
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ৪০ দিন পর ৮ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা ও ইরানের সম্মতির ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ইরানে। এ যুদ্ধে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ইরান সরকার ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশকে হারিয়েছে ইরান। দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন আলি খামেনিরই ছেলে মুজতবা খামেনি।
কিন্তু এ যুদ্ধের সূচনা হলো কীভাবে? ইসরায়েল যে যুদ্ধ বহুদিন ধরে ইরানের সঙ্গে করতে চাইছে, কীভাবে সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেললেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? ইরানে হামলার সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে চূড়ান্ত হলো?
ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে পরবর্তী দিনগুলোতে হোয়াইট হাউজে দফায় দফায় বৈঠক করে ট্রাম্প যেভাবে এ যুদ্ধের দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা বিস্তারিত উঠে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এসব বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, কে কী বলেছেন, ট্রাম্প কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন— এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সব তথ্যই। রাজনীতি ডটকমের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।

১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার ঠিক আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বহনকারী কালো এসইউভি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল) পৌঁছায় হোয়াইট হাউজে। সাংবাদিকদের দৃষ্টি এড়িয়ে প্রায় অনাড়ম্বরভাবে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্তের জন্য তখন প্রস্তুত নেতানিয়াহু, যিনি কয়েক মাস ধরেই ইরানের ওপর একটি বড় ধরনের হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রথমে ওভাল অফিসসংলগ্ন কেবিনেট রুমে জড়ো হন। এরপর নেতানিয়াহু মূল অনুষ্ঠানের জন্য নিচে হোয়াইট হাউজের ‘সিচুয়েশন রুমে’ যান, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দলের জন্য ইরান বিষয়ে একটি অত্যন্ত গোপনীয় ফাইল উপস্থাপনা করা হচ্ছিল। ওই কক্ষটি বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের জন্য খুব কমই ব্যবহৃত হতো।
সেখানে ট্রাম্প বসলেন, কিন্তু মেহগনি কাঠের কনফারেন্স টেবিলের প্রধান প্রান্তে তার স্বাভাবিক অবস্থানে নয়। এর বদলে বসলেন একপাশে, দেয়াল বরাবর লাগানো বড় স্ক্রিনগুলোর দিকে মুখ করে। নেতানিয়াহু বসলেন অন্য পাশে, প্রেসিডেন্টের ঠিক বিপরীতে।
নেতানিয়াহুর পেছনে ছিলেন ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিচালক ডেভিড বারনিয়া ও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা। নেতানিয়াহুর পেছনে দৃশ্যত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তারা এমন এক যুদ্ধকালীন নেতার চিত্র তৈরি করেছিলেন, যিনি তার দলবল দ্বারা পরিবেষ্টিত।
টেবিলের একেবারে শেষ প্রান্তে বসেছিলেন হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বসেছিলেন তার নিয়মিত আসনে, যিনি একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করছিলেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাধারণত এ ধরনের অনুষ্ঠানে একসঙ্গে বসেন, তারা ছিলেন একপাশে, সঙ্গে ছিলেন সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্বে থাকা ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও ছিলেন সেখানে, যা মূল দলটিকে পূর্ণতা দেয়।
তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি এড়াতে গোপনীয় সে বৈঠকে উপস্থিতির আকার ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট রাখা হয়েছিল। মন্ত্রিসভার অন্য শীর্ষ সদস্যরা এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না, অনুপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও, যিনি আজারবাইজানে ছিলেন এবং বৈঠকটি এত অল্প সময়ের নোটিশে নির্ধারিত হয়েছিল যে তিনি সময়মতো ফিরতে পারেননি।
সেখানে পরবর্তী এক ঘণ্টায় নেতানিয়াহুর যে উপস্থাপনাটি করেন, তা বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলের (মধ্যপ্রাচ্য) কেন্দ্রস্থলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একটি বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের পথে চালিত করার পরিকল্পনা। পরবর্তী দিন ও সপ্তাহগুলোতে হোয়াইট হাউজে সে পরিকল্পনা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা হয়। সেই আলোচনাগুলোতে ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়ার আগে তার বিকল্প ও ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করতে থাকেন।
ট্রাম্প কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, তার এই বিবরণটি ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’ শীর্ষক একটি বইয়ের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যে বইটি শিগগিরই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউজের অভ্যন্তরের বিভিন্ন সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে যেসব সাক্ষাৎকার ও তথ্য দিয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরের আলোচনাগুলো কীভাবে ট্রাম্পের সহজাত প্রবৃত্তি, তার ঘনিষ্ঠ মহলের ফাটল ও হোয়াইট হাউজ পরিচালনার পদ্ধতিকে তুলে ধরে, সেগুলো সবিস্তারে উঠে এসেছে এতে।
এই প্রতিবেদনটি তুলে ধরে, কীভাবে ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ চিন্তাভাবনা বহু মাস ধরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে গিয়েছিল, যা এমনকি ট্রাম্পের কিছু প্রধান উপদেষ্টাও উপলব্ধি করতে পারেননি। দুটি প্রশাসন জুড়েই তাদের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে এবং মাঝে কিছুটা উত্তেজনা গেলেও এই গতিশীলতা আমেরিকার রাজনীতির বাম ও ডান উভয় দিকেই তীব্র সমালোচনা ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
হোয়াইট হাউজে সরাসরি একটি যুদ্ধের সবচেয়ে বিরোধী হিসেবে পরিচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। প্রতিবেদনটি বলছে, তিনি ছাড়া শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার এমনকি সবচেয়ে সংশয়ী সদস্যরাও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সহজাত যুদ্ধ প্রবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করেন। যুদ্ধটি দ্রুত ও চূড়ান্ত হবে বলে বিশ্বাস ছড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
১১ ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিল ‘সিচুয়েশন রুমে’
১১ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু জোরালোভাবে দাবি তোলেন, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় এসেছে। তিনি এমন বিশ্বাস প্রকাশ করেন, একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি মিশনই ইরানের ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটাতে যথেষ্ট।
একপর্যায়ে ইসরায়েলিরা ট্রাম্পকে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখান। ভিডিওতে ইরানের এমন সম্ভাব্য নতুন নেতাদের একটি তালিকা ছিল, যারা কট্টরপন্থি সরকারের পতন হলে দেশের দায়িত্ব নিতে পারেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইরানের শেষ শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভী, যিনি এখন বসবাস করেন ওয়াশিংটনে। নিজেকে ভিন্নমতাবলম্বী, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে আসছেন তিনি, যিনি ইরানকে একটি ধর্মতন্ত্র-পরবর্তী সরকারের দিকে পরিচালিত করতে পারবেন বলে দাবি করা হয়।
নেতানিয়াহু ও তার সঙ্গীরা সেখানে এমন কিছু চিত্র তুলে ধরেন, যেগুলোকে তারা প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের ইঙ্গিতবাহী হিসেবে চিত্রিত করেন। এর মধ্যে ছিল—
এ ছাড়াও মোসাদের গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, ইরানের রাজপথে ফের বিক্ষোভ শুরু হবে। এর জের ধরে ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থার প্ররোচনায় দাঙ্গা ও বিদ্রোহ উসকে দেওয়ায় একটি তীব্র বোমা হামলা শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ইসরায়েলিরা এই সম্ভাবনাও উত্থাপন করেছিল, ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা ইরাক থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে উত্তর-পশ্চিমে একটি স্থলযুদ্ধ শুরু করতে পারে, যা শাসকগোষ্ঠীর বাহিনীকে আরও বিভক্ত করে এর পতনকে ত্বরান্বিত করবে।
নেতানিয়াহু আত্মবিশ্বাসী ও একঘেয়ে সুরে তার উপস্থাপনাটি পেশ করেন। মনে হচ্ছিল, কক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে এটি বেশ ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে। ট্রাম্প তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘আমার কাছে তো ভালোই লাগছে।’ নেতানিয়াহুর কাছে তার এ মন্তব্য ছিল ইরানে একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানের জন্য সম্ভাব্য সবুজ সংকেত।
বৈঠক শেষে শুধু নেতানিয়াহুই নন, আরও অনেকেই এ ধারণা নিয়ে বেরিয়েছিলেন যে ট্রাম্প মনস্থির করে ফেলেছেন। ট্রাম্পের উপদেষ্টারা দেখতে পাচ্ছিলেন, নেতানিয়াহুর সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতার সম্ভাবনায় তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছেন। জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের আগেও যখন এই দুই নেতা সাক্ষাৎ করেন, তখনো ট্রাম্প এভাবেই নেতানিয়াহুর বক্তব্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
