অ্যামেরিকায় ট্রাম্প এলে ভারতের কী

ডয়চে ভেলে
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২: ১১

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে ডনাল্ড ট্রাম্প পরিচিত 'আনপ্রেডিকটেবল' বা তার অপ্রত্যাশিত আচরণের জন্য। রক্ষণশীল রাজনীতির ধারায় কিছু কিছু বিষয় বদলায় না। সরকারে যেই আসুক না কেন, কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি তারা অনুসরণ করে। ডনাল্ড ট্রাম্প সেই ধারার রাজনীতিক নন। তিনি যা করেন, নিজের খেয়ালে করেন। তা সে যতই বিতর্কিত হোক না কেন।

আর এখানেই নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের মিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী চারিত্রিক দিক থেকে ট্রাম্পের মতো নন দীর্ঘদিন রেজিমেন্টেড রাজনীতি করেছেন তিনি। ফলে দলীয় শৃঙ্খলা, সামাজিক শৃঙ্খলা মেনে চলেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ট্রাম্পের সঙ্গে মোদীর মিল হলো, তারা দুজনেই আনপ্রেডিকটেবল। ৭৫ বছরের ভারতীয় রাজনীতি যে বিষয়গুলিতে হাত দেওয়ার সাহস করেনি, মোদী বিতর্কিত সেই বিষয়গুলি নিয়ে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছেন৷ তা সে বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির প্রসঙ্গই হোক অথবা কাশ্মীর৷ মোদীর এই অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক চালকে ট্রাম্প অভিহিত করেছেন 'কিলার' শব্দটি দিয়ে৷ ট্রাম্পের ভাষায় 'কিলার মোদী'। আর এই কিলার মানসিকতাই বিশ্বের এই দুই নেতাকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

জাতীয়তাবাদী লাইন

মোদী এবং ট্রাম্প দুজনেই জাতীয়তাবাদী, সময় সময় তারা অতি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির লাইন নেন৷ মোদীর মুখে তাই যেমন কথায় কথায় 'মেক ইন ইন্ডিয়া' শোনা যায়, ট্রাম্পের মুখে শোনা যায় 'অ্যামেরিকা ফার্স্ট৷' অর্থাৎ, আগে দেশ, পরে পররাষ্ট্র৷ জো বাইডেনের শাসনকালে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য রেখে চলেছে৷ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ভারতকে ঠিক যতটা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল, বাইডেন প্রশাসন ঠিক ততটাই দিয়েছে৷ যেখানে যেখানে ভারতের উপর চাপ তৈরি করার প্রয়োজন ছিল, বাইডেন প্রশাসন তা করতে পিছুপা হয়নি৷ কিন্তু যা ঘটেছে, তা প্রত্যাশিতভাবে ঘটেছে।

ট্রাম্প এলে কী ঘটবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই সন্দিহান৷ মনে রাখা দরকার, বড় অংশের ভারতীয় কোনো না কোনো ভাবে অ্যামেরিকার কাজের বাজারের সঙ্গে যুক্ত৷ বলা হয়, মার্কিন তথ্য-প্রযুক্তি শিল্পের সাপোর্ট সিস্টেম ভারতীয় মেধা৷ বিরাট অংশের ভারতীয় অ্যামেরিকায় বসে কাজ করেন৷ বিরাট অংশের ভারতীয় সংস্থা ভারত থেকে অ্যামেরিকার তথ্য প্রযুক্তি শিল্পকে সাহায্য করে৷ প্রথমবার সরকারে এসে এই বিষয়টি নিয়ে বার বার প্রশ্ন তুলেছিলেন ট্রাম্প৷ আউট সোর্সিং কমিয়ে দেওয়ার কথা বার বার বলেছেন তিনি৷ কাজ সংক্রান্ত ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কড়া পদক্ষেপ নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন৷ ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি অনেক বেশি রক্ষণশীল৷ এবারেও সেই একইরকম বার্তা দিতে তিনি শুরু করেছেন৷ যা ভারতীয় চাকরিজীবীদের জন্য খুব সুখবর নয়।

পররাষ্ট্র সম্পর্ক

বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত বরাবরই ভারসাম্যের কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে৷ অ্যামেরিকার যথেষ্ট বন্ধু হয়েও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক পালন করে৷ ট্রাম্প আসার পরেও ভারতের সেই নীতিতে কোনো বদল ঘটবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷ খেয়াল রাখা জরুরি, রাশিয়ার সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে মঞ্চটি ভারত শেয়ার করে, তার নাম ব্রিকস৷ চীনও সেই মঞ্চে আছে৷ বেশ কিছুদিন ধরেই ব্রিকস তাদের নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলার তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে৷ ব্রিকস বাণিজ্যের জন্য নতুন কারেন্সি বা দেশীয় কারেন্সিতে ব্যবসা করার কথা ভাবছে৷ হোয়াইট হাউসে ঢোকার আগেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, ব্রিকস এই কাজ করলে ওই দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে৷ লক্ষ্যণীয়, মেক্সিকো এবং ক্যানাডার সঙ্গে বাণিজ্যে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা করে দিয়েছেন৷ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাও করেছেন তিনি৷ ভারতের চ্যালেঞ্জ হলো, তারা ব্রিকসকে বেশি গুরুত্ব দেবে, নাকি ট্রাম্পকে৷ দুটোই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্যিক সম্পর্ক

