আগামী ২ বছর ‘কঠিন সময়’ যাবে: অর্থমন্ত্রী

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
সোমবার ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সহযোগিতায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন অর্থমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত

অর্থনীতি নানামুখী চাপে থাকায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতিরও তেমন ‘উন্নতি না মেলায়’ আগামী দুই বছর সময় ‘কঠিন’ যাবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যবসায় চাঙ্গা ভাব না এলেও এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল না হওয়া সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির বাজেট ঘোষণায় নানা আশার কথা বলেছেন তিনি।

সোমবার (২২ জুন) বাজেট বিষয়ক এক আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দুই বছর সময় ‘কঠিন’ যাবে আমি আগেভাগে বলছি। দুইটা বছর কষ্ট করতে হবে সবাই মিলে। আর জনগণের লাইফ যেটা (স্বাভাবিক রাখার) ওটা আমরা করব নীতির ভিত্তিতে, সহায়তার ভিত্তিতে। যতটুকু সীমিত আমাদের সম্পদ ওটা দিয়েই আমরা করব। ওইটা বলছি না। কিন্তু এটা (অর্থনীতি) ঘুরে দাঁড়াতে, এই যে ভঙ্গুর থেকে স্থিতিশীলতা, সেটার জন্য দুই বছর লাগবে।”

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ, করোনা মহামারির পরবর্তী অভিঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে ছিল। জুলাই আন্দোলনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতায় সেই চাপ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিতে বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বেসরকারি খাতে স্থবিরতা দেখা দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সময় প্রয়োজন বলে মত দিয়ে আসছিলেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কাগুজে পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তবায়নযোগ্য ও বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শও ছিল তাদের।

অর্থনীতিবিদরা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন। তাদের মতে, এতে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কম হলেও প্রকৃত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

তবে সরকার সেই পথ অনুসরণ না করে বড় আকারের বাজেট ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীও সামনে ‘কঠিন সময়’ অপেক্ষা করছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সহযোগিতায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যদি বলি কালকে সকালে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, এটা এটা এই কমিটমেন্টটা আমি দিতে চাইব না। এটার জন্য দুবছর সময় প্রয়োজন।’

আমীর খসরু বলেন, ‘এই ভঙ্গুর অর্থনীতি, খারাপ অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীল করতে দুই বছর লাগবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে ইনশাল্লাহ। চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে অর্থনীতি হবে ‘প্রোসপারিটি অব বাংলাদেশ’, ‘প্রোসপারিটি ফর বাংলাদেশ’। চতুর্থ ও পঞ্চম বছর হচ্ছে সমৃদ্ধির বাংলাদেশ— আমরা দেখব।”

পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতেও দুই বছর প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেট, এগেইন আমি তো বলছি দুই বছরের কুশন দরকার। আপনি দেখবেন ইনশাল্লাহ সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ঘুরে দাঁড়াবে। আমাদের বিশাল একটা অপরচুনিটি ক্রিয়েট হবে ক্যাপিটাল মার্কেটে, বিশাল অপরচুনিটি। সবার জন্য।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেটের আমাদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে আস্থাটা ফিরিয়ে আনা। এই জন্য আমরা একটা কমিশন করেছি যারা একদম ইন্ডিপেন্ডেন্ট, নন পলিটিক্যাল এবং পুরোপুরি পেশারদার লোক। সুতরাং এরা সব আইনগুলো চেঞ্জ করছে যাতে আমাদের ইনভেস্টররা সিকিউর থাকে। যারা তালিকাভুক্ত হবে কোম্পানিগুলো তারা যাতে আস্থা পায় যে এই ক্যাপিটাল মার্কেটে তার শেয়ারটা প্রোপারলি লেনদেন হবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল যারা ইনভেস্টর আছে, তাদের যাতে বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেটের ওপর আস্থা থাকে।’

