স্পন্ডাইলোসিস: ঘাড় ও কোমরের ব্যথার আধুনিক ব্যাখ্যা

ডা. এ এইচ এম আব্দুর রউফ

মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঘাড় ও কোমরের ব্যথা এখন এক নীরব মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আগে যেখানে এই ধরনের সমস্যা প্রধানত বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা তরুণ-যুবক থেকে শুরু করে কর্মজীবী— প্রায় সবার মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এই ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ হলো স্পন্ডাইলোসিস, যা মূলত মেরুদণ্ডের বয়সজনিত বা ব্যবহারজনিত পরিবর্তনের একটি জটিল রূপ।

স্পন্ডাইলোসিস কী?

স্পন্ডাইলোসিস বলতে মেরুদণ্ডের হাড় (vertebrae), ডিস্ক (intervertebral disc), এবং আশপাশের লিগামেন্টের ধীরে ধীরে ক্ষয় বা অবক্ষয়কে বোঝায়। এটি কোনো একক রোগ নয়; বরং একটি অবস্থা বা প্রক্রিয়া, যা সময়ের সাথে সাথে আমাদের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। তবে আধুনিক জীবনযাপন এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

মানুষের মেরুদণ্ড একটি জটিল কাঠামো, যা শরীরকে সোজা রাখে, ভার বহন করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়। এই কাঠামোর কোনো অংশে পরিবর্তন বা ক্ষয় হলে ব্যথা, অবশ ভাব, এমনকি চলাফেরায় অক্ষমতা দেখা দিতে পারে।

কেন বাড়ছে এই সমস্যা?

বর্তমান যুগে স্পন্ডাইলোসিস বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—

১. দীর্ঘসময় বসে থাকা

অফিস, বাসা কিংবা যানবাহনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা এখন সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের সময় আমরা শরীরের ভঙ্গির দিকে খুব কমই নজর দিই।

২. ভুল ভঙ্গি (Posture)

ঘাড় নিচু করে মোবাইল দেখা, কুঁজো হয়ে বসা বা শোয়া— এসব অভ্যাস মেরুদণ্ডে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করে।

৩. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব

ব্যায়ামের অভাবে মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।

৪. বয়সজনিত পরিবর্তন

বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিস্কের পানি কমে যায়, হাড়ে ক্ষয় শুরু হয় এবং জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়।

৫. ওজন বৃদ্ধি

অতিরিক্ত ওজন কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা স্পন্ডাইলোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

লক্ষণ ও উপসর্গ

স্পন্ডাইলোসিসের লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু উপসর্গ হলো—

  • ঘাড় বা কোমরে স্থায়ী বা মাঝেমধ্যে ব্যথা
  • ঘাড় নড়াতে সমস্যা বা শক্ত হয়ে যাওয়া
  • কাঁধ, হাত বা পায়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
  • হাত বা পায়ে অবশ ভাব বা ঝিনঝিনি
  • দীর্ঘসময় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া

অনেক সময় রোগী প্রথমে সাধারণ ব্যথা মনে করে অবহেলা করেন, কিন্তু পরে তা গুরুতর অবস্থায় পৌঁছে যায়।

আধুনিক ব্যাখ্যা: শুধুই বয়স নয়

একসময় মনে করা হতো স্পন্ডাইলোসিস শুধু বয়সজনিত সমস্যা। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, এটি মূলত ‘lifestyle disease’ বা জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের যুগে ২৫-৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যেও স্পন্ডাইলোসিসের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।

রোগ নির্ণয়

স্পন্ডাইলোসিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষার সাহায্য নেন। যেমন—

  • এক্স-রে
  • এমআরআই (MRI)
  • সিটি স্ক্যান

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে মেরুদণ্ডের ক্ষয়, ডিস্কের অবস্থান এবং স্নায়ুর ওপর চাপের মাত্রা নির্ণয় করা হয়।

চিকিৎসা: ধাপে ধাপে সমাধান

স্পন্ডাইলোসিসের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের তীব্রতা ও উপসর্গের ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব।

