অনলাইনে মিলবে ট্রেড লাইসেন্স, ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা

ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ব্যবস্থায় দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। একই সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে তিন থেকে পাঁচ বছর করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সোমবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশ’স এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ট্র্যাজেক্টরি: ক্রিটিক্যাল চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড এক্সপ্লোরিং পলিসি অপশনস’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইআরএফ।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে পরিশোধ করা লাইসেন্সের ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যাবে। এ ছাড়া যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে আনা, বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো এবং বিভিন্ন সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের বদলে সমন্বিত পরিদর্শন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে এসব সংস্কারের সুফল পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
ব্যবসা শুরুর দীর্ঘসূত্রতার চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র সংগ্রহের পর আমদানি নিবন্ধন সনদ নিয়ে যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খুলতে গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লাগে। এ দীর্ঘ প্রক্রিয়া উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে।
বিনিয়োগ বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৌশলগত মজুত এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
এলডিসি উত্তরণে বাড়তি তিন বছর পাওয়ার আশা
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর বিষয়ে চলতি অক্টোবরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্তের জন্য আরও এক মাস সময় থাকলেও এ বিষয়ে মোটামুটি সর্বসম্মত অবস্থান তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। টেকসই ও স্থিতিশীলভাবে এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বাড়তি প্রস্তুতির সময় প্রয়োজন।
আগের সরকারের সময়ে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, তখন উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু উত্তরণের পর কী সুবিধা পাওয়া যাবে এবং কী ধরনের অসুবিধার মুখে পড়তে হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
রপ্তানি কমার ঝুঁকি ৬৩৮ কোটি ডলার
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০১৮ সালের উপাত্তের ভিত্তিতে প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে এলডিসি-সুবিধা হারালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানের মতো প্রধান বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৬৩৮ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি কমার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য তাদের জিএসপি কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের উত্তরণের পরও তিন বছর পর্যন্ত বাণিজ্যসুবিধা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। কানাডা, জাপানসহ কয়েকটি দেশও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে বা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির বড় একটি অংশ সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৭ সালের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি বাণিজ্যচুক্তির লক্ষ্য
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে সরকার একটি মসৃণ উত্তরণ কৌশল নিয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাপানের সঙ্গে ইতিমধ্যে চুক্তি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা করছে সরকার। আগামী নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে আলোচনা শেষ হতে পারে। এ ছাড়া ওমান, সিঙ্গাপুর ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, শিগগিরই প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরু হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই এ আলোচনা শেষ করতে চায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসেপে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির কার্যনির্বাহী সদস্য মঈনুল হক।














