সরকার পরিবর্তনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উন্নয়নের সুর

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। প্রতীকী ছবি

২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে যে কম্পন তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক বলয় ভেঙে যাওয়ায় দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে তৈরি হয়েছিল অবিশ্বাসের এক বিশাল পাহাড়। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দুয়েকবার উষ্ণতার আভাস মিললেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বরফ গলেনি।

দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েন শেষে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সে অবিশ্বাসের পাহাড় গলতে শুরু করেছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, যিনি সিলমোহরযুক্ত চিঠিতে বয়ে এনেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছাবার্তা।

নতুন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে দুই দেশের মধ্যে ‘মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক’ অব্যাহত রাখার বক্তব্য এসেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় দিল্লিতে খুলেছে ভিসা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার তালা। সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের ইঙ্গিতই মিলছে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর। দিল্লিও হয়তো পুরনো একমুখী নীতি থেকে সরে এসে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে এগিয়ে আসবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘ভারতের লোকসভার স্পিকারের উপস্থিতি বা নরেন্দ্র মোদির চিঠির মতো বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয় যে তারা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে যেতে চায়।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুন্সী ফয়েজ আহমেদও বলেছেন, দুই দেশের ‘বৈরী’ সম্পর্কের কারণে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সংক্ষেপ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থন দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর সে সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে থাকে। ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর দুই সরকারপ্রধানই সে সম্পর্ক ‘নতুন উচ্চতা’য় উন্নীত করেন।

বিশ্লেষকদের অভিমত, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হলেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই ভারত একচেটিয়া সুবিধা পেয়ে এসেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-বাণিজ্য খাতে দুই দেশের মধ্যে এমন অনেক চুক্তি হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলেও ভারতের স্বার্থ নিশ্চিত হয়েছে। এসব কারণে সরকারি পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের বিপরীতে ভারতবিরোধী জনমতও একই সময়ে প্রবল হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রভাবশালী নেতাদের বড় অংশও ভারতে আশ্রয় নেন। যুবলীগ, ছাত্রলীগের অনেকেরও ঠাঁই হয় ভারতে। এ সময় দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হতে থাকে।

শেখ হাসিনা ইস্যু ও কূটনৈতিক স্থবিরতা

শেখ হাসিনাকে ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চার করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তাকে দিল্লি থেকে ফিরিয়ে আনার দাবিও ওঠে।

বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড সাজা দিলে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে প্রত্যর্পণ নিয়ে বহু আলোচনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি চালাচালি করলেও ভারত এ বিষয়ে সাড়া দেয়নি। তাতে সম্পর্কের শীতলতা বাড়তে থাকে দুই দেশের মধ্যে।

ভারতের গণমাধ্যম ও প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ

জুলাই-পরবর্তী সময়ে ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অতিরঞ্জিত এবং বিপুল পরিমাণে বানোয়াট প্রতিবেদনও প্রচারিত হয়েছে। নানা ধরনের ভুয়া তথ্য ও গুজবও প্রচার করা হয়েছে এসব গণমাধ্যমে। তা বাংলাদেশের জনমতকে ভারতের বিরুদ্ধে আরও উসকে দেয়। এই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনাকে আরও বাধাগ্রস্ত করেছে।

তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। ছবি: সংগৃহীত
তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। ছবি: সংগৃহীত

সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বিদ্যুৎ

দুই দেশের সম্পর্ক যখন তলানির দিকে, এমন সময়েও সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আকস্মিক বন্যার সময় ভারতের ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ খুলে দেওয়ার অভিযোগ। ভারত সে অভিযোগ অস্বীকার করলেও জনমনে অবিশ্বাসের বীজের অঙ্কুরোদ্গম থামেনি।

আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরবরাহ কমানোর হুমকি এবং বকেয়া টাকা নিয়ে দিল্লির কঠোর অবস্থানকেও ঢাকার নতুন নেতৃত্বের ওপর এক ধরনের ‘ইকোনমিক ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

হাদি হত্যা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

বাংলাদেশের ও ভারতের মধ্যেকার সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায় গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যার পর। ওই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত ফয়সালের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য ছড়িয়ে পড়লে ভারতবিরোধী ‘সেন্টিমেন্ট’ প্রকট আকার ধারণ করে।

এদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় ব্যাপক নির্যাতনের শিকার— এমন খবরে ভারতেও বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদি সিঙ্গপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। সে দিন রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু দাস নামে এক পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে তার মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনা ভারতে অনেক বেশি ফলাও করে প্রচার করা হয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের নজির হিসেবে।

দুই দেশেই অন্য দেশের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বাতাবরণে দেশে ভারতীয় হাইকমিশনগুলোর সামনে বিক্ষোভ হয়। ভারতের বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর সামনে নানা কর্মসূচি পালন করে উগ্রবাদী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। একপর্যায়ে দুই দেশেই দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম থমকে যায়, বন্ধ হয়ে যায় ভিসা পরিষেবা।

তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি। ছবি: এক্স থেকে
তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি। ছবি: এক্স থেকে

নতুন সরকারে সম্পর্কে উষ্ণতার আভাস

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যখন ‘অমোচনীয় দূরত্বে’ উপনীত হতে চলেছে মনে হচ্ছিল, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এর শুরুটা অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে থাকতেই, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ঘিরে। ৩১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার জানাজার দিন তাকে শেষ বিদায় জানাতে ঢাকায় হাজির হন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন ভারত সরকারের সমবেদনার বার্তা।

মাস দেড়েক পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শপথ নেওয়ার পর তাকে প্রথম যারা শুভেচ্ছা-অভিনন্দন জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সরাসরি তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনেই কথা বলেছেন তিনি। তারেকের শপথে নিজে আসতে না পারলেও পাঠিয়েছেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে।

এর মধ্যে দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ভিসা পরিষেবা চালু করেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, তাদের দূতাবাসগুলোও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা চালু করবে শিগগিরই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এসেছে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা। তাতে মিলেছে সম্পর্কোন্নয়নের আভাস।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুন্সী ফয়েজ আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘চাইলেই যেকোনো দেশকে হয়তো এড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিবেশী দেশকে ফেলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সঙ্গে ভারতের যে বৈরী সম্পর্ক ছিল, তার কারণে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সময় এসেছে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নতুন কিছু গড়ে তোলার। দুই দেশের সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকাণ্ডেও তার ইঙ্গিত রয়েছে।’

দিল্লির ইউ-টার্ন: কেন এখন উন্নয়নের সুর?

শুক্রবার দিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ‘প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বাংলাদেশের কথা বলেছেন। জানিয়েছেন বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতায় ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যেকার ‘বহুমাত্রিক’ সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশার কথা।

জয়সওয়াল বলেন, ‘তারেক রহমানকে দেওয়া নরেন্দ্র মোদির চিঠিতে একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করার প্রতি ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। দুই দেশের উষ্ণ ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।’

ভারতের এ পরিবর্তন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারত একতরফা সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, যেখানে ভারতের স্বার্থ যতটা রক্ষা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বার্থ ততটা হয়নি। তারা শুধু একটি বিশেষ ঘরানার সঙ্গে সম্পর্ক করেছে, জনগণের সঙ্গে নয়।’

“ফলে এ দেশের মানুষ বিচ্ছিন্নতা বোধ করেছে। এখন এ সমালোচনা দূর করার দায়িত্ব ভারতেরই। তারা মুখে ‘জনগণকেন্দ্রিক” সম্পর্কের কথা বললেও তাদের বুঝতে হবে, একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে তা সবসময়ই নতুন নতুন সমস্যার জন্ম দেয়,”— বলেন ড. ইমতিয়াজ।

ভিসা ও কানেক্টিভিটি: আস্থার নতুন দুয়ার

দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ভারতীয়দের ভিসা দিতে শুরু করেছে। একই দিনে সিলেটে ভারতের মিশনের জ্যেষ্ঠ কনস্যুলার কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ দাস সাংবাদিকদের বলেন, ভিসা পরিষেবা পূর্ণমাত্রায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। বর্তমানে মেডিকেল ও ডাবল-এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হচ্ছে। পর্যটনসহ অন্যান্য ভিসা শিগগির চালু করা হবে।

অনিরুদ্ধ দাসের বক্তব্য ও পূর্ণমাত্রায় ভিসা চালুর ঘোষণা প্রমাণ করে, দিল্লি এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, যেখানে ‘পিপল টু পিপল কন্টাক্ট’ বা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা থাকতে পারে। সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, দুই দেশের ভিসা পরিষেবা স্বাভাবিক হয়ে এলে তা দুই দেশের অর্থনীতিতেই প্রাণ ফেরাবে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই অর্থনৈতিক দিক নিয়ে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের সার্থকতা নির্ভর করে অর্থনৈতিক প্রাপ্তির ওপর। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যদি একতরফা হয় বা তাতে বাংলাদেশের লোকসান হয়, তবে জনগণ তা মেনে নেবে না।’

ঘটনাপ্রবাহ যেমনই হোক, সরকারকে ধীরেসুস্থে পদক্ষেপ নিতেই আহ্বান জানাচ্ছেন এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের বিষয়ে বলব, কেবল তো সাত দিন হলো তারা এসেছে। এখনই সব বদলে ফেলার জন্য অস্থির হওয়া চলবে না। আরও সময় দিতে হবে।’

সমমর্যাদার কূটনীতি

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মর্যাদার বিষয়টি সবসময়ই ঘুরেফিরে এসেছে। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতেও সে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা সবার।

নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও বলেছেন একই কথা। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে সব দেশের সঙ্গে সমমর্যাদা নিয়ে। সব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে, বন্ধুত্ব থাকবে; কিন্তু সেটা হবে সমতার ভিত্তিতে, পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে।’

