‘পরস্পরবিরোধী’ অবস্থান সিপিডি-টিআইবির, ‘কালো টাকা’ সাদা করার সুযোগ মিলল বাজেটে?

সজীব রহমান
আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ২২: ৩৪
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ফের আলোচনার উঠে এসেছে কালো টাকা। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

কালো টাকা। প্রতি বছর বাজেট এলেই আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেয় এই শব্দগুচ্ছ। সবার নজর থাকে, এই ‘কালো টাকা’ সাদা করার কোনো সুযোগ বাজেটে থাকছে কি না। বাজেটের দিন এবং বাজেট-পরবর্তী সময়েও সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দগুলোর মধ্যে থাকে ‘কালো টাকা’।

অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বাজেটের আগেই আহ্বান জানানো হয় সরকারের প্রতি, ‘কালো টাকা’ সাদা করার সুযোগ যেন বাজেটে না থাকে। তাদের দাবি, এ সুযোগ দিলে খুব বেশি লাভ সরকারের হয় না। লাভ হোক বা না হোক, ইতিহাস বলছে— কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বিভিন্ন সময়েই রেখেছে দায়িত্বে থাকা সরকারগুলো। তা নিয়ে ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠানসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে।

১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরেও আগের ধারাবাহিকতায় ‘কালো টাকা’ সাদা করার সুযোগ আলোচনায় এসেছে। তবে এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই ইস্যুতে ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘পরস্পরবিরোধী’ অবস্থান দৃশ্যমান হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগে’র তীব্র সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বাজেটে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না রাখা’য় সরকারকে ‘সতর্ক সাধুবাদ’ জানিয়েছে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা রাজনীতি ডটকমে বলেছেন, সরকারের দেওয়া সুযোগকে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বলা যায় না। তবে নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে— এমন কোনো সুযোগই সরকারের কাউকে দেওয়া উচিত না।

সরকার তরফ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়নি। কিন্তু বাজেটে কী আছে ‘কালো টাকা’ নিয়ে? সিপিডি কেন বলছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে? টিআইবিই বা কেন এ সুযোগ না রাখায় সরকারকে সাধুবাদ জানানোর কথা বলেছে? সরকারই বা কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে কালো টাকা ইস্যুতে?

কালো টাকা কী? সাদা করে কীভাবে?

টাকার রং তো কালো হয় না। তাহলে ‘কালো টাকা’ শব্দগুচ্ছ এলো কোথা থেকে?

মূলত অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থকে সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে কালো টাকা। আবার বৈধভাবে বা আইনসম্মতভাবে উপার্জিত হলেও যদি সে অর্থের ওপর আয়কর দেওয়া না হয়, সে অর্থকেও বলা হয় কালো টাকা। সার্বিকভাবে বলা হয়, যেকোনো ধরনের অপ্রদর্শিত অর্থকেই বলা হয়ে থাকে কালো টাকা।

এই কালো টাকা তথা অপ্রদর্শিত অর্থকে বাড়তি কর দিয়ে প্রদর্শিত করার পদ্ধতিকেই বলা হয়ে থাকে কালো টাকা সাদা করা। বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো এই সুযোগ করে দেয়। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু খাত উল্লেখ করে দিয়ে সরকার ঘোষণা দেয়, এসব খাতে বিনিয়োগ করে বাড়তি কিছু কর দিলে ওই অর্থ বৈধ হিসেবে গণ্য হবে। ওই অর্থের উৎস নিয়েও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর প্রশ্ন তোলার সুযোগ রহিত করার ঘোষণা এসেছে এর আগে বিভিন্ন সময়ে।

এর আগে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা তথা আবাসন খাত, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, শিল্পখাতে বিনিয়োগের মতো বিভিন্ন খাতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বা কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে।

কেন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়?

কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ কারও কাছে থাকার সাধারণ অর্থ, এর সঙ্গে বেআইনি বা অবৈধ লেনদেন বা প্রক্রিয়া জড়িত থাকতে পারে। তাহলে ওই অর্থ যার কাছে থাকবে, তাকে আইনের আওতায় আনাই সাধারণভাবে কাঙ্ক্ষিত প্রক্রিয়া। সেটি না করে কেন তাকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়— এ প্রশ্ন অনেকেরই।

এর আগে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে দেওয়া ব্যাখ্যায় সরকারগুলোর প্রধান যুক্তি, অপ্রদর্শিত অর্থকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসাই এ সুযোগের প্রধান কারণ। গোপন বা অলস অর্থ আবাসন, শেয়ারবাজার বা নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হলে তা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনতে ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করে বলেও যুক্তি দেওয়া হয়ে থাকে।

বাড়তি কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করা হলে সেটি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতেও ভূমিকা রাখে বলে যুক্তি রয়েছে। অতীতের সরকারগুলোর ভাষ্য, দেশের মূল আর্থিক প্রবাহের বাইরে থাকা বিপুল পরিমাণ কালো টাকাকে মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যেন সরকার এসব অর্থের ওপর নিয়মিত নজরদারি ও ভবিষ্যতে কর আদায় করতে পারে।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে লাভ হয়?

তবে ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠানগুলো বারবারই বলে আসছে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে আদতে কোনো লাভ হয় না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যও বলছে, এ সুযোগে দেশের অর্থনীতির স্রোতে খুব বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ যুক্ত হয় না। পরিসংখ্যান ব্যুরো ও এনবিআরের তথ্যও বলছে, দেশে যে পরিমাণ কালো টাকা রয়েছে, স্বাধীনতার ৫০ বছরে তার ২০ ভাগের ১ ভাগ বা ৫ শতাংশও সাদা হয়নি।

স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরে ২১ বার এ সুযোগ দিয়ে প্রায় ৪০ বছর ধরে কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশের বাইরে থেকে অর্থ নিয়ে আসার সুযোগও রাখা হয়েছিল। এনবিআরের তথ্য, এই সুযোগ নিয়ে সব মিলিয়ে সাদা হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে ২০০৬-০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সর্বোচ্চ প্রায় ৩২ হাজার করদাতা ১১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা সাদা করেন। তখনকার গঠিত দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকাও প্রকাশ করে। ধারণা করা হয়, ওই ভয়েই তখন কালো টাকা সাদা করার প্রবণতা বেড়েছিল।

অন্যদিকে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ কালো টাকা সাদা করার নজির ২০২০-২১ অর্থবছরে। সেবার আবাসন ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সাদা করেন ১১ হাজার ৮৫৯ জন ব্যক্তি। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় সেই সুযোগ বেশি নেওয়া হয় বলে ওই সময় জানিয়েছিলেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

‘কালো টাকা’ নিয়ে কী আছে এবারের বাজেটে?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বক্তৃতায় ‘কালো টাকা’ তথা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ করা নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে অর্থবিলে আয়কর আইন ২০২৩-এর প্রথম তফসিলে আনা সংশোধনীতে আবাসন খাতে বেচাকেনার ক্ষেত্রে ‘প্রকৃতমূল্য’ আর ‘দলিলমূল্যে’র মধ্যে ব্যবধান থাকলে সেই ‘অপ্রদর্শিত’ অর্থ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ টাকার উৎস নিয়ে যেন কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে, সে বিধানও রাখা হয়েছে।

অর্থবিলের সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার প্রকৃতমূল্য দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি হলে তিনি ওই ‘অপ্রদর্শিত’ অতিরিক্ত ক্রয়মূল্যের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য ‘নিয়মিত করহারে’ আয়কর পরিশোধ করবেন।

