
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। তার এই মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছে দেশের রাজনীতির এক অধ্যায়ের। সে অধ্যায় কেবল খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক জীবনের নয়, বরং দীর্ঘ চার দশক ধরে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীর যে প্রভাব, তারও অবসান ঘটল।
গত দেড় দশকে প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে। বিরোধী রাজনৈতিক মেরুতে থাকা রওশন এরশাদ দীর্ঘ দিন ধরে নিষ্ক্রিয়, বলা যায় রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত। এর মধ্যেই চিরবিদায় জানালেন চার দশক ধরে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া খালেদা জিয়া।
সব মিলিয়ে রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক শূন্যতার মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। কেবল শূন্যতা নয়; শেখ হাসিনার পলায়ন ও রওশন এরশাদের অনুপস্থিতির পর খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বই পর্দার আড়ালে চলে গেল কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে— রাজনীতির মাঠে এখন যেসব নারীরা রয়েছেন, তাদের মাধ্যমে কি রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নারী নেতৃত্বের শূন্যতা আদৌ পূরণ হবে? নাকি রাজনীতি পরিপূর্ণভাবেই প্রথাগত পুরুষতন্ত্রের বলয়ে প্রবেশ করবে?
বাংলাদেশের রাজনীতির গত চার দশকের গতিপথ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ দেশে নারী নেতৃত্বের জোয়ার যতটা না তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল উত্তরাধিকার ভিত্তিক।
এই প্রথাগত ধারার কড়া সমালোচনা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের যে জোয়ার আমরা দেখি, সেটি মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নেতৃত্ব। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া বা রওশন এরশাদ— তারা প্রত্যেকেই পারিবারিক পরিচয়ে রাজনীতিতে এসেছেন।’
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর এই বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যখন আমরা গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করি। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় আরোহণ, পুরো সময়টাই ছিল পরিবারের কোনো সদস্যের রেখে যাওয়া অমীমাংসিত রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাল ধরার দৃশ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই দীর্ঘ সময়ে দলগুলোর ভেতরে কোনো ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ নারী নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি।
এই উত্তরাধিকারের রাজনীতি কীভাবে সাধারণ নারীদের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে, সে বিষয়ে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো এমনভাবে ‘গেট’ বন্ধ করে রেখেছে যে উত্তরাধিকার ছাড়া কোনো সাধারণ মেয়ের এই নেতৃত্বে আসার সুযোগ নেই। আগামী ১০ বছর পরের কথা ভাবলেও দেখা যায়, সেখানেও জায়মা রহমান কিংবা সায়মা ওয়াজেদ অপেক্ষা করছেন। অর্থাৎ, যোগ্যতার চেয়ে রক্ত সম্পর্কই এখানে বড় ‘এন্ট্রি পাস’।”
২০২৬ সালের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দলগুলোর মনোনয়ন তালিকাতেও রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এমনই হতাশাজনক চিত্র উঠে আসে, মনে করিয়ে দেয় নারীদের জন্য রাজনীতির দরজা বন্ধ থাকার রূঢ় বাস্তবতা।
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) হাতেগোনা কয়েকজন নারীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। নভেম্বরে প্রকাশিত তাদের ২৩৭ জনের মনোনয়ন তালিকায় নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ১০ জন, শতকরা হারে যা মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি। এই ১০ জনের মধ্যে আবার একজন স্বয়ং খালেদা জিয়া, যার প্রয়াণে সে তালিকায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৪ শতাংশেরও কম।
প্রথাগতভাবে দেখা যায়, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কিছু নারী নেতাকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে থাকে। এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় সেসব নারী প্রার্থীর ভোটের মাঠে থাকার সুযোগ হয়নি। এর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর ৩০০ আসনের তালিকায় নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
এমনকি তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টিতেও (এনসিপি) নারী প্রার্থীরা আলোচনাতেই ছিলেন কম। তারপরও যে কয়েকজন ছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে দলটির নির্বাচনি জোটের পর তাদের বেশির ভাগই দল ছেড়েছেন। বাকিরা দল না ছাড়লেও ভোট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এমন বাস্তবতায় জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ নারীদের জন্য হয়ে পড়েছে আগের নির্বাচনগুলোর চেয়েও সংকুচিত। নারী অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে সব দল থেকে ৩৩ শতাংশ নারী মনোনয়নের দাবি জানানো হলেও দলগুলোর বাস্তব মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সেই ‘উত্তরাধিকার’ বা ‘টোকেনিজমে’র বাইরে সাধারণ নারীদের জায়গা পাওয়ার পথ এখনো রুদ্ধই রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ নারীদের জন্য প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। প্রকৃত নেতৃত্ব বা ‘ট্রেইলব্লেজার’রা শূন্য থেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে উঠে আসেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে সাধারণ নারীদের জন্য যে সুযোগ একেবারেই নগণ্য।
