পাঁচ পরীক্ষার মুখে ৬ মাসের সরকার

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় ৫ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। প্রতীকী ছবি

১০ আগস্ট। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা গ্রুপ তাদের ৫৭টি কারখানার সবকটিই বন্ধ করে দেয়; কারণ গ্যাস আর বিদ্যুৎ, দুটোই নেই। একই সপ্তাহে চট্টগ্রামের শিল্প গোষ্ঠী বিএসআরএম তাদের ১০টি বড় কারখানার সবগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। তাদেরও কারণ একটাই, ২২ জুলাই এক্সেলারেট এনার্জি পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর দেশের পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি কমে যায়।

নরসিংদীতে গ্যাসের চাহিদার অর্ধেকও মিলছে না। তিতাস গ্যাসের স্থানীয় কর্মকর্তার ভাষ্য, অগ্রাধিকার পাচ্ছে ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন আর গৃহস্থালির সংযোগ কাটছাঁট। গ্রামাঞ্চলে দৈনিক আট থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর নিয়মিত হয়ে উঠেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন তীব্র সংকটের মুখোমুখি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দুই দশক পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এরপর কেবল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নয়, আরও নানা চ্যালেঞ্জের মুখেই রয়েছে এই সরকার। তবে এই সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জগুলো আর দশটা সরকারের চেয়ে আলাদা।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেড় দশকের একদলীয় শাসন আর দেড় বছরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মাত্র বের হয়েছে দেশ। এর মধ্যে লুটপাট, অর্থপাচার আর ব্যাংকিং খাতের দুর্বৃত্তায়নে দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভঙ্গুর; দলীয়করণের মুখে পুলিশ-প্রশাসন স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারিয়েছে; অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কট্টর ডানপন্থিদের উত্থানের পাশাপাশি ‘মব’ সহিংসতার প্রসার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ভূমিকা রেখেছে।

এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ছয় মাস বয়সী সরকারের সামনে দেখছেন পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ— জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, স্থবির অর্থনীতি আর বাড়তে থাকা বেকারত্ব, অনিয়ন্ত্রিত আচরণের পাশাপাশি নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের হুঙ্কার প বিরোধী দল জামায়াতের সঙ্গে নানা বিষয়ে চরম মতবিরোধ, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভেঙে পড়া পুলিশ-প্রশাসনিক কাঠামো। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পাঁচটি ক্ষেত্র একে অন্যের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে একটির ব্যর্থতা অন্যগুলোর সমাধানকে কঠিন করে তোলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ পাঁচ চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘সরকারের সামনে এই মুহূর্তে পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে— জ্বালানি সংকট নিরসন, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রশ্নটিকে মোকাবিলা করা, ইশতেহার অনুযায়ী বেকারত্ব নিরসন, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করা এবং পুলিশ-প্রশাসনকে সচল করা। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— যাদের দিয়ে এই সংকট নিরসনে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে, সেই আমলাতন্ত্র ও দলীয় কাঠামো আদৌ প্রস্তুত কি না।’

জ্বালানি সংকট

আওয়ামী লীগ আমলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের তথ্য, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ২০১৮ সালের প্রায় ২৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে এখন দৈনিক ১৭০০-১৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।

ঘাটতি পূরণে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, আর আন্তর্জাতিক বাজারে দর অস্থির থাকায় খরচ বেড়েছে অনেকগুণ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির গড় স্পট মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২১ ডলারে, আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্থগিত থাকায় শুধু এই তিন মাসেই এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে আমদানিতে।

অন্যদিকে বিদ্যুতের চাহিদা এবার গ্রীষ্মে ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন আটকে ছিল ১৪ থেকে সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭২টিই গ্যাস, কয়লা বা ফার্নেস অয়েলের ঘাটতিতে ভুগছিল। এই সংকটের একটি অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, আরেকটি অংশ একেবারে নতুন।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও আমদানি-নির্ভরতার (৬৫ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদা আমদানির ওপর নির্ভরশীল) পাশাপাশি পুরনো কাঠামোগত দুর্বলতা সরকারকে জ্বালানি খাতে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। এর মধ্যেই ২২ জুলাইয়ের এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনা আসে নতুন ধাক্কা হয়ে, যা আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহে রাজধানীর কিছু এলাকাসহ সারা দেশে লোডশেডিং তীব্র করে তোলে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই ৪ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর এক আলোচনায় স্বীকার করেন যে জ্বালানি সংকটে মানুষের কষ্ট হচ্ছে এবং সরকার অজুহাত না দেখিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি, দুই ধরনের ব্যবস্থাই নিচ্ছে। ১৭ বছর বাপেক্স কার্যত অচল হয়ে ছিল অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়াতে দুটি ড্রিলিং রিগ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে জাপান থেকে এলএনজি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