এর আগে ১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউজ সফরে নেতানিয়াহু কেবিনেট কক্ষে সমবেত আমেরিকানদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেন ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকটের দিকে। ওই সময় কক্ষে উপস্থিত অন্যরা অভিযানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন।
জবাবে নেতানিয়াহু ঝুঁকির কথা স্বীকার করলেও বলেন, পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকির চেয়ে নিষ্ক্রিয় থাকার ঝুঁকিই বেশি বলে তিনি মনে করেন। যুক্তি দেন, তারা হামলা চালাতে দেরি করলে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করা ও পারমাণবিক কর্মসূচির চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরির জন্য আরও সময় দেওয়ার শামিল হবে।
কক্ষে উপস্থিত সবাই বুঝতে পেরেছিলেন, এ অঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর তৈরি ও সরবরাহ করতে পারে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে ও অনেক দ্রুততার সঙ্গে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে।
নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাগুলো এবং সেগুলোর প্রতি ট্রাম্পের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের জন্য একটি জরুরি কাজ তৈরি করে। রাতারাতি বিশ্লেষকরা ইসরায়েলি দলটি ট্রাম্পকে যা বলেছিল, তার সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করার জন্য কাজ করেন।
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ফলাফল পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে কেবল মার্কিন কর্মকর্তাদের নিয়ে আরেকটি বৈঠক হয়। সেখানে ট্রাম্প উপস্থিত হওয়ার আগে দুজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা তার ঘনিষ্ঠ মহলকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন।
বকিছুর ঊর্ধ্বে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি ছিল হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী এই সংকীর্ণ জলপথটি যদি রুদ্ধ হয়ে যেত, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর অভ্যন্তরীণ পরিণতি মারাত্মক হতো, যার শুরুটা হতো পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে।
ডানপন্থিদের সংশয়বাদী হিসেবে পরিচিত ভাষ্যকার টাকার কার্লসন গত এক বছরে বেশ কয়েকবার ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তার প্রেসিডেন্ট পদকে ধ্বংস করে দেবে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে কার্লসনের সঙ্গে কথা হয় ট্রাম্পের। ওই সময় ট্রাম্প আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন কার্লসনকে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানি আপনি এটি নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’ কার্লসন জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কীভাবে এটি জানেন। ট্রাম্প উত্তর দেন, ‘কারণ সবসময়ই তাই হয়।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিনগুলোতে আমেরিকান ও ইসরায়েলিরা একটি নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করে। ওই তথ্যে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দিনের আলোতে খোলা আকাশের নিচে বিমান হামলার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত একটি স্থানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করছিলেন। তারা একে ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানার এক ক্ষণস্থায়ী সুযোগ হিসেবে দেখে। তাদের মূল্যায়ন ছিল, এটি এমন এক লক্ষ্যবস্তু যা হয়তো আর কখনো আসবে না।
ইরানকে দীর্ঘ দিন ধরেই চাপ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। মূল লক্ষ্য, ইরানকে এমন একটি চুক্তিতে নিয়ে আসা, যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ রুদ্ধ করবে। এই কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য অতিরিক্ত সময়ও দিয়েছিল।
ট্রাম্পের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে কয়েক সপ্তাহ আগেই ইরানে হামলার বিষয়ে মনস্থির করেছিলেন। তবে সে হামলা ঠিক কখন হবে, সে বিষয়ে তখনো তিনি সিদ্ধান্ত নেননি। এ অবস্থায় ট্রাম্পকে দ্রুতই পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানান নেতানিয়াহু।
সেই একই সপ্তাহ সময়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সবশেষ আলোচনার পর জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ জেনেভা থেকে ফোন করেন। ওই সময় ওমান ও সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তিন দফা আলোচনা হয়। কুশনার ও উইটকফ সে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো চুক্তিতে আসার সদিচ্ছা ইরানের রয়েছে কি না, সেটিই মূলত যাচাই করছিলেন তারা।
আলোচনার একপর্যায়ে কুশনার ও উইটকফ ইরানিদের তাদের কর্মসূচির পুরো সময়কালের জন্য বিনামূল্যে পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা নিয়ে ইরানের যে কট্টর অবস্থান, তা বেসামরিক জ্বালানির জন্য নাকি বোমা তৈরির সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য, সেটিই পরীক্ষা করছিলেন দুই মার্কিন প্রতিনিধি। ইরানিরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। একে তাদের মর্যাদার ওপর আঘাত বলে অভিহিত করে।
কুশনার ও উইটকফ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তারা বলেন, তারা সম্ভবত কোনো একটি বিষয়ে আলোচনা করতে পারবেন, কিন্তু তাতে কয়েক মাস সময় লাগবে। তারপরও তারা ‘ইরান সমস্যা’র সমাধান করতে পারবেন কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। কারণ ইরানিরা ছলচাতুরী করছিল বলে জানান তারা।
২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টার দিকে সিচুয়েশন রুমে শুরু হয় একটি চূড়ান্ত বৈঠক। এর আগে দফায় দফায় যেসব বৈঠক হয়েছে, সেগুলোতে সবকিছু নিয়েই সবিস্তার আলোচনা হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত বৈঠকের আগেই সিচুয়েশন রুমে উপস্থিত সবার অবস্থান স্পষ্ট, যা প্রত্যেকেই জানতেন।
বৈঠক চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। ট্রাম্প যথারীতি বসেন টেবিলের প্রধান আসনে। তার ডান দিকে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, তার পাশে একে একে ছিলেন সুসি ওয়াইলস, জন র্যাটক্লিফ, হোয়াইট হাউজের কাউন্সেল ডেভিড ওয়ারিংটন ও যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং।
এদিকে চেউংয়ের বিপরীতে ছিলেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট; তার ডান দিকে ছিলেন জেনারেল কেইন, তারপর হেগসেথ ও রুবিও।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনাকে এতটাই সীমিত রাখা হয়েছিল যে ট্রেজারির দায়িত্বে থাকা স্কট বেসেন্ট ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটকে পর্যন্ত সে বৈঠকে রাখা হয়নি। অথচ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ হলে বৈশ্বিক তেল বাজার যদি অস্থির হয়ে ওঠে তা সামলানোর দায়িত্ব পড়বে এই দুজনের ওপর। শুধু তাই নয়, মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল সে বৈঠক থেকে।
বৈঠক শুরুর পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, আমাদের কাছে কী আছে?’ হেগসেথ ও কেইন হামলাগুলোর ক্রমবিন্যাস তুলে ধরেন। এরপর ট্রাম্প বলেন, তিনি একে একে সবার মতামত শুনতে চান।
ইরানে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে শুরু থেকেই দ্বিমত করে আসছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি জানেন, আমি মনে করি এটি একটি বাজে পরিকল্পনা। কিন্তু আপনি যদি এটি করতে চান, আমি আপনাকে সমর্থন করব।’
সুসি ওয়াইলস বলেন, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ট্রাম্প যদি মনে করেন যে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, তবে তার তা করা উচিত।
যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হওয়া নিয়ে বৈঠকে কোনো মতামত দেননি র্যাটক্লিফ। তবে তিনি তেহরানে আলি খামেনির কম্পাউন্ডে ইরানি নেতৃত্বের এক হওয়ার চাঞ্চল্যকর নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন। সিআইএ পরিচালক বলেন, এই শব্দটির সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব। তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনায় যদি আমরা শুধু সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা বোঝাই, তবে আমরা সম্ভবত তা করতে পারব।’
প্রশ্ন করা হলে হোয়াইট হাউজের আইনজীবী ওয়ারিংটন বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা যেভাবে পরিকল্পনাটি তৈরি করেছেন এবং প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করেছেন, সে অনুযায়ী এটি একটি আইনত অনুমোদিত বিকল্প। তিনি কোনো ব্যক্তিগত মতামত দেননি।
ট্রাম্প মতামত দেওয়ার জন্য চাপ দিলে ওয়ারিংটন বলেন, একজন মেরিন সেনা হিসেবে তিনি বহু বছর আগে ইরানের হাতে নিহত এক মার্কিন সেনাসদস্যকে চিনতেন। এ বিষয়টি অত্যন্ত ব্যক্তিগত ছিল। তিনি ট্রাম্পকে বলেন, ইসরায়েল যদি তা সত্ত্বেও এগিয়ে যেতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রেরও তাই করা উচিত।
চেউং সম্ভাব্য জনপ্রতিক্রিয়ার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এবারের নির্বাচনি ক্যাম্পেইনের কেন্দ্রে রেখেছিলেন যুদ্ধের বিরোধিতাকে। জনগণ তাকে বিদেশে যুদ্ধ করার জন্য ভোট দেয়নি। তার ওপর গত জুনে ইরানে বোমা হামলার পর প্রশাসন যা বলেছিল, এখনকার পরিকল্পনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আট মাস ধরে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে বলে যে দাবি মার্কিন প্রশাসন করে আসছিল, তার ব্যাখ্যা তারা কীভাবে দেবে— এমন প্রশ্ন রাখেন চেউং। তবে তিনিও ব্যক্তিগত মতামত তুলে না ধরে বলেন, ট্রাম্প যে সিদ্ধান্তই নেবেন, সেটিই সঠিক হবে।
