
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের দলীয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনের ছয় মাস পরে এসে নতুন বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— জামায়াত সাংগঠনিকভাবে যত শক্তিশালী, নির্বাচনি রাজনীতিতে তার প্রতিফলন তত পূর্ণাঙ্গ নয়; সংসদে যত সক্রিয়, জনমতে তার গ্রহণযোগ্যতা তত নিরঙ্কুশ নয়; এবং জোটে যত প্রয়োজনীয়, স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ার ক্ষেত্রে জোট তত সীমাবদ্ধতাও তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পাঁচ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে জামায়াত— ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি, আদর্শিক অবস্থান, ভোট-আসনের গাণিতিক বাস্তবতা ও বিএনপি-সম্পর্ক, জোট রাজনীতির টানাপোড়েন এবং তরুণ প্রজন্ম ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চ্যালেঞ্জগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি সংকট দলটির আদর্শিক অবস্থানকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। সে অস্পষ্টতা তাদের মাঠের রাজনীতিকেই কেবল নয়, জোটগত রাজনীতিকেও কঠিন করেছে। এর সূত্র ধরেই ভাঙনের মুখেও রয়েছে তাদের নেতৃত্বাধীন জোট।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরিষদের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. সাব্বির আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জামায়াতের সামনের এসব চ্যালেঞ্জ নিছক কৌশলগত সমস্যা নয়, এগুলো দলটির রাজনৈতিক চরিত্র-সংক্রান্ত মৌলিক প্রশ্ন। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াত আপামর মানুষের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির একটি বড় সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু তাদের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে অতিক্রম করতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসন আর ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট নিয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইতিহাসে আর কখনো দলটি এত বেশি ভোট পায়নি, পায়নি সংসদে এতগুলো আসন। এর আগে বিএনপির সঙ্গে জোট শরিক হিসেবে ক্ষমতায় থাকলেও সংসদে প্রধান বিরোধী দল আর দলের আমিরের সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হওয়ার ঘটনাও জামায়াতের ইতিহাসে এই প্রথম।
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আমলে চাপ ও নিপীড়নের মুখে থাকার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়া জামায়াত জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশে ফিরে আসে রাজনীতির মাঠে। এরপর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ দলটি বলা যায় বর্তমানে রাজনীতিতে নিজেদের সর্বোচ্চ সুসময় পার করছে।
কিন্তু সেই সুসময়ও জামায়াতের জন্য নির্বিঘ্ন নেই। নির্বাচনে ঐতিহাসিক ফলাফল অর্জনের ছয় মাসের মাথায় এসে জামায়াতের সামনে রাজনৈতিক চিত্রটি অনেক বেশি জটিল। তাদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। জোটের তরুণ-নেতৃত্বাধীন সবচেয়ে আলোচিত অংশীদার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। এমনকি কওমি ঘরানার ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের শলাপরামর্শ চালাচ্ছে।
একই সময়ে ব্যক্তিগত ভিডিও বিতর্কের জের ধরে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হয়েছে। এ ঘটনায় দলীয় আমিরকে সংসদের বাইরে গিয়ে স্বীকার পর্যন্ত করতে হয়েছে, ‘আমরা ফেরেশতাদের দল নই।’ জামায়াতের সামনের চ্যালেঞ্জগুলো তাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জামায়াতের জন্য সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে অমীমাংসিত প্রশ্নটি হলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দলটির ভূমিকা। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তবে দলটি স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি।
এর মধ্যে গত বছর লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে এবং এক টকশোতে অতিথি হয়ে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান দলের ‘অতীত কৃতকর্মের জন্য’ ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, শুধু একাত্তর নয়, ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা কোনো মানুষ কষ্ট পেয়ে থাকলে তার জন্য তিনি সবার কাছে ক্ষমা চাইছেন।
জামায়াতে ইসলামীর এই ক্ষমা প্রার্থনা ব্যতিক্রমী আচরণ হলেও সমালোচকদের বক্তব্য, এ ধরনের ‘গড়’ ক্ষমা চাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, কোনো অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে হলে প্রথমে অপরাধটি স্বীকার করতে হয়। এরপর তার জন্য ক্ষমা চাইতে হয়। সে জায়গা থেকে জামায়াত আমিরের ক্ষমা প্রার্থনার ভাষাটি যথাযথ নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, একাত্তরে স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দলটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্তেই মানবতাবিরোধী নানা অপরাধে জড়িত ছিল। সেসবের কোনো দায় স্বীকার না করে জামায়াত আমির সুকৌশলে ‘সাতচল্লিশ থেকে আজ পর্যন্ত’ সময়ের একটি বড় টাইম ফ্রেম ধরে ‘কোনো অপরাধ করে থাকলে’ তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। স্পষ্টতই এটি একাত্তরের দায় এড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লোটার মানসিকতা থেকেই করা হয়েছে বলে মন্তব্য সমালোচকদের।