অন্যদের জন্য নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানি অব্যাহত

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
হরমুজ প্রণালি। ফাইল ছবি

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে তেল খাতে। বিশেষ করে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এককভাবে পরিবহনে ব্যবহৃত হরমুজ প্রণালিতে ইরান সব দেশের তেলবাহী জাহাজের চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। দেশে দেশে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, সরবরাহ সংকটও শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানে হামলার আগেই ধারণা করে নিয়েছিল, নিজেদের তেল রপ্তানিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে আশঙ্কায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করবে না। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ইরানের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে অন্তত ১৬টি জাহাজ ড্রোন বা অন্যান্য হামলার শিকার হয়েছে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যখন কোনো দেশই তেল পরিবহন করতে পারছে না, তখন ইরান যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের মতোই সমান পরিমাণে তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। এর মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও সংগ্রহ করে চলেছে তারা। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালি অন্যান্য দেশের জন্য সংকট তৈরি করলেও তা ইরানের ওপর কোনো প্রভাবই ফেলছে না।

ট্যাংকার ট্র্যাকিং ডেটা ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে ইরানের হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখার তথ্য উঠে এসেছে। বাণিজ্য বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলার আর ট্যাংকার ট্র্যাকারও জানিয়েছে একই তথ্য।

কেপলার বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান প্রায় এক কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ট্যাংকার ট্র্যাকারের হিসাব, গত সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে ইরান।

এসব হিসাব বলছে, ইরান এখনো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে, যেখানে গত বছর প্রতিদিন তাদের গড় রপ্তানি ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল। অর্থাৎ এ যুদ্ধ শুরুর পর প্রভাব পড়লেও ইরানের তেল রপ্তানির কাঠামো একবারে ভেঙে পড়েনি।

ইরানি ট্যাংকারে বাধা দিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে অন্তত ১৫টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ইউজে ম্যারিটাইম ট্রেড অপারেশন্স। এসব হামলায় গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন রুটে কার্যত জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের তেলবাহী জাহাজ থামানোর কোনো চেষ্টা করেনি, যদিও তারা ইরানের নৌ বাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করেছে। একই সঙ্গে শোধনাগার, পাইপলাইন বা তেল সংরক্ষণাগারের মতো জ্বালানি অবকাঠামোতেও বড় ধরনের হামলা থেকে বিরত রয়েছে ওয়াশিংটন, যদিও তেহরানের আশপাশে ইসরায়েলি হামলায় কিছু সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের প্রায় সব তেল রপ্তানি হয় উপকূল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ থেকে, যেটি তেলদ্বীপ নামেও পরিচিত। সম্প্রতি সেখানে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। তবে হামলার পরও সেখানকার তেল অবকাঠামো অক্ষত রয়ে গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য পরে সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা অব্যাহত রাখে, তবে খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি মাইক ওয়াল্টজ সিএনএনকে বলেন, প্রেসিডেন্ট কোনো বিকল্পই টেবিলের বাইরে রাখছেন না, প্রয়োজনে খার্গ দ্বীপের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা হতে পারে।

অন্যদিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, আপাতত হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু ইরানি, ভারতীয় ও চীনা জাহাজের চলাচলে ওয়াশিংটনের ‘সম্মতি’ রয়েছে।

স্যাটেলাইট বলছে, খার্গ দ্বীপে তেল কার্যক্রম সচল

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খার্গ দ্বীপের ৫৫টি তেল সংরক্ষণ ট্যাংক অক্ষত রয়েছে। একই দিনে দুটি ইরানি ট্যাংকারে প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেল তেল লোড করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্যাংকার ট্র্যাকার।

তবে বাস্তবে আরও বেশি ট্যাংকার চলাচল করতে পারে, কারণ অনেক সময় এসব জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে, যেন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়ানো যায়। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, অন্তত ছয়টি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে বা ভুল অবস্থান দেখিয়ে চলাচল করছে।

সমুদ্রে আগে থেকেই ছিল ১৭ কোটি ব্যারেল তেল

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সা জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর আগেই বিশ্ব জুড়ে সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল ছিল, যা ক্রেতার অপেক্ষায় ছিল। শুধু তাই নয়, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ফেব্রুয়ারিতেই রপ্তানি বাড়িয়ে দেয় ইরান। খার্গ থেকে দৈনিক গড়ে ২০ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।

ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে, দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিও বাড়িয়েছে। ইরাকের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের বরাতে বলা হয়, গত সপ্তাহে ইরান থেকে গ্যাস আমদানি তিনগুণ বেড়ে দৈনিক এক কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটারে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালি কূটনৈতিক হাতিয়ার

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরান হরমুজ প্রণালিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে। তবে এটি আমাদের শত্রু ও তাদের মিত্রদের জন্য বন্ধ। অন্যরা এ পথে চলাচল করতে পারবে।

ইরানের অনুমতি পেতে ভারত গত মাসে জব্দ করা তিনটি ইরানি ট্যাংকার ছেড়ে দেয় বলে জানিয়েছে পত্রিকা শার্ক। পরে দুটি ভারতীয় জাহাজ নিরাপদে প্রণালি অতিক্রম করে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বলেন, আলোচনার মাধ্যমেই এ সমাধান সম্ভব হয়েছে এবং কূটনীতিই এখানে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

হরমুজের ওপরই নির্ভরশীল ইরান

দীর্ঘমেয়াদে ইরানের জন্যও হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থলপথে তেল রপ্তানির সুযোগ সীমিত এবং পারস্য উপসাগরের বাইরে বড় বন্দর ব্যবহারের সক্ষমতাও কম। অন্যদিকে সৌদি আরবের লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের মতো বিকল্প সুবিধা ইরানের নেই। ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে ইরানেরও।

সিএনএন লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চায়, ইরানি জাহাজও ওই প্রণালি পার হতে গিয়ে বিপদে পড়বে। তবে এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিকে ইরানই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রমাণ রাখতে পেরেছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা করল মালয়েশিয়া

প্রতি বছর মালয়েশিয়ায় অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও ধর্মীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। জাতীয় রেডিও এবং টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষকে এই ঘোষণা জানানো হয়।

৬ ঘণ্টা আগে

আমাদের যুদ্ধ নয়— ট্রাম্পকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইউরোপ

ইউরোপীয় নেতারা একতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত নেতৃত্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল নিচ্ছেন। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস বলেন, ‘এখন আমরা অনেকটা শান্ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, যেকোনো সময় অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটতে পারে। তাই মাথা ঠান্ডা রেখে এগোচ্ছি।’

৭ ঘণ্টা আগে

কাতারের গ্যাস স্থাপনায় ইরানি হামলা: সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান

কাতার-এর গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস স্থাপনায় ইরান-এর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, এসব দেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে কাতারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং তাদের নিজস্ব মজ

৮ ঘণ্টা আগে

ইরান যুদ্ধের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলার চায় পেন্টাগন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে বলে জানা গেছে।

১০ ঘণ্টা আগে