
জেসমিন রহমান

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নের একটি— তারেক রহমান দেশে ফিরছেন কবে। দেশে ফিরবেন, ফিরছেন, আর মাত্র কদিন বাকি— এমন যখন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন, তার ফেরার চাবি এখনো ‘অন্যের হাতে’।
দেশে ফেরা নিয়ে তারেক রহমানের এই ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য এমন একটি সময়ে এলো যখন তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। স্বাভাবিকভাবেই তার এ মন্তব্য রাজনীতিতে জুগিয়েছে আলোচনার নতুন খোরাক। প্রশ্ন উঠেছে— তারেক রহমানের দেশে ফেরা বা না ফেরার সিদ্ধান্ত তাহলে কার হাতে!
অনেকের আলোচনাতেই উঠে এসেছে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের কথা, যখন তারেক রহমানকে বাধ্য করা হয়েছিল মুচলেকা দিয়ে দেশ ছাড়াতে। ওই সময় লন্ডনে উড়াল দেওয়ার আগে তাকে অঙ্গীকারনামায় সই করতে হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল তিনি রাজনীতি করবেন না। সেই অঙ্গীকারনামাই আজও তার দেশে ফেরার অন্তরায়, এমন অভিমত অনেকের।
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আড়ালে অন্য কোনো খেলা চলছে কি না। নাকি পুরনো কোনো ভয় এখনো তাড়া করে ফিরছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে। রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র কথাও এখনো ঘুরেফিরে আসছে। এমনকি বাদ যাচ্ছে না ৫ আগস্ট পরবর্তী সেই আলোচনা, যেখানে প্রধান দুই দলকে ক্ষমতার বাইরে রাখার কথা বলেছিলেন গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া কেউ কেউ।
এমন সব আলোচনা-প্রশ্ন আর গুঞ্জনের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথে দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক বাধা নেই বলে মনে হলেও ‘অদৃশ্য বাধা’টি সম্ভবত অনেক বেশি গভীর ও ব্যক্তিগত। ২০০৭ সালের ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ এবং ওয়ান-ইলেভেনের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা হয়তো তিনি ভুলতে পারেননি, যখন তাকে রিমান্ডের নামে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। সেই ট্রমা এখনো তাকে তাড়া করে ফিরছে কি না, এমন প্রশ্নও রেখেছেন অনেকে।
তবে নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি বা ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি যাই থাকুক না কেন, মায়ের এমন শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তারেক রহমানকে দ্রুতই দেশে ফিরে দলের হাল ধরা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, রাজনীতি করতে গেলে ঝুঁকিমুক্ত থাকার সুযোগ নেই।
ঠিক যেখানে আলোচনার সূত্রপাত সেটি হলো তারেক রহমানেরই একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। নিজের মা বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার জন্য সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ যেভাবে প্রার্থনারত, তাতে সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতেই এ স্ট্যাটাস দেন তিনি। মায়ের জন্য দোয়াও চান সবার কাছে।
এর সঙ্গে সঙ্গেই তারেক রহমান তুলে ধরেন তার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ। বলেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।’
তারেক রহমানের নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাহলে কোন শক্তি কাজ করছে— এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের অভিমত, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে যারা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, সম্ভবত সেই শক্তির সঙ্গে তার পূর্বতন বোঝাপড়ার এখনো সমাধান হয়নি।

রাজনীতি ডটকমকে ড. সাব্বির বলেন, “আগে তাকে নিয়ে যে সমস্যাগুলো হয়েছিল, সেগুলোর সুরাহা হয়নি। বিএনপি হয়তো ভাবছে, তারেক যদি ফিরে আসেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর যে অংশটা তার ওপর অত্যাচার করেছিল, তারা হয়তো এখনো তাকে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিচ্ছে না।”
