ভোরে প্রশ্নপত্র পান এনবিআরের ২ কর্মী, পরে ছড়িয়ে পড়ে উত্তরসহ: এসআরবি

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুই কর্মচারীর কাছে ভোরেই প্রশ্নপত্রের ছবি পৌঁছেছিল। প্রথমে অস্পষ্ট ছবি পেলেও পৌনে দুই ঘণ্টা পর একই প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পান তাদের একজন। পরে প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করে তা চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাদের মাধ্যমে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে যায় সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী এবং গ্রাহকদের হাতে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনের কথোপকথন ও তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের এমন চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এ ঘটনায় গত তিন দিনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে এনবিআর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন— এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮) ও এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩) এবং চক্রের দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন।
অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ ও বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র ও চার হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
প্রশ্নফাঁসের পর ছায়া তদন্ত
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্য পদের নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। এতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ঘটনার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি। ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। এরপর প্রশ্নপত্রের উৎস, সরবরাহকারী, মধ্যবর্তী বিতরণকারী ও গ্রাহকদের শনাক্ত করতে অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটির গোয়েন্দা দল। তদন্তে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ওই সময় পরীক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ তদন্তে শনিবারই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে শুক্রবার নতুন করে ওই নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান
এসআরবির অধিনায়ক ফায়েজুল আরেফীন জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে তাকে আরও দুজনের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার মফিজুল একজন চাকরিপ্রার্থী। একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি এই চক্রে যুক্ত হন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
তাদের দেওয়া তথ্য ও মুঠোফোনের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে চক্রের অন্য সদস্যদের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে উত্তরখান থেকে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং মিরপুর-১০ এলাকা থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মুঠোফোনের চ্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার সাভার থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে শুক্রবার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ফাঁস হওয়া প্রশ্ন থেকে উত্তরপত্র, পরে বিতরণ
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনে পাওয়া বার্তা বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও বিতরণের ধারাবাহিকতা শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে এসআরবি। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি আসে। সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পাঠান এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর।
এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তার সহকর্মী ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান। পরবর্তী সময়ে চক্রের সদস্যদের নিজস্ব প্রার্থী এবং প্রশ্নপত্র বিতরণের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় আসাদুল ইসলাম, রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও লেনদেন করতেন। পরিচিত প্রার্থীদের কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো। কতজনের কাছে প্রশ্ন বিক্রি করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা।
এসআরবির ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো।
তবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এনবিআরের দুই কর্মচারী কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদে সে বিষয়ে তারা সন্তোষজনক জবাব দেননি বলে জানিয়েছে এসআরবি। এ ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ জড়িত কি না, এমন প্রশ্নে এসআরবি কর্মকর্তা ফায়েজুল আরেফীন বলেন, তদন্ত শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।

-9b3b1c.jpg)
















-dc8cd9-256x144.webp)