একই কথা বলেন প্রেস উইংয়ের লেভিট। তার ভাষ্য, এ সিদ্ধান্ত একান্তই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। তিনি তার মতো করে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, প্রেস টিম সে সিদ্ধান্তকেই যথাসাধ্য সামাল দেবে।
হেগসেথ অবশ্য অন্যদের মতো ব্যক্তিগত মতামত দিতে কার্পণ্য করেননি। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানিদের মোকাবিলা করতেই হবে। আর সেটি করতে হলে এখনই করা ভালো। প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সৈন্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ অভিযান চালানো সম্ভব।
জেনারেল কেইন বৈঠকে অনেকটাই রক্ষণাত্মক অবস্থান নিয়েছিলেন। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে এর ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেন তিনি। সেখানে অভিযান চালাতে হলে অস্ত্রশস্ত্র কমানোর ক্ষেত্রে কী অর্থ বহন করবে, তাও ব্যাখ্যা করেন। কেইন কোনো মতামত না দিয়ে বলেন, তার অবস্থান ছিল যে যদি ট্রাম্প অভিযানের নির্দেশ দেন, তবে সামরিক বাহিনী তা কার্যকর করবে।
এরপর কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি আরও স্পষ্ট করে ট্রাম্পকে বলেন, যদি আমাদের লক্ষ্য হয় ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা অভ্যুত্থান, তবে আমাদের তা করা উচিত নয়। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, তবে সেই লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পারি।
সবাই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সহজাত যুদ্ধবাজ প্রবৃত্তিকে মেনে নেন। তারা তাকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে, অকল্পনীয় ঝুঁকি নিতে এবং কোনো না কোনোভাবে সফল হতে দেখেছেন। আর কেউ তাঁকে বাধা দেওয়ার মতো নেই।
এ পর্যায়ে উপস্থিতি সবার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের এটা করা দরকার। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে এবং এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে ইরান যেন ইসরায়েল বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে না পারে।
জেনারেল কেইন বললেন, তার হাতে কিছুটা সময় আছে। পরদিন বিকেল ৪টার আগে তাকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
পরদিন বিকেলে ট্রাম্প যখন এয়ার ফোর্স ওয়ানে, তখনই ইরানে হামলার নির্দেশ দেন তিনি। জেনারেল কেইন প্রেসিডেন্টের নির্দেশের জন্য যে সময়সীমা দিয়েছিলেন, ট্রাম্পের আদেশটি পাঠানো হয় সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ২২ মিনিট আগে। ট্রাম্পের সে আদেশে বলা হয়, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদিত। কোনোভাবেই বাতিল করা চলবে না। শুভকামনা।’
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বিষয়ে গভীর জ্ঞান ছিল এবং তারা ইরানের ব্যবস্থা ও এর কুশীলবদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতেন। তারা নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাটিকে চারটি অংশে বিভক্ত করেছিলেন। প্রথমটি ছিল ‘শিরশ্ছেদ’— আলি খামেনিকে হত্যা করা। দ্বিতীয়টি ছিল শক্তি প্রদর্শন ও প্রতিবেশীদের হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেওয়া। তৃতীয়টি ছিল ইরানের অভ্যন্তরে একটি গণঅভ্যুত্থান। আর চতুর্থটি ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, যেখানে দেশ শাসনের জন্য একজন ধর্মনিরপেক্ষ নেতাকে নিযুক্ত করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করেছিলেন, প্রথম দুটি উদ্দেশ্য আমেরিকান গোয়েন্দা ও সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জনযোগ্য। তবে নেতানিয়াহুর প্রস্তাবের তৃতীয় ও চতুর্থ অংশ, যার মধ্যে এমনকি কুর্দিদের দ্বারা ইরানে স্থল আক্রমণের সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই জানান মার্কিন কর্মকর্তারা।
ট্রাম্প যখন বৈঠকে যোগ দেন, র্যাটক্লিফ তাকে এই মূল্যায়ন সম্পর্কে অবহিত করেন। সিআইএ পরিচালক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাব্য দৃশ্যপট বর্ণনা করতে একটি শব্দ ব্যবহার করেন— ‘হাস্যকর’।
সেই মুহূর্তে মার্কো রুবিও তাকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘এটি বাজে কথা।’
র্যাটক্লিফ আরও যোগ করেন, যেকোনো সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহের অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রাখলে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু একে একটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আজারবাইজান থেকে সদ্য ফেরা ভ্যান্সসহ আরও বেশ কয়েকজন এ সময় কথা বলতে শুরু করেন। ভ্যান্সও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এরপর জেনারেল কেইনের দিকে ফিরে ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করেন, ‘জেনারেল, আপনি কী মনে করেন?’
জেনারেল কেইন জবাব দেন, ‘স্যার, আমার অভিজ্ঞতায় ইসরায়েলিদের জন্য এটিই স্বাভাবিক। তারা বাড়িয়ে বলে এবং তাদের পরিকল্পনা সবসময় সুগঠিত হয় না। তারা জানে যে আমাদের তাদের প্রয়োজন এবং সে কারণেই তারা বোজানোর জন্য জোর করছে।’
ট্রাম্প দ্রুতই কেইনের মূল্যায়নটি বিবেচনা করলেন। তিনি বললেন, ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হবে তাদের সমস্যা।’ তবে এটি তিনি ইসরায়েলিদের নাকি ইরানি জনগণের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সেটি স্পষ্ট ছিল না। নেতানিয়াহু ইরানের ওপর হামলার যে ক্ষেত্রে যে চারটি বিষয় উল্লেখ করেছিলেন, তার মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থটি অর্জনযোগ্য কি না, তার ওপর যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে না বলেই জানান ট্রাম্প।
বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্পকে মূলত ওই পরিকল্পনার প্রথম দুটি বিষয়— আলি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা এবং ইরানের সামরিক বাহিনীকে ভেঙে দেওয়া— অর্জনের দিকেই বেশি আগ্রহী দেখা যায়।
জেনারেল কেইনকে ট্রাম্প ‘রেজিন কেইন’ বলে উল্লেখ করতে পছন্দ করতেন। কয়েক বছর আগে তিনি ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেছিলেন এই বলে— অন্যদের ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুত ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) পরাজিত করা সম্ভব। ওই সময় কেইন যে আস্থা অর্জন করেন তারই পুরস্কার হিসেবে বিমান বাহিনীর ফাইটার পাইলট হিসেবে কাজ করা এই জেনারেলকে শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা পদে উন্নীত করেন ট্রাম্প।
জেনারেল কেইন কোনো রাজনৈতিক অনুগত ব্যক্তি ছিলেন না। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে তার গুরুতর উদ্বেগও ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্টের কাছে নিজের মতামত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। ইরান হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত উপদেষ্টাদের ছোট দলটি যখন পরবর্তী দিনগুলোতে আলোচনা চালাচ্ছিল, তখন জেনারেল কেইন উদ্বেগজনক এক সামরিক মূল্যায়ন তুলে ধরেন ট্রাম্পসহ সবার কাছে।
কেইন ওই মূল্যায়নে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের অভিযান মার্কিন অস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকও, যেগুলোর সরবরাহ ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে বছরের পর বছর ধরে সমর্থন দেওয়ার পর এমনিতেই চাপের মধ্যে ছিল। জেনারেল কেইন এ মজুতগুলো দ্রুত পূরণ করার কোনো স্পষ্ট পথ দেখতে পাননি।
হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করতে গেলে তাতে যেসব ব্যাপক অসুবিধা তৈরি হবে সেগুলো তুলে ধরেন কেইন। ইরানের দ্বারা যে ওই প্রণালি অবরোধের ঝুঁকিতে থাকবে, তুলে ধরেন সে কথাও। ট্রাম্প এ সম্ভাবনা এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে নাকচ করে দিয়েছিলেন যে পরিস্থিতি অত দূর গড়ানোর আগেই ইরানের শাসকগোষ্ঠী আত্মসমর্পণ করবে।
ট্রাম্পের ধারণা ছিল, খুব দ্রুতই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। বিশেষ করে জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বোমাবর্ষণের বিপরীতে ইরানের দুর্বল প্রতিক্রিয়ার কারণেই তার মধ্যে এ ধারণা আরও দৃঢ় হয়।
যুদ্ধের প্রাক্কালে জেনারেল কেইনের ভূমিকা সামরিক পরামর্শক ও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যেকার একটি চিরায়ত টানাপোড়েনকে তুলে ধরের। চেয়ারম্যান কোনো পক্ষ না নেওয়ার ব্যাপারে এতটাই অনড় ছিলেন যে তিনি বারবার বলতেন, প্রেসিডেন্টকে কী করতে হবে তা বলা তার কাজ নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের পরিণতিসহ বিভিন্ন বিকল্প উপস্থাপন করাই তার কাজ।
কেইন যেকোনো ইস্যুতেই আলোচনায় বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, ‘এবং তারপর কী?’ তবে ট্রাম্পকে কেবলই সেটিই শুনতে দেখা যেত যা তিনি শুনতে চাইতেন।
জেনারেল কেইন তার আগের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক এ মিলির তুলনায় সব দিক দিয়েই ভিন্ন ছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় মিলি তার সঙ্গে তীব্র বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টকে বিপজ্জনক বা বেপরোয়া পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখাকেই নিজের ভূমিকা হিসেবে দেখতেন তিনি।