রাজনৈতিক দলগুলোতে অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ‘মহিলা দল’ থাকলেও সেগুলো কার্যকর কিছু নয় বলে মনে করেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এগুলো অনেকটা রথের পঞ্চম চাকার মতো, প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বা মূল কাঠামোতে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই।’
রাজনীতিতে উত্তরাধিকারের এই দেয়াল ভাঙার নতুন তাগিদ দেখা যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের মাঝে। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সে অভ্যুত্থানে সম্মুখ সারিতে থাকা অনেক তরুণীই পরে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অনেকেই দল ছেড়েছেন। তাসনিম জারা দল ছেড়ে জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বাকিরা এখনো রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেননি।
তরুণ নারী নেতৃত্ব জাতীয় ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামলী সুলতানা জেদনী রাজনীতি ডটকমকে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে নারীদের সচেতনতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, দেশের যেকোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নারীরা কীভাবে রাজপথে সোচ্চার হয়েছেন। এই জাগরণ প্রমাণ করে, নারীরা এখন কেবল দর্শক নন, বরং পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।’
জেদনী অবশ্য একই সঙ্গে এ রূঢ় বাস্তবতাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই সচেতনতার চিত্রটি শহরে যতটা দৃশ্যমান, গ্রামীণ জনপদে এখনো ততটা নয়। সেখানে নারীরা মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিলেও তার পেছনে প্রায়ই থাকে অসচেতনতা কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ। ধর্ম ও পরিবারের চাপ ছাড়াও এর পেছনে দলগুলোর ভেতরেও অনেক সময় সংকীর্ণতা কাজ করে থাকে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শ্যামলী সুলতানা জেদনী বলেন, ‘ধর্মীয় ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রামের নারীরা এখনো রাজনৈতিকভাবে ততটা সচেতন হয়ে উঠতে পারছেন না। পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হয় একজন নারীকে। এমনকি নিজ দলের ভেতরেও অনেক সময় সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না।’
এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও মানসিক হয়রানিকে বড় বাধা অভিহিত করে জেদনী বলেন, ‘একজন সচেতন নারীকে প্রায়ই কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন বক্তব্য ও নানা ধরনের চারিত্রিক অবমাননার শিকার হতে হয়। রাষ্ট্রকে কেবল নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলে চলবে না, প্রতিটি নারীর জন্য একটি নির্ভয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যখন আইনের সঠিক প্রয়োগ হবে এবং নারীরা মানুষ হিসেবে পূর্ণ নিরাপত্তা পাবে, তখনই তারা সাহসের সঙ্গে রাজনীতি ও সমাজ বিনির্মাণে নিজেদের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবে।’
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক নারী কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হকও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গীর সমস্যার কথা তুলে ধরেন রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের নেপথ্যের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়েও অনেক নারী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাজনীতি করছেন। মূল সমস্যাটি নারীদের যোগ্যতায় নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে।’
‘দলগুলোর ভেতরে এখনো যথাযথ গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে এবং নারীদের মূল নেতৃত্বে নিয়ে আসার ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যায়। তারা যদি নারীদের জন্য সুযোগের দুয়ার খুলে না দেয়, নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত না করে, তবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়া কঠিন,’— বলেন শিরীন পারভিন হক।
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও তা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, “সংরক্ষিত নারী আসন মূলতেই ‘ভোট ব্যাংক’ এবং দলীয় আত্মীয়স্বজনদের সুবিধা দেওয়ার একটি মাধ্যম। এটি মূলত একটি ‘টোকেন’ ব্যবস্থা, দয়া করে কিছু আসন দেওয়া।”