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘এই ইতিহাসের বোঝা কাটিয়ে ওঠাই জামায়াতের জন্য ১ নম্বর এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ যত প্রজন্মের কথাই বলা হোক না কেন, দেশ ও জাতির ইতিহাস সব প্রজন্মের জন্যই প্রযোজ্য। বর্তমান প্রজন্মের সবার জন্ম একাত্তরের পরে হলেও ওই ইতিহাসের প্রভাব এখনো লেগে আছে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াত ডানপন্থি অবস্থান থেকে মধ্যপন্থি অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং নির্বাচনি প্রচারের একাংশে ধর্মকে ব্যবহার না করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ না করা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা প্রকাশ, কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলার মতো পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ‘একাত্তরবিরোধী’ ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন অধ্যাপক নিজাম। তবে তার মূল্যায়ন, ‘এই পরিবর্তন সর্বসাধারণের বিবেচনায় কতটুকু পৌঁছেছে, তা বলা কঠিন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘একাত্তর প্রশ্নটি কখনোই জামায়াতের পিছু ছাড়েনি। তরুণ প্রজন্মের একাংশ বর্তমান বক্তব্যে আশ্বস্ত হলেও দেশের একটি বড় অংশের কাছে এটি এখনো অমীমাংসিত এক ট্রমা। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতিতে পূর্ণাঙ্গ গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে জামায়াতকে এ প্রশ্নে আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।’
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একাত্তর ইস্যুর ‘আবেদন’ আগের তুলনায় কিছুটা হলেও কমেছে। তবে এটি রাজনৈতিকভাবে একটি ‘স্থায়ী অস্ত্র’। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে জামায়াত শতবার ক্ষমা চাইলেও তাতে কিছু হবে না। কারণ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটি একটি স্থায়ী রাজনৈতিক অস্ত্র।’
জামায়াতের দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের আদর্শিক পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্টতা তৈরি করা। এটি নিছক তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়, কারণ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই প্রশ্নই জোট ভাঙনের প্রত্যক্ষ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নির্বাচনি মাঠেও এটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
গত ১৪ জানুয়ারি ন্যাশনাল খ্রিষ্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাশ, বাংলাদেশ ইভানজেলিক্যাল রিভাইভাল চার্চের চেয়ারম্যান রেভারেন্ড বনি বাড়ৈ ও টিচার ফর পাস্তর ইন বাংলাদেশের ফরমার লেজিসলেটর ড. গর্ডনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সাক্ষাতের পর প্রতিনিধি দলের সদস্যরা গণমাধ্যমকে জানান, শফিকুর রহমান তাদের বলেছেন যে ক্ষমতায় গেলে জামায়াত শরিয়াহ আইন কায়েম করবে না।
এদিকে নির্বাচনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকেও জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রচলিত আইনেই দেশ পরিচালনার কথা বলা হয়। অন্যদিকে একাধিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে, তৃণমূলে নির্বাচনি প্রচারের সময় জামায়াত ঠিকই আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের কথা বলেছে। সমালোচকরা এ ক্ষেত্রে জামায়াতের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণের অভিযোগ তোলেন। এমনকি নির্বাচনের আগে জামায়াতের ‘শরিয়াহ কায়েমে অনীহা’কে বড় কারণ দেখিয়ে নির্বাচনি জোট ছেড়ে যায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
একই সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে, ২০১২ সাল থেকে জামায়াত ধাপে ধাপে তার গঠনতন্ত্র থেকে ‘আল্লাহর আইন কায়েম’জাতীয় ভাষা সরিয়ে সাংবিধানিক ভাষায় প্রতিস্থাপন করেছে কি না। নির্বাচনের আগে আগে জামায়াত নতুন লোগো ব্যবহার করতে শুরু করে, যেখানে ‘আল্লাহ’ ও ‘আকিমুদ্দিন’ লেখা দেখা যায়নি। জামায়াতের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, তাদের লোগো এখনো চূড়ান্ত হয়নি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আদর্শিক প্রশ্নে জামায়াতের এমন অবস্থান নিয়ে অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জামায়াত এখনো একটি প্রশ্নে আটকে আছে— তারা কি একটি কট্টরপন্থি ইসলামী দল, নাকি লিবারেল ডেমোক্রেটিক দল? পাকিস্তানের মুসলিম লিগ যেমন ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক কাঠামোয় প্রবেশ করেছে, কিন্তু জামায়াত এখনো সেই রূপান্তর সম্পূর্ণ করতে পারেনি।’
অধ্যাপক নিজামের পর্যবেক্ষণ, বাহ্যিকভাবে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন প্রক্রিয়া অন্য যেকোনো দলের চেয়ে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ হলেও দলটি এখনো জনমনে স্পষ্ট করতে পারেনি— সংসদীয় ব্যবস্থায় তারা শারিয়াহ আইন প্রয়োগ করবে, নাকি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় থাকবে। তার ভাষায়, ‘এই আদর্শিক অস্পষ্টতা কাটাতে না পারা জামায়াতের বড় সংকট।’
ড. সাব্বির আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জামায়াত একদিকে নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুসারী দাবি করছে, অন্যদিকে তাদের মূল মতাদর্শিক লক্ষ্য একটি ইসলামভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই দ্বৈততা থেকেই প্রশ্ন তৈরি হয়— জামায়াত কি প্রকৃতপক্ষে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, নাকি ক্ষমতায় পৌঁছানোর একটি সিঁড়ি হিসেবে একই সঙ্গে গণতন্ত্র ও ধর্মকে ব্যবহার করছে?’
ড. আব্দুল লতিফ মাসুম জামায়াতের এই প্রবণতাকে কিছুটা রসিকতার সঙ্গে তুলনা করেন দেশের অন্য দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে মিলিয়ে। তিনি বলেন, ‘বিএনপি তো আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে, আর জামায়াতে ইসলামী বিএনপি হওয়ার চেষ্টা করছে!’
