ড. ইউনূসের আমলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নে মুখোমুখি মতিউর রহমান-শফিকুল আলম

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে তা নিয়ে মুখোমুখি হয়ে পড়েছেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান এবং ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের দায়িত্বে ছিলেন।
মতিউর রহমানের বক্তব্যেই আলোচনার সূত্রপাত, যেখানে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার অভিযোগ তোলেন। বলেন, সে সময় ভয়ের পরিবেশের মধ্যে গণমাধ্যমকে কাজ করতে হয়েছে। ওই সময় প্রেস সচিবের দায়িত্বে থাকা শফিকুল আলম তার এ বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মতিউর রহমান গণমাধ্যমে ওই সময়ের ভয়ের সংস্কৃতি নিয়ে সত্য গোপন করেছেন। তিনি যে সরকারের অংশ ছিলেন সেই অন্তর্বর্তী সরকার কোনো গণমাধ্যমকে চাপ দেয়নি।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান এবং ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, অধ্যাপক ইউনূসের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বহুল পরিচিত। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও পরিচালনায় মতিউর রহমানের ভূমিকা থাকার বিষয়টি আলোচিত হলেও এ-সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ নেই।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় সংবাদমাধ্যম দুটি।
‘ভারতীয় দালাল’ আখ্যা দিয়ে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে হামলাযোগ্য করে তুলতে ক্রমাগত উসকানি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর প্রচার হওয়ার পর গভীর রাতে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় পত্রিকা দুটি।
ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে: মতিউর রহমান
রোববার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে বক্তৃতা দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত। জুলাই অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন হলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি।
মতিউর রহমান বলেন, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশবাসীকে অনেকটা হতাশ করেছে। তখন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন ছিল। ওই সময় নানা চাপ ও ভয়ের মুখে অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মালিকানা বদলেছে, অনেক সম্পাদকের জায়গায় নতুন কেউ এসেছেন, আর অনেক সাংবাদিককে কাজ ছাড়তে হয়েছে।

প্রথম আলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পত্রিকাটির সম্পাদক বলেন, পুরো সময় ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকি ছিল। দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশ থেকে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোর অফিসের সামনে প্রায় সাত দিন বিক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল জনতা রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আগুন দেয়। আগুনে দুটি সংবাদমাধ্যমের কোনো কর্মী হতাহত না হলেও অনেকে ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
মতিউর রহমানের অভিযোগ, সে সময় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সময়মতো ও যথেষ্ট শক্তি নিয়ে এগিয়ে যায়নি। দায়িত্বশীলরা তাদের সরাসরি কঠোর নির্দেশ দেননি। এরপর ডেইলি স্টারের কার্যালয়ও অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।
মতিউর রহমান সত্য এড়িয়ে গেছেন: শফিকুল আলম
মতিউর রহমানের এমন বক্তব্যের একদিন পর আজ মঙ্গলবার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে কড়া সমালোচনা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের দায়িত্বে থাকা শফিকুল আলম। তার বক্তব্যে ‘গুরুতর আংশিক সত্য, ভুল তথ্য এবং বিভ্রান্তিকর মন্তব্য রয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুল আলম লিখেছেন, ভয়ের পরিবেশের প্রসঙ্গে মতিউর রহমান স্পষ্টতই সত্য এড়িয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার কখনো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেনি, কোনো সংবাদপত্র বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি কিংবা কোনো সংবাদ প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলার নির্দেশও দেয়নি (কয়েকটি ক্ষেত্রে আমরা স্থানীয় গণমাধ্যমকে মিথ্যা বা ভুল তথ্যসম্বলিত প্রতিবেদন সংশোধনের অনুরোধ করেছি)।
তিনি লিখেছেন, হাসিনা সরকারের সময় যেসব গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ ছিল, এমনকি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি গণমাধ্যমে জোর করে আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও ছিল, সেসব সংস্থাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব না করার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সংবাদপত্র, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম যেকোনো বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও সরকারের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল বলে ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন শফিকুল আলম।

তিনি লিখেছেন, আমরা দেখেছি, ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ ও টক শো অতিথিরা কোনো বাধা ছাড়াই মিথ্যা ও ভুল তথ্য প্রচার করেছেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ উদ্যোগগুলো সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অবাধ সুযোগ ছিল। তবু অন্তর্বর্তী সরকার এসব বিষয়ে কখনো আদালতের আশ্রয় নেয়নি কিংবা মিথ্যা ও অসত্য প্রচারকারীদের টেলিভিশন বা সংবাদপত্রে বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করতে কোনো গণমাধ্যমকে ফোন করে নির্দেশ দেয়নি।
কিছু গণমাধ্যম জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের প্রকাশ্যে ‘উগ্রপন্থি’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের চাপের মুখে ছিল বলে পোস্টে উল্লেখ করেছেন সাবেক এই প্রেস সচিব। লিখেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার কি কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করেছিল? না। বরং হাসিনা সরকারের সময় বন্ধ করে দেওয়া সংবাদ ও টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ দিয়েছিল।
জুলাইয়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে অনেক গণমাধ্যম শেখ হাসিনা ও তার দলের তোষামোদ করেছে বলে সমালোচনা করেছেন শফিকুল আলম। লিখেছেন, এখন এসব সাংবাদিক ও গণমাধ্যম মালিক নিজেদের ইতিহাসের ভুল পাশে দেখতে পাওয়ায় শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছেন, বিতর্কিত আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়েছেন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে জুলাইয়ের ঘটনাবলির উপস্থাপনায় প্রকাশ্য পরিবর্তন এনেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার কি গণমাধ্যম মালিকদের এসব পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিল?— এমন প্রশ্ন রেখে নিজেই উত্তর দিয়েছেন শফিকুল আলম, ‘না, দেয়নি। মালিকেরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় এসব পরিবর্তন করেছেন।’
শফিকুল আলমের দাবি, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গণমাধ্যমের মালিকরা শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো হাত নেই। তিনি লিখেছেন, ‘মালিকরা স্বাধীনভাবে এসব পরিবর্তন করেছেন— এ বিষয়টি সম্পাদক মতিউর রহমান খুব ভালোভাবেই জানেন, যদিও তিনি এ নিয়ে লিখতে চান না।’
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে পুলিশের ঠেকানো উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেস সচিব। ওই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। হামলা ঠেকাতে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সরাসরি ও কার্যকর নির্দেশনা’ দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন— মতিউর রহমানের এই দাবির ভিত্তি এখনো স্পষ্ট নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শফিকুল আলম লিখেছেন, ‘উভয় সংবাদপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছিল এবং সামরিক কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করে দ্য ডেইলি স্টারের আটকে পড়া সাংবাদিকদের নিরাপদে বের করে আনেন।’
