অভিবাসন এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্প সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের উপর চাপ তৈরি করতে পারে, তা অনেকেই মনে করছেন৷ তবে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্প সরকার ভারতকে সাহায্য করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়ে সমস্ত মার্কিন ডেমোক্র্যাট সরকার ভারসাম্যের নীতি নিয়ে চলেছে৷ বাইডেনের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি৷ ট্রাম্পের প্রথম সরকার এবিষয়ে অনেক বেশি ভারতপন্থি মনোভাব দেখিয়েছে৷ জঙ্গিবাদ নিয়ে ভারতের বক্তব্যের সঙ্গে অতীত ট্রাম্প সরকারের বক্তব্য অনেক সময়েই মিলে গেছে৷ এপর্যায়েও পাকিস্তান প্রশ্নে ট্রাম্প দিল্লির দিকে ঝুঁকে থাকবেন বলেই মনে করছেন কূটনীতিবিদেরা৷ অন্যদিকে, কাশ্মীর নিয়েও ট্রাম্প সরকার ভারতের উপর বিশেষ চাপ তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে না।

চলতি সময়ে ক্যানাডায় 'খালিস্তানি হত্যা' নিয়ে ক্যানাডার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে৷ ট্রাম্প সরকার এবিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে৷ ভারত আসা করছে, এবিষয়ে ট্রাম্প মোদীকে সাহায্য করবেন।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের চলতি পরিস্থিতি নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উত্তেজনা তৈরি হয়েছে৷ যদিও সরকারিভাবে ভারত এবং বাংলাদেশ কোনো দেশই তা প্রকাশ্যে আনছে না৷ বরং দুই দেশই কিছুটা সময় কেনার কৌশল নিয়েছে৷ ট্রাম্প সরকার বাংলাদেশ বিষয়ে কী মনোভাব নেয়, সেই বিষয়টিও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ৷ কূটনৈতিকভাবে ভারত এনিয়ে অ্যামেরিকার সঙ্গে আলোচনা করতে পারে বলেও সাউথ ব্লকের অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক

ট্রাম্পের প্রথম আমলে চীনের সঙ্গে অ্যামেরিকার সম্পর্ক সর্বকালীন তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। চীনের সঙ্গে অ্যামেরিকার খারাপ সম্পর্ক ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে সুখের৷ কারণ ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপড়েনে ভারত সবসময়ই বাকি বিশ্বকে পাশে পেতে চায়৷ বিশেষ করে অ্যামেরিকাকে৷ এবিষয়েও ট্রাম্প মোদীকে সাহায্য করবেন বলেই মনে করা হচ্ছে৷

সব মিলিয়ে ট্রাম্প আমলে ভারত-অ্যামেরিকা সম্পর্ক এক কথায় 'মশলাদার' হবে বলে মনে করছেন কূটনীতিবিদেরা৷ ট্রাম্প এবং মোদী দুজনেই যেহেতু কূটনৈতিক স্তরে 'আনপ্রেডিকটেবল', ফলে আগামী চার বছর নানা কিছু ঘটার সম্ভাবনাই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা৷ প্রশ্ন হলো, সম্ভাবনা আশঙ্কায় না পরিণত হয়!

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা— কারা থাকছেন, কী এজেন্ডা, বাধা কোথায়

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের ঠিক ছয় সপ্তাহ পর এই আলোচনা হতে যাচ্ছে। এ আলোচনা থেকে সারা বিশ্বের মানুষের প্রত্যাশা— দুই সপ্তাহের জন্য যে যুদ্ধবিরতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে, সেটি যুদ্ধে বন্ধের স্থায়ী রূপ পাবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলবে তেলবাহী জাহাজ; ছয় সপ্তাহ ধরে বৈশ্বিক যে জ্বালানি সংকট

৩ ঘণ্টা আগে

ইরান বিজয়ী পক্ষ, ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে: খামেনি

মোতজবা খামেনি তার বার্তায় বলেন, এই যুদ্ধে ইরানের জনগণই ‘বিজয়ী পক্ষ’ এবং এই যুদ্ধে ‘বিজয়ী জাতি’ও ইরানই। যুদ্ধের প্রতিটি ক্ষতির জন্য ইরান ক্ষতিপূরণ আদায় করবে এবং এই যুদ্ধে আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করবে।

৪ ঘণ্টা আগে

নেতানিয়াহুকে কূটনীতি ‘হত্যা’র সুযোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘চরম বোকামি’ হবে: ইরান

আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহুর দুর্নীতি মামলার বিচার আগামী রোববার আবার শুরু হচ্ছে। তার দাবি, যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পেছনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর গোপন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

৫ ঘণ্টা আগে

হরমুজ নিয়ে ইরানের আচরণ খুবই খারাপ, চুক্তির পরিপন্থি: ট্রাম্প

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরান তেলবাহী ট্যাংকার থেকে ফি আদায় করছে বলে খবর পাচ্ছি। তারা যেন এমনটা না করে। আর যদি করেও থাকে, তবে এখনই তা বন্ধ করতে হবে।’

৬ ঘণ্টা আগে