মহামন্দার ১৫ মাস, বিনিয়োগকারীর সর্বনাশ!

ফজলুল বারী

দেশের অর্থনীতি মন্দা কবলিত। পুঁজিবাজারও মন্দা কবলিত প্রায় ১৭ বছর ধরে। এর মধ্যে গত ১৫ মাস এ বাজারে মহামন্দাকাল চলছে। দেশের অন্য সব খাতেও বিনিয়োগ খরা চলমান।

নতুন বিনিয়োগ নেই। পুরোনো বিনিয়োগও ঝুঁকিতে। শিল্পে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই অব্যাহত। দেশে বেকার ও ছদ্ম বেকারের সংখ্যা কমবেশি এক কোটি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা তিন কোটি ৬০ লাখ। মধ্য ও নিম্নবিত্তের ক্ষুধার কষ্টও বাড়ছে।

উলটো দিকের তথ্য— গত ১৬ মাসে দেশে ১১ হাজার নতুন কোটিপতির উদ্ভব ঘটেছে। সিন্দুকবন্দি টাকা ব্যাংকমুখী হচ্ছে। এক বছরে সিন্দুকবন্দি এক লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে জমা পড়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে বড়দের জমা অর্থের অঙ্ক ৫৫ হাজার কোটিরও বেশি।

উন্নয়ন ও উৎপাদন খাতে স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন না হলে ব্যাংকের তারল্য উদ্বৃত্ত বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা প্রকট।

তত্ত্ব মতে, ব্যাংকসহ সব অলস টাকার একাংশ হলেও পুঁজিবাজারমুখী হওয়ার কথা। বাস্তবে তা ঘটেনি। অথচ দেশের পুঁজিবাজার দারুণভাবে ক্রয়ানুকূল অবস্থানে রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মার্কেট পিই ৮ দশমিক ৫৫। খাতভিত্তিক পিই অনুপাত বিশ্লেষণে তালিকাভুক্ত ২১ খাতের মধ্যে ১৭ খাতের পিই অনুপাতই ২০-এর নিচে। আট খাতের পিই অনুপাত ১৫ দশমিক ৮৮ থেকে ১০ দশমিক ৬৬। মিউচুয়াল ফান্ডের পিই অনুপাত ৩ দশমিক ৩৬, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পিই অনুপাত ৪ দশমিক ২২, ব্যাংক খাতের পিই অনুপাত ৫ দশমিক ৯৫, ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের পিই অনুপাত ৯ দশমিক ৫১।

এই পাঁচ খাতের মৌলভিত্তি সম্পন্ন সিকিউরিটিজ দিয়ে বিনিয়োগ পোর্টফোলিও গঠন করা হলে সাড়ে ৬ বছরে পুঁজি উঠে আসবে। সঙ্গে প্রতিবছর আকর্ষণীয় লভ্যাংশও মিলবে। বাজার স্বাভাবিক পর্যায়ে উন্নীত হলে নিশ্চিতভাবেই মূলধন মুনাফাও যোগ হবে।

পাঁচ খাতের বাইরে আরও ১৬ খাতের সিকিউরিটিজ আছে। প্রতিটি খাতেই মৌলভিত্তির ক্রয়ানুকূল সিকিউরিটিজ রয়েছে। সব দিক বিবেচনায় দেশের পুঁজিবাজার দারুণভাবে ক্রয়ানুকূল।

বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল, সহসাই পুঁজিবাজারের সব সূচকেরই ধনাত্মক পরিবর্তন ঘটবে। কারণ দেশের রাজনৈতিক সূচক ইতিবাচক পথে হাঁটছে। ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন পকেটে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের সমাবেশ ঘটছে। বিনিয়োগযোগ্য অর্থ আছে।

আইসিবির হাতে ১০০০ + ৫০০ কোটি = দেড় হাজার কোটি টাকা রয়েছে। শেয়ারও আছে। আইসিবি চাইলে বর্তমান শক্তিতে ভর করেই ডিএসইএক্স সূচক এক হাজার থেকে ১৫০০ পয়েন্ট উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে। তাতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে পেত। আইসিবি ছাড়াও কয়েকটি ব্যাংক-ব্যাকড ব্রোকার হাউজে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল আছে। ফোর্স সেলের মাধ্যমে অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে। তাদের কাছেও প্রচুর শেয়ার আছে।

অধুনা নিষ্ক্রিয় কিছু মার্কেট প্লেয়ারের হাতেও টাকা আছে। তারা আগেভাগেই শেয়ার বিক্রি করে চুপচাপ বসে আছে। অপেক্ষা করছে—কবে ‘বাজার শত্রু’ বিদায় হবেন।

বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়ন— শীর্ষ পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনই (বিএসইসি) পুঁজিবাজারকে ক্রেতাশূন্য করেছে। গত দেড় বছরে অনেক বিনিয়োগকারী পথে বসেছে। বাজার খেলোয়াড়রাও ক্ষতিগ্রস্ত ও হয়রানির শিকার হয়েছে।

পৃথিবীর সব দেশেই বিনিয়োগকারীরা মুনাফা ও কোম্পানির প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়েই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অথচ বিএসইসি ও ডিএসই (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারীর মুনাফা সহ্যই করতে পারে না। বাজার মুনাফামুখী হলেই মোটা অঙ্কের জরিমানা, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, বিও অ্যাকাউন্ট বন্ধসহ নানা ধরনের শাস্তির খড়্গ বিনিয়োগকারীসহ বাজারসংশ্লিষ্টদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।

তাছাড়া পুঁজিবাজার হলো সুদমুক্ত পুঁজি প্রাপ্তির নির্ভরযোগ্য উৎস। উদ্যোক্তা এ বাজার থেকে পুঁজি উত্তোলন করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা বণ্টন করে। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি। এ বাজারের বিনিয়োগও দীর্ঘমেয়াদি। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিধি-বিধান অপরিহার্য। বাংলাদেশে পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপকরা এ নিয়ম মানে না। যখন-তখন বিধি-বিধান পরিবর্তন করে। নিত্যনতুন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়।

চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছুই জানানো হয় না। তাতেই বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিঃস্ব অবস্থায় বাজার ছাড়তেও বাধ্য হয়।

বাজার ব্যবস্থাপকদের বিনিয়োগবিদ্বেষী এসব কর্মকাণ্ডের জন্য বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারমুখী হওয়ার সাহস পাচ্ছে না। সারাক্ষণ পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার আতঙ্কে থাকে।

এখনো পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৬ লাখের বেশি বিনিয়োগকারী আছে। তাদের পোর্টফোলিওর ভার এরই মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমেছে। এ ধরনের বাজারচিত্র নতুন পুঁজি প্রবেশের অন্তরায়। এ পরিস্থিতির দায় সম্পূর্ণভাবেই বাজার ব্যবস্থাপকদের কাঁধেই পড়ে।

বিএসইসি পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হলেও স্টক এক্সচেঞ্জই হলো তালিকাভুক্তিসহ এ বাজারসংশ্লিষ্ট যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মূল প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে এ দায়িত্ব ডিএসইর। ডিমিউচুয়ালাইজড ডিএসই একটি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।

বাস্তবে এটি বিএসইসির একটি বর্ধিত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করছে। ডিএসইর পরিচালনা বোর্ডের সদস্য সংখ্যা ১২। এর মধ্যে সাতজন মনোনীত স্বতন্ত্র সদস্য। শেয়ারহোল্ডার সদস্য চারজন। নির্বাচনের মাধ্যমে উল্লিখিত চারজন বোর্ডে আসার কথা। একটি চক্র চারজনকে মনোনয়ন দিয়ে বোর্ডে পাঠায়।

বর্তমানে ডিএসই চালায় গুটিকয়েক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বোর্ডের তিনজন প্রভাবশালী সদস্য। এর মধ্যে দুজন মনোনীত সদস্য, একজন বিনা ভোটে নির্বাচিত সদস্য।

ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায় হলেও এখানে একটি চক্র বহাল তবিয়তে আছে। এখানেও নির্বাচন নির্বাসনে গেছে। সরকার পরিবর্তনের পরও নির্বাচন ফিরে আসেনি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষণ

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইসলামী ব্যাংকের ‘গ্রাহক সেবা মাস’ শুরু

‘কল্যাণমুখী ব্যাংকিংয়ের অগ্রযাত্রায় গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’— এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ‘গ্রাহক সেবা মাস’ কর্মসূচি শুরু করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। আজ বুধবার রাজধানীর ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হুসাইন প্রধান অতিথি হিসেবে কর্ম

৩ দিন আগে

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড, এক অর্থবছরে ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারের নগদ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পাঠানোর সুযোগ বাড়ায় প্রবাসীরা আগের তুলনায় বেশি বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করছেন। এর ফলেই রেমিট্যান্সে এ রেকর্ড প্রবৃদ্ধি এসেছে।

৩ দিন আগে

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস সংসদে

নতুন অর্থবছরে সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদের অনুমোদন পেয়েছে। আজ মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে নির্দিষ্টকরণ বিল, ২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে এই বাজেট অনুমোদন পায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুর দিন ১ জুলাই থেকে এই বাজেট কার্যকর হবে।

৪ দিন আগে

নীতি সুদহার ১০ শতাংশই বহাল, কমলো ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে মে মাস পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এ বাস্তবতায় নতুন করে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

৪ দিন আগে