ট্রাম্প ও কেইনের আলাপচারিতার সঙ্গে পরিচিত একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, জেনারেল কেইনের কৌশলগত পরামর্শকে রণনৈতিক উপদেশের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার একটি অভ্যাস ছিল ট্রাম্পের। বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়াত— জেনারেল এক নিঃশ্বাসে অভিযানের একটি দিকের অসুবিধা সম্পর্কে সতর্ক করতেন, পরের নিঃশ্বাসেই উল্লেখ করতেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সস্তা, নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী বোমার কার্যত অফুরন্ত ভাণ্ডার রয়েছে এবং একবার আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারলে তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর হামলা চালাতে পারবে।
চেয়ারম্যানের কাছে এগুলো ছিল পৃথক পর্যবেক্ষণ। কিন্তু ট্রাম্প সম্ভবত ভাবতেন যে দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে বাতিল করে দেয়। আলোচনার কোনো পর্যায়েই চেয়ারম্যান সরাসরি প্রেসিডেন্টকে বলেননি যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ একটি ভয়াবহ পরিকল্পনা, যদিও জেনারেল কেইনের কিছু সহকর্মী বিশ্বাস করতেন যে তিনি ঠিক এটাই ভাবতেন।
প্রেসিডেন্টের অনেক উপদেষ্টার কাছে নেতানিয়াহু অবিশ্বস্ত হলেও পরিস্থিতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের মতামতের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল, যা ট্রাম্প দলের বা বৃহত্তর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের হস্তক্ষেপবিরোধীরা স্বীকার করতে চাইতেন না। বহু বছর ধরেই এটি সত্য ছিল।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প যতগুলো পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, তার মধ্যে ইরান স্বতন্ত্র। তিনি একে এক অনন্য বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। দেশটির যুদ্ধ করার বা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত ছিলেন। তার ওপর নেতানিয়াহুর প্রস্তাবটি ইরানের ধর্মতন্ত্রের অবসান ইস্যুতে ট্রাম্পের ইচ্ছার সঙ্গে মিলে যায়।

১৯৭৯ সালে ওই ধর্মতন্ত্র যখন ইরানের ক্ষমতায় আসীন হয়, ট্রাম্পের বয়স তখন ৩২। তখন থেকেই এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কাঁটা হয়ে ছিল। ৪৭ বছর পর ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন যে তিনিই হতে পারেন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে সক্ষম।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে এসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার ওপর ট্রাম্পের আস্থা আরও বেড়ে যায়। এ বছরেরই ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তার আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করার জন্য চালানো চোখধাঁধানো কমান্ডো অভিযানটি তাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। এ অভিযানে কোনো আমেরিকান সেনার প্রাণহানি ঘটেনি, যা ট্রাম্পের কাছে মনে হয়েছে মার্কিন বাহিনীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাক্রমের আরও একটি প্রমাণ।
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে হেগসেথ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন। রুবিও সহকর্মীদের কাছে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি এ বিষয়ে অনেক বেশি দ্বিধান্বিত। তিনি বিশ্বাস করতেন না যে ইরানিরা আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে রাজি হবে। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার পরিবর্তে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের অভিযান চালিয়ে যাওয়াই ছিল তার পছন্দ।
নিজে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের পক্ষে না থাকলেও ট্রাম্পকে এ অভিযান থেকে বিরত করার চেষ্টা করেননি রুবিও। বরং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
বিদেশে একটি নতুন সংঘাতের পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে সুসি ওয়াইলসের উদ্বেগ ছিল। কিন্তু তিনি বড় সভাগুলোতে সামরিক বিষয়ে কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করতেন না। বরং তিনি উপদেষ্টাদের সেই সব পরিবেশে প্রেসিডেন্টের কাছে তাদের মতামত ও উদ্বেগ প্রকাশ করতে উৎসাহিত করতেন।
ওয়াইলস অন্যান্য অনেক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করলেও ট্রাম্প ও জেনারেলদের সঙ্গে কক্ষে তিনি নিজেকে আড়ালে রাখতেন। তার ঘনিষ্ঠরা বলেছেন, সামরিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে অন্যদের সামনে রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করাকে তিনি তার দায়িত্ব বলে মনে করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, জেনারেল কেইন, র্যাটক্লিফ ও রুবিওর মতো উপদেষ্টাদের বিশেষজ্ঞ মতামত ট্রাম্পের শোনা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবু ওয়াইলস সহকর্মীদের বলেছিলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। ইরানের ওপর হামলার ফলে গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া হবে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ঘটতে পারত। এ নির্বাচনই নির্ধারণ করতে পারত যে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর সাফল্যের বছর হবে, নাকি হাউজ ডেমোক্র্যাটদের সমন জারির বছর হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওয়াইলস এই অভিযানের পক্ষে ছিলেন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন আর কেউ ছিলেন না বা এটি ঠেকানোর জন্য তার চেয়ে বেশি চেষ্টাও কেউ করেননি। ভ্যান্স ঠিক সে ধরনের সামরিক দুঃসাহসিকতার বিরোধিতা করেই তার রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছিলেন, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনাধীন ছিল। তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ‘সম্পদের বিশাল অপচয়’ ও ‘অত্যন্ত ব্যয়বহুল’ বলে উল্লেখ করেন।
তবে সব ক্ষেত্রে আবার শান্তিবাদী ছিলেন না ভ্যান্স। জানুয়ারিতে যখন ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে সতর্ক করে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন, তখন ভ্যান্স ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টকে তার চূড়ান্ত সীমা কার্যকর করতে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন একটি সীমিত, শাস্তিমূলক হামলা, যা বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিবাদে ২০১৭ সালে সিরিয়ার ওপর ট্রাম্পের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মডেলের কাছাকাছি ছিল।
ভাইস প্রেসিডেন্ট মনে করতেন, ইরানের সঙ্গে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ একটি বিপর্যয় হবে। তার পছন্দ ছিল কোনো হামলা না হওয়া। কিন্তু ট্রাম্প কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারেন জেনে তিনি আরও সীমিত পদক্ষেপের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছিলেন। একপর্যায়ে এটি নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল যে ট্রাম্প বড় আকারের অভিযান চালাতেই বদ্ধপরিকর। ওই সময় ভ্যান্স যুক্তি দিয়েছিলেন, দ্রুত নিজের উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের আশায় তার বিপুল শক্তি প্রয়োগ করা উচিত।
সহকর্মীদের সামনেই ট্রাম্পকে সতর্ক করেন ভ্যান্স। বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা ও অগণিত হতাহতের কারণ হতে পারে। এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটকেও ভেঙে দিতে পারে এবং নতুন কোনো যুদ্ধ হবে না— এই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী বহু ভোটারের কাছে এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভ্যান্স আরও কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি আমেরিকার অস্ত্রশস্ত্র সমস্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। টিকে থাকার প্রবল ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন একটি শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আগামী কয়েক বছরের জন্য সংঘাত মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বেশি খারাপ অবস্থানে ফেলতে পারে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট তার সহযোগীদের বলেন, যখন শাসনের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে, তখন প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কী করবে তা কোনো সামরিক জ্ঞান দিয়েই সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়। একটি যুদ্ধ সহজেই অপ্রত্যাশিত দিকে মোড় নিতে পারে। তিনি আরও মনে করতেন, যুদ্ধের পর একটি শান্তিপূর্ণ ইরান গড়ে তোলার সম্ভাবনা খুব কম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ৪০ দিন পর ৮ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা ও ইরানের সম্মতির ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ইরানে। এ যুদ্ধে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ইরান সরকার ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশকে হারিয়েছে ইরান। দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন আলি খামেনিরই ছেলে মুজতবা খামেনি।
কিন্তু এ যুদ্ধের সূচনা হলো কীভাবে? ইসরায়েল যে যুদ্ধ বহুদিন ধরে ইরানের সঙ্গে করতে চাইছে, কীভাবে সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেললেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? ইরানে হামলার সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে চূড়ান্ত হলো?
ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে পরবর্তী দিনগুলোতে হোয়াইট হাউজে দফায় দফায় বৈঠক করে ট্রাম্প যেভাবে এ যুদ্ধের দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা বিস্তারিত উঠে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এসব বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, কে কী বলেছেন, ট্রাম্প কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন— এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সব তথ্যই। রাজনীতি ডটকমের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।

১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার ঠিক আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বহনকারী কালো এসইউভি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল) পৌঁছায় হোয়াইট হাউজে। সাংবাদিকদের দৃষ্টি এড়িয়ে প্রায় অনাড়ম্বরভাবে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্তের জন্য তখন প্রস্তুত নেতানিয়াহু, যিনি কয়েক মাস ধরেই ইরানের ওপর একটি বড় ধরনের হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রথমে ওভাল অফিসসংলগ্ন কেবিনেট রুমে জড়ো হন। এরপর নেতানিয়াহু মূল অনুষ্ঠানের জন্য নিচে হোয়াইট হাউজের ‘সিচুয়েশন রুমে’ যান, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দলের জন্য ইরান বিষয়ে একটি অত্যন্ত গোপনীয় ফাইল উপস্থাপনা করা হচ্ছিল। ওই কক্ষটি বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের জন্য খুব কমই ব্যবহৃত হতো।
সেখানে ট্রাম্প বসলেন, কিন্তু মেহগনি কাঠের কনফারেন্স টেবিলের প্রধান প্রান্তে তার স্বাভাবিক অবস্থানে নয়। এর বদলে বসলেন একপাশে, দেয়াল বরাবর লাগানো বড় স্ক্রিনগুলোর দিকে মুখ করে। নেতানিয়াহু বসলেন অন্য পাশে, প্রেসিডেন্টের ঠিক বিপরীতে।
নেতানিয়াহুর পেছনে ছিলেন ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিচালক ডেভিড বারনিয়া ও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা। নেতানিয়াহুর পেছনে দৃশ্যত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তারা এমন এক যুদ্ধকালীন নেতার চিত্র তৈরি করেছিলেন, যিনি তার দলবল দ্বারা পরিবেষ্টিত।
টেবিলের একেবারে শেষ প্রান্তে বসেছিলেন হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বসেছিলেন তার নিয়মিত আসনে, যিনি একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করছিলেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাধারণত এ ধরনের অনুষ্ঠানে একসঙ্গে বসেন, তারা ছিলেন একপাশে, সঙ্গে ছিলেন সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্বে থাকা ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও ছিলেন সেখানে, যা মূল দলটিকে পূর্ণতা দেয়।
তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি এড়াতে গোপনীয় সে বৈঠকে উপস্থিতির আকার ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট রাখা হয়েছিল। মন্ত্রিসভার অন্য শীর্ষ সদস্যরা এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না, অনুপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও, যিনি আজারবাইজানে ছিলেন এবং বৈঠকটি এত অল্প সময়ের নোটিশে নির্ধারিত হয়েছিল যে তিনি সময়মতো ফিরতে পারেননি।
সেখানে পরবর্তী এক ঘণ্টায় নেতানিয়াহুর যে উপস্থাপনাটি করেন, তা বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলের (মধ্যপ্রাচ্য) কেন্দ্রস্থলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একটি বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের পথে চালিত করার পরিকল্পনা। পরবর্তী দিন ও সপ্তাহগুলোতে হোয়াইট হাউজে সে পরিকল্পনা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা হয়। সেই আলোচনাগুলোতে ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়ার আগে তার বিকল্প ও ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করতে থাকেন।
ট্রাম্প কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, তার এই বিবরণটি ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’ শীর্ষক একটি বইয়ের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যে বইটি শিগগিরই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউজের অভ্যন্তরের বিভিন্ন সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে যেসব সাক্ষাৎকার ও তথ্য দিয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরের আলোচনাগুলো কীভাবে ট্রাম্পের সহজাত প্রবৃত্তি, তার ঘনিষ্ঠ মহলের ফাটল ও হোয়াইট হাউজ পরিচালনার পদ্ধতিকে তুলে ধরে, সেগুলো সবিস্তারে উঠে এসেছে এতে।
এই প্রতিবেদনটি তুলে ধরে, কীভাবে ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ চিন্তাভাবনা বহু মাস ধরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে গিয়েছিল, যা এমনকি ট্রাম্পের কিছু প্রধান উপদেষ্টাও উপলব্ধি করতে পারেননি। দুটি প্রশাসন জুড়েই তাদের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে এবং মাঝে কিছুটা উত্তেজনা গেলেও এই গতিশীলতা আমেরিকার রাজনীতির বাম ও ডান উভয় দিকেই তীব্র সমালোচনা ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
হোয়াইট হাউজে সরাসরি একটি যুদ্ধের সবচেয়ে বিরোধী হিসেবে পরিচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। প্রতিবেদনটি বলছে, তিনি ছাড়া শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার এমনকি সবচেয়ে সংশয়ী সদস্যরাও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সহজাত যুদ্ধ প্রবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করেন। যুদ্ধটি দ্রুত ও চূড়ান্ত হবে বলে বিশ্বাস ছড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
১১ ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিল ‘সিচুয়েশন রুমে’
১১ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু জোরালোভাবে দাবি তোলেন, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় এসেছে। তিনি এমন বিশ্বাস প্রকাশ করেন, একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি মিশনই ইরানের ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটাতে যথেষ্ট।
একপর্যায়ে ইসরায়েলিরা ট্রাম্পকে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখান। ভিডিওতে ইরানের এমন সম্ভাব্য নতুন নেতাদের একটি তালিকা ছিল, যারা কট্টরপন্থি সরকারের পতন হলে দেশের দায়িত্ব নিতে পারেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইরানের শেষ শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভী, যিনি এখন বসবাস করেন ওয়াশিংটনে। নিজেকে ভিন্নমতাবলম্বী, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে আসছেন তিনি, যিনি ইরানকে একটি ধর্মতন্ত্র-পরবর্তী সরকারের দিকে পরিচালিত করতে পারবেন বলে দাবি করা হয়।
নেতানিয়াহু ও তার সঙ্গীরা সেখানে এমন কিছু চিত্র তুলে ধরেন, যেগুলোকে তারা প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের ইঙ্গিতবাহী হিসেবে চিত্রিত করেন। এর মধ্যে ছিল—
এ ছাড়াও মোসাদের গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, ইরানের রাজপথে ফের বিক্ষোভ শুরু হবে। এর জের ধরে ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থার প্ররোচনায় দাঙ্গা ও বিদ্রোহ উসকে দেওয়ায় একটি তীব্র বোমা হামলা শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ইসরায়েলিরা এই সম্ভাবনাও উত্থাপন করেছিল, ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা ইরাক থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে উত্তর-পশ্চিমে একটি স্থলযুদ্ধ শুরু করতে পারে, যা শাসকগোষ্ঠীর বাহিনীকে আরও বিভক্ত করে এর পতনকে ত্বরান্বিত করবে।
নেতানিয়াহু আত্মবিশ্বাসী ও একঘেয়ে সুরে তার উপস্থাপনাটি পেশ করেন। মনে হচ্ছিল, কক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে এটি বেশ ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে। ট্রাম্প তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘আমার কাছে তো ভালোই লাগছে।’ নেতানিয়াহুর কাছে তার এ মন্তব্য ছিল ইরানে একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানের জন্য সম্ভাব্য সবুজ সংকেত।
বৈঠক শেষে শুধু নেতানিয়াহুই নন, আরও অনেকেই এ ধারণা নিয়ে বেরিয়েছিলেন যে ট্রাম্প মনস্থির করে ফেলেছেন। ট্রাম্পের উপদেষ্টারা দেখতে পাচ্ছিলেন, নেতানিয়াহুর সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতার সম্ভাবনায় তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছেন। জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের আগেও যখন এই দুই নেতা সাক্ষাৎ করেন, তখনো ট্রাম্প এভাবেই নেতানিয়াহুর বক্তব্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
এর আগে ১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউজ সফরে নেতানিয়াহু কেবিনেট কক্ষে সমবেত আমেরিকানদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেন ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকটের দিকে। ওই সময় কক্ষে উপস্থিত অন্যরা অভিযানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন।