তারেক রহমান নিজেও বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ‘স্পর্শকাতর’ অভিহিত করে ‘বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত’ বলে ব্যাখ্যা দেননি। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে— ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের ছায়া কি রয়ে গেছে? যারা একসময় তারেক রহমানের মেরুদণ্ডে আঘাত করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল, তারা কি এখনো তাকে আটকাতে চাইছে? ড. সাব্বিরের মতে, তাদের হয়তো কোনো স্বার্থ বা ‘স্টেক’ রয়ে গেছে এখনো।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা যখন চরমে, অনেকের প্রত্যাশা ছিল সরকার তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে তারেক রহমানের দেশে ফেরা ইস্যুতে সরকারও ‘অদৃশ্য চাপে’ আছে কি না— এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম এ পরিস্থিতিতে সরকারের দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘এখন সরকারের ওপর অলিখিতভাবে একটি দায়িত্ব চেপেছে। প্রশ্ন হলো— দেশে ফেরাটা কি তারেক রহমানের জন্য নিরাপদ? সরকারই বা কীভাবে সেটি নিশ্চিত করবে?’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মেজর এমদাদুল বলেন, “সরকার উনাকেও (তারেক রহমান) জিজ্ঞাসা করতে পারে যে তিনি কী কারণে ওই কথাটা বলেছেন। কারণ তে তিনি (তারেক রহমান) প্রকাশ করেননি। এখন আমি বা আপনি যতটুকু অনুমান করতে পারি— ‘সিকিউরিটি পারসপেক্টিভ’ বা নিরাপত্তা ইস্যু।”
৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। তার দলের প্রতাপশালী নেতারা এখন আত্মগোপনে বা কারাগারে। তাহলে তারেক রহমানের জন্য বাধা কে— জানতে চাইলে এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘এখন সরকারকেই ব্যাখ্যা দিতে হবে যে কেন উনি এই কথাটা বললেন।’
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আশ্বস্ত করা হচ্ছে, তারেক রহমানের দেশে ফিরতে তাদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কোনো বিধিনিষেধ অথবা কোনো ধরনের আপত্তি নেই।’
মা যখন মৃত্যুশয্যায়, দলকে যখন অনেকেই ক্ষমতার কাছাকাছি দেখছেন, এমন সময়ই ‘কাণ্ডারি’ নেই প্রত্যক্ষ দৃশ্যপটে। এ পরিস্থিতি বিএনপির অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীকে হতাশ করেছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বিষয়টিকে খুব ইতিবাচকভাবে দেখছেন না।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমি ঐকান্তিকভাবে চাই, তিনি (তারেক রহমান) দেশে ফিরে আসুক। ইন ফ্যাক্ট, আমি চাইছিলাম, ৫ আগস্টের পরপরই উনি দেশে আসবেন এবং বিএনপির হাল ধরবেন।’

দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও তারেক রহমানের দেশে না ফেরা দলের ভবিষ্যতের জন্য অশনী সংকেত হতে পারে বলে মনে করেন এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। বলেন, “ওখান থেকেই নমিনেশন হচ্ছে। কিন্তু এভাবে ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ তো দেশ চলবে না। উনাকে নিশ্চয়ই আসতে হবে। ওনার যদি কোনো অসুবিধা থাকে, সেটা প্রকাশ্যে জনগণকে বলবেন। যদি উনি বিএনপিকে ধরে রাখতে চান, তাহলে উনাকে দেশে ফিরে এসে বিএনপির হাল ধরতেই হবে। তা না হলে খালেদা জিয়ার দুঃখজনক অবর্তমানে দলটি সামনে অনেক গভীর সংকটে পড়বে।’
নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে যে এত কথা হচ্ছে, তাকে খুব একটা পাত্তা দিতে নারাজ ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। রাজনীতি করতে গেলে ঝুঁকি এড়ানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিহীন সমাজ বা ঝুঁকিহীন নেতৃত্ব কি হতে পারে? প্রেসিডেন্ট ওবামাই হোন কিংবা গণ্ডগ্রামের কোনো নেতাই হোন— প্রত্যেকের একটা ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি নিয়েই রাজনীতি করতে হয়, সমাজসেবা করতে হয়, নিজের মত প্রচার করতে হয়। আমার মনে হয়, উনার মতো একজন ভিআইপিকে প্রোটেকশন দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের সরকারের থাকা উচিত এবং সেটা আছেও।’