জ্বালানি সংকটের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়। কারণ এটি সরাসরি রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান আর সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুল ইসলাম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচন শীতকালে আয়োজন করা হতো, যেন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে ও রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি না হয়। কিন্তু বর্তমান লোডশেডিং শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।’

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুই বছরের আগে জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের এমন অবস্থান থেকেই অধ্যাপক আইনুলের শঙ্কা, সরকার এমন অবস্থান ধরে রাখলে শিল্প-কর্মসংস্থান-রাজস্বের শৃঙ্খলে প্রশ্ন উঠবে একের পর এক। তিনি বলেন, ‘শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হলে রাজস্ব আদায় কমবে। আর রাজস্ব ছাড়া ঘাটতি বাজেট মেটানো অসম্ভব। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট নিছক প্রকৌশলগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।’

অর্থনৈতিক চাপ ও কর্মসংস্থান

সংখ্যায় অর্থনীতির চিত্র মিশ্র। ৩০ জুলাই পর্যন্ত আইএমএফের বিপিএম৬ মানদণ্ডে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে, গত বছরের একই সময়ের ২৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে যথেষ্ট বেশি। একই সময়ে গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসী আয়ও রেকর্ড গড়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ শতাংশের বেশি। অর্থবছরের হিসাবে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও এটি নতুন রেকর্ড। বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ক্রেতাদের খুব একটা স্বস্তি না দিলেও মূল্যস্ফীতির গ্রাফ নিম্নমুখী। গত জুলাইয়ে এর হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা আগের আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এদিকে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে রপ্তানিতে। মার্চে রপ্তানি আয় ছিল আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম, যা পরপর আট মাস ধরে চলা নেতিবাচক প্রবণতার অংশ। পরে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে, যা জুলাইয়ে আগের ১২ মাসের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। তা সত্ত্বেও এ মাসের রপ্তানিও গত বছরের একই সময়েও তুলনায় কম।

দারিদ্র্যের হারও উদ্বেগজনক, যা ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। এসঅ্যান্ডপি সম্প্রতি বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান ইন্ডিকেটর নেতিবাচক করেছে; ফিচও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব চাপ, জ্বালানি ঝুঁকি আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাবকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে মে মাসে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল আগেই।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতের চাপ ও জ্বালানি ঘাটতির সম্মিলিত প্রভাবে গত কয়েক বছরের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা।

রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের মূল্যায়নে যা স্পষ্ট উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত।

কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এই চাপের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, আর শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-কর্মসংস্থান কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয়— এমন তরুণের হার ২০ দশমিক ৩ শতাংশ। লিঙ্গভেদে এই চিত্র আরও অসম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে তরুণীদের প্রায় অর্ধেক— ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কর্মহীন-শিক্ষাহীন পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ১১ দশমিক ১ শতাংশ।

এই পটভূমিতেই বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে শুধু তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই ১০ লাখ চাকরির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ইশতেহারে বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আড়াই শতাংশে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ধরা হয়েছে।

কিন্তু অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজেই সতর্ক করে দিয়েছেন, অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সময় লাগবে, সংস্কারের পূর্ণ ফল মিলতে দুই বছরের মতো অপেক্ষা করতে হতে পারে। এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেকারত্ব কমানোর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাই রাখা হয়নি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাজেট বক্তৃতা জুড়ে ছড়িয়ে থাকলেও তা পরিমাপযোগ্য কোনো সূচকের সঙ্গে যুক্ত নয়।

