
কার্ত্তিক দাস, নড়াইল

একসময়কার মেধাবী শিক্ষার্থী পলাশ দাস (ছদ্মনাম) ছিলেন জেলা ফুটবল দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে খেলা থেকে এখন তিনি বহু দূরে। ২৮ বছর বয়সী এই তরুণের দিনের অধিকাংশ সময় এখন কাটে নেশার ঘোরে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, পরিচিত কাউকে দেখলেই হাত পেতে ১০ টাকা চান। টাকা দিয়ে কী করবেন— জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেন না।
নড়াইল পৌরসভার বাসিন্দা পলাশের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, মাদকাসক্তির কারণে পলাশ মানসিক ভারসাম্য হারানোর পথে।
পলাশ একা নন, নড়াইল শহর থেকে শুরু করে উপজেলা ও গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণ ও মধ্যবয়সীদের একাংশও মাদকের ছোবলে আক্রান্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও জেলায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাত বাড়ালেই বিভিন্ন এলাকায় মিলছে মাদক। প্রায় প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক ব্যবসায়ী আটক হচ্ছে, জব্দ হচ্ছে গাঁজা, ইয়াবা, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।
সরেজমিনে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতা, গ্রাম্য মাতব্বর ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও তুলনামূলকভাবে কমে যায়। এ সুযোগে মাদক ব্যবসা নতুন করে বিস্তার লাভ করে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেক নারীও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। বর্তমানে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের অবস্থা ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’র মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের মতো রাতভর পুলিশি টহল বা মাদক পাচারের রুটে নিয়মিত চেকপোস্টও দেখা যায় না। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে।
মাদকের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন এলাকায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেছেন। সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির পাশাপাশি জনসমাগমস্থলে মাদকবিরোধী ব্যানারও টাঙানো হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে গণপিটুনির পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কোথাও কোথাও অভিযুক্তদের বাড়িঘর ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু মাদকের কালো ছায়া দূর করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদক ব্যবসায় জড়িত এক ব্যক্তি রাজনীতি ডটকমকে জানান, মাদক পাচারকারীরা নড়াইলকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। মাঝে মধ্যে পুলিশ বড় চালান আটক করলেও মাদকের প্রবাহ থামছে না।
ওই মাদক কারবারিরর দাবি, ঢাকা-বেনাপোল ভায়া নড়াইল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে কিছু তরুণকে মাসোহারা দিয়ে নজরদারির কাজে রাখা হয়েছে। তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে দামি মোবাইল ফোন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি নজরে রাখাই তাদের কাজ। তিনি বলেন, ‘সোর্সরাই এখন মাদক সাম্রাজ্যের সম্রাট।’
মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার অন্তত ১৮টি স্থানে নিয়মিত মাদক কেনাবেচা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু কথিত ছাত্র ও যুবনেতা অর্থায়নের মাধ্যমে এ ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কিছু জনপ্রতিনিধি, এবং এমনকি নারী চা বিক্রেতারাও এই অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
তাদের মতে, যশোর থেকে আসা মাদকের চালান নড়াইল হয়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। ফলে একদিকে নড়াইল যেমন মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে জেলা জুড়েই মাদকের ছোবল ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নড়াইল কার্যালয়ে মাদকসেবী বা মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। জেলার কোথায় কোথায় মাদক বিক্রি হয়, তা নিয়ে নেই কোনো তথ্যভাণ্ডার।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নড়াইল কার্যালয়ের উপপরিচালক গোলক মজুমদার জানালেন, এ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় যে তথ্যভাণ্ডার রয়েছে সেখানেও তারা ঢুকতে পারেন না। তিনি বলেন, ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিডিএমএস) মামলা দায়ের থেকে চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত নানা ধরনের তথ্য থাকে। কিন্তু তাতে কোনো প্রবেশাধিকার না থাকায় তদন্তে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
কার্যালয়ে জনবল ও যানবাহন সংকট রয়েছে জানিয়ে গোলক মজুমদার বলেন, জনবল ও পরিবহন সংকটের কারণে অভিযান পরিচালনায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারপরও আমরা বসে নেই। পরিবহন সমস্যা দূর হলে কার্যক্রম আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাড়তি জনবলের দাবি জানিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, দিনে দিনে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। একটি ইউনিটের জনবল দিয়ে পুরো জেলার মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উপজেলা পর্যায়েও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিস চালু করা প্রয়োজন।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে জেলায় ৮৮টি মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ সময় জব্দ করা হয়েছে—
