৯/১১ হামলার ২৫ বছর: প্রযুক্তির ওপর অতিভরসাই কি নতুন দুর্বলতা?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মুহূর্তের ব্যবধানে টুইন টাওয়ারের দুটি ভবনেই চালানো হয় বিমান হামলা। ছবি: সংগৃহীত

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় কেঁপে উঠল নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার। ওই হামলার প্রভাবে কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বের রাজনীতি-অর্থনীতিসহ নানা খাত বদলে যায় নানাভাবে। চলতি শতাব্দীর বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাঁকবদলে ওই হামলাকেই সবচেয়ে বড় প্রভাবক আখ্যা দিয়ে থাকেন বিশ্লেষকরা।

নাইন-ইলেভেন হিসেবে পরিচিত ওই হামলায় অন্যান্য খাতের মতো বিশ্ব জুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থাতেও আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় যুক্ত হয় একের পর এক প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার স্তর। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমারেখায় আপস করতে হয় অনেক ক্ষেত্রেই।

সেই হামলার ২৫ বছর পর প্রশ্ন উঠছে— নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রযুক্তির ওপর এই অতিনির্ভরতা কি উলটো নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে?

নাইন-ইলেভেনের ওই সন্ত্রাসী হামলার আড়াই দশক পর পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয়। এর লক্ষ্য ছিল এমন একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সব অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। ধীরে ধীরে অনেক কিছুই সেই সমন্বিত কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

তবে দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় বিশ্লেষকরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে এসব কাঠামো শক্তিশালী ও সুরক্ষিত মনে হলেও এর মধ্যে থেকে গেছে গুরুতর দুর্বলতা। সেই দুর্বলতাই নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওসামা বিন লাদেনের গড়ে তোলা আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করেন। দুটি বিমান নিয়ে তারা হামলা চালান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া ভবন টুইন টাওয়ারে। একটি বিমান আছড়ে পড়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভ্যানিয়ার শ্যাংকসভিলের একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এসব হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত ও প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত হন।

নাইন-ইলেভেন হামলার পরদিনও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন টুইন টাওয়ার ঘিরে আশপাশের গোটা এলাকা। ছবি: সংগৃহীত
নাইন-ইলেভেন হামলার পরদিনও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন টুইন টাওয়ার ঘিরে আশপাশের গোটা এলাকা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রকে নাড়িয়ে দেওয়া ওই হামলার পর শুরু হয় ব্যাপক পর্যালোচনা। এরই ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয় ইতিহাসের যেকোনো সন্ত্রাসী হামলার সবচেয়ে বিস্তৃত তদন্ত। এর ফল ছিল নাইন-ইলেভেন কমিশনের প্রতিবেদন।

হামলার কারণ ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার আগের কয়েক মাসে গোয়েন্দা ব্যবস্থাগুলো ‘সতর্কসংতেক’ জানিয়ে আসছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এমন কোনো হামলার কথা কল্পনা করতেও ব্যর্থ হয়েছে। এর ফল হিসেবেই ওই হুমকি বা সতর্কবার্তাকে যথাযথভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

তবে কমিশনের কাজ শুধু হামলার কারণ অনুসন্ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কীভাবে নতুন করে সাজানো ও আরও কার্যকর করা যায়, সেটিও ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নিরাপত্তার একটি নতুন মডেল তৈরি হয় এবং তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা

নাইন-ইলেভেন কমিশনের সুপারিশে বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিকে একীভূত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বয়ের একটি উদাহরণ হলো যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট টেরোরিজম অ্যানালাইসিস সেন্টার। একই সঙ্গে নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে প্রযুক্তিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে সুরক্ষিত করতে চালু হয় ‘স্তরভিত্তিক নিরাপত্তা’ পদ্ধতি। প্রতীকী স্থাপনা, আর্থিক এলাকা, নগরকেন্দ্র, স্টেডিয়াম ও অভিজাত বিপণিবিতানে ব্যাপকভাবে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। বিশেষ করে বিমানবন্দরগুলোতে নিশ্চিত করা হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা অবকাঠামো।

