রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনেও আলোচনায় ৭০ অনুচ্ছেদ, কী বলছে সরকার ও বিরোধী দল

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ২১
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনেও আলোচনায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। ছবি: এআই

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের চেয়ে ১৬৭ ভোট বেশি পেয়েছেন তিনি। এই নির্বাচনের দিনেও ফের আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ।

বিরোধী দলের অভিযোগ, সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তথা সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারছেন না। ফলে এই নির্বাচনেও চলছে সরকারি দলের দলীয়করণ।

আর সরকার বলছে, জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন হলে তবেই সেটি প্রয়োগ করার সুযোগ আছে। তার আগ পর্যন্ত সংবিধান মেনে ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে কারও দলীয় প্রার্থীর বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

কী আছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে।

‘ফ্লোর ক্রসিং’ হিসেবে পরিচিত এই অনুচ্ছেদের অর্থ— কোনো দলীয় সংসদ সদস্য তার সংসদে যেকোনো বিষয়ে তার দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তিনি আর সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেন ৭০ অনুচ্ছেদ আলোচনায়

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। সাধারণত সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের মনোনীত প্রার্থীই এই নির্বাচনে জয়লাভ করেন, তা বলাই বাহুল্য। এ কারণেই ১৯৯১ সালের পর থেকে আজকের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই বিরোধী দলগুলো কোনো প্রার্থী দেয়নি। সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন।

এবারের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরকারি দল বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোটও প্রার্থী দিয়েছে। তারা বলছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমুন্নত রাখতেই পরাজয় নিশ্চিত ধরে নিয়েও তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের অভিমত, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রকৃত অর্থে একটি পৃথক সাংবিধানিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া। এটি সংসদের আইন প্রণয়নমূলক কাজ নয়, বরং সংসদ সদস্যদের ওপর সংবিধান কর্তৃক অর্পিত নির্দিষ্ট কার্যাবলি এবং দায়িত্ব, যা তাদের আইন প্রণয়নমূলক কাজের অতিরিক্ত। ফলে এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে মূলত কোনো সংসদ সদস্যের প্রস্তাবনা ও অন্য কোনো সংসদ সদস্যের সমর্থনই হলো মূল ভিত্তি। এ ক্ষেত্রে ওই প্রার্থীর প্রতি দলীয় সমর্থন থাকতে পারে, কিন্তু সেই সমর্থন তাকে আইনিভাবে দলীয় প্রার্থীতে পরিণত করে না এবং তাকে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ওই প্রার্থীকে ভোট দিতে কোনো সংসদ সদস্যকে বাধ্যও করে না।

গত সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ৭০ অনুচ্ছেদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা আয়োজন করে। সভায় রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য’ বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নের সময় সংসদীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় সংবিধান নির্ধারিত নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে ভোট দেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোট সাংবিধানিক অর্থে সংসদে প্রদত্ত ভোট নয়।’

একই অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়। কিন্তু সংবিধানে এ বিষয়ে সুষ্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় বিগত স্বৈরাচারী শাসকরা নিজেদের সুবিধা লাভের জন্য এই অনুচ্ছেদের অপপ্রয়োগ করেছেন। বর্তমান সরকারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটিকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে এর সুযোগ নিতে চাইছেন।’

এর আগে গত ১১ আগস্ট সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়।

ওই বৈঠক শেষে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল হবে।

চিফ হুইপের যুক্তি, 'সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেহেতু সংশোধন হয়নি, সুতরাং এটা কার্যকর থাকবে।'

ভোটের দিন কী বলল বিরোধী দল

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে জাতীয় সংসদে প্রবেশের আগে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকেও আমরা এগোতে পারতাম। কিন্তু সেটা হচ্ছে না।’

এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও কাজের ক্ষেত্রে আগের ব্যবস্থাই অনুসরণ করছে। এর মাধ্যমে আবারও ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই বজায় থাকছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জনগণের কাছে সেই বার্তাই দিচ্ছে।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের ভাষ্য, বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। ফলে বিএনপি মুখে এক কথা বলছে, কাজে আরেকটি করছে। সরকার গণভোটের রায়, জনগণ ও গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এখানে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে সরকার আর গণতন্ত্রের পক্ষে আছে— এমনটা মনে করার সুযোগ নেই।

৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের কথা বলল সরকারি দল

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের দলের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে— বিরোধী দলের এমন অভিযোগ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা।

মন্ত্রী বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে। জুলাই জাতীয় সনদে আমরা যেভাবে একমত হয়েছি, সেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধিত হয়ে যায়, তার পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে, তখন সেই ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারেই হবে। কিন্তু এখনো তো সংবিধান সংশোধন হয়নি।’

৭০ অনুচ্ছেদের কারণে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে— বিরোধী দলের এ অভিযোগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত যে সংসদীয় কমিটি গঠন করেছি, সেই কমিটিতে বিরোধীদলীয় সদস্যরা এখনো যোগদান করেননি। ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে। সেটা জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে।’

জুলাই সনদের সেই সমঝোতা সম্পর্কে সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে চারটি বিষয় উল্লেখিত আছে। তার মধ্যে দুটি বিষয়ে সব দল মোটামুটি একমত— অর্থবিল ও আস্থা ভোট। সবাই মনে করেন, ৭০ অনুচ্ছেদে এই দুটি বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা থাকবে না।

অন্য দুটি বিষয় সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিল ও যুদ্ধপরিস্থিতিতে দলের বাইরে ভোট দিতে পারবে কি না— এ ব্যাপারে বিএনপির পক্ষ থেকে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) আছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ দুই বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলের মতামত অনুসারে ভোট দেবেন। আরেকটি বড় বিরোধী দল তখন সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করেনি।

Ad
Ad
ad
ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলীয়করণ চলছে, অভিযোগ নাহিদের

নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রশাসনের সর্বস্তরে বিএনপি সরকার দলীয়করণ করছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থী দেওয়ার মাধ্যমে একই ধরনের দলীয়করণ করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নিজেই দলীয় প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করছেন এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

৩ ঘণ্টা আগে

১৬৭ ভোটের ব্যবধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত মির্জা ফখরুল

২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন তাকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। অর্থাৎ, মির্জা ফখরুল তার চেয়ে ১৬৭ ভোট বেশি পেয়েছেন।

৫ ঘণ্টা আগে

জাতীয় সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে বিরোধী দল: রাশেদ খাঁন

রাশেদ খাঁন লিখেছেন, ‘৬ মাসে সরকারের মূল্যায়নের পাশাপাশি বিরোধী দলেরও মূল্যায়ন জরুরি। যেহেতু গণ-অভ্যুত্থানের একটি শক্তি সরকার পরিচালনার দায়িত্বে, আরেকটি শক্তি বিরোধী দলে। সুতরাং রাষ্ট্র পুনর্গঠনে উভয়ের দায়িত্ব আছে। কিন্তু বিরোধী দল সরকারকে কতটুকু সহযোগিতা করছে, সেটাও মূল্যায়ন করার বিষয়।’

৫ ঘণ্টা আগে

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ‘পারস্পরিক আস্থা’ অর্জনের পর: হুমায়ুন কবির

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে।

৬ ঘণ্টা আগে