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি সরাসরি সংখ্যাতাত্ত্বিক। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০৯টি আসন (৭০ শতাংশের বেশি) পেয়েছে, আর জামায়াত ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৬৮টি আসন (২৩ শতাংশের কম) পেয়েছে। সে হিসাবে জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত ও প্রাপ্ত আসনের অনুপাতের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে, যা সাংগঠনিক শক্তি ও রাজপথের রাজনীতির পার্থক্যকেই তুলে ধরে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ড. সাব্বির আহমেদের বিশ্লেষণ, এই সমীকরণটি জামায়াতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলির অংশ— তারা কি এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো শক্ত গণভিত্তি তৈরি করতে পারবে, নাকি তাদের সব সময় অন্য কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ওপরই ভরসা করে থাকতে হবে?
অধ্যাপক সাব্বির বলেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারার দলগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা জামায়াতের জন্য জরুরি একটি কাজ।
ড. আব্দুল লতিফ মাসুমের পর্যবেক্ষণ, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ বিএনপি তৈরি করলে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারত। কিন্তু তার ধারণা, বিএনপি এই সুযোগ দেবে না, বরং কৌশলগত কারণে বিএনপি আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানে আরও কঠোর হবে।
অধ্যাপক আব্দুল লতিফ বলেন, জামায়াতের জোরালো অবস্থান ও উগ্রপন্থার পুরনো বদনামকে ব্যবহার করে বিএনপিসহ অন্যান্য দল রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে, যা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। সংসদীয় বা রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে জামায়াতের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম। নেতৃত্বের পরিপক্বতার প্রশ্নেও দলটিকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
সংসদে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জামায়াত নিজেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা ‘গতানুগতিক’ বিরোধী দল হিসেবে থাকবে না। কিন্তু ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ এতে ঝুঁকি দেখছেন। তার ভাষায়, “সংসদে জামায়াতকে প্রায় প্রতিদিনই দাঁড়িয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, যা একধরনের ‘ওভার অ্যাক্টিভ’ ভূমিকা। সংসদীয় প্রক্রিয়া হওয়া উচিত ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক, আর জামায়াতের উচিত একটি প্রকৃত ‘কনস্টিটিউশনাল অপজিশন’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।”
নিজেদের গড়া নির্বাচনি জোট ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখেও রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’র আওতায় জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে। এনসিপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হয়ে ১১-দলীয় জোটে রূপ নেয়।
শরিয়া আইন কায়েম নিয়ে আদর্শিক দ্বন্দ্ব আর আসন সমঝোতা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বাচনের আগেই জোট ছাড়ে। নির্বাচনের পর সেই অস্বস্তি আরও গভীর হয়েছে। ২৫ জুলাই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ত্যাগ করে।
সবশেষ দুদিন আগেও ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে লংমার্চ কর্মসূচিতে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে এনসিপিরও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন— এনসিপি অন্তত ঢাকার একটি সিটি করপোরেশনে সমঝোতা চাইলেও জামায়াত তাতে সাড়া দেয়নি; উভয় দলই আলাদাভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পথে হাঁটছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এ বিষয়ে বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয়ভাবে সমঝোতা হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সে সুযোগ নেই।’ একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, জামায়াতের একাংশ মনে করে দলগুলোকে ‘পরিকল্পিতভাবে’ জোট থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ পরিস্থিতিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে চট্টগ্রামে বৈঠক হয়েছে, যেখানে একটি বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। এনসিপি সে প্ল্যাটফর্মে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
জোট ভাঙনের ক্ষেত্রে আদর্শিক প্রশ্নও কাজ করছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জোট ত্যাগের পেছনে সরাসরি কারণ ছিল শরিয়াহ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান, যা তৃতীয় চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আবার এনসিপির ভেতরে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে শুরু থেকেই মতবিরোধ ছিল। তাজনূভা জাবীন, তাসনিম জারাসহ জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বের দলত্যাগেরও কারণ ছিল জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত।
ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদের বিশ্লেষণে জামায়াতের নেতৃত্বেও এই টানাপোড়েনের প্রতিফলন আছে। তিনি বলেন, জামায়াত ‘লিবারেল এডুকেশনে শিক্ষিত’দের জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। মঈনুর রহমান বা বর্তমান আমির শফিকুর রহমানের মতো ব্যক্তিরা এর উদাহরণ। বাহ্যিকভাবে এটি ইতিবাচক মনে হলেও এর ফলে দলের ভেতরে পুরানো কট্টরপন্থি ধারা ও সামনে আসা নতুন লিবারেল ধারার মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়ে গেছে, যার পুরোপুরি সমাধান এখনো হয়নি।