‘এই নারীরা সংসদে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেন না। দেশে এত এত ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু কোনো সংরক্ষিত নারী সদস্যকে এ নিয়ে সংসদে কখনো জোরালো প্রতিবাদ বা মুলতবি প্রস্তাব আনতে দেখা যায় না। এটি প্রকারান্তরে অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়,’— বলেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এ অধ্যাপক বিশ্বাস করেন, প্রকৃত নারী নেতৃত্ব তখনই আসবে যখন তারা উত্তরাধিকারের দেয়াল ভেঙে নিজের যোগ্যতায় রাজনীতির মাঠে জায়গা করে নেবেন এবং দলগুলো নারীদের সংরক্ষিত আসনের ‘টোকেনিজম’ ছেড়ে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেবে। প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে যারা উঠে আসছেন, যেমন— তাসনিম জারা, তাদের তিনি উচ্চমূল্য দিয়ে অধ্যাপক দিলারা বলেন, ‘তারাই প্রকৃত নেতা এবং আগামীর পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে, যাদের দেখে সাধারণ মেয়েরা অনুপ্রাণিত হবে।’
ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে বর্তমানের এ গভীর শূন্যতাকে অন্যভাবে দেখছেন প্রবীণ রাজনীতিকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম সহসভাপতি (ভিপি) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের যে বলয় আমরা দেখেছি, তাতে রওশন এরশাদের অনুপস্থিতি, শেখ হাসিনার পলায়ন কিংবা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অনুপস্থিতিতে অনেকে গভীর শূন্যতা বা ‘ভ্যাকিউম’ দেখছেন। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম, তা কখনোই স্থবির থাকে না। ইতিহাস এক বহমান নদী, যা ক্রমাগত সামনের দিকে ধাবিত হয়।’
সেলিম বিশ্বাস করেন, উত্তরাধিকার কিংবা পশ্চাৎপদ ‘টুলস কালচারে’র মতো বিষয়গুলো সময়ের আবর্তে ক্ষয়ে যেতে বাধ্য। তিনি বলেন, ‘নারী মুক্তির লড়াইকে কোনো কৃত্রিম দেয়াল দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। সামাজিকভাবে বা মধ্যযুগীয় ফতোয়া দিয়ে নারীকে গৃহবন্দি রাখার অপচেষ্টা সাময়িক সংকট তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ধোপে টিকবে না। সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর যৌক্তিক ও ন্যায্য অধিকার সময়ের বিবর্তনে উন্মোচিত হবেই। ইতিহাসকে উলটো দিকে চালানোর সাধ্য কারও নেই।’
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে নারী নেতৃত্বের শূন্যতাকেন্দ্রিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মতো ব্যক্তিত্বরা ইতিহাসের অংশ। তিনি নিজ গুণেই একজন মহৎ ব্যক্তি। তার এই মহত্তকে অতিরঞ্জিত করতে গিয়ে যদি আমরা এমন এক অন্ধকার চিত্র আঁকি যে তার পরে আর কেউ আসবে না, সেটি হবে তাকে অপমান করার শামিল। তিনি ইতিহাসকে এমনভাবে রুদ্ধ করে যাননি যেন ভবিষ্যতে তার চেয়েও যোগ্য কেউ তৈরি হতে না পারে।’
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদটি ছিল নারীদের দখলে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বিরল উদাহরণ। কিন্তু এই শীর্ষ নারী নেতৃত্বের নিচে তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়ন বা অংশগ্রহণের চিত্র ছিল অত্যন্ত করুণ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি ভোটে জয়ী হয়ে আসা নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা কখনোই ১০ শতাংশের ঘর স্পর্শ করতে পারেনি।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ও শিরীন পারভিন হক দুজনেই মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোকেই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বাইরে গিয়ে নারীকে মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে, নারীর জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সেটি করতে পারলেই রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব এই মুহূর্তে যেভাবে আড়ালে চলে গেছে, তা থেকে আবার বেরিয়ে আসতে পারবে।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। তার এই মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছে দেশের রাজনীতির এক অধ্যায়ের। সে অধ্যায় কেবল খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক জীবনের নয়, বরং দীর্ঘ চার দশক ধরে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীর যে প্রভাব, তারও অবসান ঘটল।
গত দেড় দশকে প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে। বিরোধী রাজনৈতিক মেরুতে থাকা রওশন এরশাদ দীর্ঘ দিন ধরে নিষ্ক্রিয়, বলা যায় রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত। এর মধ্যেই চিরবিদায় জানালেন চার দশক ধরে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া খালেদা জিয়া।
সব মিলিয়ে রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক শূন্যতার মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। কেবল শূন্যতা নয়; শেখ হাসিনার পলায়ন ও রওশন এরশাদের অনুপস্থিতির পর খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বই পর্দার আড়ালে চলে গেল কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে— রাজনীতির মাঠে এখন যেসব নারীরা রয়েছেন, তাদের মাধ্যমে কি রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নারী নেতৃত্বের শূন্যতা আদৌ পূরণ হবে? নাকি রাজনীতি পরিপূর্ণভাবেই প্রথাগত পুরুষতন্ত্রের বলয়ে প্রবেশ করবে?