যাত্রীদের আগাম নিরাপত্তা যাচাই, বায়োমেট্রিক নথি, পুরো শরীর স্ক্যান করার যন্ত্র, সশস্ত্র পুলিশের টহল ও নজরদারি ক্যামেরা— এসব হয়ে ওঠে আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএসএ) নামে আলাদা একটি সরকারি সংস্থাই গড়ে তোলা হয়।

৯/১১-এর পর প্রতিটি বড় হামলার পর একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। হুমকি যে ধরনেরই হোক, সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে আরও সমন্বয়, আরও প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তার আরও স্তর।

কিন্তু গত ২৫ বছরে নিরাপত্তার এই কাঠামো গড়ে তুলতে এবং সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধে বিপুল অর্থ ও প্রাণ ব্যয় করার পরও প্রশ্ন থেকে যায়— সত্যিকার অর্থে কি সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে?

টুইন টাওয়ারের পাশাপাশি সেদিন হামলা হয় মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনেও। ছবি: সংগৃহীত
টুইন টাওয়ারের পাশাপাশি সেদিন হামলা হয় মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনেও। ছবি: সংগৃহীত

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নাইন-ইলেভেনের মতো একই ধরনের হামলা আবার ঘটার সম্ভাবনা কম। তবে এমন হামলা আর কখনো ঘটবে না— এ নিশ্চয়তাও দেওয়ার সুযোগ নেই।

ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের সমাজবিজ্ঞান, সমাজনীতি ও অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক পিট ফাসি এবং মায়নুথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মার্ক ম্যাগুয়ের দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন বৈশ্বিক এই নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। দীর্ঘ সময় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ বিষয়ে ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরেছেন তারা।

‘দ্য এম্পটি ওয়াচটাওয়ার: কাউন্টারটেরোরিজম আফটার ৯/১১’ বইয়ে দুই গবেষক তাদের দুই দশকের মাঠপর্যায়ের গবেষণা তুলে ধরেছেন। পাঁচটি পৃথক ঘটনা নিয়ে গবেষণায় তারা এমন নিরাপত্তাব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো ব্যয়বহুল হলেও সমন্বয়ের দিক থেকে দুর্বল এবং যার মধ্যে রয়েছে নানা ফাঁকফোকর। বাইরে থেকে শক্তিশালী মনে হলেও এসব ব্যবস্থায় ভয়াবহ ব্যর্থতার ঝুঁকি রয়েছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন সুরক্ষিত স্থাপনা ও মনিটরিং কন্ট্রোল রুম পরিদর্শন করেছেন। বিমানবন্দর, শহর ও বড় ক্রীড়া আয়োজনগুলোতে বায়োমেট্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। একাধিক দেশে সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিশেষায়িত নজরদারি ইউনিটের সঙ্গে থেকে নৃতাত্ত্বিক গবেষণাও করেছেন।

উন্নত নজরদারির বাস্তব চিত্র

নাইন-ইলেভেনের পরপরই নিরাপত্তা জোরদারে কিছু একটা করার তাগিদ তৈরি হয়। অনিশ্চিত ও ভয়াবহ সম্ভাবনার মধ্যে নিশ্চিত কিছু করার চেষ্টা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো নতুন ধরনের সীমান্তে পরিণত হয় এবং নজরদারির নতুন ব্যবস্থা পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

প্রযুক্তিবিদরা সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য নানা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে আইন মেনে চলা যাত্রীদের চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

তবে অধ্যাপক ফাসি ও অধ্যাপক ম্যাগুয়ের তাদের পাঁচটি গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেখিয়েছেন, বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। তারা এমন নিরাপত্তা কর্মী পেয়েছেন, যারা নিজের পরিচালনা করা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাগুলো নিজেরাই ঠিকমতো বোঝেন না। কোথাও নজরদারি ক্যামেরা ভুল দিকে তাক করা ছিল। কোথাও কর্মীদের মনোবল কমে গিয়েছিল। এমনকি একটি জায়গায় সংকট ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণকক্ষটি মালামাল রাখার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

