
প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান শপথ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি।
দেশের জন্মলগ্নে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে। তারপর একে একে আরও আটজন দায়িত্ব পালন করেছেন প্রধানমন্ত্রী পদে। সবশেষ এই তালিকায় যুক্ত হলেন তারেক রহমান।
এই ১১ জনের মধ্যে তারেক রহমান দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সন্তান। তার আগে দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা, যার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয় পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে তার মা খালেদা জিয়া ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, বাবা জিয়াউর রহমান ছিলের রাষ্ট্রপতি।
দেশের সরকারপ্রধান পদে এর আগে যে ১০ জন দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু তথ্য দেখে নেওয়া যাক একনজরে—
পাকিস্তান আমলে সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার তার নেতৃত্বেই শপথ নেয়।

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী পরাজিত হলে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছিল মুজিবনগর সরকারের মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তানে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন। এরপর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। ওই দিনই শেষ হয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের দায়িত্বকাল। তিনি আট মাস ২৬ দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে নতুন সরকার। ওই দিন তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন একদিন আগেই পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ পদে তিনি আসীন ছিলেন তিন বছর ১৩ দিন। পরে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করে সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন তিনি।
বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মুহাম্মদ মনসুর আলী, যিনি ক্যাপ্টেন মনসুর নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
স্বাধীনতার পর দেশে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সে পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। ওই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন মনসুর।
ওই বছরেরই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর সামরিক অভ্যুত্থানে পদচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন মনসুর ছয় মাস ২১ দিন প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রী পদ বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৭৮ সালে গিয়ে পদটি প্রতর্বন করা হলেও কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমান দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ মশিউর রহমানের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া প্রধানমন্ত্রীর পদ ফাঁকা ছিল ওই বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত।
তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯৭৯ সালের ১৫ এপ্রিল দেশের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শাহ আজিজুর রহমান। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত দুই বছর ১১ মাস ৯ দিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই দিন আরেক সামরিক অভ্যুত্থানে পদচ্যুত করা হয় শাহ আজিজুরকে। একই সঙ্গে বিলুপ্ত করা হয় প্রধানমন্ত্রী পদটি।
রাষ্ট্রপতি পদে থাকা জিয়াউর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে নিহত হলে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৪ সালের ৩০ মার্চ তিনি দেশের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আতাউর রহমান খানকে নিয়োগ করেন।
স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো স্থিতিশীলতা ছিল না। ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী পদটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এতে ৯ মাস ২ দিন দায়িত্ব পালনের পর প্রধানমন্ত্রী পদে আতাউর রহমান খানের দায়িত্বের অবসান ঘটে।

এরশাদ সরকারের অধীনে ১৯৮৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ৯ জুলাই দেশের ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ তখনকার মন্ত্রিপরিষদ বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
প্রধানমন্ত্রী পদে মিজানুর রহমান চৌধুরীর স্থায়িত্ব ছিল আট মাস ১৮ দিন।

এরশাদ সরকারের সময় রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ দেশের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মওদুদ আহমদ। শুরুতে জিয়াউর রহমানের বিএনপিতে যোগ দিলেও পরে তিনি এরশাদ সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। এরশাদের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ও সামলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে মওদুদ আহমদও বেশি দিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট তাকে সরে যেতে হয়। সে হিসাবে প্রধানমন্ত্রী পদে মাত্র এক বছর চার মাস ১৬ দিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

দেশের আরেক ক্ষণস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ। মওদুদ আহমদ সরে যাওয়ার পর দেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তবে তাকেও বছর দেড়েকের আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়।
আশির দশকের শেষভাগে এরশাদবিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। সব রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন হয়। অবসান ঘটে কাজী জাফরের প্রধানমন্ত্রিত্বের। তিনি এক বছর তিন মাস ২৪ দিন দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন।

স্বাধীনতার দুই দশকের মাথায় ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ দেশের নবম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। এরশাদ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় নিয়ে তার নেতৃত্বেই বিএনপি সরকার গঠন করে। ওই সময় আবার দেশে সংসদীয় শাসনব্যস্থা প্রবর্তিত হয়।
ইতিহাসের নবম হলেও খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রীও তিনি। এরপর তিনি আরও দুই দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে তিনি ১০ বছর ২৯ দিন দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ২৩ জুন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনিও প্রথম মেয়াদের পাঁচ বছর সফলভাবে পূর্ণ করেন। পাঁচ বছর ১৯ দিন পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরে দাঁড়ান তিনি।
শেখ হাসিনা এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিপুল জয়ে সরকার গঠন করেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর সাত মাস দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সব মিলিয়ে ২০ বছর তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি)। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দেড় বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
এর আগে ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় তারেক রহমান দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় মামলা-নির্যাতনের মুখে দেশ ছাড়তে হয় তাকে। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি লন্ডনে ছিলেন। সেখান থেকেই ভার্চুয়ালি দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বেই বিএনপি এ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে। তারেক রহমান নিজে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় পেয়েছেন।
মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পর দলের সংসদীয় সভায় তাকেই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন বিএনপির এমপিরা। পরে বিকেলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান শপথ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি।
দেশের জন্মলগ্নে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে। তারপর একে একে আরও আটজন দায়িত্ব পালন করেছেন প্রধানমন্ত্রী পদে। সবশেষ এই তালিকায় যুক্ত হলেন তারেক রহমান।
এই ১১ জনের মধ্যে তারেক রহমান দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সন্তান। তার আগে দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা, যার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয় পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে তার মা খালেদা জিয়া ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, বাবা জিয়াউর রহমান ছিলের রাষ্ট্রপতি।
দেশের সরকারপ্রধান পদে এর আগে যে ১০ জন দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু তথ্য দেখে নেওয়া যাক একনজরে—
পাকিস্তান আমলে সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার তার নেতৃত্বেই শপথ নেয়।