বাংলাদেশের রাজনীতির গত চার দশকের গতিপথ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ দেশে নারী নেতৃত্বের জোয়ার যতটা না তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল উত্তরাধিকার ভিত্তিক।
এই প্রথাগত ধারার কড়া সমালোচনা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের যে জোয়ার আমরা দেখি, সেটি মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নেতৃত্ব। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া বা রওশন এরশাদ— তারা প্রত্যেকেই পারিবারিক পরিচয়ে রাজনীতিতে এসেছেন।’
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর এই বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যখন আমরা গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করি। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় আরোহণ, পুরো সময়টাই ছিল পরিবারের কোনো সদস্যের রেখে যাওয়া অমীমাংসিত রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাল ধরার দৃশ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই দীর্ঘ সময়ে দলগুলোর ভেতরে কোনো ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ নারী নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি।
এই উত্তরাধিকারের রাজনীতি কীভাবে সাধারণ নারীদের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে, সে বিষয়ে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো এমনভাবে ‘গেট’ বন্ধ করে রেখেছে যে উত্তরাধিকার ছাড়া কোনো সাধারণ মেয়ের এই নেতৃত্বে আসার সুযোগ নেই। আগামী ১০ বছর পরের কথা ভাবলেও দেখা যায়, সেখানেও জায়মা রহমান কিংবা সায়মা ওয়াজেদ অপেক্ষা করছেন। অর্থাৎ, যোগ্যতার চেয়ে রক্ত সম্পর্কই এখানে বড় ‘এন্ট্রি পাস’।”
২০২৬ সালের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দলগুলোর মনোনয়ন তালিকাতেও রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এমনই হতাশাজনক চিত্র উঠে আসে, মনে করিয়ে দেয় নারীদের জন্য রাজনীতির দরজা বন্ধ থাকার রূঢ় বাস্তবতা।
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) হাতেগোনা কয়েকজন নারীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। নভেম্বরে প্রকাশিত তাদের ২৩৭ জনের মনোনয়ন তালিকায় নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ১০ জন, শতকরা হারে যা মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি। এই ১০ জনের মধ্যে আবার একজন স্বয়ং খালেদা জিয়া, যার প্রয়াণে সে তালিকায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৪ শতাংশেরও কম।
প্রথাগতভাবে দেখা যায়, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কিছু নারী নেতাকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে থাকে। এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় সেসব নারী প্রার্থীর ভোটের মাঠে থাকার সুযোগ হয়নি। এর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর ৩০০ আসনের তালিকায় নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
এমনকি তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টিতেও (এনসিপি) নারী প্রার্থীরা আলোচনাতেই ছিলেন কম। তারপরও যে কয়েকজন ছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে দলটির নির্বাচনি জোটের পর তাদের বেশির ভাগই দল ছেড়েছেন। বাকিরা দল না ছাড়লেও ভোট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এমন বাস্তবতায় জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ নারীদের জন্য হয়ে পড়েছে আগের নির্বাচনগুলোর চেয়েও সংকুচিত। নারী অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে সব দল থেকে ৩৩ শতাংশ নারী মনোনয়নের দাবি জানানো হলেও দলগুলোর বাস্তব মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সেই ‘উত্তরাধিকার’ বা ‘টোকেনিজমে’র বাইরে সাধারণ নারীদের জায়গা পাওয়ার পথ এখনো রুদ্ধই রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ নারীদের জন্য প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। প্রকৃত নেতৃত্ব বা ‘ট্রেইলব্লেজার’রা শূন্য থেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে উঠে আসেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে সাধারণ নারীদের জন্য যে সুযোগ একেবারেই নগণ্য।
