
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ‘গুরুতর ঘাটতি ও অবহেলা’ পেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় কারও গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কমিটি বলছে, জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্বাসযন্ত্র (এসসিবিএ) দেওয়া হয়নি। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি চলছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, যখন ইয়ার্ডে ছিলেন না সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা জরুরি উদ্ধারকারী দল।
এ ঘটনায় ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
গত ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ওই ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাস বের হয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান। নিহতদের মধ্যে অক্সিজেন সরবরাহের গাড়ির এক হেলপারও ছিলেন, যিনি ইয়ার্ডের বাইরের লোক ছিলেন।
ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সরেজমিন পরিদর্শন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।
জাহাজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি রাখা হয়। আন্তর্জাতিক নৌযাত্রার নিয়ম অনুযায়ী এক আন্তর্জাতিক সীমা থেকে অন্য সীমায় যাওয়ার সময় এই পানি পরিবর্তন করে নতুন ব্যালাস্ট ওয়াটার নেওয়া হয়।
প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের ‘এমটি রাসি’ জাহাজটি গত বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি ইউনিয়নের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা হয়। তীরে ভেড়ানোর সময় জাহাজটির চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংকই পানিতে পূর্ণ ছিল।
জাহাজ ভাঙার কাজ শেষের দিকে এলে একে একে ট্যাংকগুলো কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। চারটির মধ্যে একটি ট্যাংক আগেই কাটা হয়েছিল। দ্বিতীয় ট্যাংক কাটার সময়ই বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যালাস্ট ট্যাংকের তলায় দীর্ঘদিন ধরে সামুদ্রিক পানি জমে ছিল। সেই পানির সঙ্গে কাদা, তলানি ও বিভিন্ন জৈব পদার্থও জমেছিল। দীর্ঘ সময় পানি স্থির থাকায় সেখানে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়।
এই অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশে তলানিতে থাকা জীবাণু জৈব পদার্থ ভাঙার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি করে। ১৪ আগস্ট ট্যাংকের তলায় ছিদ্র করে পানি বের করার সময় জমে থাকা সেই গ্যাসও পানির সঙ্গে বেরিয়ে আসে।
ট্যাংকের মুখের কাছে গ্যাসের ঘনত্ব দ্রুত বেড়ে গেলে সেখানে থাকা শ্রমিকরা অল্প সময়ের মধ্যেই অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাঁদের মৃত্যু হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার একাধিক ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার, ইয়ার্ডের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। ওই দিন নিয়মিত কাটিং কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা থাকলেও পরদিনের কাজের প্রস্তুতি হিসেবে ট্যাংক ছিদ্র করার ‘রুটিন’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চললেও সেদিন ইয়ার্ডে কোনো সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা জরুরি উদ্ধারকারী দল ছিল না।
শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা এসসিবিএ না দেওয়ার বিষয়টিকেও গুরুতর ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। এমনকি দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া শ্রমিকদেরও পর্যাপ্ত এসসিবিএ ছাড়াই ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কমিটির পর্যবেক্ষণ, এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে থাকতে পারে।
ইয়ার্ডের পিপিই স্টোরে সাধারণ নিরাপত্তা সরঞ্জাম মজুত থাকলেও উচ্চঝুঁকির কাজে সেগুলো যথাযথভাবে সরবরাহ ও ব্যবহার করা হয়নি।
দুর্ঘটনার খবর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে জানাতেও বিলম্ব হয়েছিল বলে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা।
এদিকে ইয়ার্ডে নতুন এনভিআরভিত্তিক সিসিটিভি ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চলছিল। সেটি তখনও কার্যকর না হওয়ায় দুর্ঘটনার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার দিন ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের তালিকার সঙ্গে বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে জমা দেওয়া অনুমোদিত তালিকার বড় ধরনের গরমিল পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত মূল পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে একজন ছাড়া অন্যদের নাম অনুমোদিত জনবল তালিকায় ছিল না। এমনকি দুর্ঘটনার দিনের প্রকৃত হাজিরা শিটও তদন্ত কমিটির কাছে দেখাতে পারেনি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।
ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, দুর্ঘটনার পর বহিরাগত শ্রমিকদের নথিপত্র নষ্ট হয়ে যায়।
কমিটি বলেছে, ট্যাংক ছিদ্র করার কাজকে ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ‘রুটিন’ কাজ হিসেবে দেখেছিল। সাধারণত এ ধরনের কাজের সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনাকে জানানো হতো না। তদন্ত কমিটির মতে, এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও তদারকির একটি উল্লেখযোগ্য ত্রুটি।
জাহাজটির গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারটেক কিমসকোর দেওয়া গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেটে সব ট্যাংক প্রকৃতপক্ষে পরিদর্শন না করেই সেগুলোকে ‘অ্যাকসেপ্টেবল’ বলা হয়েছে।
ওই সনদে হাইড্রোজেন সালফাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস পরীক্ষা করা হয়নি। শুধু অক্সিজেন এবং দাহ্য গ্যাসের নিম্ন বিস্ফোরণসীমা গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছিল।
তবে জাহাজ আমদানি, বিচিং, সৈকতায়ন ও বিভাজনের অনুমতি দেওয়ার প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি তদন্ত কমিটিকে জানান, ১২ আগস্ট ২০২৬ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ছাড়পত্র নবায়ন না করেই জাহাজ কাটার কাজ চলছিল।
দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতাও যথাযথভাবে পালন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এর বাইরে তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতিটি পরিবারকে ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য ২ লাখ টাকা করে শ্রম আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ৩৫টি সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি ও তলানির নমুনা পরীক্ষা, ডিজিটাল ব্যালাস্ট ওয়াটার এক্সচেঞ্জ রিপোর্ট সংরক্ষণ এবং প্রতিটি জাহাজের জন্য নির্দিষ্ট গ্যাস-ফ্রি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা।
প্রশিক্ষিত কারিগরি দল দিয়ে শিপ রিসাইক্লিং প্ল্যান বাস্তবায়ন, প্রতিটি ইয়ার্ডে ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেন্টিলেশন পরিকল্পনা, সিসিটিভি ও রেকর্ড সংরক্ষণ, নিয়মিত মহড়া এবং আধুনিক মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহারেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
কোনো শ্রমিক আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ বা কাজ শুরুর আগে অক্সিজেন, বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাসের মাত্রা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। কাজ চলাকালে প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর গ্যাস পরীক্ষা করে তার রেকর্ড সংরক্ষণের সুপারিশও রয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানে প্রশিক্ষিত এইচএসই সুপারভাইজার নিয়োগ, হট ওয়ার্ক বা কনফাইন্ড স্পেসে প্রবেশের আগে ‘পারমিট টু ওয়ার্ক’ ব্যবস্থা চালু এবং বিষাক্ত বা সংকুচিত স্থানের বাইরে সার্বক্ষণিক উদ্ধারকারী দল রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি।
শ্রমিক ও সেফটি কর্মীদের এসসিবিএ ব্যবহারের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি ইয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সাড়া দেওয়ার দল রাখার কথাও বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে জানানোর সুপারিশও রয়েছে।
সবশেষে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের নিরাপত্তা গাফিলতির জন্য ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
কমিটির সার্বিক পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা তদারকি ও সেফটি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া ছুটির দিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ পরিচালনা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি, অনুমোদিত জনবল তালিকায় অসামঞ্জস্য এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম চালানো—সব মিলিয়ে ইয়ার্ডটির নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা ছিল।
তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত রাসায়নিক কারণ এবং কার কতটা দায়, তা নির্ধারণে চূড়ান্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলও গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ‘গুরুতর ঘাটতি ও অবহেলা’ পেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় কারও গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কমিটি বলছে, জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্বাসযন্ত্র (এসসিবিএ) দেওয়া হয়নি। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি চলছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, যখন ইয়ার্ডে ছিলেন না সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা জরুরি উদ্ধারকারী দল।