গত কয়েক দশকে নিরাপত্তা খাতে কর্মীদের আচরণ শনাক্ত কর প্রশিক্ষণের ওপরও ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শরীরের নড়াচড়া বা মুখের অভিব্যক্তি পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য হামলার আগাম লক্ষণ শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

টুইন টাওয়ারে নিহতদের স্মরণ। ছবি: সংগৃহীত
টুইন টাওয়ারে নিহতদের স্মরণ। ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের কয়েকটি দেশের রাজধানীতে এই দুই অধ্যাপক কয়েক মাস গোপন নজরদারি দলের সঙ্গে থেকে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিভিন্ন দেশে এসব দল দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলেও প্রশ্ন হলো— সেই দক্ষতার মানদণ্ডই বা কী?

দুই অধ্যাপক বলছেন, সন্ত্রাসবাদ সৌভাগ্যক্রমে একটি বিরল ঘটনা। তবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়া দেশগুলোতে এর মাত্রা বেশি। ফলে খুবই বিরল কোনো হামলা না ঘটাকে ভিত্তি করে এসব নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা কঠিন।

এ কারণে সম্ভাব্য হুমকির অনেক লক্ষণই আসলে ভিড়ের মধ্যে থাকা মানুষের স্বাভাবিক মানসিক চাপ, ক্লান্তি কিংবা শারীরিক সমস্যার প্রকাশ হতে পারে। অথচ উন্নত আচরণ শনাক্তকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাগুলো অনেক সময় সাধারণ মানুষকেও এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে, যেন তাদের লুকানোর মতো কিছু রয়েছে।

দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিক এক বিশ্লেষণে দুই অধ্যাপক বলছেন, সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশের ব্যাপক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে কখনো কখনো কোনো আইন না ভাঙা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ওপর রাষ্ট্রের পুরো শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৯/১১-এর পর চালু হওয়া অনেক নতুন পুলিশি কৌশল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে যথাযথভাবে সমন্বিত ছিল না।

কখনো কখনো প্রযুক্তি ও পুলিশি কৌশলের এই সমন্বয় পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে নজরদারির আওতায় এনেছে। এর একটি উদাহরণ ২০১১ সালে পরিত্যক্ত প্রজেক্ট চ্যাম্পিয়ন। ওই প্রকল্পের আওতায় বার্মিংহামের প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় শত শত ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল।

নিরাপত্তার আড়ালে লুকানো ঝুঁকি

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশে সন্ত্রাসবিরোধী নজরদারি তালিকায় থাকা মানুষের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা বা প্রতিটি হামলা ঠেকাতে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়।

এর পরিবর্তে প্রযুক্তি ও পুলিশি কৌশলের একাধিক স্তর নিয়ে গড়ে ওঠা নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু দুই অধ্যাপক তাদের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে বলছেন, এ ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা দিতে পারে প্রযুক্তি ও মানবিক ব্যবস্থার সংযোগস্থলে।

২০১৬ সালের ব্রাসেলস বিমানবন্দরে হামলাসহ সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি বড় হামলা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সফল সন্ত্রাসী হামলাগুলো অনেক সময় প্রযুক্তি ও মানবিক ব্যবস্থার সমন্বয়ের জায়গাগুলোকেই আঘাত করে ঘটেছে। এতে নিরাপত্তার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা ও ধস নামতে পারে।

প্রযুক্তি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার এই সংযোগ নিরাপত্তা কার্যক্রমের সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই দুই উপাদানের প্রতিটিতেই দুর্বলতা রয়েছে। অধ্যাপক ফাস ও অধ্যাপক ম্যাগুয়েরের অন্য গবেষণাতেও উঠে এসেছে, নিরাপত্তা প্রযুক্তির সক্ষমতাকে প্রায়ই অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়। প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধাগুলো ধরে নেওয়া হলেও এর ব্যর্থতাগুলো প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়।