রাজনৈতিক দলগুলোতে অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ‘মহিলা দল’ থাকলেও সেগুলো কার্যকর কিছু নয় বলে মনে করেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এগুলো অনেকটা রথের পঞ্চম চাকার মতো, প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বা মূল কাঠামোতে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই।’
রাজনীতিতে উত্তরাধিকারের এই দেয়াল ভাঙার নতুন তাগিদ দেখা যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের মাঝে। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সে অভ্যুত্থানে সম্মুখ সারিতে থাকা অনেক তরুণীই পরে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অনেকেই দল ছেড়েছেন। তাসনিম জারা দল ছেড়ে জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বাকিরা এখনো রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেননি।
তরুণ নারী নেতৃত্ব জাতীয় ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামলী সুলতানা জেদনী রাজনীতি ডটকমকে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে নারীদের সচেতনতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, দেশের যেকোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নারীরা কীভাবে রাজপথে সোচ্চার হয়েছেন। এই জাগরণ প্রমাণ করে, নারীরা এখন কেবল দর্শক নন, বরং পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।’
জেদনী অবশ্য একই সঙ্গে এ রূঢ় বাস্তবতাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই সচেতনতার চিত্রটি শহরে যতটা দৃশ্যমান, গ্রামীণ জনপদে এখনো ততটা নয়। সেখানে নারীরা মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিলেও তার পেছনে প্রায়ই থাকে অসচেতনতা কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ। ধর্ম ও পরিবারের চাপ ছাড়াও এর পেছনে দলগুলোর ভেতরেও অনেক সময় সংকীর্ণতা কাজ করে থাকে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শ্যামলী সুলতানা জেদনী বলেন, ‘ধর্মীয় ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রামের নারীরা এখনো রাজনৈতিকভাবে ততটা সচেতন হয়ে উঠতে পারছেন না। পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হয় একজন নারীকে। এমনকি নিজ দলের ভেতরেও অনেক সময় সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না।’
এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও মানসিক হয়রানিকে বড় বাধা অভিহিত করে জেদনী বলেন, ‘একজন সচেতন নারীকে প্রায়ই কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন বক্তব্য ও নানা ধরনের চারিত্রিক অবমাননার শিকার হতে হয়। রাষ্ট্রকে কেবল নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলে চলবে না, প্রতিটি নারীর জন্য একটি নির্ভয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যখন আইনের সঠিক প্রয়োগ হবে এবং নারীরা মানুষ হিসেবে পূর্ণ নিরাপত্তা পাবে, তখনই তারা সাহসের সঙ্গে রাজনীতি ও সমাজ বিনির্মাণে নিজেদের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবে।’
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক নারী কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হকও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গীর সমস্যার কথা তুলে ধরেন রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের নেপথ্যের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়েও অনেক নারী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাজনীতি করছেন। মূল সমস্যাটি নারীদের যোগ্যতায় নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে।’
‘দলগুলোর ভেতরে এখনো যথাযথ গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে এবং নারীদের মূল নেতৃত্বে নিয়ে আসার ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যায়। তারা যদি নারীদের জন্য সুযোগের দুয়ার খুলে না দেয়, নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত না করে, তবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়া কঠিন,’— বলেন শিরীন পারভিন হক।
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও তা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, “সংরক্ষিত নারী আসন মূলতেই ‘ভোট ব্যাংক’ এবং দলীয় আত্মীয়স্বজনদের সুবিধা দেওয়ার একটি মাধ্যম। এটি মূলত একটি ‘টোকেন’ ব্যবস্থা, দয়া করে কিছু আসন দেওয়া।”
