কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ‘গণতান্ত্রিক মাইলফলক’, সংস্কারের তাগিদ দিয়ে ৬৪ সুপারিশ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ। কোলাজ: কমনওয়েলথের লোগো ও ভোট গ্রহণের লাইন

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের গণভোটকে দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ। তবে একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করা, আইনের শাসন সুদৃঢ় করা, নারী ও তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

সোমবার (১৫ জুন) ৯৭ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব মূল্যায়ন ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি সব মিলিয়ে চূড়ান্ত এ প্রতিবেদনে ৬৪টি সুপারিশ তুলে ধরেছে।

ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আদ্দোর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের এই পর্যবেক্ষক দল গত ৪ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অবস্থান করে নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি, ভোটগ্রহণ, গণনা ও নির্বাচন-পরবর্তী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। এ সময় তারা তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও প্রধান নির্বাচন কমিশনার, প্রধান বিচারপতি, সেনাপ্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে। পর্যবেক্ষকরা দেশের আটটি বিভাগে গিয়ে ভোটগ্রহণ ও ফল ব্যবস্থাপনাও সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর এক বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ওই আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এই সরকারের চারটি প্রধান দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা পুনর্প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদবিষয়ক গণভোট আয়োজন।

পর্যবেক্ষক দল বলেছে, এই নির্বাচন ছিল শুধু সরকার গঠনের ভোট নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল নির্বাচন

কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপের মূল্যায়নে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিয়ে আগে থেকেই সংশয় ছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার বিষয়টি এসব প্রশ্নকে উসকে দিয়েছিল। তবে এসব প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও তারা ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফল ব্যবস্থাপনাকে পেশাদার, সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।

প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশন, ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রশংসা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য বাংলাদেশের জনগণেরও প্রশংসা করেছে পর্যবেক্ষক দল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপের চেয়ার ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডো। ছবি: কমনওয়েলথ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপের চেয়ার ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডো। ছবি: কমনওয়েলথ

নতুন প্রযুক্তি ও ডাক ভোটের প্রশংসা

প্রতিবেদনে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি নতুন উদ্যোগকে বিশেষভাবে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে প্রবাসী বাংলাদেশি ও আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ডাক ভোট চালু করা। এ পদ্ধতির আওতায় বিশ্বের ১২২টি দেশে অবস্থানরত প্রায় সাত লাখ ৭২ হাজার প্রবাসী ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি নির্বাচনি অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

এ ছাড়া নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ নিবন্ধিত ভোটার অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, যা ২০২৬ সালে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক আয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ১০ লাখ সদস্যের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি ড্রোন, বডি-ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি ও বিশেষ সাইবার নিরাপত্তা সেলের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভোটের সার্বক্ষণিক তদারকি করা হয়। পর্যবেক্ষক দলের মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া এসব ব্যবস্থা নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

গণভোট নিয়ে সচেতনতার ঘাটতি

সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গণভোটে চার কোটি ৭২ লাখের বেশি ভোট পড়ে এবং প্রস্তাবটি ৬১ দশমিক ৬৪ শতাংশ সমর্থন পায়।

তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা ছিল না। পাশাপাশি জুলাই সনদ প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা তুলনামূলক সীমিত ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নারী ও তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৪ শতাংশ। সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন নারী। ফলে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

এ জন্য সংস্থাটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নারী প্রার্থীর বাধ্যতামূলক কোটা নির্ধারণ, নির্বাচনি প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নারীদের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।

একইভাবে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটার দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রার্থী হিসেবে তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত। রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তরুণদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করেছে কমনওয়েলথ।

প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি

প্রতিবেদনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য প্রথমবারের মতো ব্রেইল ব্যালট চালু করাকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছে কমনওয়েলথের এই পর্যবেক্ষক দল। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ভোটারদের সহায়তায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের উদ্যোগের প্রশংসা করা হলেও অনেক ভোটকেন্দ্র এখনো শারীরিকভাবে পুরোপুরি প্রবেশযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ কারণে ভবিষ্যতে সব ভোটকেন্দ্রে র‌্যাম্প, বড় অক্ষরের নির্দেশিকা, সাংকেতিক ভাষার সহায়তা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে পর্যবেক্ষক দল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিল কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ। ছবি: কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিল কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ। ছবি: কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ

গণমাধ্যম ও ডিজিটাল পরিবেশ

কমনওয়েলথের পর্যবেক্ষণ, নির্বাচনি প্রচারে গণমাধ্যমের পরিবেশ আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় বেশি উন্মুক্ত ছিল। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টেলিভিশন তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ প্রচার করেছে।

তবে একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনি বিধিনিষেধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কয়েকটি গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার ঘটনা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ছাড়া তথ্যযুক্তি আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের কারণে সংবাদমাধ্যমের ওপর একটি ‘চাপের পরিবেশ’ (মিডিয়া চিল) তৈরি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্স নির্বাচনি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। তবে একই সঙ্গে এসব মাধ্যমে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের গঠিত মিডিয়া মনিটরিং ও সাইবার ইউনিটকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ও আইনের শাসন শক্তিশালী করার আহ্বান

প্রতিবেদনের সুপারিশে নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও কার্যক্ষমতা আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা, নির্বাচনি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল গঠন, ভোটার শিক্ষার পরিধি বাড়ানো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আরও সমতাভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে কমনওয়েলথ।

প্রতিবেদন প্রকাশ করে কমনওয়েলথের মহাসচিব শার্লি বচওয়ে বলেন, বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়া দেশটির জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

৬ শিশুমৃত্যুর ঘটনায় শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতক ও শিশুদের জন্য নিরাপদ চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। অক্সিজেন প্রবাহের জন্য ভেন্টিলেশন ব্যবস্থাও ছিলো না হাসপাতালটিতে। নবজাতকদের শ্বাসকষ্ট হলেও, কোনো ডাক্তার তখন দায়িত্বে ছিলেন না। ডেকেও নার্সদের সাড়া মেলেনি।

৩ ঘণ্টা আগে

রাজশাহীর আমের হাটে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নিলেন তাজা আমের স্বাদ

৩ ঘণ্টা আগে

দিল্লি বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল, সংবাদ সম্মেলনে জানালেন তথ্য উপদেষ্টা

দিল্লিতে হেনস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সেখানে আমাকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। একটা জায়গায় বসতে দেয়া হয়েছিল। ওখানে কোনো রুমে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছে, এটা একদম ভুল কথা।

৪ ঘণ্টা আগে

মহাখালীতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ

৬ ঘণ্টা আগে