বিক্রেতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির প্রকৃতমূল্য দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি হলে তিনি অপ্রদর্শিত ওই অতিরিক্ত অঙ্কের ওপর মূলধনী মুনাফার জন্য প্রযোজ্য হারে আয়কর পরিশোধ করবেন। অর্থাৎ তিনি এই জমি যখন কিনেছেন তখন যে মূল্য ছিল এবং তিনি যে টাকায় বিক্রি করেছেন— এই দুইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান থাকবে, সেটিই তার মুনাফা। এই আয়ের ওপর তাকে ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে— যদি কোনো ব্যক্তি তার অপ্রদর্শিত অর্থ ‘স্বতঃপ্রণোদিত’ বৈধ করার আগেই আয়কর আইনে তার বিরুদ্ধে কোনো অডিট বা কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, তাহলে তখনো তিনি এ অর্থ বৈধ করতে পারবেন। তার সেই অর্থের ওপর তখন যে কর ধার্য হওয়ার কথা, তার চেয়ে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিতে হবে তাকে।

তবে তার এই ‘স্বতঃপ্রণোদিত’ ঘোষণার আগেই যদি বাংলাদেশের কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা চলে বা অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে তিনি এই সুযোগ আর গ্রহণ করতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে সংশোধনীতে।

টিআইবি কেন সাধুবাদ জানিয়েছে সরকারকে?

টিআইবি মনে করছে, এবারের প্রস্তাবিত এই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সরকার ফিরিয়ে আনেনি। এ কারণে সরকারকে ‘সতর্ক সাধুবাদ’ও জানিয়েছে সংস্থাটি। পরে সরকার কোনো কৌশলে যেন এ সুযোগ ফিরিয়ে না আনে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছে তারা।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতিসহায়ক বিধান ‘কালো টাকা সাদা’ করার সুযোগ প্রদান না করা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনি অঙ্গীকারের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ নানা অজুহাতে বিভিন্ন খাতে ‘অর্থ বিলে’ এ সুযোগটি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

‘এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার অনৈতিক সুযোগটি আর যেন ফিরে না আসে। স্বাধীনতার পরে নিরবচ্ছিন্নভাবে এই সুযোগ দেওয়া হলেও এর মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে আর্থিক লাভের থেকে সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি ‘কর ফাঁকি’ দেওয়ার দুর্বিনীত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। আশা করছি, এই দুর্নীতিসহায়ক চর্চার বিপরীতে সরকার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে,’— বিবৃতিতে বলেন ড. জামান।

আবাসন খাতে অর্থবিলের যে সংশোধনী আনা হয়েছে তাকে কেন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ মনে করছে না টিআইবি?

এ নিয়ে জানতে চাইলে টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, আমাদের দেশে জমিজমা বা ফ্ল্যাট বেচাকেনার ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয়মূল্য এবং দলিলে দেখানো ক্রয়-বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় একটি ব্যবধান থাকে। বছরের পর বছর ধরে এ চর্চা চলে আসছে। সরকারিভাবে জমিজমার দাম এবং বাস্তব দামের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটি এর অন্যতম মূল একটি কারণ।

তৌহিদুল বলেন, এই লেনদেনটি তো বৈধ। কিন্তু লেনদেনের পর এর একটি অংশ অপ্রদর্শিত হয়ে আসছে। এখন সেই অর্থ নিয়মিত কর দিয়েই ক্রেতা বা বিক্রেতা প্রদর্শিত করে নিতে পারছেন। এ সুযোগ আগেও ছিল। ফলে এই সুযোগটিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বললে সঠিক হয় না। আবার কেবল বাড়তি কর দিয়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে যেকোনো অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। এ কারণেই এই ইস্যুটিকে টিআইবি সাধুবাদ জানিয়েছে।

সিপিডি বলছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে সরকার

এদিকে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে কালো টাকা ইস্যুতে টিআইবির বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে সিপিডি। বাজেটে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ দেওয়াকে নৈতিকভাবে পুরোপুরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ মন্তব্য করে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং তাদের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য বাড়ায়।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে ড. ফাহমিদা বলেন, এটি নৈতিকতার অবক্ষয় ও সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায়। অন্যায্য বা অপ্রদর্শিত উপায়ে অর্জিত অর্থ নামমাত্র কর দিয়ে বৈধ করার নিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, সাধারণ নাগরিকরা যেখানে কষ্টের উপার্জনে উচ্চ হারে কর দেন, সেখানে কালো টাকার মালিকদের বিশেষ ছাড় দেওয়া এক ধরনের মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করে। এতে কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত করদাতাদের বড় বৈষম্যের তৈরি হয়। এই নীতি সৎ ও নিয়মিত করদাতাদের কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি কর সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর।