জবাবে নেতানিয়াহু ঝুঁকির কথা স্বীকার করলেও বলেন, পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকির চেয়ে নিষ্ক্রিয় থাকার ঝুঁকিই বেশি বলে তিনি মনে করেন। যুক্তি দেন, তারা হামলা চালাতে দেরি করলে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করা ও পারমাণবিক কর্মসূচির চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরির জন্য আরও সময় দেওয়ার শামিল হবে।
কক্ষে উপস্থিত সবাই বুঝতে পেরেছিলেন, এ অঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর তৈরি ও সরবরাহ করতে পারে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে ও অনেক দ্রুততার সঙ্গে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে।
নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাগুলো এবং সেগুলোর প্রতি ট্রাম্পের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের জন্য একটি জরুরি কাজ তৈরি করে। রাতারাতি বিশ্লেষকরা ইসরায়েলি দলটি ট্রাম্পকে যা বলেছিল, তার সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করার জন্য কাজ করেন।
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ফলাফল পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে কেবল মার্কিন কর্মকর্তাদের নিয়ে আরেকটি বৈঠক হয়। সেখানে ট্রাম্প উপস্থিত হওয়ার আগে দুজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা তার ঘনিষ্ঠ মহলকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন।
বকিছুর ঊর্ধ্বে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি ছিল হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী এই সংকীর্ণ জলপথটি যদি রুদ্ধ হয়ে যেত, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর অভ্যন্তরীণ পরিণতি মারাত্মক হতো, যার শুরুটা হতো পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে।
ডানপন্থিদের সংশয়বাদী হিসেবে পরিচিত ভাষ্যকার টাকার কার্লসন গত এক বছরে বেশ কয়েকবার ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তার প্রেসিডেন্ট পদকে ধ্বংস করে দেবে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে কার্লসনের সঙ্গে কথা হয় ট্রাম্পের। ওই সময় ট্রাম্প আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন কার্লসনকে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানি আপনি এটি নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’ কার্লসন জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কীভাবে এটি জানেন। ট্রাম্প উত্তর দেন, ‘কারণ সবসময়ই তাই হয়।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিনগুলোতে আমেরিকান ও ইসরায়েলিরা একটি নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করে। ওই তথ্যে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দিনের আলোতে খোলা আকাশের নিচে বিমান হামলার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত একটি স্থানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করছিলেন। তারা একে ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানার এক ক্ষণস্থায়ী সুযোগ হিসেবে দেখে। তাদের মূল্যায়ন ছিল, এটি এমন এক লক্ষ্যবস্তু যা হয়তো আর কখনো আসবে না।
ইরানকে দীর্ঘ দিন ধরেই চাপ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। মূল লক্ষ্য, ইরানকে এমন একটি চুক্তিতে নিয়ে আসা, যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ রুদ্ধ করবে। এই কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য অতিরিক্ত সময়ও দিয়েছিল।
ট্রাম্পের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে কয়েক সপ্তাহ আগেই ইরানে হামলার বিষয়ে মনস্থির করেছিলেন। তবে সে হামলা ঠিক কখন হবে, সে বিষয়ে তখনো তিনি সিদ্ধান্ত নেননি। এ অবস্থায় ট্রাম্পকে দ্রুতই পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানান নেতানিয়াহু।
সেই একই সপ্তাহ সময়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সবশেষ আলোচনার পর জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ জেনেভা থেকে ফোন করেন। ওই সময় ওমান ও সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তিন দফা আলোচনা হয়। কুশনার ও উইটকফ সে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো চুক্তিতে আসার সদিচ্ছা ইরানের রয়েছে কি না, সেটিই মূলত যাচাই করছিলেন তারা।
আলোচনার একপর্যায়ে কুশনার ও উইটকফ ইরানিদের তাদের কর্মসূচির পুরো সময়কালের জন্য বিনামূল্যে পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা নিয়ে ইরানের যে কট্টর অবস্থান, তা বেসামরিক জ্বালানির জন্য নাকি বোমা তৈরির সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য, সেটিই পরীক্ষা করছিলেন দুই মার্কিন প্রতিনিধি। ইরানিরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। একে তাদের মর্যাদার ওপর আঘাত বলে অভিহিত করে।
কুশনার ও উইটকফ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তারা বলেন, তারা সম্ভবত কোনো একটি বিষয়ে আলোচনা করতে পারবেন, কিন্তু তাতে কয়েক মাস সময় লাগবে। তারপরও তারা ‘ইরান সমস্যা’র সমাধান করতে পারবেন কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। কারণ ইরানিরা ছলচাতুরী করছিল বলে জানান তারা।
২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টার দিকে সিচুয়েশন রুমে শুরু হয় একটি চূড়ান্ত বৈঠক। এর আগে দফায় দফায় যেসব বৈঠক হয়েছে, সেগুলোতে সবকিছু নিয়েই সবিস্তার আলোচনা হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত বৈঠকের আগেই সিচুয়েশন রুমে উপস্থিত সবার অবস্থান স্পষ্ট, যা প্রত্যেকেই জানতেন।
বৈঠক চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। ট্রাম্প যথারীতি বসেন টেবিলের প্রধান আসনে। তার ডান দিকে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, তার পাশে একে একে ছিলেন সুসি ওয়াইলস, জন র্যাটক্লিফ, হোয়াইট হাউজের কাউন্সেল ডেভিড ওয়ারিংটন ও যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং।
এদিকে চেউংয়ের বিপরীতে ছিলেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট; তার ডান দিকে ছিলেন জেনারেল কেইন, তারপর হেগসেথ ও রুবিও।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনাকে এতটাই সীমিত রাখা হয়েছিল যে ট্রেজারির দায়িত্বে থাকা স্কট বেসেন্ট ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটকে পর্যন্ত সে বৈঠকে রাখা হয়নি। অথচ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ হলে বৈশ্বিক তেল বাজার যদি অস্থির হয়ে ওঠে তা সামলানোর দায়িত্ব পড়বে এই দুজনের ওপর। শুধু তাই নয়, মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল সে বৈঠক থেকে।
বৈঠক শুরুর পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, আমাদের কাছে কী আছে?’ হেগসেথ ও কেইন হামলাগুলোর ক্রমবিন্যাস তুলে ধরেন। এরপর ট্রাম্প বলেন, তিনি একে একে সবার মতামত শুনতে চান।
ইরানে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে শুরু থেকেই দ্বিমত করে আসছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি জানেন, আমি মনে করি এটি একটি বাজে পরিকল্পনা। কিন্তু আপনি যদি এটি করতে চান, আমি আপনাকে সমর্থন করব।’
সুসি ওয়াইলস বলেন, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ট্রাম্প যদি মনে করেন যে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, তবে তার তা করা উচিত।
যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হওয়া নিয়ে বৈঠকে কোনো মতামত দেননি র্যাটক্লিফ। তবে তিনি তেহরানে আলি খামেনির কম্পাউন্ডে ইরানি নেতৃত্বের এক হওয়ার চাঞ্চল্যকর নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন। সিআইএ পরিচালক বলেন, এই শব্দটির সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব। তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনায় যদি আমরা শুধু সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা বোঝাই, তবে আমরা সম্ভবত তা করতে পারব।’
প্রশ্ন করা হলে হোয়াইট হাউজের আইনজীবী ওয়ারিংটন বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা যেভাবে পরিকল্পনাটি তৈরি করেছেন এবং প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করেছেন, সে অনুযায়ী এটি একটি আইনত অনুমোদিত বিকল্প। তিনি কোনো ব্যক্তিগত মতামত দেননি।
ট্রাম্প মতামত দেওয়ার জন্য চাপ দিলে ওয়ারিংটন বলেন, একজন মেরিন সেনা হিসেবে তিনি বহু বছর আগে ইরানের হাতে নিহত এক মার্কিন সেনাসদস্যকে চিনতেন। এ বিষয়টি অত্যন্ত ব্যক্তিগত ছিল। তিনি ট্রাম্পকে বলেন, ইসরায়েল যদি তা সত্ত্বেও এগিয়ে যেতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রেরও তাই করা উচিত।
চেউং সম্ভাব্য জনপ্রতিক্রিয়ার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এবারের নির্বাচনি ক্যাম্পেইনের কেন্দ্রে রেখেছিলেন যুদ্ধের বিরোধিতাকে। জনগণ তাকে বিদেশে যুদ্ধ করার জন্য ভোট দেয়নি। তার ওপর গত জুনে ইরানে বোমা হামলার পর প্রশাসন যা বলেছিল, এখনকার পরিকল্পনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আট মাস ধরে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে বলে যে দাবি মার্কিন প্রশাসন করে আসছিল, তার ব্যাখ্যা তারা কীভাবে দেবে— এমন প্রশ্ন রাখেন চেউং। তবে তিনিও ব্যক্তিগত মতামত তুলে না ধরে বলেন, ট্রাম্প যে সিদ্ধান্তই নেবেন, সেটিই সঠিক হবে।
একই কথা বলেন প্রেস উইংয়ের লেভিট। তার ভাষ্য, এ সিদ্ধান্ত একান্তই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। তিনি তার মতো করে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, প্রেস টিম সে সিদ্ধান্তকেই যথাসাধ্য সামাল দেবে।