অধ্যাপক নিজাম বলেন, এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন বাইরের জোট-রাজনীতি অস্থিরতার একটি কারণ হতে পারে। কারণ দলের ভেতরে দিকনির্দেশনা যত অস্পষ্ট থাকে, শরিক দলগুলোর কাছে দলের অবস্থানও তত অনির্দিষ্ট মনে হয়।
নতুন প্রজন্মের আস্থা অর্জন এবং সেই আস্থা ধরে রাখার মতো সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে বিশ্লেষকরা জামায়াতের পঞ্চম চ্যালেঞ্জ বলে করছেন, যা জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের উঠতি তরুণ প্রজন্ম জামায়াতের অতীতের আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেনি। বিগত দিনের শোনা কথা ও রূপের ওপর ভিত্তি করে জামায়াতকে হুট করে অ্যাকসেপ্ট করা বেশ ডিফিকাল্ট। ফলে জামায়াতকে এই প্রজন্মের সামনে স্পষ্ট করতে হবে তারা আসলে কোন ধারার রাজনীতি করতে চায়— নতুনরা বিশ্বাস করবে, নাকি সংশয়ের চোখে দেখবে— সেই রায় এখনো আসেনি, যা জামায়াতের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।’
ড. সাব্বির আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আজকের তরুণ প্রজন্ম কেবল ধর্মানুভূতি বা রাজনৈতিক স্লোগানে সন্তুষ্ট নয়। তারা চায় বৈষম্যহীন সমাজ, কর্মসংস্থান, বাকস্বাধীনতা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। জামায়াত যদি তরুণদের কেবল আবেগ দিয়ে ধরে রাখতে চায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা রাজনৈতিকভাবে সফল হবে না।’
তবে এ অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে দলের নিজস্ব সাংগঠনিক শৃঙ্খলা থেকে। জুলাই মাসে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জরুরি বৈঠক করে তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার ভিত্তিতে তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জামায়াতের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন গাজী নজরুল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দলের জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে আসে। ঘটনার তিন দিন পরই জামায়াত আমিরকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হয়, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতাদের দল নয়। আমরা মানুষ, আমাদেরও ভুলত্রুটি হয়।’
ড. আব্দুল লতিফ মাসুম অবশ্য এ ঘটনাকে দলটির জন্য কৌশলগত সংকট হিসেবে না দেখলেও বিশ্লেষকদের মধ্যে এ ঘটনার তাৎপর্য নিয়ে মতভেদ আছে। তারা বলছেন, এ ঘটনাটি ঠিক তখনই ঘটেছে যখন জামায়াত নিজেদের একটি নতুন, সংস্কারপন্থি ও নৈতিক রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াত দেখাতে চেয়েছে যে তারা জবাবদিহিমূলক, কিন্তু ঘটনাটি একই সঙ্গে প্রমাণ করে— তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও প্রতিটি নেতার আচরণ দলের ঘোষিত নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাখা বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে পাঁচ চ্যালেঞ্জের মুখে জামায়াত দাঁড়িয়ে, সেগুলো পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি সংকট দলেন আদর্শিক অস্পষ্টতাকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ জামায়াত যত দ্রুত নিজেকে মধ্যপন্থি প্রমাণ করতে চায়, ততই তার ঐতিহ্যবাহী ভিত্তির কাছে প্রশ্ন ওঠে— সে সত্যিকারের ইসলামি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কি না। আর এই প্রশ্নই ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের মতো শরিকদের জোট ছাড়ার কারণ হয়েছে।
আবার ভোট-আসনের গাণিতিক ফারাক জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে দ্বন্দ্বে ঠেলে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তার স্বাধীন রাজনৈতিক সম্প্রসারণের সীমা নির্ধারণ করতে পারে। আবার তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জনের প্রশ্নটিও সরাসরি নির্ভর করছে ওপরের চারটি প্রশ্নের সুরাহার ওপর। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদেরই একটি বড় অংশ এখন প্রশ্ন তুলছে, জামায়াতের সঙ্গে সহযোগিতা তাদের নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য কতটা মূল্য দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রেই জামায়াতের সামনে বাস্তবসম্মত বিকল্প আছে, যদিও প্রতিটির সঙ্গেই রাজনৈতিক ঝুঁকি জড়িত। তারা বলছেন, আগামী দিনে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান মূলত নির্ভর করবে তিনটি সক্ষমতার ওপর— আদর্শিক অবস্থানে স্পষ্টতা আনার সক্ষমতা, জোট-শরিকদের আস্থা ধরে রাখার সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলাকে জাতীয় রাজনীতির নজরদারির মানদণ্ডে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা।
ড. সাব্বির আহমেদের ভাষায়, এই পাঁচ চ্যালেঞ্জ জামায়াত কীভাবে সমাধান করে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাদের প্রকৃত অবস্থান কী হবে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ইসলামপন্থি শিবিরে চলমান নতুন মেরুকরণ, বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সম্ভাব্য বিকল্প প্ল্যাটফর্মের সূত্র ধরে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এ প্রশ্নগুলোর প্রাথমিক উত্তর মিলতে শুরু করবে।