কালো টাকা নিয়ে কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে সরকার

এত আলোচনার মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘এবারের বাজেটে কোনো কালো টাকা সাদা করার প্রভিশন রাখা হয় নাই। আমার মনে হয়, ওটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। আমরা ছোট্ট একটা প্রভিশন গত বছরই করেছিলাম— যারা জমি বিক্রি করে যে টাকা পান, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন হয় কম দামে। অথচ উনার টাকাটা কিন্তু হোয়াইট। উনি জমি বিক্রি করেছেন ৫ কোটি টাকা, রেজিস্ট্রেশন ১ কোটি টাকা। বাকি ৪ কোটি টাকা নিয়ে উনি খুব বিপদে থাকতেন।’

‘সে কারণে আমরা গত বছরে এই আইনটা করেছিলাম, উনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে বাকি চার কোটি টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হয়েছে এবং ওনার যদি বায়নানামা থাকে, তাহলে উনি তার ওপরে নিয়মিত কর (রেগুলার ট্যাক্স) দিতে পারেন। এটা আমরা গতবারেই করেছি,’— বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

কেবল বিক্রেতা নয়, ক্রেতার জন্যও একই সুযোগ রাখা হয়েছে জানিয়ে আবদুর রহমান খান বলেন, এবার বায়ারের জন্য ওই রকম একটা সুবিধা চিন্তা করা হয়েছে। বায়াররাও ঝামেলায় পড়েন। একটা ফ্ল্যাট হয়তো উনি কিনলেন ২০ কোটি টাকা দিয়ে, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে ২ কোটি টাকায়। আমাদের ট্যাক্সের লোকজন আবার গিয়ে বলছেন, ‘আমাদের কাছে প্রমাণ আছে, আপনি ২০ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন। আপনাকে এখন এক্সট্রা ট্যাক্স দিতে হবে জরিমানাসহ।’

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ফ্ল্যাটের ক্রেতারা ঝামেলায় পড়ে যান উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, তাদের জন্য বলা হয়েছে, যদি তারা নিজেরা ঘোষণা দেন, তাহলে ওই ১৫ শতাংশ বাড়তি কর দিয়ে বাকি টাকা দেখাতে পারেন। এ রকম একটা প্রভিশন আছে। এটা নিয়ে যদি আপত্তি থাকে, আমার মনে হয় সাবজেক্টটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারেন।

জমিজমা কেনাবেচার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ও বাস্তব দামের যে পার্থক্য, এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী সে বিষয়ে আলোকপাত করেন। বলেন, সরকার নির্ধারিত দামকে বাস্তব দামে নিয়ে আসার জন্য সরকার কাজ করছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে মৌজা রেটের বিষয়টা, যেটা সত্যিকার ভ্যালু থেকে অনেক কম থাকে, সেটা আপনারা সবাই জানেন। এটার ওপরে আমরা একটু কাজ করছি। যেহেতু আমরা সময় পাইনি, দেড় মাসের মধ্যে বাজেট করতে হয়েছে, অনেক কিছুই ইচ্ছা থাকলেও আমরা শেষ করতে পারিনি। মৌজা রেটের যে বিষয়টা আছে, সেটার ওপর একটা কমিটি হয়েছে এবং মৌজা রেটগুলো আমরা রিভিউ করতে যাচ্ছি।’