হেগসেথ অবশ্য অন্যদের মতো ব্যক্তিগত মতামত দিতে কার্পণ্য করেননি। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানিদের মোকাবিলা করতেই হবে। আর সেটি করতে হলে এখনই করা ভালো। প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সৈন্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ অভিযান চালানো সম্ভব।
জেনারেল কেইন বৈঠকে অনেকটাই রক্ষণাত্মক অবস্থান নিয়েছিলেন। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে এর ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেন তিনি। সেখানে অভিযান চালাতে হলে অস্ত্রশস্ত্র কমানোর ক্ষেত্রে কী অর্থ বহন করবে, তাও ব্যাখ্যা করেন। কেইন কোনো মতামত না দিয়ে বলেন, তার অবস্থান ছিল যে যদি ট্রাম্প অভিযানের নির্দেশ দেন, তবে সামরিক বাহিনী তা কার্যকর করবে।
এরপর কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি আরও স্পষ্ট করে ট্রাম্পকে বলেন, যদি আমাদের লক্ষ্য হয় ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা অভ্যুত্থান, তবে আমাদের তা করা উচিত নয়। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, তবে সেই লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পারি।
সবাই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সহজাত যুদ্ধবাজ প্রবৃত্তিকে মেনে নেন। তারা তাকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে, অকল্পনীয় ঝুঁকি নিতে এবং কোনো না কোনোভাবে সফল হতে দেখেছেন। আর কেউ তাঁকে বাধা দেওয়ার মতো নেই।
এ পর্যায়ে উপস্থিতি সবার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের এটা করা দরকার। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে এবং এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে ইরান যেন ইসরায়েল বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে না পারে।
জেনারেল কেইন বললেন, তার হাতে কিছুটা সময় আছে। পরদিন বিকেল ৪টার আগে তাকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
পরদিন বিকেলে ট্রাম্প যখন এয়ার ফোর্স ওয়ানে, তখনই ইরানে হামলার নির্দেশ দেন তিনি। জেনারেল কেইন প্রেসিডেন্টের নির্দেশের জন্য যে সময়সীমা দিয়েছিলেন, ট্রাম্পের আদেশটি পাঠানো হয় সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ২২ মিনিট আগে। ট্রাম্পের সে আদেশে বলা হয়, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদিত। কোনোভাবেই বাতিল করা চলবে না। শুভকামনা।’
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বিষয়ে গভীর জ্ঞান ছিল এবং তারা ইরানের ব্যবস্থা ও এর কুশীলবদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতেন। তারা নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাটিকে চারটি অংশে বিভক্ত করেছিলেন। প্রথমটি ছিল ‘শিরশ্ছেদ’— আলি খামেনিকে হত্যা করা। দ্বিতীয়টি ছিল শক্তি প্রদর্শন ও প্রতিবেশীদের হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেওয়া। তৃতীয়টি ছিল ইরানের অভ্যন্তরে একটি গণঅভ্যুত্থান। আর চতুর্থটি ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, যেখানে দেশ শাসনের জন্য একজন ধর্মনিরপেক্ষ নেতাকে নিযুক্ত করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করেছিলেন, প্রথম দুটি উদ্দেশ্য আমেরিকান গোয়েন্দা ও সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জনযোগ্য। তবে নেতানিয়াহুর প্রস্তাবের তৃতীয় ও চতুর্থ অংশ, যার মধ্যে এমনকি কুর্দিদের দ্বারা ইরানে স্থল আক্রমণের সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই জানান মার্কিন কর্মকর্তারা।
ট্রাম্প যখন বৈঠকে যোগ দেন, র্যাটক্লিফ তাকে এই মূল্যায়ন সম্পর্কে অবহিত করেন। সিআইএ পরিচালক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাব্য দৃশ্যপট বর্ণনা করতে একটি শব্দ ব্যবহার করেন— ‘হাস্যকর’।
সেই মুহূর্তে মার্কো রুবিও তাকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘এটি বাজে কথা।’
র্যাটক্লিফ আরও যোগ করেন, যেকোনো সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহের অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রাখলে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু একে একটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আজারবাইজান থেকে সদ্য ফেরা ভ্যান্সসহ আরও বেশ কয়েকজন এ সময় কথা বলতে শুরু করেন। ভ্যান্সও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এরপর জেনারেল কেইনের দিকে ফিরে ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করেন, ‘জেনারেল, আপনি কী মনে করেন?’
জেনারেল কেইন জবাব দেন, ‘স্যার, আমার অভিজ্ঞতায় ইসরায়েলিদের জন্য এটিই স্বাভাবিক। তারা বাড়িয়ে বলে এবং তাদের পরিকল্পনা সবসময় সুগঠিত হয় না। তারা জানে যে আমাদের তাদের প্রয়োজন এবং সে কারণেই তারা বোজানোর জন্য জোর করছে।’
ট্রাম্প দ্রুতই কেইনের মূল্যায়নটি বিবেচনা করলেন। তিনি বললেন, ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হবে তাদের সমস্যা।’ তবে এটি তিনি ইসরায়েলিদের নাকি ইরানি জনগণের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সেটি স্পষ্ট ছিল না। নেতানিয়াহু ইরানের ওপর হামলার যে ক্ষেত্রে যে চারটি বিষয় উল্লেখ করেছিলেন, তার মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থটি অর্জনযোগ্য কি না, তার ওপর যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে না বলেই জানান ট্রাম্প।
বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্পকে মূলত ওই পরিকল্পনার প্রথম দুটি বিষয়— আলি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা এবং ইরানের সামরিক বাহিনীকে ভেঙে দেওয়া— অর্জনের দিকেই বেশি আগ্রহী দেখা যায়।
জেনারেল কেইনকে ট্রাম্প ‘রেজিন কেইন’ বলে উল্লেখ করতে পছন্দ করতেন। কয়েক বছর আগে তিনি ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেছিলেন এই বলে— অন্যদের ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুত ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) পরাজিত করা সম্ভব। ওই সময় কেইন যে আস্থা অর্জন করেন তারই পুরস্কার হিসেবে বিমান বাহিনীর ফাইটার পাইলট হিসেবে কাজ করা এই জেনারেলকে শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা পদে উন্নীত করেন ট্রাম্প।
জেনারেল কেইন কোনো রাজনৈতিক অনুগত ব্যক্তি ছিলেন না। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে তার গুরুতর উদ্বেগও ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্টের কাছে নিজের মতামত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। ইরান হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত উপদেষ্টাদের ছোট দলটি যখন পরবর্তী দিনগুলোতে আলোচনা চালাচ্ছিল, তখন জেনারেল কেইন উদ্বেগজনক এক সামরিক মূল্যায়ন তুলে ধরেন ট্রাম্পসহ সবার কাছে।
কেইন ওই মূল্যায়নে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের অভিযান মার্কিন অস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকও, যেগুলোর সরবরাহ ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে বছরের পর বছর ধরে সমর্থন দেওয়ার পর এমনিতেই চাপের মধ্যে ছিল। জেনারেল কেইন এ মজুতগুলো দ্রুত পূরণ করার কোনো স্পষ্ট পথ দেখতে পাননি।
হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করতে গেলে তাতে যেসব ব্যাপক অসুবিধা তৈরি হবে সেগুলো তুলে ধরেন কেইন। ইরানের দ্বারা যে ওই প্রণালি অবরোধের ঝুঁকিতে থাকবে, তুলে ধরেন সে কথাও। ট্রাম্প এ সম্ভাবনা এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে নাকচ করে দিয়েছিলেন যে পরিস্থিতি অত দূর গড়ানোর আগেই ইরানের শাসকগোষ্ঠী আত্মসমর্পণ করবে।
ট্রাম্পের ধারণা ছিল, খুব দ্রুতই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। বিশেষ করে জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বোমাবর্ষণের বিপরীতে ইরানের দুর্বল প্রতিক্রিয়ার কারণেই তার মধ্যে এ ধারণা আরও দৃঢ় হয়।
যুদ্ধের প্রাক্কালে জেনারেল কেইনের ভূমিকা সামরিক পরামর্শক ও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যেকার একটি চিরায়ত টানাপোড়েনকে তুলে ধরের। চেয়ারম্যান কোনো পক্ষ না নেওয়ার ব্যাপারে এতটাই অনড় ছিলেন যে তিনি বারবার বলতেন, প্রেসিডেন্টকে কী করতে হবে তা বলা তার কাজ নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের পরিণতিসহ বিভিন্ন বিকল্প উপস্থাপন করাই তার কাজ।
কেইন যেকোনো ইস্যুতেই আলোচনায় বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, ‘এবং তারপর কী?’ তবে ট্রাম্পকে কেবলই সেটিই শুনতে দেখা যেত যা তিনি শুনতে চাইতেন।
জেনারেল কেইন তার আগের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক এ মিলির তুলনায় সব দিক দিয়েই ভিন্ন ছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় মিলি তার সঙ্গে তীব্র বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টকে বিপজ্জনক বা বেপরোয়া পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখাকেই নিজের ভূমিকা হিসেবে দেখতেন তিনি।