রাজনীতির মাঠ যখন গরম, তখন কিছু ‘টেকনিক্যাল’ বিষয়ও সামনে এনেছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, তারেক রহমান লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকার ফলে তার বাংলাদেশি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে। দেশি পাসপোর্ট তিনি ‘সারেন্ডার’ করেছিলেন বলেও শোনা যায়। এখন চাইলেই কি তিনি হুট করে বিমানে উঠতে পারেন?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রিটেনের ‘অ্যাসাইলাম’ বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। একবার পাসপোর্ট ‘সারেন্ডার’ করে অ্যাসাইলাম নিলে আবার ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা পাসপোর্ট ইস্যু করা একটি দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার। লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এই ছাড়পত্র পাওয়া এবং ব্রিটিশ হোম অফিসের ক্লিয়ারেন্স— সব মিলিয়ে এটি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
তবে এসব ইস্যুকে মূল সমস্যা হিসেবে মানতে নারাজ ড. সাব্বির। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে পাসপোর্ট বাধা হতে পারে না বলে মনে করেন তিনি। ড. সাব্বির রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, পাসপোর্টের চেয়ে প্রথম কারণটিই (ওয়ান-ইলেভেনের শক্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাদের সঙ্গে একসময় তার সংকটকালীন সম্পর্ক ছিল, সেটাই হয়তো এখনো তার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’
তারেক রহমানের দেশে না ফেরার বিষয়টি নিয়ে ‘টেকনিক্যাল’ নানা বিষয় জল্পনা-কল্পনায় উঠে এলেও এর পেছনে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা। বিএনপি হয়তো তাদের শীর্ষ নেতাকে নিয়ে নির্বাচনের আগে কোনো ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতায় জড়াতে চায় না— এমনটি মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক মামুন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে খানিকটা অস্পষ্টতা ও গোপনীয়তা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তা কেবলই কাকতালীয় নয়, বরং একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। আইনি জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে হাইকমান্ড সম্ভবত অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেছে। এ কৌশলগত নীরবতা দলের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের রহস্য ও আকর্ষণ জিইয়ে রাখে। নেতা কখন আসবেন— এ অপেক্ষাই কর্মীদের চাঙ্গা রাখে।’

তারেক রহমান দেশে না থাকলে দল দুর্বল হয়ে পড়বে— অনেকের এমন ধারণার সঙ্গে অধ্যাপক মামুন একমত নন। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির এই যুগে শারীরিক উপস্থিতি অপরিহার্য নয়, যদি আনুগত্য থাকে। তার অনুপস্থিতিতেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেই। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ও আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যমে দলের সব স্তরে নির্দেশনার আদান-প্রদান স্বাভাবিক হওয়ায় তিনি না এলেও চলছে— এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।’
জিয়া পরিবারের প্রতি কর্মীদের ‘যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে’ থাকা আবেগ বিএনপির বড় চালিকাশক্তি বলে মনে করেন অধ্যাপক মামুন। তিনি বলেন, ‘বিএনপির কাঠামোর স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি হলো দেশজুড়ে নেতাকর্মীদের তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিবারের প্রতি এ ধরনের আনুগত্য বহুলাংশে ঐতিহ্যগত ও আবেগপ্রসূত। এ নিঃশর্ত আনুগত্যই নিশ্চিত করেছে যে তার শারীরিক অনুপস্থিতি যেন নেতৃত্বের শূন্যতা বা সাংগঠনিক দুর্বলতায় রূপান্তরিত না হয়। বরং দূর থেকেই তিনি দলের প্রধান শক্তি ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।’