অধ্যাপক সাব্বির বলেন, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি প্রশ্নাতীত। প্রশ্ন হলো— সেই শক্তি একটি বিস্তৃত, টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচনি জোটে রূপান্তরের প্রক্রিয়া স্থায়ী হবে, নাকি আরও একবার তা জোট ভাঙন ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের দলীয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনের ছয় মাস পরে এসে নতুন বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— জামায়াত সাংগঠনিকভাবে যত শক্তিশালী, নির্বাচনি রাজনীতিতে তার প্রতিফলন তত পূর্ণাঙ্গ নয়; সংসদে যত সক্রিয়, জনমতে তার গ্রহণযোগ্যতা তত নিরঙ্কুশ নয়; এবং জোটে যত প্রয়োজনীয়, স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ার ক্ষেত্রে জোট তত সীমাবদ্ধতাও তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পাঁচ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে জামায়াত— ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি, আদর্শিক অবস্থান, ভোট-আসনের গাণিতিক বাস্তবতা ও বিএনপি-সম্পর্ক, জোট রাজনীতির টানাপোড়েন এবং তরুণ প্রজন্ম ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চ্যালেঞ্জগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি সংকট দলটির আদর্শিক অবস্থানকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। সে অস্পষ্টতা তাদের মাঠের রাজনীতিকেই কেবল নয়, জোটগত রাজনীতিকেও কঠিন করেছে। এর সূত্র ধরেই ভাঙনের মুখেও রয়েছে তাদের নেতৃত্বাধীন জোট।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরিষদের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. সাব্বির আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জামায়াতের সামনের এসব চ্যালেঞ্জ নিছক কৌশলগত সমস্যা নয়, এগুলো দলটির রাজনৈতিক চরিত্র-সংক্রান্ত মৌলিক প্রশ্ন। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াত আপামর মানুষের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির একটি বড় সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু তাদের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে অতিক্রম করতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসন আর ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট নিয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইতিহাসে আর কখনো দলটি এত বেশি ভোট পায়নি, পায়নি সংসদে এতগুলো আসন। এর আগে বিএনপির সঙ্গে জোট শরিক হিসেবে ক্ষমতায় থাকলেও সংসদে প্রধান বিরোধী দল আর দলের আমিরের সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হওয়ার ঘটনাও জামায়াতের ইতিহাসে এই প্রথম।
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আমলে চাপ ও নিপীড়নের মুখে থাকার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়া জামায়াত জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশে ফিরে আসে রাজনীতির মাঠে। এরপর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ দলটি বলা যায় বর্তমানে রাজনীতিতে নিজেদের সর্বোচ্চ সুসময় পার করছে।
কিন্তু সেই সুসময়ও জামায়াতের জন্য নির্বিঘ্ন নেই। নির্বাচনে ঐতিহাসিক ফলাফল অর্জনের ছয় মাসের মাথায় এসে জামায়াতের সামনে রাজনৈতিক চিত্রটি অনেক বেশি জটিল। তাদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। জোটের তরুণ-নেতৃত্বাধীন সবচেয়ে আলোচিত অংশীদার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। এমনকি কওমি ঘরানার ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের শলাপরামর্শ চালাচ্ছে।
একই সময়ে ব্যক্তিগত ভিডিও বিতর্কের জের ধরে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হয়েছে। এ ঘটনায় দলীয় আমিরকে সংসদের বাইরে গিয়ে স্বীকার পর্যন্ত করতে হয়েছে, ‘আমরা ফেরেশতাদের দল নই।’ জামায়াতের সামনের চ্যালেঞ্জগুলো তাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জামায়াতের জন্য সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে অমীমাংসিত প্রশ্নটি হলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দলটির ভূমিকা। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তবে দলটি স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি।
এর মধ্যে গত বছর লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে এবং এক টকশোতে অতিথি হয়ে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান দলের ‘অতীত কৃতকর্মের জন্য’ ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, শুধু একাত্তর নয়, ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা কোনো মানুষ কষ্ট পেয়ে থাকলে তার জন্য তিনি সবার কাছে ক্ষমা চাইছেন।
জামায়াতে ইসলামীর এই ক্ষমা প্রার্থনা ব্যতিক্রমী আচরণ হলেও সমালোচকদের বক্তব্য, এ ধরনের ‘গড়’ ক্ষমা চাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, কোনো অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে হলে প্রথমে অপরাধটি স্বীকার করতে হয়। এরপর তার জন্য ক্ষমা চাইতে হয়। সে জায়গা থেকে জামায়াত আমিরের ক্ষমা প্রার্থনার ভাষাটি যথাযথ নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, একাত্তরে স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দলটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্তেই মানবতাবিরোধী নানা অপরাধে জড়িত ছিল। সেসবের কোনো দায় স্বীকার না করে জামায়াত আমির সুকৌশলে ‘সাতচল্লিশ থেকে আজ পর্যন্ত’ সময়ের একটি বড় টাইম ফ্রেম ধরে ‘কোনো অপরাধ করে থাকলে’ তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। স্পষ্টতই এটি একাত্তরের দায় এড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লোটার মানসিকতা থেকেই করা হয়েছে বলে মন্তব্য সমালোচকদের।