্রিকার সাভানায় দীর্ঘসময় উটপাখির আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তারা বিপদে পড়লে দৌড়ে পালায় বা শক্তিশালী পা দিয়ে লাথি মেরে প্রতিরোধ করে। সেই লাথির আঘাতে সিংহ বা হায়েনার মতো প্রাণীও আহত হতে পারে। তাই প্রকৃত অর্থে উটপাখি ভীরু নয়। বরং সাহসী ও শক্তিশালী প্রাণী।

এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গবেষক ড. পিটার হাউসম্যান বলেছেন, “মানুষ উটপাখিকে প্রায়শই ভুল বোঝে। সত্য হলো, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী দৌড়বিদ পাখি। এমন প্রাণীকে ভীরু ভাবা বড় অন্যায়। বালুর নিচে মাথা ঢুকানো একটি কল্পকাহিনি মাত্র।”

তবে কেন এই ভ্রান্তি এত জনপ্রিয় হলো? সামাজিক মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের মনে ‘সমস্যা থেকে পালানো’ নিয়ে একটি প্রতীকী ছবি দরকার ছিল। উটপাখির আচরণ নিয়ে ভুল ধারণা সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। ফলে রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে যখন কেউ বড় সমস্যাকে এড়িয়ে যায়, তখন তাকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়—সে নাকি উটপাখির মতো বালুর নিচে মুখ লুকিয়েছে।

বাস্তবে উটপাখি এক বিস্ময়কর প্রাণী। তাদের চোখ পৃথিবীর স্থলজ প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বড়—প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার ব্যাস। এত বড় চোখ থাকার কারণে তারা দূরের বিপদও সহজে টের পায়। তাদের শক্তিশালী দৌড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে। আর লম্বা গলা ও বিশাল শরীর তাদের আলাদা করে তোলে। এরা আসলে বেঁচে থাকার জন্য দারুণভাবে অভিযোজিত।

এখন প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন এমন ভ্রান্তিতে বিশ্বাস করতে চায়? গবেষকরা মনে করেন, মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই গল্প বানাতে ভালোবাসে। কোনো অদ্ভুত আচরণ চোখে পড়লেই তা নিয়ে বাড়িয়ে বলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গল্প লোককথায় রূপ নেয়। উটপাখির মাথা নিচু করা নিয়ে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, সেটিও গল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আর একসময় সেটি সত্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

তবে আধুনিক যুগে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তির কারণে এখন অনেকেই জানেন, উটপাখি আসলে কখনোই বালুর মধ্যে মুখ লুকায় না। তবুও এই ভুল ধারণা পুরোপুরি মুছে যায়নি। সিনেমা, কার্টুন, শিশুদের বই এমনকি রাজনৈতিক ভাষণেও এখনও “উটপাখির মতো মুখ লুকানো” বাক্যটি শোনা যায়।

উটপাখি বালুর মধ্যে মুখ গুঁজে রাখে—এটি আসলে এক মিথ। বাস্তবে তারা দৌড়ায়, লড়ে, লুকিয়ে পড়ে—কিন্তু বালুর ভেতর মুখ ঢোকানো তাদের স্বভাব নয়। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ এই ভুল ধারণাকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করেছে। অথচ এই ভুল ধারণাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কল্পনায় বেঁচে আছে।

তাই আমরা যখন শুনি “উটপাখির মতো ভীরু হয়ে বালুর নিচে মুখ লুকিও না”, তখন আসলে মনে রাখা উচিত—উটপাখি ভীরু নয়, বরং অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বুদ্ধিমান প্রাণী। ভ্রান্তি টিকেছে, কিন্তু বাস্তবের উটপাখি বরাবরই মরুভূমির রাজা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে।

সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

ফারুকীর চেয়ে তিশার সম্পদই বেশি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সম্পদের বিবরণী থেকে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে এই উপদেষ্টার সম্পদ কমলেও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে তার স্ত্রীর সম্পদ। বর্তমানে ফারুকীর মোট সম্পদের চেয়ে তিশার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৪ লাখ টাকা বেশি।

৯ ঘণ্টা আগে

৫০তম বিসিএস প্রিলির ফল প্রকাশ

৫০তম বিসিএসে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে মোট ২ হাজার ১৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫টি ক্যাডার পদের বিপরীতে এই নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। ক্যাডার পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ হবে স্বাস্থ্য ক্যাডারে, যেখানে শূন্য পদের সংখ্যা ৬৫০টি। এছাড়া প্রশাসন ক্যাডারে ২০০ জন, পুলিশ ক্যাডারে ১১৭ জন

১০ ঘণ্টা আগে

৫ দিন সারা দেশে ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ

তবে বেবিচকের পূর্বানুমতি ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার ছাড়পত্রের সাপেক্ষে গবেষণা, জরিপ, কৃষি ও পরিবীক্ষণ কাজে এবং সরকারি সংস্থার আয়োজিত অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য ড্রোন ব্যবহারের অনুমোদন পেতে পারে সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

১০ ঘণ্টা আগে

আপনার ভোটেই রচিত হবে গৌরবময় বাংলাদেশের ইতিহাস: প্রধান উপদেষ্টা

তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা ও শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে সফল করে তুলি। ভয় নয়—আশা নিয়ে; উদাসীনতা নয়—দায়িত্ববোধ নিয়ে; বিভক্তি নয়—ঐক্যের শক্তি নিয়ে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য গণভোটের মাধ্যমেই আমরা প্রমাণ করব—বাংলাদেশের জনগণ নিজেদ

১০ ঘণ্টা আগে