যখন দেশ জুড়ে আলোচনা— তারেক রহমান কবে ফিরবেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে এক নাটকীয় মোড়। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জানা গেল, ছেলে ফিরছেন না, বরং মৃত্যু পথযাত্রী মা-ই হয়তো পাড়ি জমাবেন ছেলের কাছে। তারেক রহমানের সহসাই দেশে না ফেরার বিষয়টি তার উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিনের শনিবারের (২৯ নভেম্বর) বক্তব্যেও অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকেই এবার দেশ ছাড়তে হতে পারে।
ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় ড. মাহদী আমিন লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়ার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলে তাকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে লন্ডনের সেই হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, যাদের তত্ত্বাবধানে চলতি বছরের শুরুতে চার মাস চিকিৎসা নিয়ে খালেদা জিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি লাভ করেছিলেন।’
মাহদী আমিনের এ বক্তব্যকে কেবল মেডিকেল আপডেট নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই পড়ছেন বিশ্লেষকরা। বলছেন, তার এই বক্তব্যের অর্থ— আইনি জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি অথবা ওয়ান-ইলেভেনের ‘ডিপ স্টেটে’র প্রভাব হয়তো এতটাই প্রকট যে মায়ের এ চরম মুহূর্তেও তারেক রহমান ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বা চাইলেও নিতে পারছেন না।
বরং খালেদা জিয়াকেই হয়তো সংকটাপন্ন শরীর নিয়েও এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে চাপতে হতে পারে। ড. মাহদী আমিনও সেটি নিশ্চিত করেছেন তার স্ট্যাটাসে— ‘পাশাপাশি একটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসজ্জিত বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করারও উদ্যোগ চলছে।’
এ খবরটি দলের নেতাকর্মীদের জন্য একই সঙ্গে স্বস্তির ও বেদনার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্য স্বস্তির খবর, খালেদা জিয়া লন্ডনে গেলে উন্নত চিকিৎসা পাবেন। আর বেদনার কারণ, শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের ফেরাটা আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।
লন্ডনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান হয়তো ভাবছেন ঢাকার আকাশের কথা। ভাবছেন মায়ের শীর্ণ হাতের স্পর্শের কথা। এভারকেয়ার হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মা-ও হয়তো বুঝে গেছেন ছেলের ফেরা হচ্ছে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চেয়েছিলেন, ঝুঁকি নিয়ে তারেক রহমান ফিরে আসুক। অধ্যাপক মামুন তারেক রহমানের না ফেরা দেখছেন ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে। আর ড. সাব্বির খুঁজেছিলেন ‘অদৃশ্য বাধার দেয়াল’। তবে শেষ পর্যন্ত ড. মাহদী আমিনের বক্তব্যই নির্মম বাস্তবতা হয়ে সামনে এল, যেখানে রাজনীতির দাবা খেলায় হেরে যেতে হচ্ছে আবেগকে।
বাস্তবতা হলো— হাসপাতালের শয্যায় সংকটাপন্ন মায়ের পাশে ফেরা হচ্ছে না ছেলের। বরং ছেলেকে কাছে পেতে মাকেই এখন আকাশ পাড়ি দিতে হবে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে মনিটরের বিপ বিপ শব্দ আর ইঞ্জিনের গর্জনের মাঝখানে চাপা পড়ে যাবে হাজারও কর্মীর স্লোগান। ইতিহাসে লেখা থাকবে— রাজনীতি আর আইনি প্যাঁচের কাছে মাঝে মাঝে রক্তের টানও অসহায় হয়ে পড়ে।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নের একটি— তারেক রহমান দেশে ফিরছেন কবে। দেশে ফিরবেন, ফিরছেন, আর মাত্র কদিন বাকি— এমন যখন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন, তার ফেরার চাবি এখনো ‘অন্যের হাতে’।
দেশে ফেরা নিয়ে তারেক রহমানের এই ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য এমন একটি সময়ে এলো যখন তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। স্বাভাবিকভাবেই তার এ মন্তব্য রাজনীতিতে জুগিয়েছে আলোচনার নতুন খোরাক। প্রশ্ন উঠেছে— তারেক রহমানের দেশে ফেরা বা না ফেরার সিদ্ধান্ত তাহলে কার হাতে!