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘এই ইতিহাসের বোঝা কাটিয়ে ওঠাই জামায়াতের জন্য ১ নম্বর এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ যত প্রজন্মের কথাই বলা হোক না কেন, দেশ ও জাতির ইতিহাস সব প্রজন্মের জন্যই প্রযোজ্য। বর্তমান প্রজন্মের সবার জন্ম একাত্তরের পরে হলেও ওই ইতিহাসের প্রভাব এখনো লেগে আছে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াত ডানপন্থি অবস্থান থেকে মধ্যপন্থি অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং নির্বাচনি প্রচারের একাংশে ধর্মকে ব্যবহার না করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ না করা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা প্রকাশ, কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলার মতো পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ‘একাত্তরবিরোধী’ ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন অধ্যাপক নিজাম। তবে তার মূল্যায়ন, ‘এই পরিবর্তন সর্বসাধারণের বিবেচনায় কতটুকু পৌঁছেছে, তা বলা কঠিন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘একাত্তর প্রশ্নটি কখনোই জামায়াতের পিছু ছাড়েনি। তরুণ প্রজন্মের একাংশ বর্তমান বক্তব্যে আশ্বস্ত হলেও দেশের একটি বড় অংশের কাছে এটি এখনো অমীমাংসিত এক ট্রমা। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতিতে পূর্ণাঙ্গ গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে জামায়াতকে এ প্রশ্নে আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।’
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একাত্তর ইস্যুর ‘আবেদন’ আগের তুলনায় কিছুটা হলেও কমেছে। তবে এটি রাজনৈতিকভাবে একটি ‘স্থায়ী অস্ত্র’। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে জামায়াত শতবার ক্ষমা চাইলেও তাতে কিছু হবে না। কারণ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটি একটি স্থায়ী রাজনৈতিক অস্ত্র।’
জামায়াতের দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের আদর্শিক পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্টতা তৈরি করা। এটি নিছক তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়, কারণ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই প্রশ্নই জোট ভাঙনের প্রত্যক্ষ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নির্বাচনি মাঠেও এটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
গত ১৪ জানুয়ারি ন্যাশনাল খ্রিষ্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাশ, বাংলাদেশ ইভানজেলিক্যাল রিভাইভাল চার্চের চেয়ারম্যান রেভারেন্ড বনি বাড়ৈ ও টিচার ফর পাস্তর ইন বাংলাদেশের ফরমার লেজিসলেটর ড. গর্ডনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সাক্ষাতের পর প্রতিনিধি দলের সদস্যরা গণমাধ্যমকে জানান, শফিকুর রহমান তাদের বলেছেন যে ক্ষমতায় গেলে জামায়াত শরিয়াহ আইন কায়েম করবে না।
এদিকে নির্বাচনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকেও জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রচলিত আইনেই দেশ পরিচালনার কথা বলা হয়। অন্যদিকে একাধিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে, তৃণমূলে নির্বাচনি প্রচারের সময় জামায়াত ঠিকই আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের কথা বলেছে। সমালোচকরা এ ক্ষেত্রে জামায়াতের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণের অভিযোগ তোলেন। এমনকি নির্বাচনের আগে জামায়াতের ‘শরিয়াহ কায়েমে অনীহা’কে বড় কারণ দেখিয়ে নির্বাচনি জোট ছেড়ে যায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
একই সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে, ২০১২ সাল থেকে জামায়াত ধাপে ধাপে তার গঠনতন্ত্র থেকে ‘আল্লাহর আইন কায়েম’জাতীয় ভাষা সরিয়ে সাংবিধানিক ভাষায় প্রতিস্থাপন করেছে কি না। নির্বাচনের আগে আগে জামায়াত নতুন লোগো ব্যবহার করতে শুরু করে, যেখানে ‘আল্লাহ’ ও ‘আকিমুদ্দিন’ লেখা দেখা যায়নি। জামায়াতের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, তাদের লোগো এখনো চূড়ান্ত হয়নি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আদর্শিক প্রশ্নে জামায়াতের এমন অবস্থান নিয়ে অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জামায়াত এখনো একটি প্রশ্নে আটকে আছে— তারা কি একটি কট্টরপন্থি ইসলামী দল, নাকি লিবারেল ডেমোক্রেটিক দল? পাকিস্তানের মুসলিম লিগ যেমন ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক কাঠামোয় প্রবেশ করেছে, কিন্তু জামায়াত এখনো সেই রূপান্তর সম্পূর্ণ করতে পারেনি।’
অধ্যাপক নিজামের পর্যবেক্ষণ, বাহ্যিকভাবে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন প্রক্রিয়া অন্য যেকোনো দলের চেয়ে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ হলেও দলটি এখনো জনমনে স্পষ্ট করতে পারেনি— সংসদীয় ব্যবস্থায় তারা শারিয়াহ আইন প্রয়োগ করবে, নাকি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় থাকবে। তার ভাষায়, ‘এই আদর্শিক অস্পষ্টতা কাটাতে না পারা জামায়াতের বড় সংকট।’
ড. সাব্বির আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জামায়াত একদিকে নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুসারী দাবি করছে, অন্যদিকে তাদের মূল মতাদর্শিক লক্ষ্য একটি ইসলামভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই দ্বৈততা থেকেই প্রশ্ন তৈরি হয়— জামায়াত কি প্রকৃতপক্ষে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, নাকি ক্ষমতায় পৌঁছানোর একটি সিঁড়ি হিসেবে একই সঙ্গে গণতন্ত্র ও ধর্মকে ব্যবহার করছে?’
ড. আব্দুল লতিফ মাসুম জামায়াতের এই প্রবণতাকে কিছুটা রসিকতার সঙ্গে তুলনা করেন দেশের অন্য দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে মিলিয়ে। তিনি বলেন, ‘বিএনপি তো আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে, আর জামায়াতে ইসলামী বিএনপি হওয়ার চেষ্টা করছে!’