নাইন-ইলেভেন হামলার প্রধান আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন। ছবি: সংগৃহীত
নাইন-ইলেভেন হামলার প্রধান আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন। ছবি: সংগৃহীত

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে চেহারা শনাক্ত করার প্রযুক্তির কথা, যে পরীক্ষার ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। কর্মীহীন নিয়ন্ত্রণকক্ষ কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) তৈরি কাল্পনিক ‘গোয়েন্দা তথ্যে’র মতো বাস্তব উদাহরণও প্রযুক্তির ওপর সমালোচনাহীন বিশ্বাসের চিত্র তুলে ধরে।

গত আড়াই দশকে যেসব নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সবচেয়ে সফল হিসেবে দেখা গেছে সেগুলো মূলত নির্ভর করেছে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের উদ্যোগ, দক্ষতা ও কাজের প্রতি আগ্রহের ওপর। অর্থাৎ কেবল প্রযুক্তি বা নিরাপত্তাব্যবস্থার স্তর বাড়ালেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না, সেগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

নাইন-ইলেভেন কমিশনের প্রতিবেদনে আরেকটি প্রবণতার কথা উঠে এসেছিল, সন্ত্রাসী হামলার পরবর্তী প্রতিক্রিয়াতেও সেটি দেখা গেছে। প্রতিবারই আরও প্রযুক্তি এবং আরও ভালো সমন্বয়ের দাবি উঠেছে।

অধ্যাপক ফাস ও অধ্যাপক ম্যাগুয়ের বলছেন, প্রক্রিয়াগত ব্যর্থতা বা কোনো প্রযুক্তি না থাকার কারণে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটি শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রায়ই কোনো সিস্টেমকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এমন কিছু সংশোধন করতে বলা হয়, যা শুরু থেকেই ওই সিস্টেমে সমস্যার কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। তখন সেই সিস্টেমকে শক্তিশালী করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরতা নিরাপত্তার ঝুঁকিকেই তখন প্রকাশ করে দেয়।

অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যম দ্য কনভারসেশনে অধ্যাপক পিট ফাস ও অধ্যাপক মার্ক ম্যাগুয়েরের লেখা নিবন্ধ অবলম্বনে

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

আর্কটিকে রুশ সাবমেরিনের নাশকতা ঠেকানোর দাবি ন্যাটোর

ওই ঘটনায় কোনো ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাশিয়া তখন বাস্তবে কোনো ক্যাবল কাটার বদলে একটি নতুন ধরনের নাশকতা প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটির মহড়া চালাচ্ছিল। প্রযুক্তিটির ধরন বা এটি কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

৭ ঘণ্টা আগে

হরমুজের পর বাব-এল-মান্দেব: মোখা দখলে হুতিরা, চাপে বৈশ্বিক বাণিজ্য

বাব এল-মান্দেব থেকে মোখা প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর চারটি সামরিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হুতিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একই সময়ে তারা হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকেও অগ্রসর হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী দক্ষিণে ধুবাবের দিকে এগোচ্ছে। ধুবাব বাব এল-মান

৯ ঘণ্টা আগে

মার্কিন ইতিহাসের ভয়াবহতম সেই হামলার দিন ও তারপর কী ঘটেছিল

দিনটি ছিল ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। ছিনতাইকারীরা ছোট ছোট দলে পূর্ব আমেরিকার আকাশপথ দিয়ে ওড়া চারটি বিমান একইসাথে ছিনতাই করে। তারা বিমানগুলোকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আঘাত হানার জন্য।

১১ ঘণ্টা আগে

৯/১১-এর ২৫ বছর: যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও বদলে যাওয়া বিশ্ব

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকাণ্ডে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় আট ট্রিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধাঞ্চলের ব্যয়ই ছিল প্রায় ২.৩ ট্র

১২ ঘণ্টা আগে
Advertisement