অনেকের আলোচনাতেই উঠে এসেছে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের কথা, যখন তারেক রহমানকে বাধ্য করা হয়েছিল মুচলেকা দিয়ে দেশ ছাড়াতে। ওই সময় লন্ডনে উড়াল দেওয়ার আগে তাকে অঙ্গীকারনামায় সই করতে হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল তিনি রাজনীতি করবেন না। সেই অঙ্গীকারনামাই আজও তার দেশে ফেরার অন্তরায়, এমন অভিমত অনেকের।
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আড়ালে অন্য কোনো খেলা চলছে কি না। নাকি পুরনো কোনো ভয় এখনো তাড়া করে ফিরছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে। রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র কথাও এখনো ঘুরেফিরে আসছে। এমনকি বাদ যাচ্ছে না ৫ আগস্ট পরবর্তী সেই আলোচনা, যেখানে প্রধান দুই দলকে ক্ষমতার বাইরে রাখার কথা বলেছিলেন গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া কেউ কেউ।
এমন সব আলোচনা-প্রশ্ন আর গুঞ্জনের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথে দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক বাধা নেই বলে মনে হলেও ‘অদৃশ্য বাধা’টি সম্ভবত অনেক বেশি গভীর ও ব্যক্তিগত। ২০০৭ সালের ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ এবং ওয়ান-ইলেভেনের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা হয়তো তিনি ভুলতে পারেননি, যখন তাকে রিমান্ডের নামে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। সেই ট্রমা এখনো তাকে তাড়া করে ফিরছে কি না, এমন প্রশ্নও রেখেছেন অনেকে।
তবে নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি বা ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি যাই থাকুক না কেন, মায়ের এমন শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তারেক রহমানকে দ্রুতই দেশে ফিরে দলের হাল ধরা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, রাজনীতি করতে গেলে ঝুঁকিমুক্ত থাকার সুযোগ নেই।
ঠিক যেখানে আলোচনার সূত্রপাত সেটি হলো তারেক রহমানেরই একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। নিজের মা বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার জন্য সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ যেভাবে প্রার্থনারত, তাতে সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতেই এ স্ট্যাটাস দেন তিনি। মায়ের জন্য দোয়াও চান সবার কাছে।
এর সঙ্গে সঙ্গেই তারেক রহমান তুলে ধরেন তার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ। বলেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।’
তারেক রহমানের নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাহলে কোন শক্তি কাজ করছে— এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের অভিমত, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে যারা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, সম্ভবত সেই শক্তির সঙ্গে তার পূর্বতন বোঝাপড়ার এখনো সমাধান হয়নি।

রাজনীতি ডটকমকে ড. সাব্বির বলেন, “আগে তাকে নিয়ে যে সমস্যাগুলো হয়েছিল, সেগুলোর সুরাহা হয়নি। বিএনপি হয়তো ভাবছে, তারেক যদি ফিরে আসেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর যে অংশটা তার ওপর অত্যাচার করেছিল, তারা হয়তো এখনো তাকে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিচ্ছে না।”