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী পরাজিত হলে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছিল মুজিবনগর সরকারের মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তানে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন। এরপর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। ওই দিনই শেষ হয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের দায়িত্বকাল। তিনি আট মাস ২৬ দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে নতুন সরকার। ওই দিন তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন একদিন আগেই পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ পদে তিনি আসীন ছিলেন তিন বছর ১৩ দিন। পরে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করে সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন তিনি।
বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মুহাম্মদ মনসুর আলী, যিনি ক্যাপ্টেন মনসুর নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
স্বাধীনতার পর দেশে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সে পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। ওই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন মনসুর।
ওই বছরেরই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর সামরিক অভ্যুত্থানে পদচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন মনসুর ছয় মাস ২১ দিন প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রী পদ বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৭৮ সালে গিয়ে পদটি প্রতর্বন করা হলেও কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমান দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ মশিউর রহমানের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া প্রধানমন্ত্রীর পদ ফাঁকা ছিল ওই বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত।
তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯৭৯ সালের ১৫ এপ্রিল দেশের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শাহ আজিজুর রহমান। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত দুই বছর ১১ মাস ৯ দিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই দিন আরেক সামরিক অভ্যুত্থানে পদচ্যুত করা হয় শাহ আজিজুরকে। একই সঙ্গে বিলুপ্ত করা হয় প্রধানমন্ত্রী পদটি।
রাষ্ট্রপতি পদে থাকা জিয়াউর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে নিহত হলে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৪ সালের ৩০ মার্চ তিনি দেশের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আতাউর রহমান খানকে নিয়োগ করেন।
স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো স্থিতিশীলতা ছিল না। ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী পদটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এতে ৯ মাস ২ দিন দায়িত্ব পালনের পর প্রধানমন্ত্রী পদে আতাউর রহমান খানের দায়িত্বের অবসান ঘটে।

এরশাদ সরকারের অধীনে ১৯৮৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ৯ জুলাই দেশের ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ তখনকার মন্ত্রিপরিষদ বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
প্রধানমন্ত্রী পদে মিজানুর রহমান চৌধুরীর স্থায়িত্ব ছিল আট মাস ১৮ দিন।

এরশাদ সরকারের সময় রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ দেশের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মওদুদ আহমদ। শুরুতে জিয়াউর রহমানের বিএনপিতে যোগ দিলেও পরে তিনি এরশাদ সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। এরশাদের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ও সামলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে মওদুদ আহমদও বেশি দিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট তাকে সরে যেতে হয়। সে হিসাবে প্রধানমন্ত্রী পদে মাত্র এক বছর চার মাস ১৬ দিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

দেশের আরেক ক্ষণস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ। মওদুদ আহমদ সরে যাওয়ার পর দেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তবে তাকেও বছর দেড়েকের আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়।
আশির দশকের শেষভাগে এরশাদবিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। সব রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন হয়। অবসান ঘটে কাজী জাফরের প্রধানমন্ত্রিত্বের। তিনি এক বছর তিন মাস ২৪ দিন দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন।

স্বাধীনতার দুই দশকের মাথায় ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ দেশের নবম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। এরশাদ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় নিয়ে তার নেতৃত্বেই বিএনপি সরকার গঠন করে। ওই সময় আবার দেশে সংসদীয় শাসনব্যস্থা প্রবর্তিত হয়।
ইতিহাসের নবম হলেও খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রীও তিনি। এরপর তিনি আরও দুই দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে তিনি ১০ বছর ২৯ দিন দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ২৩ জুন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনিও প্রথম মেয়াদের পাঁচ বছর সফলভাবে পূর্ণ করেন। পাঁচ বছর ১৯ দিন পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরে দাঁড়ান তিনি।
শেখ হাসিনা এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিপুল জয়ে সরকার গঠন করেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর সাত মাস দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সব মিলিয়ে ২০ বছর তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি)। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দেড় বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
এর আগে ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় তারেক রহমান দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় মামলা-নির্যাতনের মুখে দেশ ছাড়তে হয় তাকে। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি লন্ডনে ছিলেন। সেখান থেকেই ভার্চুয়ালি দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বেই বিএনপি এ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে। তারেক রহমান নিজে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় পেয়েছেন।
মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পর দলের সংসদীয় সভায় তাকেই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন বিএনপির এমপিরা। পরে বিকেলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় ডাক পেয়েছেন ৪৯ জন। এ তালিকায় ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ডাক পেয়েছেন।
১৮ ঘণ্টা আগে
সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভেতরে ও বাইরে চলছে জোর আলোচনা। দলীয় সূত্র বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা নিয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র—সব পর্যায়েই চলছে বিশ্লেষণ।
১৮ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা আশাবাদী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
১৯ ঘণ্টা আগে
সংসদ সদস্যদের শপথ শেষ। এবার নতুন সরকার গঠনের পালা। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি এরই মধ্যে সংসদীয় দলের সভায় দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এবার তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পালা। তার শপথের পর শপথ নেবেন মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও।
২০ ঘণ্টা আগে