প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মুখেই এনসিটি পরিচালনার ভার পেল ডিপি ওয়ার্ল্ড

নানা পক্ষের বিরোধিতা ও বিক্ষোভের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড। বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৫ বছরের জন্য কনসেশন চুক্তি সই হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে কোম্পানির চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম চুক্তিতে সই করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, ঢাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

চুক্তি সইয়ের আগে বেলা ২টা থেকে এর বিরোধিতায় ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এ কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
শান্তিপূর্ণ এ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করেছে বলে অভিযোগ করেন সিপিবির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন। পুলিশের লাঠিচার্জের সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনসহ দলের বহু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।

পরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে মঞ্জুর মঈন লেখেন, ‘সিপিবি সভাপতিকে মেরে আহত করার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান সরকার রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহারের যে যাত্রা শুরু করলো তার একটাই পরিণতি। মানুষের ঘৃণার সাগরে পতিত হয়ে সমাপ্তির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া।’
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। টার্মিনালটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পিপিপি ও সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) বিভিন্ন কাঠামোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আবার এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ নিয়ে চুক্তির আলোচনা জোরালো হলে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে অন্তর্বর্তী সরকার।
এরপর বিএনপির নতুন সরকার গত ৪ জুন ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। সরকারের নির্দেশনার পর আলোচনা প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিমও গঠন করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিরোধিতায় কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে বন্দর রক্ষা কমিটি। এর মধ্যে গণঅনশন ও বিক্ষোভ মিছিল রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে একই দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা পরিষদ।
সরকারের যুক্তি, বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালিত হলে বন্দরের কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়বে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্রুত হবে। এর পাশাপাশি লজিস্টিকস ও বন্দর অবকাঠামো খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি ও প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনবলের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, এনসিটি বিদেশি কোম্পানির হাতে গেলে চট্টগ্রাম বন্দর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে এবং দক্ষ কর্মশক্তি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এর পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন। বহুজাতিক কোম্পানিকে ইজারা দিলে সরকার সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত হবে, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাবে এবং ‘কনসেশন’ চুক্তির কারণে বিপজ্জনক পণ্য খালাসের আশঙ্কাও রয়েছে বলে তাদের দাবি।

-dde4e8.jpg)
