ফলে অর্থনীতিবিদদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন— বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এই লক্ষ্য বর্তমান রাজস্ব-সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা আর বৈশ্বিক শুল্ক-অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত কি না।

অর্থনীতির এমন পরিস্থিতির সঙ্গে জ্বালানি খাতের সংযোগের কথা তুলে ধরে ঢাবি শিক্ষক অধ্যাপক আইনুল ইসলাম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটগুলো নিছক গাণিতিক সমস্যা নয়, এগুলো মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ। কারণ ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠিত না হলে ও সুশাসনে না ফিরলে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে না, আর শেয়ারবাজার মন্দা থাকলে রিয়েল এস্টেট থেকে উৎপাদনশীল শিল্প পর্যন্ত প্রতিটি খাত গতিহীন হয়ে পড়বে। অথচ এই খাতগুলোই দেশে বড় ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করে।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের কারখানাগুলো ব্যাপক সংকটের মুখে পড়েছে, যা কর্মসংস্থান সংকট ও সামাজিক অসন্তোষকে তীব্র করে তুলতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক আইনুল। তার সতর্কবার্তা স্পষ্ট, ‘অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত পুনরুদ্ধার করা না গেলে এই সংকটগুলোই সরকারের রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট হিসেবে প্রকাশ পাবে।’

মাঠের রাজনীতি

দীর্ঘ দুই দশকের বিরতিতে ক্ষমতায় এসে বিএনপি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দল সামলাতে গিয়েও। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেও প্রান্তিক পর্যায় থেকে চাঁদাবাজি, জমি দখল, দলীয় কমিটি নিয়ে বিরোধ আর স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগ থামছে না।

মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৫২৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ গেছে ৭৯ জনের এবং আহত হয়েছেন চার হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ৩০২টি ঘটনাই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল, যাতে নিহত হয়েছেন ৫৪ জন।

বিএনপির দাবি, কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল কর্মী পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থাও চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগ বন্ধ করতে পারেনি। এপ্রিলে দলীয় হাইকমান্ড আরও কঠোর অবস্থানের কথা জানায়, শুধু বহিষ্কার নয়, আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যতম বড় অংশ ছিল ফ্যামিলি কার্ড, যা দরিদ্র পরিবারগুলোর সহায় হয়ে আসবে বলে বলা হয়েছিল। কিন্তু দেশের একাধিক এলাকা থেকে অভিযোগ উঠেছে, ভিজিএফ কার্ডের একটি বড় অংশ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বদলে দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে চলে যাচ্ছে, যা নিয়মবহির্ভূত বলে স্থানীয় প্রশাসন নিজেই স্বীকার করেছে।

সংসদেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে সতর্ক করা হয়েছে, অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে অভিযোগ এখনো থেমে যায়নি।

এ প্রেক্ষাপটে ড. সাব্বির আহমেদের পর্যবেক্ষণ, দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসনকেও এ ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য যত ভালোই হোক না কেন, দল ও আমলাতন্ত্র সঠিকভাবে সহায়তা না করলে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে দলীয় প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমলাতন্ত্র থেকে শতভাগ সেবা আর দলের কাছ থেকে শতভাগ আনুগত্য নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে যেকোনো ভালো পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের ধাপে গিয়ে আটকে যাবে।’

দলীয় শৃঙ্খলার পাশাপাশি জুলাইয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক জটিলতাকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সরকার এখনো ভারতের কাছে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি অব্যাহত রেখেছে, যদিও নয়াদিল্লি এখনো সে দাবিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আবার তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের অভিযোগ রয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে সরকারকে সঠিক কূটনৈতিক পথে হাঁটতে হবে বলে মনে করেন ড. সাব্বির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার দাবিতে সরকারের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি সঠিক পথে নেই। দাবি অব্যাহত রেখেও ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নিলে সেটি হতো অধিকতর বাস্তবমুখী কৌশল। যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও একইসঙ্গে বলা হয়েছে যে অতীত ভুলে যাওয়ার আহ্বান তারা জানাচ্ছে না, বরং সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। অর্থাৎ জটিলতা দুপক্ষের অবস্থানের সংঘাত থেকেই তৈরি, কোনো একপক্ষের একক সিদ্ধান্তে নয়।’