এ ঘটনায় ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
গত ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ওই ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাস বের হয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান। নিহতদের মধ্যে অক্সিজেন সরবরাহের গাড়ির এক হেলপারও ছিলেন, যিনি ইয়ার্ডের বাইরের লোক ছিলেন।
ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সরেজমিন পরিদর্শন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।
জাহাজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি রাখা হয়। আন্তর্জাতিক নৌযাত্রার নিয়ম অনুযায়ী এক আন্তর্জাতিক সীমা থেকে অন্য সীমায় যাওয়ার সময় এই পানি পরিবর্তন করে নতুন ব্যালাস্ট ওয়াটার নেওয়া হয়।
প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের ‘এমটি রাসি’ জাহাজটি গত বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি ইউনিয়নের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা হয়। তীরে ভেড়ানোর সময় জাহাজটির চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংকই পানিতে পূর্ণ ছিল।
জাহাজ ভাঙার কাজ শেষের দিকে এলে একে একে ট্যাংকগুলো কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। চারটির মধ্যে একটি ট্যাংক আগেই কাটা হয়েছিল। দ্বিতীয় ট্যাংক কাটার সময়ই বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যালাস্ট ট্যাংকের তলায় দীর্ঘদিন ধরে সামুদ্রিক পানি জমে ছিল। সেই পানির সঙ্গে কাদা, তলানি ও বিভিন্ন জৈব পদার্থও জমেছিল। দীর্ঘ সময় পানি স্থির থাকায় সেখানে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়।
এই অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশে তলানিতে থাকা জীবাণু জৈব পদার্থ ভাঙার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি করে। ১৪ আগস্ট ট্যাংকের তলায় ছিদ্র করে পানি বের করার সময় জমে থাকা সেই গ্যাসও পানির সঙ্গে বেরিয়ে আসে।
ট্যাংকের মুখের কাছে গ্যাসের ঘনত্ব দ্রুত বেড়ে গেলে সেখানে থাকা শ্রমিকরা অল্প সময়ের মধ্যেই অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাঁদের মৃত্যু হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার একাধিক ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার, ইয়ার্ডের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। ওই দিন নিয়মিত কাটিং কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা থাকলেও পরদিনের কাজের প্রস্তুতি হিসেবে ট্যাংক ছিদ্র করার ‘রুটিন’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চললেও সেদিন ইয়ার্ডে কোনো সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা জরুরি উদ্ধারকারী দল ছিল না।
শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা এসসিবিএ না দেওয়ার বিষয়টিকেও গুরুতর ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। এমনকি দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া শ্রমিকদেরও পর্যাপ্ত এসসিবিএ ছাড়াই ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কমিটির পর্যবেক্ষণ, এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে থাকতে পারে।
ইয়ার্ডের পিপিই স্টোরে সাধারণ নিরাপত্তা সরঞ্জাম মজুত থাকলেও উচ্চঝুঁকির কাজে সেগুলো যথাযথভাবে সরবরাহ ও ব্যবহার করা হয়নি।
দুর্ঘটনার খবর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে জানাতেও বিলম্ব হয়েছিল বলে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা।
এদিকে ইয়ার্ডে নতুন এনভিআরভিত্তিক সিসিটিভি ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চলছিল। সেটি তখনও কার্যকর না হওয়ায় দুর্ঘটনার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার দিন ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের তালিকার সঙ্গে বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে জমা দেওয়া অনুমোদিত তালিকার বড় ধরনের গরমিল পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত মূল পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে একজন ছাড়া অন্যদের নাম অনুমোদিত জনবল তালিকায় ছিল না। এমনকি দুর্ঘটনার দিনের প্রকৃত হাজিরা শিটও তদন্ত কমিটির কাছে দেখাতে পারেনি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।
ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, দুর্ঘটনার পর বহিরাগত শ্রমিকদের নথিপত্র নষ্ট হয়ে যায়।
কমিটি বলেছে, ট্যাংক ছিদ্র করার কাজকে ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ‘রুটিন’ কাজ হিসেবে দেখেছিল। সাধারণত এ ধরনের কাজের সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনাকে জানানো হতো না। তদন্ত কমিটির মতে, এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও তদারকির একটি উল্লেখযোগ্য ত্রুটি।