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, মৌজা রেটগুলোকে একদম রিয়েল ভ্যালুতে আনার চেষ্টা করছি, যেন ওই কালো টাকা সাদা করার আর কোনো সুযোগ না থাকে। এই কাজটা চলছে। এটা দীর্ঘ একটা কাজ। সারা দেশের সার্ভে করতে হবে, মৌজা রেট ঠিক করতে হবে। বাজারের এক দাম, কৃষিজমির আরেক দাম। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই কাজ চলছে, আমরা সময়ের অভাবে শেষ করতে পারিনি। এটা কমপ্লিট হলে মৌজা রেটটা যখন মার্কেট ভ্যালুর সঙ্গে আমরা নিয়ে আসতে পারব, তখন কালো টাকা সাদা করার খুব বেশি সুযোগ থাকবে না।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাজেট ও ‘কালো টাকা’ ইস্যুতে রাজনীতি ডটকম কথা বলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশার সঙ্গে। অর্থবিলের ওই সংশোধনীর মাধ্যমে আবাসন খাতের লেনদেনের অপ্রদর্শিত অর্থকে কর দিয়ে প্রদর্শিত করার সুযোগকে তিনি ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বলে মনে করছেন না। তারপরও নৈতিকভাবে কোনো পদ্ধতিতেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষেও তিনি নন।

ড. সায়েমা বলেন, প্লট বা ফ্ল্যাট বেচাকেনার ক্ষেত্রে অনেক সময় যে দাম দেখানো হয়, প্রকৃতপক্ষে বেচাকেনা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি দামে। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট লেনদেন দেখিয়ে তার ওপর কর দেওয়াকে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বলা যায়া না। তারপরও আমার মনে হয়, অপ্রদর্শিত যেকোনো ধরনের আয়ই প্রশ্ন তৈরি করে। নৈতিকতার দিক থেকে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই সরকারের এমন কোনো কিছুই করা উচিত না যা নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাজেট চূড়ান্ত করার সময় এ নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো সরকার বিবেচনায় নেবে বলে আশা করছেন ড. সায়েমা হক বিদিশা। রাজনীতি ডটকমকে তিবি বলেন, বাজেট চূড়ান্ত করার সময় এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার সুযোগ আছে। যে সুযোগের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে কথা উঠেছে, অনেক দ্বিমত-প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। সরকার বাজেট চূড়ান্ত করার সময় আরেকটু চিন্তাভাবনা করুক। চূড়ান্ত বাজেটে কোনো পরিমার্জনা আসে কি না, আমরা সেটা দেখব।

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বাজেট সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা, বড় সুযোগ: সিপিডি

সিপিডি বলছে, বিএনপি এই বাজেট কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর কছে বাজেটের সাফল্য। সে হিসাবে এই বাজেট বিএনপির জন্য একটি বড় সুযোগও। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বিএনপি দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার দিকে নিয়ে যেতে পারবে, সেই সঙ্গে জনবান্ধব নীতির প্রতি নিজেদের অবস্থানও প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।

১১ ঘণ্টা আগে

রাজনৈতিক চিন্তার বড় বাজেট, বাস্তবায়নে ঝুঁকি অনেক

প্রস্তাবিত এই বাজেটের শিরোনামও করা হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। কিন্তু অর্থনীতিবিদের অনেকের দুশ্চিন্তা এর বাস্তবায়নের ঝুঁকি নিয়ে। কারণ বিশাল অঙ্কের বাজেটের বড় ঘাটতি মেটাতে নির্ভরতা থাকবে রাজস্ব আয়ের ওপর। সেখানে রাজস্ব আয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা। সেখানে রাজস

১১ ঘণ্টা আগে

কর খাতে নানা ছাড়ে স্বস্তির আভাস

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়াতে বিপুল পরিমাণ কর বসানোর কৌশল নেয়নি সরকার। বরং করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে. বিভিন্ন খাতে

১২ ঘণ্টা আগে

রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়

অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ দেশের অর্থনীতির যে বিপর্যয় তৈরি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে, এতে এর পুনরুদ্ধার ও একে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন, অর্থাৎ সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক

১ দিন আগে