রাজনীতির মাঠে সরকারের জন্য আরেক ‍গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা স্থানীয় সরকার নির্বাচন। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, পাঁচ শতাধিক উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ আর ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন এ বছরের শেষ নাগাদ শুরু হতে পারে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে সরকরের সামনে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ক্ষমতাবলয়ের বাইরে থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি হতে বিএপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তৃণমূলের বিভিন্ন সূত্রের ইঙ্গিত, এসব নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থীর বাইরেও দলের একাধিক নেতা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হতে পারেন। বিএনপি থেকে অবশ্য এরই মধ্যে সতর্ক করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘দলীয় শৃঙ্খলা’র বাইরে কেউ কিছু করলে দল কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত সমস্যা হলো ব্যাপক সহিংসতা, কারণ জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর সঙ্গে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা অনেক বেশি। সহিংসতা কমিয়ে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াটাই সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে, বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন দলীয় পর্যায়েই শৃঙ্খলা প্রশ্নবিদ্ধ।’

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

নির্বাচনের আগে বিএনপি আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারকে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছিল। ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, সে অঙ্গীকার সরকার এখনো বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে পারেনি।

পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে দুই হাজার ৭৬টি। সে হিসাবে গড়ে প্রতিদিন খুনের মামলার সংখ্যা প্রায় ১০টি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, একই সময়ে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন, রাজনৈতিক সহিংসতায় আরও অন্তত ৭৭ জন।

এদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে এক হাজার ৬৬৭ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ২৯২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩৪১ জন নারী ও কন্যাশিশু।

হত্যা, ধর্ষণ, রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা ও অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোও জনমনে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ‘প্রতিটি ঘটনার পর তদন্তে জোর দেওয়া হচ্ছে এবং সাফল্যও আসছে। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বজনিত হত্যাকাণ্ড ঠেকানো পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সংসদে বলেছেন একই কথা, প্রতিটি ঘটনাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনেছে। ফলে সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী করার সুযোগ নেই। দেড় দশকের রাজনৈতিক দমননীতির ফলে তৈরি হওয়া অপরাধ-সংস্কৃতি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধবিজ্ঞানী তৌহিদুল হকের পর্যবেক্ষণ, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধী চক্র বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা সহিংসতার এই উল্লম্ফনের একটি ব্যাখ্যা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারে রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্ষমতা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূলে রয়েছে আরও গভীর একটি সংকট— পুলিশ বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী সময়ে থানা ও ফাঁড়ি থেকে ব্যাপক অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন এখনো চলমান। সাবেক সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, ৩ মে একদিনেই ১৬ জন ডিআইজি ও একজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে অবসরে পাঠানো হয়।

একই সময়ে ২০০৬ সাল থেকে আটকে থাকা ৩৩০ জন সার্জেন্ট-উপপরিদর্শকের নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়েছে, আর গত দেড় বছরে পদোন্নতি পেয়েছেন পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা। বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির দায়িত্ব নিয়েছেন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষ পদেও পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে।

ড. সাদিক হাসান রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ মূলত দুই ভাগে বিভক্ত— রাজনৈতিক নির্বাহী, যাদের কাজ নীতি নির্ধারণ; আর প্রশাসনিক নির্বাহী বা আমলাতন্ত্র, যাদের কাজ প্রশ্নহীনভাবে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা।’

ড. সাদিকের পর্যবেক্ষণ, প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা এই সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বা অনুগত কর্মকর্তার সংখ্যা প্রশাসনে তুলনামূলক কম, যা সরকারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার ভাষায়, ‘স্মরণকালের সর্বোচ্চসংখ্যক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনে, যাদের অনেকেই সরকারের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজন, আর বিপরীতে ক্যারিয়ার কর্মকর্তাদের একাংশকে ওএসডি করা হয়েছে বা মাঠ পর্যায়ে বদলি করা হয়েছে।’

সরকারের নীতির সঙ্গে আমলাতন্ত্রের বিরোধ এবং আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের থমকে যাওয়ার ঘটনাও এর মধ্যে ঘটেছে। সরকারি প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৫০ হাজার থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। এ সংক্রান্ত নির্দেশনাও জারি করা হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থমকে যায়।