তারেক রহমান নিজেও বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ‘স্পর্শকাতর’ অভিহিত করে ‘বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত’ বলে ব্যাখ্যা দেননি। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে— ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের ছায়া কি রয়ে গেছে? যারা একসময় তারেক রহমানের মেরুদণ্ডে আঘাত করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল, তারা কি এখনো তাকে আটকাতে চাইছে? ড. সাব্বিরের মতে, তাদের হয়তো কোনো স্বার্থ বা ‘স্টেক’ রয়ে গেছে এখনো।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা যখন চরমে, অনেকের প্রত্যাশা ছিল সরকার তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে তারেক রহমানের দেশে ফেরা ইস্যুতে সরকারও ‘অদৃশ্য চাপে’ আছে কি না— এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম এ পরিস্থিতিতে সরকারের দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘এখন সরকারের ওপর অলিখিতভাবে একটি দায়িত্ব চেপেছে। প্রশ্ন হলো— দেশে ফেরাটা কি তারেক রহমানের জন্য নিরাপদ? সরকারই বা কীভাবে সেটি নিশ্চিত করবে?’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মেজর এমদাদুল বলেন, “সরকার উনাকেও (তারেক রহমান) জিজ্ঞাসা করতে পারে যে তিনি কী কারণে ওই কথাটা বলেছেন। কারণ তে তিনি (তারেক রহমান) প্রকাশ করেননি। এখন আমি বা আপনি যতটুকু অনুমান করতে পারি— ‘সিকিউরিটি পারসপেক্টিভ’ বা নিরাপত্তা ইস্যু।”
৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। তার দলের প্রতাপশালী নেতারা এখন আত্মগোপনে বা কারাগারে। তাহলে তারেক রহমানের জন্য বাধা কে— জানতে চাইলে এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘এখন সরকারকেই ব্যাখ্যা দিতে হবে যে কেন উনি এই কথাটা বললেন।’
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আশ্বস্ত করা হচ্ছে, তারেক রহমানের দেশে ফিরতে তাদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কোনো বিধিনিষেধ অথবা কোনো ধরনের আপত্তি নেই।’
মা যখন মৃত্যুশয্যায়, দলকে যখন অনেকেই ক্ষমতার কাছাকাছি দেখছেন, এমন সময়ই ‘কাণ্ডারি’ নেই প্রত্যক্ষ দৃশ্যপটে। এ পরিস্থিতি বিএনপির অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীকে হতাশ করেছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বিষয়টিকে খুব ইতিবাচকভাবে দেখছেন না।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমি ঐকান্তিকভাবে চাই, তিনি (তারেক রহমান) দেশে ফিরে আসুক। ইন ফ্যাক্ট, আমি চাইছিলাম, ৫ আগস্টের পরপরই উনি দেশে আসবেন এবং বিএনপির হাল ধরবেন।’

দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও তারেক রহমানের দেশে না ফেরা দলের ভবিষ্যতের জন্য অশনী সংকেত হতে পারে বলে মনে করেন এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। বলেন, “ওখান থেকেই নমিনেশন হচ্ছে। কিন্তু এভাবে ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ তো দেশ চলবে না। উনাকে নিশ্চয়ই আসতে হবে। ওনার যদি কোনো অসুবিধা থাকে, সেটা প্রকাশ্যে জনগণকে বলবেন। যদি উনি বিএনপিকে ধরে রাখতে চান, তাহলে উনাকে দেশে ফিরে এসে বিএনপির হাল ধরতেই হবে। তা না হলে খালেদা জিয়ার দুঃখজনক অবর্তমানে দলটি সামনে অনেক গভীর সংকটে পড়বে।’
নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে যে এত কথা হচ্ছে, তাকে খুব একটা পাত্তা দিতে নারাজ ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। রাজনীতি করতে গেলে ঝুঁকি এড়ানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিহীন সমাজ বা ঝুঁকিহীন নেতৃত্ব কি হতে পারে? প্রেসিডেন্ট ওবামাই হোন কিংবা গণ্ডগ্রামের কোনো নেতাই হোন— প্রত্যেকের একটা ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি নিয়েই রাজনীতি করতে হয়, সমাজসেবা করতে হয়, নিজের মত প্রচার করতে হয়। আমার মনে হয়, উনার মতো একজন ভিআইপিকে প্রোটেকশন দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের সরকারের থাকা উচিত এবং সেটা আছেও।’