আমীর খসরু বলেন, ‘ডিরেগুলেশন ইজ এ বিগ মুভ। আমি জানি এটা খুব কঠিন। অনেক বাধাগ্রস্ত আমি হয়ে গেছি অলরেডি। ইতোমধ্যে করার (ঘোষণা) সময়ই বাধাগ্রস্ত হয়েছি। এটা এক্সিকিউশন করতে গেলে আরও বাধাগ্রস্ত হব আমি জানি কিন্তু যত কঠিন ডিসিশন নিতে হয় আমি নিতে প্রস্তুত আছি।’

তিনি আরও বলেন, “এই ডিরেগুলেশনের পথে যদি কেউ বাধাগ্রস্ত হয়, তাদের আমরা বেরিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেবো। ওই যে দরজা আছে পেছনে, ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যান। কোনো দরকার নাই (তাদের)। দেশ হিসেবে আমরা অনেক ‘সাফার’ করেছি। বাংলাদেশের মানুষের এখন চায় একটা সত্যিকার মুক্ত জীবনযাপন করতে।”

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে আমলাতান্ত্রিক কারণে যেসব বাধার শিকার হতে, সেসবের অনেককিছু কমিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে নানান বাধা কমিয়ে আনারও কথা বলা হয়, যেসব নিয়ে দীর্ঘদিন অভিযোগ ছিল ব্যবসায়ীদের। এসব থাকায় ঘুষের লেনদেন এবং ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। কালক্ষেপণও হয়ে থাকে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বিজনেস স্কুলের ডিন প্রফেসর এ মএ বাকী খলিলী এবং সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। এম এ বাকী খলিলী আগামী করবর্ষের ব্যক্তিশ্রেণির করকাঠামোর সমালোচনায় বলেন, এর জন্য করের চাপ বেড়ে সীমিত আয়ের মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে।

তিনি আরও বলেন, “যদি সঞ্চয় না বাড়ে, সম্পদ তৈরি না হয়, তাইলে অর্থনীতির সুদিন ফিরবে না। কারণ তারা (সীমিত আয়ের মানুষ) তো ভোক্তাও বটে। তো সেই কনটেক্সটে আমার কাছে এইবারের যে আয়করের হারের কাঠামো যেটা সরকার দিয়েছে, তা কিছুটা ‘রিগ্রেসিভ’ মনে হয়েছে। কারণ এর আগে ৫ শতাংশ হার একটা ছিল। আমরা যারা ঢাকায় থাকি অনেকের সীমিত আয় আছে। শহরের অন্যান্য প্রান্তেও অনেকে থাকে। আমার কাছে মনে হয় শতাংশ হার এটি রাখা উচিত ছিল সরকারের।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক বিশ্ববিদ্যালয় মুনাফা না করায় এখান থেকে করপোরেট করের হার কমানোর অনুরোধ করেন। অন্যথায় আইন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনাফা করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন, যাতে যাদের প্রয়োজন তারা মুনাফা করতে পারেন, যাদের প্রয়োজন না তারা ট্রাস্টিজের মাধ্যমে পরিচালনা করেন।

উল্লেখ্য, আগামী করবর্ষের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করপোরেট করহার ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার; বিএনপি সরকার বাজেটে সেটি অপরিবর্তিত রেখেছে। বর্তমানে এখানে ১৫ শতাংশ কর রয়েছে।

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে আসছে, বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করলে ব্যবস্থা: ইসলামী ব্যাংক

সতর্কতামূলক এক বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ফলে ব্যাংকের আর্থিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে এবং গ্রাহকদের লেনদেনও স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

২ দিন আগে

১ বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে ৪১ শতাংশ

গত পাঁচ বছরের হিসাবে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের নামে সবচেয়ে কম অর্থ ছিল ২০২৩ সালে। সে সময় জমার পরিমাণ নেমে এসেছিল মাত্র ১ কোটি ৭৭ লাখ সুইস ফ্রাঁতে, যার মূল্য প্রায় ২৭০ কোটি টাকা।

৩ দিন আগে

রিজার্ভ চুরি: আতিউরসহ ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করছে সিআইডি

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তা। এ তালিকায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, মেজবাউল হক ও আবুল কাসেমের নাম রয়েছে।

৪ দিন আগে

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হলেন আশিকুর রহমান

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৯৯৯ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন আশিকুর রহমান।

৪ দিন আগে