ড. সাদিক হাসান বলেন, ‘পোশাক বা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে কিংবা কিছু কর্মকর্তা রদবদল করে প্রশাসনিক সংস্কার সম্পন্ন হয় না। শুধু লোক বদলে পুলিশ বা প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা ও মানসিক সক্ষমতা ফেরানো সম্ভব নয়। কাজের মৌলিক ধরন ও জবাবদিহির কাঠামো বদল না হলে জনগণের আস্থা ফিরবে না।’

ড. সাব্বির আহমেদও বলেন প্রায় একই কথা, ‘প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থাকা পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। এ জন্য নিয়মিত বসা, অভিযোগ শোনা ও প্রয়োজনীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করা জরুরি।’

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কমিশনাররা পদত্যাগ করেন। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পরে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দুদকে। একই সময়ে সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা সংস্থা ও আমলাতন্ত্রের শীর্ষ পদেও ব্যাপক রদবদল হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার বদলে দলীয়করণের দিকে যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে আরেকটি আনুগত্য-নির্ভর কাঠামোই তৈরি করবে, যা অতীতেও বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংকটের মূল উৎস ছিল।

৫ চ্যালেঞ্জ, একটি শৃঙ্খল

বিশ্লেষকরা বলছেন, তারা যে পাঁচটি ক্ষেত্রকে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ মনে করছেন, সেগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি স্পষ্ট শৃঙ্খলে বাঁধা। জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদন কমায়, উৎপাদন কমলে রপ্তানি ও রাজস্ব কমে, রাজস্ব কমলে ঘাটতি বাজেট মেটানো কঠিন হয়, বেকারত্ব বাড়ে, যা মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ায় এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর।

আর এই পুরো চক্রের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে পুলিশ ও প্রশাসন, যাদের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভর করছে বাকি চারটি সমস্যার সমাধান কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে।

ড. সাব্বির আহমেদ এই সংযোগের প্রসঙ্গ টেনে রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘যেকোনো সরকারের পরিকল্পনাই সাধারণত ভালো থাকে, কিন্তু মূল সমস্যা বাস্তবায়নে। নিয়মিত মনিটরিং ও তদারকি নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ভুলের জন্য কঠোর শাস্তির বদলে দলকে উৎসাহিত করে সেরা ফল বের করে আনাই বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে কার্যকর পথ।’ ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রবণতাকে ঝুঁকি অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘অনভিজ্ঞ হলেও সঠিক মানুষকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দিলে সময়, শ্রম আর অভিজ্ঞতার অপচয় হয়।’

এসব চ্যালেঞ্জ উৎরানোর পথও বাতলে দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দলীয় নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক আনুগত্য আর জনআস্থা— এই তিনটি একসঙ্গে অর্জন করতে পারলেই কেবল সরকারের পক্ষে চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। সরকারকে সেদিকেই মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

Ad
Ad
ad
ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

নৈতিক স্খলন— এবার সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ পড়লেন গাজী নজরুল

নৈতিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় দুটি কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার জায়গায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নতুন দুই সদস্যের নাম প্রস্তাব করা হয়।

১ দিন আগে

৬৪ জেলার দায়িত্বে ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপ, কে কোন জেলায়?

সরকার বলছে, এসব দায়িত্ব দেওয়ার ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সাংবিধানিক কিংবা আইনি সংস্থার আইনি ক্ষমতা খর্ব হবে না।

২ দিন আগে

এটা প্রশ্ন নাকি পল্টনের বক্তৃতা— হাসনাতের সম্পূরক প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সম্পূরক প্রশ্ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। হাসনাত তার বক্তব্যে প্রশ্ন রেখেছেন, নাকি রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়েছেন— তা বুঝতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটা প্রশ্ন না পল্টনের বক্তৃতা; বুঝতে পারিন

২ দিন আগে

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়: জামায়াত আমির

সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘মক্কা প্যাক্টে যোগদান বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়। দেশ ও জাতির প্রয়োজন এবং স্বার্থে বাংলাদেশ কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাতে অন্য কারও শ্বাসকষ্টে ভোগার প্রয়োজন নেই।’

২ দিন আগে