‘এই নারীরা সংসদে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেন না। দেশে এত এত ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু কোনো সংরক্ষিত নারী সদস্যকে এ নিয়ে সংসদে কখনো জোরালো প্রতিবাদ বা মুলতবি প্রস্তাব আনতে দেখা যায় না। এটি প্রকারান্তরে অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়,’— বলেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এ অধ্যাপক বিশ্বাস করেন, প্রকৃত নারী নেতৃত্ব তখনই আসবে যখন তারা উত্তরাধিকারের দেয়াল ভেঙে নিজের যোগ্যতায় রাজনীতির মাঠে জায়গা করে নেবেন এবং দলগুলো নারীদের সংরক্ষিত আসনের ‘টোকেনিজম’ ছেড়ে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেবে। প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে যারা উঠে আসছেন, যেমন— তাসনিম জারা, তাদের তিনি উচ্চমূল্য দিয়ে অধ্যাপক দিলারা বলেন, ‘তারাই প্রকৃত নেতা এবং আগামীর পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে, যাদের দেখে সাধারণ মেয়েরা অনুপ্রাণিত হবে।’
ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে বর্তমানের এ গভীর শূন্যতাকে অন্যভাবে দেখছেন প্রবীণ রাজনীতিকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম সহসভাপতি (ভিপি) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের যে বলয় আমরা দেখেছি, তাতে রওশন এরশাদের অনুপস্থিতি, শেখ হাসিনার পলায়ন কিংবা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অনুপস্থিতিতে অনেকে গভীর শূন্যতা বা ‘ভ্যাকিউম’ দেখছেন। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম, তা কখনোই স্থবির থাকে না। ইতিহাস এক বহমান নদী, যা ক্রমাগত সামনের দিকে ধাবিত হয়।’
সেলিম বিশ্বাস করেন, উত্তরাধিকার কিংবা পশ্চাৎপদ ‘টুলস কালচারে’র মতো বিষয়গুলো সময়ের আবর্তে ক্ষয়ে যেতে বাধ্য। তিনি বলেন, ‘নারী মুক্তির লড়াইকে কোনো কৃত্রিম দেয়াল দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। সামাজিকভাবে বা মধ্যযুগীয় ফতোয়া দিয়ে নারীকে গৃহবন্দি রাখার অপচেষ্টা সাময়িক সংকট তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ধোপে টিকবে না। সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর যৌক্তিক ও ন্যায্য অধিকার সময়ের বিবর্তনে উন্মোচিত হবেই। ইতিহাসকে উলটো দিকে চালানোর সাধ্য কারও নেই।’
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে নারী নেতৃত্বের শূন্যতাকেন্দ্রিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মতো ব্যক্তিত্বরা ইতিহাসের অংশ। তিনি নিজ গুণেই একজন মহৎ ব্যক্তি। তার এই মহত্তকে অতিরঞ্জিত করতে গিয়ে যদি আমরা এমন এক অন্ধকার চিত্র আঁকি যে তার পরে আর কেউ আসবে না, সেটি হবে তাকে অপমান করার শামিল। তিনি ইতিহাসকে এমনভাবে রুদ্ধ করে যাননি যেন ভবিষ্যতে তার চেয়েও যোগ্য কেউ তৈরি হতে না পারে।’
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদটি ছিল নারীদের দখলে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বিরল উদাহরণ। কিন্তু এই শীর্ষ নারী নেতৃত্বের নিচে তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়ন বা অংশগ্রহণের চিত্র ছিল অত্যন্ত করুণ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি ভোটে জয়ী হয়ে আসা নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা কখনোই ১০ শতাংশের ঘর স্পর্শ করতে পারেনি।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ও শিরীন পারভিন হক দুজনেই মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোকেই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বাইরে গিয়ে নারীকে মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে, নারীর জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সেটি করতে পারলেই রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব এই মুহূর্তে যেভাবে আড়ালে চলে গেছে, তা থেকে আবার বেরিয়ে আসতে পারবে।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়া কোনো আপস করেননি।
৭ ঘণ্টা আগে
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলের নেতাকর্মীদের সমবেদনা জানিয়েছেন ছারছীন দরবার শরিফের পীর হযরত মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমাদ হুসাইন।
৭ ঘণ্টা আগে
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, "ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে, মানুষের মধ্যে যে আবেগ কাজ করছে, সে আবেগ নিঃসন্দেহে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করবে।"
৮ ঘণ্টা আগে
প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার তিনটি সংসদীয় আসনে আগে থেকে মনোনীত বিকল্প প্রার্থীরাই দলের চূড়ান্ত প্রার্থী বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
৯ ঘণ্টা আগে