নতুন সরকারের সড়ক-রেলসহ যোগাযোগ খাতের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বন্ধ থাকা রেল যোগাযোগ চালুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ আবার চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দেশের স্বার্থ বিবেচনায় ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’

এ বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গতি পাওয়ার পাশাপাশি মর্যাদাপূর্ণ হবে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুন্সী ফয়েজ আহমেদ।

রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার— ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে, সেটি একান্তই দুই দেশের নিজস্ব বোঝাপড়ার ভিত্তিতে হতে হবে। আমাদের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সম্পর্ক কেমন হবে, সেটি ভারতের সঙ্গে বোঝাপড়া করে বা তাদের কথা চিন্তা করে নির্ধারিত হবে না। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।’

‘ভারতও এখন সম্ভবত বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে,’— যোগ করেন মুন্সী ফয়েজ।

আঞ্চলিক আধিপত্য বনাম দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ

বিগত দিনগুলোতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত এক ধরনের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করেছে বলে জনমনে ধারণা ছিল। বিশেষ করে চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের অস্বস্তি ছিল প্রকাশ্য। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের ইস্যুতে আলোচনা হলেও প্রভাব বিস্তারের পক্ষপাতী নন বিশেষজ্ঞরা।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘ভারত প্রায়ই এই সম্পর্কের মধ্যে বেশি সুবিধা নেয় এবং অন্য দেশের সঙ্গে, বিশেষ করে চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে নাক গলায়। এটি বন্ধ করতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেমন কেবল দ্বিপাক্ষিক, তেমনি পাকিস্তান বা অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও হবে দ্বিপাক্ষিক, যা ভারতের সঙ্গে বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে না।’

‘এই স্বতন্ত্র অবস্থানকে বারত কীভাবে গ্রহণ করে, সেটি একটি চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেশীকে তো পরিবর্তন করা যায় না। তাই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে এবং সে সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ। নতুন করে সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রেও ভারতকে এটি বুঝতে হবে,’— বলেন ড. ইমতিয়াজ।

জনগণের প্রত্যাশা ও ধৈর্য

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নতুন সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া বড় ইস্যু হলেও একমাত্র নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাকে শাস্তি দেওয়ার জনদাবি রয়েছে এবং আমরা মনে করি ভারতের উচিত তাকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা। কিন্তু শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে না পাঠালেও তা বাণিজ্য সম্পর্কসহ বৃহত্তর সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা হবে না। আমরা আরও ভালো সম্পর্ক গড়তে চাই।’

নতুন সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বারবারই এমন ‘মর্যাদাপূর্ণ’ সম্পর্কের কথা বলা হলেও ধীরে চলো নীতি অবলম্বনের পক্ষেই মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘আবেগে গা ভাসানো চলবে না’ উল্লেখ করে মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘নতুন যে নেতৃত্ব এসেছে, তারা যেন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সচেতনভাবে রক্ষা করেন, আমরা সেটাই চাই। একে অন্যকে দোষারোপ না করে কীভাবে অবস্থার উন্নতি করা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে।’

একই আহ্বান ড. ইমতিয়াজ আহমেদও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়া করার দরকার নেই। আমরা যা কিছু অর্জন করতে চাই, তা রাতারাতি সম্ভব নয়। নতুন যে নেতৃত্ব এসেছে, তারা যেন অত্যন্ত সচেতনভাবে দেশের স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করেন।’

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

নাগরিক সেবা সহজ ও কার্যকর করতে জনতা ব্যাংক-ডিএসসিসির চুক্তি

নাগরিক সেবা আরও সহজ ও কার্যকর করতে জনতা ব্যাংক পিএলসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মধ্যে নাগরিক সেবা বিষয়ক একটি সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) সই হয়েছে। আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এ সমঝোতা স্মারক সই হয়।

১০ ঘণ্টা আগে

ঢাকার বনানীতে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন ভিসা আবেদন কেন্দ্র চালু

বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা আবেদনকারীদের জন্য ঢাকায় নতুন ভিসা আবেদন কেন্দ্র চালু করেছে ভিএফএস গ্লোবাল। আজ বুধবার রাজধানীর বনানীতে কেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয়। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আবেদনকারীরা অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এই কেন্দ্রে ভিসার আবেদন জমা দিতে পারবেন।

১০ ঘণ্টা আগে

কওমি মাদরাসার জন্য ৬ শিক্ষা বোর্ড গঠনের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে এসব বোর্ডের সনদকে সরকারি ও বেসরকারি মাদরাসার দুটি নির্দিষ্ট পদে নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও সংসদকে জান

১১ ঘণ্টা আগে

দাম কমেছে এলপিজির, বেড়েছে সয়াবিনের

এলপিজির দামে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সয়াবিন তেলের দামে বাড়ল চাপ। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অন্যদিকে বোতলে ভরা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা করা হয়েছে।

১২ ঘণ্টা আগে
Advertisement