গত ৪ মে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কালিয়া উপজেলার পাখিমারা গ্রামের একটি বাড়ির খাটের নিচ থেকে ৩৮ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী ওই বাড়িতে থেকেই মাদক বেচাকেনা করে থাকেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নড়াইল জেলা পুলিশের তথ্য, গত ১ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত মাদকসংক্রান্ত প্রায় ২৫টি মামলা হয়েছে। এ সময় ৫১ জন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৯ কেজি ৫৫৫ গ্রাম গাঁজা, ১ হাজার ৫২৯ পিস ইয়াবা, ৩৯ বোতল ফেনসিডিল এবং ৩৫ বোতল উইনসায়েক্স।
নড়াইলে প্রায় আট লাখ মানুষের বিপরীতে মোট পুলিশ সদস্য রয়েছেন ৮৯৯ জন। এর মধ্যে চারটি থানা, একটি ফাঁড়ি, পাঁচটি পুলিশ ক্যাম্প ও দুটি তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত আছেন ৪১৮ জন সদস্য।
নড়াইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. রকিবুল হাসান বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব, গ্রামীণ সংঘর্ষ ও বিভিন্ন ‘ভিআইপি প্রটোকল’ সামলাতে গিয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। তারপরও পুলিশ চেষ্টা করছে। কিন্তু মাদক যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, এই জনবল দিয়ে তার বিস্তার ঠেকানো মুশকিল।
রকিবুল হাসান আরও বলেন, ‘আরও বড় সমস্যা হচ্ছে— মাদক মামলায় কেউ সাক্ষী হতে চায় না। ফলে আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।’
শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে মাদকের বিস্তার রোধ করা যাবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সব ধরনের শ্রেণিপেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাখতে হবে বড় ভূমিকা।
নড়াইল সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. মনিরুজ্জামান মল্লিক বলেন, মাদক একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা, যা ব্যক্তি ও পরিবার তো বটেই, রাষ্ট্রের জন্যও মারাত্মক হুমকি। মাদকাসক্তি রোধে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব শিক্ষক ও অভিভাবকদের। এ বিষয়ে সবাইকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।

একসময়কার মেধাবী শিক্ষার্থী পলাশ দাস (ছদ্মনাম) ছিলেন জেলা ফুটবল দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে খেলা থেকে এখন তিনি বহু দূরে। ২৮ বছর বয়সী এই তরুণের দিনের অধিকাংশ সময় এখন কাটে নেশার ঘোরে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, পরিচিত কাউকে দেখলেই হাত পেতে ১০ টাকা চান। টাকা দিয়ে কী করবেন— জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেন না।
নড়াইল পৌরসভার বাসিন্দা পলাশের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, মাদকাসক্তির কারণে পলাশ মানসিক ভারসাম্য হারানোর পথে।
পলাশ একা নন, নড়াইল শহর থেকে শুরু করে উপজেলা ও গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণ ও মধ্যবয়সীদের একাংশও মাদকের ছোবলে আক্রান্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও জেলায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাত বাড়ালেই বিভিন্ন এলাকায় মিলছে মাদক। প্রায় প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক ব্যবসায়ী আটক হচ্ছে, জব্দ হচ্ছে গাঁজা, ইয়াবা, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।
সরেজমিনে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতা, গ্রাম্য মাতব্বর ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও তুলনামূলকভাবে কমে যায়। এ সুযোগে মাদক ব্যবসা নতুন করে বিস্তার লাভ করে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেক নারীও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। বর্তমানে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের অবস্থা ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’র মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের মতো রাতভর পুলিশি টহল বা মাদক পাচারের রুটে নিয়মিত চেকপোস্টও দেখা যায় না। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে।
মাদকের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন এলাকায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেছেন। সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির পাশাপাশি জনসমাগমস্থলে মাদকবিরোধী ব্যানারও টাঙানো হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে গণপিটুনির পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কোথাও কোথাও অভিযুক্তদের বাড়িঘর ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু মাদকের কালো ছায়া দূর করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদক ব্যবসায় জড়িত এক ব্যক্তি রাজনীতি ডটকমকে জানান, মাদক পাচারকারীরা নড়াইলকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। মাঝে মধ্যে পুলিশ বড় চালান আটক করলেও মাদকের প্রবাহ থামছে না।
ওই মাদক কারবারিরর দাবি, ঢাকা-বেনাপোল ভায়া নড়াইল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে কিছু তরুণকে মাসোহারা দিয়ে নজরদারির কাজে রাখা হয়েছে। তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে দামি মোবাইল ফোন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি নজরে রাখাই তাদের কাজ। তিনি বলেন, ‘সোর্সরাই এখন মাদক সাম্রাজ্যের সম্রাট।’
মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার অন্তত ১৮টি স্থানে নিয়মিত মাদক কেনাবেচা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু কথিত ছাত্র ও যুবনেতা অর্থায়নের মাধ্যমে এ ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কিছু জনপ্রতিনিধি, এবং এমনকি নারী চা বিক্রেতারাও এই অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