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি সরাসরি সংখ্যাতাত্ত্বিক। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০৯টি আসন (৭০ শতাংশের বেশি) পেয়েছে, আর জামায়াত ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৬৮টি আসন (২৩ শতাংশের কম) পেয়েছে। সে হিসাবে জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত ও প্রাপ্ত আসনের অনুপাতের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে, যা সাংগঠনিক শক্তি ও রাজপথের রাজনীতির পার্থক্যকেই তুলে ধরে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ড. সাব্বির আহমেদের বিশ্লেষণ, এই সমীকরণটি জামায়াতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলির অংশ— তারা কি এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো শক্ত গণভিত্তি তৈরি করতে পারবে, নাকি তাদের সব সময় অন্য কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ওপরই ভরসা করে থাকতে হবে?
অধ্যাপক সাব্বির বলেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারার দলগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা জামায়াতের জন্য জরুরি একটি কাজ।
ড. আব্দুল লতিফ মাসুমের পর্যবেক্ষণ, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ বিএনপি তৈরি করলে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারত। কিন্তু তার ধারণা, বিএনপি এই সুযোগ দেবে না, বরং কৌশলগত কারণে বিএনপি আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানে আরও কঠোর হবে।
অধ্যাপক আব্দুল লতিফ বলেন, জামায়াতের জোরালো অবস্থান ও উগ্রপন্থার পুরনো বদনামকে ব্যবহার করে বিএনপিসহ অন্যান্য দল রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে, যা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। সংসদীয় বা রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে জামায়াতের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম। নেতৃত্বের পরিপক্বতার প্রশ্নেও দলটিকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
সংসদে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জামায়াত নিজেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা ‘গতানুগতিক’ বিরোধী দল হিসেবে থাকবে না। কিন্তু ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ এতে ঝুঁকি দেখছেন। তার ভাষায়, “সংসদে জামায়াতকে প্রায় প্রতিদিনই দাঁড়িয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, যা একধরনের ‘ওভার অ্যাক্টিভ’ ভূমিকা। সংসদীয় প্রক্রিয়া হওয়া উচিত ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক, আর জামায়াতের উচিত একটি প্রকৃত ‘কনস্টিটিউশনাল অপজিশন’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।”
নিজেদের গড়া নির্বাচনি জোট ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখেও রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’র আওতায় জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে। এনসিপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হয়ে ১১-দলীয় জোটে রূপ নেয়।
শরিয়া আইন কায়েম নিয়ে আদর্শিক দ্বন্দ্ব আর আসন সমঝোতা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বাচনের আগেই জোট ছাড়ে। নির্বাচনের পর সেই অস্বস্তি আরও গভীর হয়েছে। ২৫ জুলাই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ত্যাগ করে।
সবশেষ দুদিন আগেও ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে লংমার্চ কর্মসূচিতে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে এনসিপিরও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন— এনসিপি অন্তত ঢাকার একটি সিটি করপোরেশনে সমঝোতা চাইলেও জামায়াত তাতে সাড়া দেয়নি; উভয় দলই আলাদাভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পথে হাঁটছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এ বিষয়ে বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয়ভাবে সমঝোতা হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সে সুযোগ নেই।’ একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, জামায়াতের একাংশ মনে করে দলগুলোকে ‘পরিকল্পিতভাবে’ জোট থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ পরিস্থিতিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে চট্টগ্রামে বৈঠক হয়েছে, যেখানে একটি বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। এনসিপি সে প্ল্যাটফর্মে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
জোট ভাঙনের ক্ষেত্রে আদর্শিক প্রশ্নও কাজ করছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জোট ত্যাগের পেছনে সরাসরি কারণ ছিল শরিয়াহ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান, যা তৃতীয় চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আবার এনসিপির ভেতরে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে শুরু থেকেই মতবিরোধ ছিল। তাজনূভা জাবীন, তাসনিম জারাসহ জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বের দলত্যাগেরও কারণ ছিল জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত।
ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদের বিশ্লেষণে জামায়াতের নেতৃত্বেও এই টানাপোড়েনের প্রতিফলন আছে। তিনি বলেন, জামায়াত ‘লিবারেল এডুকেশনে শিক্ষিত’দের জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। মঈনুর রহমান বা বর্তমান আমির শফিকুর রহমানের মতো ব্যক্তিরা এর উদাহরণ। বাহ্যিকভাবে এটি ইতিবাচক মনে হলেও এর ফলে দলের ভেতরে পুরানো কট্টরপন্থি ধারা ও সামনে আসা নতুন লিবারেল ধারার মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়ে গেছে, যার পুরোপুরি সমাধান এখনো হয়নি।
অধ্যাপক নিজাম বলেন, এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন বাইরের জোট-রাজনীতি অস্থিরতার একটি কারণ হতে পারে। কারণ দলের ভেতরে দিকনির্দেশনা যত অস্পষ্ট থাকে, শরিক দলগুলোর কাছে দলের অবস্থানও তত অনির্দিষ্ট মনে হয়।