১. ওষুধ

ব্যথা কমানোর জন্য পেইনকিলার, মাংসপেশি শিথিলকারী ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

২. ফিজিওথেরাপি

এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি করলে মাংসপেশি শক্তিশালী হয় এবং ব্যথা কমে।

৩. জীবনযাত্রার পরিবর্তন

সঠিক ভঙ্গিতে বসা, দাঁড়ানো ও হাঁটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. ব্যায়াম

নিয়মিত ব্যায়াম মেরুদণ্ডের নমনীয়তা ও শক্তি বাড়ায়।

৫. সার্জারি

যখন স্নায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং অন্যান্য চিকিৎসায় কাজ হয় না, তখন অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।

প্রতিরোধ: সচেতন থাকলেই সম্ভব

স্পন্ডাইলোসিস পুরোপুরি প্রতিরোধ করা না গেলেও সচেতনতার মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

  • সঠিক ভঙ্গিতে বসুন ও কাজ করুন
  • প্রতি ৩০-৪০ মিনিট পরপর বিরতি নিন
  • নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
  • শক্ত ও সমতল বিছানায় ঘুমান

তরুণদের জন্য বিশেষ বার্তা

বর্তমান প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। মোবাইল ও ল্যাপটপের অতিরিক্ত ব্যবহার তাদের মেরুদণ্ডের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’ এখন একটি পরিচিত সমস্যা, যা মূলত ঘাড়ের স্পন্ডাইলোসিসের একটি আধুনিক রূপ।

তাই তরুণদের এখনই সচেতন হতে হবে। আজকের অবহেলা ভবিষ্যতে স্থায়ী অক্ষমতার কারণ হতে পারে।

নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকি

নারীদের মধ্যে বিশেষ করে মেনোপজের পর হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়, যা স্পন্ডাইলোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া গৃহস্থালির কাজের সময় ভুল ভঙ্গি ও অতিরিক্ত চাপও একটি কারণ।

গ্রামীণ ও শহুরে প্রেক্ষাপট

গ্রামে শারীরিক পরিশ্রম বেশি হলেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, শহরে সচেতনতা কিছুটা বেশি হলেও জীবনযাত্রা অত্যন্ত অনিয়মিত। ফলে দুই ক্ষেত্রেই স্পন্ডাইলোসিস একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্পন্ডাইলোসিস কোনো ভয়াবহ রোগ নয়, কিন্তু অবহেলা করলে এটি জীবনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করতে পারে। এটি আমাদের শরীরের একটি সতর্ক সংকেত, যা আমাদের জীবনযাত্রার ত্রুটিগুলো নির্দেশ করে।

সুতরাং, চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা ও প্রতিরোধ। আমরা যদি এখনই সঠিক অভ্যাস গড়ে তুলি, তাহলে ভবিষ্যতে এই নীরব যন্ত্রণার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবো।

ঘাড় ও কোমরের ব্যথাকে কখনোই হালকাভাবে নেবেন না। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, সুস্থ থাকুন, কর্মক্ষম থাকুন— এই প্রত্যাশাই রইল।

লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যশোর

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদের শেনজেনভুক্ত দূতাবাসগুলোর সতর্কবার্তা

যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শেনজেনভুক্ত কোনো দেশে অবস্থান করলে সেই দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। এজন্য বিজ্ঞপ্তিতে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা ও প্রত্যাখ্যান এড়াতে নাগরিকদের ভিসার নিয়মকানুন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

২ ঘণ্টা আগে

বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে ঢাকায় আসছে মার্কিন প্রতিনিধিদল

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ঢাকায় আসছেন মার্কিন অ্যাসিস্ট্যান্ট ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়া ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল।

২ ঘণ্টা আগে

মহাসড়কগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে: সড়কমন্ত্রী

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি বলেছেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাতীয় মহাসড়কগুলোকে পর্যায়ক্রমে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। এরপর আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোকে এই পর্যায়ক্রমে আনতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি।

৩ ঘণ্টা আগে

শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কাজ করছে: আইনমন্ত্রী

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

৩ ঘণ্টা আগে