তাদের মতে, যশোর থেকে আসা মাদকের চালান নড়াইল হয়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। ফলে একদিকে নড়াইল যেমন মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে জেলা জুড়েই মাদকের ছোবল ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নড়াইল কার্যালয়ে মাদকসেবী বা মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। জেলার কোথায় কোথায় মাদক বিক্রি হয়, তা নিয়ে নেই কোনো তথ্যভাণ্ডার।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নড়াইল কার্যালয়ের উপপরিচালক গোলক মজুমদার জানালেন, এ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় যে তথ্যভাণ্ডার রয়েছে সেখানেও তারা ঢুকতে পারেন না। তিনি বলেন, ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিডিএমএস) মামলা দায়ের থেকে চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত নানা ধরনের তথ্য থাকে। কিন্তু তাতে কোনো প্রবেশাধিকার না থাকায় তদন্তে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
কার্যালয়ে জনবল ও যানবাহন সংকট রয়েছে জানিয়ে গোলক মজুমদার বলেন, জনবল ও পরিবহন সংকটের কারণে অভিযান পরিচালনায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারপরও আমরা বসে নেই। পরিবহন সমস্যা দূর হলে কার্যক্রম আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাড়তি জনবলের দাবি জানিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, দিনে দিনে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। একটি ইউনিটের জনবল দিয়ে পুরো জেলার মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উপজেলা পর্যায়েও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিস চালু করা প্রয়োজন।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে জেলায় ৮৮টি মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ সময় জব্দ করা হয়েছে—
গত ৪ মে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কালিয়া উপজেলার পাখিমারা গ্রামের একটি বাড়ির খাটের নিচ থেকে ৩৮ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী ওই বাড়িতে থেকেই মাদক বেচাকেনা করে থাকেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নড়াইল জেলা পুলিশের তথ্য, গত ১ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত মাদকসংক্রান্ত প্রায় ২৫টি মামলা হয়েছে। এ সময় ৫১ জন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৯ কেজি ৫৫৫ গ্রাম গাঁজা, ১ হাজার ৫২৯ পিস ইয়াবা, ৩৯ বোতল ফেনসিডিল এবং ৩৫ বোতল উইনসায়েক্স।
নড়াইলে প্রায় আট লাখ মানুষের বিপরীতে মোট পুলিশ সদস্য রয়েছেন ৮৯৯ জন। এর মধ্যে চারটি থানা, একটি ফাঁড়ি, পাঁচটি পুলিশ ক্যাম্প ও দুটি তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত আছেন ৪১৮ জন সদস্য।
নড়াইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. রকিবুল হাসান বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব, গ্রামীণ সংঘর্ষ ও বিভিন্ন ‘ভিআইপি প্রটোকল’ সামলাতে গিয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। তারপরও পুলিশ চেষ্টা করছে। কিন্তু মাদক যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, এই জনবল দিয়ে তার বিস্তার ঠেকানো মুশকিল।
রকিবুল হাসান আরও বলেন, ‘আরও বড় সমস্যা হচ্ছে— মাদক মামলায় কেউ সাক্ষী হতে চায় না। ফলে আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।’
শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে মাদকের বিস্তার রোধ করা যাবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সব ধরনের শ্রেণিপেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাখতে হবে বড় ভূমিকা।
নড়াইল সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. মনিরুজ্জামান মল্লিক বলেন, মাদক একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা, যা ব্যক্তি ও পরিবার তো বটেই, রাষ্ট্রের জন্যও মারাত্মক হুমকি। মাদকাসক্তি রোধে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব শিক্ষক ও অভিভাবকদের। এ বিষয়ে সবাইকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও রামগড় উপজেলায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি অভিযান পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। অভিযানে এক সশস্ত্র সংগঠনের সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আত্মসমর্পণ করেছেন আরও দুই সদস্য। উদ্ধার করা হয়েছে একাধিক অস্ত্র, ম্যাগাজিন ও গোলাবারুদ।
২ দিন আগে
নিহতদের একজন নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে এবং অন্যজন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস)- সশস্ত্র হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করেছে ইউপিডিএফ।
২ দিন আগে
দিনাজপুর সদর উপজেলার সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় চারজনকে আটক করেছে স্থানীয় এলাকাবাসী। আজ বুধবার ভোর ৬টার দিকে বনতারা-গিলাবাড়ি সীমান্ত এলাকায় তাদের আটক করা হয়।
২ দিন আগে
মামলার বাদী খোকন তালুকদার নিজেকে কুমিল্লা মহানগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিলেও মহানগর যুবদল সেই দাবি অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির সদস্যসচিব রোমান হাসান বলেন, খোকন যুবদলের কোনো পর্যায়ের নেতা বা কর্মী নন। অতীতে তিনি যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২ দিন আগে