নতুন প্রজন্মের আস্থা অর্জন এবং সেই আস্থা ধরে রাখার মতো সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে বিশ্লেষকরা জামায়াতের পঞ্চম চ্যালেঞ্জ বলে করছেন, যা জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের উঠতি তরুণ প্রজন্ম জামায়াতের অতীতের আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেনি। বিগত দিনের শোনা কথা ও রূপের ওপর ভিত্তি করে জামায়াতকে হুট করে অ্যাকসেপ্ট করা বেশ ডিফিকাল্ট। ফলে জামায়াতকে এই প্রজন্মের সামনে স্পষ্ট করতে হবে তারা আসলে কোন ধারার রাজনীতি করতে চায়— নতুনরা বিশ্বাস করবে, নাকি সংশয়ের চোখে দেখবে— সেই রায় এখনো আসেনি, যা জামায়াতের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।’
ড. সাব্বির আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আজকের তরুণ প্রজন্ম কেবল ধর্মানুভূতি বা রাজনৈতিক স্লোগানে সন্তুষ্ট নয়। তারা চায় বৈষম্যহীন সমাজ, কর্মসংস্থান, বাকস্বাধীনতা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। জামায়াত যদি তরুণদের কেবল আবেগ দিয়ে ধরে রাখতে চায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা রাজনৈতিকভাবে সফল হবে না।’
তবে এ অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে দলের নিজস্ব সাংগঠনিক শৃঙ্খলা থেকে। জুলাই মাসে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জরুরি বৈঠক করে তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার ভিত্তিতে তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জামায়াতের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন গাজী নজরুল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দলের জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে আসে। ঘটনার তিন দিন পরই জামায়াত আমিরকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হয়, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতাদের দল নয়। আমরা মানুষ, আমাদেরও ভুলত্রুটি হয়।’
ড. আব্দুল লতিফ মাসুম অবশ্য এ ঘটনাকে দলটির জন্য কৌশলগত সংকট হিসেবে না দেখলেও বিশ্লেষকদের মধ্যে এ ঘটনার তাৎপর্য নিয়ে মতভেদ আছে। তারা বলছেন, এ ঘটনাটি ঠিক তখনই ঘটেছে যখন জামায়াত নিজেদের একটি নতুন, সংস্কারপন্থি ও নৈতিক রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াত দেখাতে চেয়েছে যে তারা জবাবদিহিমূলক, কিন্তু ঘটনাটি একই সঙ্গে প্রমাণ করে— তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও প্রতিটি নেতার আচরণ দলের ঘোষিত নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাখা বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে পাঁচ চ্যালেঞ্জের মুখে জামায়াত দাঁড়িয়ে, সেগুলো পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি সংকট দলেন আদর্শিক অস্পষ্টতাকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ জামায়াত যত দ্রুত নিজেকে মধ্যপন্থি প্রমাণ করতে চায়, ততই তার ঐতিহ্যবাহী ভিত্তির কাছে প্রশ্ন ওঠে— সে সত্যিকারের ইসলামি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কি না। আর এই প্রশ্নই ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের মতো শরিকদের জোট ছাড়ার কারণ হয়েছে।
আবার ভোট-আসনের গাণিতিক ফারাক জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে দ্বন্দ্বে ঠেলে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তার স্বাধীন রাজনৈতিক সম্প্রসারণের সীমা নির্ধারণ করতে পারে। আবার তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জনের প্রশ্নটিও সরাসরি নির্ভর করছে ওপরের চারটি প্রশ্নের সুরাহার ওপর। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদেরই একটি বড় অংশ এখন প্রশ্ন তুলছে, জামায়াতের সঙ্গে সহযোগিতা তাদের নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য কতটা মূল্য দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রেই জামায়াতের সামনে বাস্তবসম্মত বিকল্প আছে, যদিও প্রতিটির সঙ্গেই রাজনৈতিক ঝুঁকি জড়িত। তারা বলছেন, আগামী দিনে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান মূলত নির্ভর করবে তিনটি সক্ষমতার ওপর— আদর্শিক অবস্থানে স্পষ্টতা আনার সক্ষমতা, জোট-শরিকদের আস্থা ধরে রাখার সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলাকে জাতীয় রাজনীতির নজরদারির মানদণ্ডে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা।
ড. সাব্বির আহমেদের ভাষায়, এই পাঁচ চ্যালেঞ্জ জামায়াত কীভাবে সমাধান করে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাদের প্রকৃত অবস্থান কী হবে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ইসলামপন্থি শিবিরে চলমান নতুন মেরুকরণ, বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সম্ভাব্য বিকল্প প্ল্যাটফর্মের সূত্র ধরে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এ প্রশ্নগুলোর প্রাথমিক উত্তর মিলতে শুরু করবে।
অধ্যাপক সাব্বির বলেন, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি প্রশ্নাতীত। প্রশ্ন হলো— সেই শক্তি একটি বিস্তৃত, টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচনি জোটে রূপান্তরের প্রক্রিয়া স্থায়ী হবে, নাকি আরও একবার তা জোট ভাঙন ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন শুরু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা। দাবি না মানলেন ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকারের পতন হবে বলে জানাচ্ছেন তারা।
২ দিন আগে
তিনি বলেন, ‘সংসদীয় রাজনীতিতে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সংসদের বিতর্ককে দ্রুত রাজপথে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করে।’
২ দিন আগে
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ‘লংমার্চ’ কর্মসূচি শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্য। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার দুপুরে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে এক পথসভায় এসব কথা বলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের।
২ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের বি১/বি২ ভিজিটর ভিসা দেশটিতে একটি নির্দিষ্ট ও সীমিত সময়ের যাত্রার জন্য সীমাবদ্ধ। সাধারণত ব্যবসায়িক কাজে ভ্রমণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘বি১’ ভিসা দিয়ে থাকে। আর পর্যটন ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে ভ্রমণের জন্য ‘বি২’ ভিসা দেওয়া হয়।
২ দিন আগে