উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘অনুরোধ’, ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত ট্রাম্পের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান যুদ্ধ নিয়ে সামরিক-রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতীকী ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ইরানের ওপর নতুন করে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তবে উপসাগরীয় আরব মিত্রদের ‘অনুরোধে’ তিনি এই হামলা স্থগিত করেছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত একটি চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী হয়ে তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এসেছেন।

মঙ্গলবার (১৯ মে) বিবিসির খবরে বলা হয়, সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নেতাদের অনুরোধে তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।

ইরান অবশ্য আগেই হুমকি দিয়ে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি প্রায় ছয় সপ্তাহের চলমান যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে, তবে তাদের আরব মিত্রদের ওপর পালটা হামলা চালানো হবে। ট্রাম্প এরই মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়িয়েছেন এবং রাজনৈতিকভাবে বোঝা হয়ে দাঁড়ানো এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

সোমবার ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে জানান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা তাকে ইরানের ওপর মঙ্গলবার নির্ধারিত সামরিক হামলা স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছেন, কারণ বর্তমানে অত্যন্ত ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে।

তিনি আরও বলেন, গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ‘যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর পূর্ণ মাত্রায় ও বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে হোয়াইট হাউজের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, এ ক্ষেত্রে একটি ‘অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আরব দেশগুলো একটি চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ‘বিরত রাখবে’।

পরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প একে ‘একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করলেও মন্তব্য করেন, ‘দেখা যাক শেষ পর্যন্ত এর ফলাফল কী দাঁড়ায়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন সময়ও গেছে যখন আমরা ভেবেছি চুক্তির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কাজ করেনি। তবে এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।’

ইরানের সাথে চুক্তি হওয়ার ‘খুব ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি তাদের ওপর তীব্র বোমা হামলা না চালিয়েই আমরা এটি করতে পারি, তবে আমি খুব খুশি হব।’

অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা অস্বীকার করে আসছে। দেশটির একজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যেন ‘পুনরায় কৌশলগত ভুল এবং ভুল হিসাব-নিকাশ’ না করে।

ইরান বিষয়ে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন দেশের অভ্যন্তরে তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে দেশের মানুষ এই যুদ্ধের পক্ষে নেই। গত সোমবার প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস/সিয়েনার একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।

জরিপে আরও দেখা গেছে, মাত্র ৩৭ শতাংশ ভোটার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন। জনমনে যুদ্ধ নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং অর্থনীতি ও অভিবাসনসহ অন্যান্য বিষয়ে ট্রাম্পের নীতি নিয়ে ক্ষোভের কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, এই জরিপ তারই ইঙ্গিত দেয়।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। এর জবাবে তেহরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় বিষয় হলো উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা আতঙ্ক। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও হামলা হলে ইরান কীভাবে তার পালটা জবাব দেবে, তা নিয়ে এই দেশগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কাছে এখনও বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা দিয়ে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দর, পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা এবং এমনকি গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের মধ্যে সুপেয় পানির প্রধান উৎস সমুদ্রের পানি শোধন প্ল্যান্টগুলোতে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ হামলা চালাতে পারে।

আলোচনা সহজতর করার জন্য গত এপ্রিলে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, মাঝেমধ্যে দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হওয়া সত্ত্বেও তা মোটের উপর বজায় রয়েছে। তবে ইরান এখনও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ দিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হতো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানের এই পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনও তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং তাদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি রেখেছে।

গত সোমবার ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি বার্তা প্রকাশ করে। সেখানে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, এমন কিছু নতুন যুদ্ধক্ষেত্র উন্মোচন করা হবে যেখানে শত্রুদের অভিজ্ঞতা খুবই কম এবং তারা অত্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় পড়বে।

তবে বিবিসি বলছে, তাসনিম নিউজ সম্ভবত গত ১২ মার্চের খামেনির দেওয়া বক্তব্যটিই পুনরায় প্রকাশ করেছে। বেশ কিছু ইরানি সংবাদমাধ্যম ইদানীং তার আগের লিখিত বার্তাগুলো পুনরায় প্রচার করছে।

এর আগে সোমবার ইরান জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে ইরানি গণমাধ্যমের আগের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে কোনো সুনির্দিষ্ট ছাড় দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

গত রোববার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইরানের জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে, তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, অন্যথায় তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’

এর কয়েক দিন আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেহরানের দাবিগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জোর দিয়ে বলেছেন যে, তাদের দাবিগুলো ছিল ‘দায়িত্বশীল এবং উদার’।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা তাসনিমের তথ্যমতে, ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল— সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা (যার মধ্যে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের চলমান হামলাও অন্তর্ভুক্ত), ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর আর কোনো হামলা না করার নিশ্চয়তা। এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলোও দাবিতে উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, ইরানের আরেক আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ফার্স নিউজ রোববার জানায়, তেহরানের প্রস্তাবের জবাবে ওয়াশিংটন পাঁচটি শর্ত বেঁধে দিয়েছে। এর মধ্যে একটি শর্ত হলো— ইরান কেবল একটিমাত্র পারমাণবিক কেন্দ্র চালু রাখতে পারবে এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

পরে গত শুক্রবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখে তবে তিনি তা মেনে নেবেন। দুই দেশের মধ্যকার এই বড় বিরোধের জায়গায় ট্রাম্পের এই মন্তব্য অবস্থান পরিবর্তনের আভাস দেয়, যা মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করার আগের দাবি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের দাবি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

হুতিদের ‘দখলে’ ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, হুমকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইয়েমেন সরকারের চারটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, মোখা দখলের মধ্য দিয়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের প্রভাব আরও বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালির কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও হুতিরা হামলা চালাচ্ছে।

১৭ ঘণ্টা আগে

নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জিতলে প্রত্যেক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার দেবেন ট্রাম্প

ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যখন পণ্যের দাম বাড়ছে, যার পেছনে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে শুরু করা যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। ইরান এর পালটা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা

১৮ ঘণ্টা আগে

যুদ্ধে টিকতে না পেরে মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে মরিয়া ইরান: ট্রাম্প

ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নৌযানকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় আবারও হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।

২১ ঘণ্টা আগে

মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: একাধিক যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত

আমেরিকান কর্মকর্তাদের মতে, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে সম্প্রতি পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে অন্তত এক নাবিক নিহত এবং একজন নিখোঁজ হন। এর পরই মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা জোরদার করে ইরান।

১ দিন আগে
Advertisement