ট্রাম্প ও কেইনের আলাপচারিতার সঙ্গে পরিচিত একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, জেনারেল কেইনের কৌশলগত পরামর্শকে রণনৈতিক উপদেশের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার একটি অভ্যাস ছিল ট্রাম্পের। বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়াত— জেনারেল এক নিঃশ্বাসে অভিযানের একটি দিকের অসুবিধা সম্পর্কে সতর্ক করতেন, পরের নিঃশ্বাসেই উল্লেখ করতেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সস্তা, নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী বোমার কার্যত অফুরন্ত ভাণ্ডার রয়েছে এবং একবার আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারলে তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর হামলা চালাতে পারবে।
চেয়ারম্যানের কাছে এগুলো ছিল পৃথক পর্যবেক্ষণ। কিন্তু ট্রাম্প সম্ভবত ভাবতেন যে দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে বাতিল করে দেয়। আলোচনার কোনো পর্যায়েই চেয়ারম্যান সরাসরি প্রেসিডেন্টকে বলেননি যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ একটি ভয়াবহ পরিকল্পনা, যদিও জেনারেল কেইনের কিছু সহকর্মী বিশ্বাস করতেন যে তিনি ঠিক এটাই ভাবতেন।
প্রেসিডেন্টের অনেক উপদেষ্টার কাছে নেতানিয়াহু অবিশ্বস্ত হলেও পরিস্থিতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের মতামতের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল, যা ট্রাম্প দলের বা বৃহত্তর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের হস্তক্ষেপবিরোধীরা স্বীকার করতে চাইতেন না। বহু বছর ধরেই এটি সত্য ছিল।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প যতগুলো পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, তার মধ্যে ইরান স্বতন্ত্র। তিনি একে এক অনন্য বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। দেশটির যুদ্ধ করার বা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত ছিলেন। তার ওপর নেতানিয়াহুর প্রস্তাবটি ইরানের ধর্মতন্ত্রের অবসান ইস্যুতে ট্রাম্পের ইচ্ছার সঙ্গে মিলে যায়।

১৯৭৯ সালে ওই ধর্মতন্ত্র যখন ইরানের ক্ষমতায় আসীন হয়, ট্রাম্পের বয়স তখন ৩২। তখন থেকেই এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কাঁটা হয়ে ছিল। ৪৭ বছর পর ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন যে তিনিই হতে পারেন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে সক্ষম।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে এসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার ওপর ট্রাম্পের আস্থা আরও বেড়ে যায়। এ বছরেরই ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তার আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করার জন্য চালানো চোখধাঁধানো কমান্ডো অভিযানটি তাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। এ অভিযানে কোনো আমেরিকান সেনার প্রাণহানি ঘটেনি, যা ট্রাম্পের কাছে মনে হয়েছে মার্কিন বাহিনীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাক্রমের আরও একটি প্রমাণ।
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে হেগসেথ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন। রুবিও সহকর্মীদের কাছে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি এ বিষয়ে অনেক বেশি দ্বিধান্বিত। তিনি বিশ্বাস করতেন না যে ইরানিরা আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে রাজি হবে। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার পরিবর্তে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের অভিযান চালিয়ে যাওয়াই ছিল তার পছন্দ।
নিজে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের পক্ষে না থাকলেও ট্রাম্পকে এ অভিযান থেকে বিরত করার চেষ্টা করেননি রুবিও। বরং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
বিদেশে একটি নতুন সংঘাতের পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে সুসি ওয়াইলসের উদ্বেগ ছিল। কিন্তু তিনি বড় সভাগুলোতে সামরিক বিষয়ে কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করতেন না। বরং তিনি উপদেষ্টাদের সেই সব পরিবেশে প্রেসিডেন্টের কাছে তাদের মতামত ও উদ্বেগ প্রকাশ করতে উৎসাহিত করতেন।
ওয়াইলস অন্যান্য অনেক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করলেও ট্রাম্প ও জেনারেলদের সঙ্গে কক্ষে তিনি নিজেকে আড়ালে রাখতেন। তার ঘনিষ্ঠরা বলেছেন, সামরিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে অন্যদের সামনে রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করাকে তিনি তার দায়িত্ব বলে মনে করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, জেনারেল কেইন, র্যাটক্লিফ ও রুবিওর মতো উপদেষ্টাদের বিশেষজ্ঞ মতামত ট্রাম্পের শোনা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবু ওয়াইলস সহকর্মীদের বলেছিলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। ইরানের ওপর হামলার ফলে গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া হবে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ঘটতে পারত। এ নির্বাচনই নির্ধারণ করতে পারত যে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর সাফল্যের বছর হবে, নাকি হাউজ ডেমোক্র্যাটদের সমন জারির বছর হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওয়াইলস এই অভিযানের পক্ষে ছিলেন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন আর কেউ ছিলেন না বা এটি ঠেকানোর জন্য তার চেয়ে বেশি চেষ্টাও কেউ করেননি। ভ্যান্স ঠিক সে ধরনের সামরিক দুঃসাহসিকতার বিরোধিতা করেই তার রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছিলেন, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনাধীন ছিল। তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ‘সম্পদের বিশাল অপচয়’ ও ‘অত্যন্ত ব্যয়বহুল’ বলে উল্লেখ করেন।
তবে সব ক্ষেত্রে আবার শান্তিবাদী ছিলেন না ভ্যান্স। জানুয়ারিতে যখন ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে সতর্ক করে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন, তখন ভ্যান্স ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টকে তার চূড়ান্ত সীমা কার্যকর করতে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন একটি সীমিত, শাস্তিমূলক হামলা, যা বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিবাদে ২০১৭ সালে সিরিয়ার ওপর ট্রাম্পের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মডেলের কাছাকাছি ছিল।
ভাইস প্রেসিডেন্ট মনে করতেন, ইরানের সঙ্গে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ একটি বিপর্যয় হবে। তার পছন্দ ছিল কোনো হামলা না হওয়া। কিন্তু ট্রাম্প কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারেন জেনে তিনি আরও সীমিত পদক্ষেপের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছিলেন। একপর্যায়ে এটি নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল যে ট্রাম্প বড় আকারের অভিযান চালাতেই বদ্ধপরিকর। ওই সময় ভ্যান্স যুক্তি দিয়েছিলেন, দ্রুত নিজের উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের আশায় তার বিপুল শক্তি প্রয়োগ করা উচিত।
সহকর্মীদের সামনেই ট্রাম্পকে সতর্ক করেন ভ্যান্স। বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা ও অগণিত হতাহতের কারণ হতে পারে। এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটকেও ভেঙে দিতে পারে এবং নতুন কোনো যুদ্ধ হবে না— এই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী বহু ভোটারের কাছে এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভ্যান্স আরও কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি আমেরিকার অস্ত্রশস্ত্র সমস্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। টিকে থাকার প্রবল ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন একটি শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আগামী কয়েক বছরের জন্য সংঘাত মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বেশি খারাপ অবস্থানে ফেলতে পারে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট তার সহযোগীদের বলেন, যখন শাসনের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে, তখন প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কী করবে তা কোনো সামরিক জ্ঞান দিয়েই সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়। একটি যুদ্ধ সহজেই অপ্রত্যাশিত দিকে মোড় নিতে পারে। তিনি আরও মনে করতেন, যুদ্ধের পর একটি শান্তিপূর্ণ ইরান গড়ে তোলার সম্ভাবনা খুব কম।

সমুদ্রতলে সম্ভাব্য মাইন এড়িয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালিতে নতুন ও বিকল্প নৌরুট ঘোষণা করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌ শাখা। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
১৩ ঘণ্টা আগে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরাইল সম্পূর্ণভাবে আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ বন্ধ করে দেয় এবং শুধু মসজিদের কর্মী এবং জেরুজালেম ইসলামিক ওয়াকফ-এর কর্মকর্তাদের নামাজ পড়ার অনুমতি দেয়। আর ফিলিস্তিনিদের শহরের ছোট ছোট মসজিদে নামাজ পড়তে বাধ্য করা হয়।
১৫ ঘণ্টা আগে
ন্যাটোর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ‘যখন আমাদের তাদের প্রয়োজন ছিল, তখন ন্যাটো পাশে ছিল না। আর ভবিষ্যতেও দরকার হলে তারা থাকবে না। গ্রিনল্যান্ডের কথা মনে রাখো—ওই বড়, খারাপভাবে পরিচালিত বরফের টুকরো।
১৫ ঘণ্টা আগে