কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন: ১০ মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ, তদন্ত চলমান

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ পর্যটকের মরদেহ পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। এরই মধ্যে নিহতদের ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, রিসোর্টটির অনুমোদন ও বিভিন্ন অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল ১১টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেন। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত এবং রিসোর্টটির অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়েও খোঁজখবর নেন তাঁরা।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের বলেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোনো অনুমোদন ছিল না। অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে তদন্ত কমিটি তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রতিষ্ঠানটিকে এর আগে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। তদন্ত শেষে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
ঘটনাস্থলে তদন্ত কমিটির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার।
ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে শনাক্ত
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে কোন মরদেহটি কার, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁদের মধ্যে দুজন নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, আগুনে নিহত ১০ জনের মরদেহ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। তাই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। এরপর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।
কক্সবাজারস্থ সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের হাসপাতালগুলোতে নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হতে পারে।
নিহতদের মরদেহ নিতে স্বজনেরা হাসপাতালে এলেও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় এখনই তাঁদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হচ্ছে না। ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সাত ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান
শনিবার সকালে ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয় এবং ছয়জন দগ্ধ হন।
ইউএনও পান্না আক্তারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান চলে সাত ঘণ্টা। দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে ১০টি মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে অভিযান শেষ হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে ছয়টি একটি কক্ষে এবং চারটি ওয়াশরুমে পাওয়া গেছে। ছয়জন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যরা আগুন থেকে বাঁচতে ওয়াশরুমে আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনে কাঠসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে রিসোর্টটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শনিবার বিকেলে উড়োজাহাজে ঢাকায় পাঠানো হয়। অন্য দুজন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অতিথিদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন
উখিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবু আব্দুল্লাহ জানান, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া বোর্ডার তালিকা অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সময় সেখানে ১৮ জন অতিথি ছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন সকালে মর্নিং ওয়াকে বের হওয়ায় নিরাপদে ছিলেন। তালিকা অনুযায়ী, বাকি ১৬ জনের মধ্যে ছয়জন চিকিৎসাধীন এবং ১০ জন নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের নাম বোর্ডার তালিকার সঙ্গে মেলেনি।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে প্রথম প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।




















