ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা: দুর্বল চুক্তি, নাকি যুদ্ধ থেকে ‘মুক্তি’র কৌশল ট্রাম্পের?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাসের সংঘাতের পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু চুক্তিটি প্রকাশের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সমালোচকদের দাবি, এই সমঝোতায় অনেক বেশি ছাড় দিতে হলেও তার বিপরীতে ওয়াশিংটনের অর্জন খুব কম। অন্যদিকে ট্রাম্প বলছেন, দীর্ঘ যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত আসত। তাই সংঘাতের অবসানই ছিল সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

ফ্রান্সে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, তিনি কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাননি। যুদ্ধ চলতে থাকলে সেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও যিনি বলেছিলেন আলোচনায় বসার সময় তিনি আমেরিকানদের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা ভাবছেন না, এখন তিনিই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সমঝোতার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।

বাজারের সংকেতই কি সিদ্ধান্ত বদলেছে?

ট্রাম্প বরাবরই শেয়ারবাজারকে নিজের নীতির সফলতার অন্যতম সূচক হিসেবে তুলে ধরেছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি বলেন, যখনই ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন, তখনই শেয়ারবাজার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আবার আলোচনায় অচলাবস্থার খবর প্রকাশ পেলেই বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

ট্রাম্প এমনকি দাবি করেন, বাজারের মূল্যায়ন তার অধিকাংশ উপদেষ্টার চেয়েও বেশি নির্ভুল। নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অবশ্য যোগ করেন, ‘অবশ্য সেটি আমাকে বাদ দিলে।’

বিশ্লেষকদের মতে, এ মন্তব্য দেখায় যে ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বস্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

চাপের মুখে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ?

যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট একাধিকবার তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন এবং প্রয়োজনে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপের কথাও বলেন। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।

তেলের দাম বাড়তে শুরু করে, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হয়। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমতে থাকে। বিভিন্ন জরিপে তার অনুমোদনের হার ৩০ শতাংশের ঘরে নেমে আসে।

এ বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার একটি পথ হয়ে উঠেছে।

সমঝোতায় কী পেল ইরান?

সমালোচকদের সবচেয়ে বড় আপত্তি— অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের ওপর থেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। ফলে দেশটি আবারও বিপুল রাজস্ব আয় করার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সমালোচকদের মতে, এই ছাড়গুলো যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই দিয়ে ফেলেছে। ফলে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় ওয়াশিংটনের হাতে চাপ তৈরির কার্যকর উপায় অনেকটাই কমে গেছে।

এ কারণেই রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেও আপত্তি উঠেছে। কেউ কেউ এটিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের কঠোর পররাষ্ট্রনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত বলে মন্তব্য করেছেন। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও এই সমঝোতাকে ‘তুষ্টিকরণ’ নীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।

কৌশলগত ঝুঁকি কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলকে বৈধতা দিয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে তেহরান দেখিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চাপ তৈরি করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব। এতে শুধু বিশ্ব অর্থনীতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব পড়ে।

এখন যদি ইরান মনে করে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেই ওয়াশিংটন সমঝোতায় বাধ্য হবে, তাহলে ভবিষ্যতের আলোচনায় তেহরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ট্রাম্প অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, ইরান সমঝোতা ভঙ্গ করলে আবারও সামরিক হামলা চালানো হবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন— কয়েক সপ্তাহের ব্যাপক বিমান হামলাও যখন তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে নতি স্বীকার করাতে পারেনি, তখন ভবিষ্যতে একই হুমকি কতটা কার্যকর হবে?

বুধবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: সংগৃহীত
বুধবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: সংগৃহীত

নিজের অবস্থানও কি সীমাবদ্ধ করলেন ট্রাম্প?

সমঝোতা স্মারকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অন্যের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেবে না। পাশাপাশি একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকেও বিরত থাকবে। এর ফলে যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প যে ইরানি জনগণকে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই অবস্থান থেকেও কার্যত সরে আসতে হয়েছে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, এই অঙ্গীকার শুধু বর্তমান প্রশাসন নয়, ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রশাসনের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।

এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি

ট্রাম্প দাবি করছেন, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি করবে। তার মতে, আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কার্যকর সমাধান সম্ভব। তবে সংশয়ও কম নয়।

কারণ যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, দেশটির আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা বন্ধে বাধ্য করা। এমনকি তিনি একসময় ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ও দাবি করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সমঝোতায় এসব লক্ষ্য সরাসরি অর্জিত হয়নি। বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

৬০ দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে সাফল্য-ব্যর্থতা

ফ্রান্সে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ৬০ দিনের সময়সীমাকে তিনি ‘কঠোর সময়সীমা’ হিসেবে দেখছেন না। অর্থাৎ প্রয়োজন হলে আলোচনা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

এ অবস্থায় অনেক বিশ্লেষকের প্রশ্ন, সমঝোতাটি কি সত্যিই একটি বিস্তৃত ও স্থায়ী ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির পথ তৈরি করবে, নাকি এটি শুধু ট্রাম্পকে একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধ থেকে রাজনৈতিকভাবে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দেবে?

এর উত্তর নির্ভর করবে আগামী দুই মাসের কূটনৈতিক আলোচনার ওপর। যদি আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কার্যকর সমাধান আসে, তাহলে বর্তমান সমঝোতা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে। তা না হলে এই চুক্তি ইতিহাসে এমন একটি সমঝোতা হিসেবেই থেকে যেতে পারে, যা যুদ্ধ থামালেও মূল সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

হরমুজে তেল পরিবহন শুরু, লেবাননে ইসরায়েলের নতুন হামলায় ফের অনিশ্চয়তা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও স্বাভাবিকভাবে তেল পরিবহন শুরু হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে এর মধ্যে লেবাননে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এ হামলা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

১৩ ঘণ্টা আগে

নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের বৈঠকে যোগ দেবেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী

গত প্রায় একবছরের মধ্যে এটিই হবে ওয়াং ইর প্রথম ভারত সফর। এর আগে গত বছরের আগস্টে তিনি নয়াদিল্লি সফর করেন। সফরে অজিত ডোভাল ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

১৪ ঘণ্টা আগে

বালু উত্তোলন নিয়ে বিরোধ— ভারতে বিজেপি নেতাকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে সোনহাত থানা এলাকার নওগাইন গ্রামে এ রোমমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর কোরিয়া জেলা জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য।

১৬ ঘণ্টা আগে

ব্রহ্মপুত্রে চীনের নতুন মেগা বাঁধ নিয়ে কেন উদ্বেগ ছড়াচ্ছে ভারতে?

ভারতীয় সংস্থাগুলোর গোয়েন্দা তথ্য এবং স্যাটেলাইট চিত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে এ ধরনের বিশাল বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের ভাটির প্রভাব নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই নির্মাণ কাজের গতি বেশ বেড়েছে।

১৭ ঘণ্টা আগে