রাজনীতির মাঠ যখন গরম, তখন কিছু ‘টেকনিক্যাল’ বিষয়ও সামনে এনেছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, তারেক রহমান লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকার ফলে তার বাংলাদেশি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে। দেশি পাসপোর্ট তিনি ‘সারেন্ডার’ করেছিলেন বলেও শোনা যায়। এখন চাইলেই কি তিনি হুট করে বিমানে উঠতে পারেন?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রিটেনের ‘অ্যাসাইলাম’ বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। একবার পাসপোর্ট ‘সারেন্ডার’ করে অ্যাসাইলাম নিলে আবার ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা পাসপোর্ট ইস্যু করা একটি দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার। লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এই ছাড়পত্র পাওয়া এবং ব্রিটিশ হোম অফিসের ক্লিয়ারেন্স— সব মিলিয়ে এটি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
তবে এসব ইস্যুকে মূল সমস্যা হিসেবে মানতে নারাজ ড. সাব্বির। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে পাসপোর্ট বাধা হতে পারে না বলে মনে করেন তিনি। ড. সাব্বির রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, পাসপোর্টের চেয়ে প্রথম কারণটিই (ওয়ান-ইলেভেনের শক্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাদের সঙ্গে একসময় তার সংকটকালীন সম্পর্ক ছিল, সেটাই হয়তো এখনো তার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’
তারেক রহমানের দেশে না ফেরার বিষয়টি নিয়ে ‘টেকনিক্যাল’ নানা বিষয় জল্পনা-কল্পনায় উঠে এলেও এর পেছনে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা। বিএনপি হয়তো তাদের শীর্ষ নেতাকে নিয়ে নির্বাচনের আগে কোনো ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতায় জড়াতে চায় না— এমনটি মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক মামুন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে খানিকটা অস্পষ্টতা ও গোপনীয়তা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তা কেবলই কাকতালীয় নয়, বরং একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। আইনি জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে হাইকমান্ড সম্ভবত অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেছে। এ কৌশলগত নীরবতা দলের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের রহস্য ও আকর্ষণ জিইয়ে রাখে। নেতা কখন আসবেন— এ অপেক্ষাই কর্মীদের চাঙ্গা রাখে।’

তারেক রহমান দেশে না থাকলে দল দুর্বল হয়ে পড়বে— অনেকের এমন ধারণার সঙ্গে অধ্যাপক মামুন একমত নন। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির এই যুগে শারীরিক উপস্থিতি অপরিহার্য নয়, যদি আনুগত্য থাকে। তার অনুপস্থিতিতেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেই। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ও আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যমে দলের সব স্তরে নির্দেশনার আদান-প্রদান স্বাভাবিক হওয়ায় তিনি না এলেও চলছে— এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।’
জিয়া পরিবারের প্রতি কর্মীদের ‘যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে’ থাকা আবেগ বিএনপির বড় চালিকাশক্তি বলে মনে করেন অধ্যাপক মামুন। তিনি বলেন, ‘বিএনপির কাঠামোর স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি হলো দেশজুড়ে নেতাকর্মীদের তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিবারের প্রতি এ ধরনের আনুগত্য বহুলাংশে ঐতিহ্যগত ও আবেগপ্রসূত। এ নিঃশর্ত আনুগত্যই নিশ্চিত করেছে যে তার শারীরিক অনুপস্থিতি যেন নেতৃত্বের শূন্যতা বা সাংগঠনিক দুর্বলতায় রূপান্তরিত না হয়। বরং দূর থেকেই তিনি দলের প্রধান শক্তি ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।’
যখন দেশ জুড়ে আলোচনা— তারেক রহমান কবে ফিরবেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে এক নাটকীয় মোড়। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জানা গেল, ছেলে ফিরছেন না, বরং মৃত্যু পথযাত্রী মা-ই হয়তো পাড়ি জমাবেন ছেলের কাছে। তারেক রহমানের সহসাই দেশে না ফেরার বিষয়টি তার উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিনের শনিবারের (২৯ নভেম্বর) বক্তব্যেও অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকেই এবার দেশ ছাড়তে হতে পারে।
ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় ড. মাহদী আমিন লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়ার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলে তাকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে লন্ডনের সেই হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, যাদের তত্ত্বাবধানে চলতি বছরের শুরুতে চার মাস চিকিৎসা নিয়ে খালেদা জিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি লাভ করেছিলেন।’
মাহদী আমিনের এ বক্তব্যকে কেবল মেডিকেল আপডেট নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই পড়ছেন বিশ্লেষকরা। বলছেন, তার এই বক্তব্যের অর্থ— আইনি জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি অথবা ওয়ান-ইলেভেনের ‘ডিপ স্টেটে’র প্রভাব হয়তো এতটাই প্রকট যে মায়ের এ চরম মুহূর্তেও তারেক রহমান ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বা চাইলেও নিতে পারছেন না।
বরং খালেদা জিয়াকেই হয়তো সংকটাপন্ন শরীর নিয়েও এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে চাপতে হতে পারে। ড. মাহদী আমিনও সেটি নিশ্চিত করেছেন তার স্ট্যাটাসে— ‘পাশাপাশি একটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসজ্জিত বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করারও উদ্যোগ চলছে।’
এ খবরটি দলের নেতাকর্মীদের জন্য একই সঙ্গে স্বস্তির ও বেদনার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্য স্বস্তির খবর, খালেদা জিয়া লন্ডনে গেলে উন্নত চিকিৎসা পাবেন। আর বেদনার কারণ, শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের ফেরাটা আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।
লন্ডনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান হয়তো ভাবছেন ঢাকার আকাশের কথা। ভাবছেন মায়ের শীর্ণ হাতের স্পর্শের কথা। এভারকেয়ার হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মা-ও হয়তো বুঝে গেছেন ছেলের ফেরা হচ্ছে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চেয়েছিলেন, ঝুঁকি নিয়ে তারেক রহমান ফিরে আসুক। অধ্যাপক মামুন তারেক রহমানের না ফেরা দেখছেন ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে। আর ড. সাব্বির খুঁজেছিলেন ‘অদৃশ্য বাধার দেয়াল’। তবে শেষ পর্যন্ত ড. মাহদী আমিনের বক্তব্যই নির্মম বাস্তবতা হয়ে সামনে এল, যেখানে রাজনীতির দাবা খেলায় হেরে যেতে হচ্ছে আবেগকে।
বাস্তবতা হলো— হাসপাতালের শয্যায় সংকটাপন্ন মায়ের পাশে ফেরা হচ্ছে না ছেলের। বরং ছেলেকে কাছে পেতে মাকেই এখন আকাশ পাড়ি দিতে হবে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে মনিটরের বিপ বিপ শব্দ আর ইঞ্জিনের গর্জনের মাঝখানে চাপা পড়ে যাবে হাজারও কর্মীর স্লোগান। ইতিহাসে লেখা থাকবে— রাজনীতি আর আইনি প্যাঁচের কাছে মাঝে মাঝে রক্তের টানও অসহায় হয়ে পড়ে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “গত ১৬ বছরে দেশের অর্থনৈতিক যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনও বাস্তবসম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। তবে সমাজকে ইতিবাচক সংকেত দিতে হবে যে সরকার সেই পথেই এগোচ্ছে। শিক্ষা সংস্কারে
৬ ঘণ্টা আগে
এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য নিজ নিজ অবস্থান থেকে দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
৭ ঘণ্টা আগে
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সসহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান। তিনি বলেন, বিদেশে নেয়ার মতো শারীরিক অবস্থায় এলে তবেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
৭ ঘণ্টা আগে
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, শেখ হাসিনার ফাঁসি দেখা পর্যন্ত আল্লাহ যেন বেগম খালেদা জিয়াকে বাঁচিয়ে রাখেন।
৮ ঘণ্টা আগে