জাহাজটির গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারটেক কিমসকোর দেওয়া গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেটে সব ট্যাংক প্রকৃতপক্ষে পরিদর্শন না করেই সেগুলোকে ‘অ্যাকসেপ্টেবল’ বলা হয়েছে।
ওই সনদে হাইড্রোজেন সালফাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস পরীক্ষা করা হয়নি। শুধু অক্সিজেন এবং দাহ্য গ্যাসের নিম্ন বিস্ফোরণসীমা গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছিল।
তবে জাহাজ আমদানি, বিচিং, সৈকতায়ন ও বিভাজনের অনুমতি দেওয়ার প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি তদন্ত কমিটিকে জানান, ১২ আগস্ট ২০২৬ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ছাড়পত্র নবায়ন না করেই জাহাজ কাটার কাজ চলছিল।
দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতাও যথাযথভাবে পালন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এর বাইরে তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতিটি পরিবারকে ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য ২ লাখ টাকা করে শ্রম আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ৩৫টি সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি ও তলানির নমুনা পরীক্ষা, ডিজিটাল ব্যালাস্ট ওয়াটার এক্সচেঞ্জ রিপোর্ট সংরক্ষণ এবং প্রতিটি জাহাজের জন্য নির্দিষ্ট গ্যাস-ফ্রি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা।
প্রশিক্ষিত কারিগরি দল দিয়ে শিপ রিসাইক্লিং প্ল্যান বাস্তবায়ন, প্রতিটি ইয়ার্ডে ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেন্টিলেশন পরিকল্পনা, সিসিটিভি ও রেকর্ড সংরক্ষণ, নিয়মিত মহড়া এবং আধুনিক মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহারেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
কোনো শ্রমিক আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ বা কাজ শুরুর আগে অক্সিজেন, বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাসের মাত্রা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। কাজ চলাকালে প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর গ্যাস পরীক্ষা করে তার রেকর্ড সংরক্ষণের সুপারিশও রয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানে প্রশিক্ষিত এইচএসই সুপারভাইজার নিয়োগ, হট ওয়ার্ক বা কনফাইন্ড স্পেসে প্রবেশের আগে ‘পারমিট টু ওয়ার্ক’ ব্যবস্থা চালু এবং বিষাক্ত বা সংকুচিত স্থানের বাইরে সার্বক্ষণিক উদ্ধারকারী দল রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি।
শ্রমিক ও সেফটি কর্মীদের এসসিবিএ ব্যবহারের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি ইয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সাড়া দেওয়ার দল রাখার কথাও বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে জানানোর সুপারিশও রয়েছে।
সবশেষে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের নিরাপত্তা গাফিলতির জন্য ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
কমিটির সার্বিক পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা তদারকি ও সেফটি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া ছুটির দিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ পরিচালনা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি, অনুমোদিত জনবল তালিকায় অসামঞ্জস্য এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম চালানো—সব মিলিয়ে ইয়ার্ডটির নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা ছিল।
তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত রাসায়নিক কারণ এবং কার কতটা দায়, তা নির্ধারণে চূড়ান্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলও গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

রোববার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় স্বামীবাগের মুন্সিরটেক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ তিনজন হলেন— হোটেল কর্মচারী মো. সিয়াম (২২), চা দোকানি আলমগীর হোসেন (৩২) ও গৃহিণী আশা আক্তার (২৮)।
১৭ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের লালদিয়ায় এপিএম টার্মিনাল নির্মাণকে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবে পরিণত হবে।
১ দিন আগে
রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সীমান্তের ভারতীয় অংশে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সোহাগ চিমটিবিল এলাকার সফিকুল ইসলামের ছেলে। পরিবারের ভাষ্য, তিনি রাখালের কাজ করতেন।
১ দিন আগে
বগুড়া সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ওই এলাকায় প্রায় এক মাস ধরে পানি নিষ্কাশনের ড্রেন সংস্কারের কাজ চলছে। দুপুর ১২টার দিকে শ্রমিকেরা ড্রেনের কাদা-পানি সরিয়ে মাটি খননের সময় একসঙ্গে বেশ কিছু গুলি পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তারা বিষয়টি পুলিশকে জানান।
১ দিন আগে