ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে রাখার আশা হারাচ্ছে ইউরোপীয় মিত্ররা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ‘নিশ্চিতভাবেই বিবেচনায় রয়েছে’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

সুয়েজ সংকট, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক আক্রমণ— ইউরোপের বাইরের বড় যুদ্ধগুলোর জের ধরে বারবারই ন্যাটো ভেতরে বিভাজন রেখা স্পষ্ট হয়েছে। এবার ইরান যুদ্ধ ঘিরে সেই পুরোনো চাপ আবার সামনে চলে এসেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ও এর ফলশ্রুতিতে পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধ এই জোটের ঐক্যকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চলমান প্রেক্ষাপটে ন্যাটোকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এই জোটের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে রাখা যাবে কি না, তা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে শুরু থেকেই আলোচিত হরমুজ প্রণালি, যেটি এককভাবে বিশ্বের জ্বালানি তেল পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট। যুদ্ধের শুরু থেকেই এই নৌ রুট কার্যত অচল করে দিয়েছে ইরান। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুমকি-ধমকি দিয়েও এই নৌ পথ চালু করতে পারেননি। এমনকি ইউরোপীয় মিত্রদের সরাসরি হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানের আহ্বান জানিয়েও সাড়া পাননি।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ইউরোপীয় দেশগুলো সামরিক অভিযান চালাতে সরাসরি সহায়তা না করায় ট্রাম্প বেজায় চটেছেন। এর জের ধরে তিনি ইউরোপী মিত্র দেশগুলোর প্রতি ক্রমেই কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। এ ছাড়া কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ তাদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনাও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে ট্রাম্পের ক্ষোভও বাড়ছে।

গত ২০ মার্চ নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘ভীরু— এবং আমরা এটা মনে রাখব!’

এরপরও একাধিক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন, তিনি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ‘অবশ্যই বিবেচনায়’ রেখেছেন। অবশ্য ইরান যুদ্ধ নিয়ে গত ১ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন ট্রাম্প, যেখানে তিনি আর ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে কোনো হুঁশিয়ারি দেননি।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ট্রাম্প গত কয়েকদিন ধরে ন্যাটো নিয়ে নতুন কিছু না বললেও তার প্রশাসনের মধ্যে সে অবস্থানই প্রতিফলিত হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যেমন ন্যাটোকে অভিহিত করেছেন ‘একমুখী রাস্তা’ হিসেবে। অথচ রুবিও একসময় ট্রান্সআটলান্টিক এই জোটের কট্টর সমর্থক ছিলেন।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রুবিও এখন নতুন করে তার অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই— চলমান সংঘাত শেষ হলে আমাদের অবশ্যই এই সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের পথেই হাঁটতে হবে।’

ন্যাটো-ট্রাম্প দূরত্ব কেন বাড়ছে

ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলো শুরু থেকেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাদের ভাষ্য, এটি এমন এক সংঘাত যেখানে আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুতই বৈশ্বিক সংঘাতকে উসকে দিতে পারে, যা রূপ নিতে পারে বৈশ্বিক সংকটে। এ কারণে ইরান যুদ্ধে সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো।

জার্মানি ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সাড়া না দিলেও এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনে ৪০টি দেশকে নিয়ে একটি জোট গঠনের উদ্যোগ যাত্রা শুরু করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে যুক্তরাজ্য। এই জোটও সামরিক নয়, কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘ডেডলক’ ভাঙার চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলোর এ অবস্থান ওয়াশিংটন স্পষ্টতই ‘অসহযোগিতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে ইউরোপের দৃষ্টিতে এটি নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার কৌশল। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সরাসরি প্রভাব ফেলবে ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও শরণার্থী সংকটের ওপর।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের আহ্বানের বিপরীতে ইউরোপের যুদ্ধ এড়িয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার উদ্যোগ— এটিকেই ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়াতে মূল ভূমিকা পালন করছে।

ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিরোধ স্পষ্ট হলেও ন্যাটো প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অনাস্থা’ নতুন কিছু নয়। ন্যাটোকে সর্বোচ্চ সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিলেও বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছুই পাচ্ছে না— ট্রাম্প এমন অভিযোগ বহু আগ থেকেই, এমনকি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম মেয়াদেও করেছেন।

পার্থক্য হলো— আগের মেয়াদে ট্রাম্প সরাসরি কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ালেও এবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে গেছেন, যেখানে তিনি ন্যাটোর কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চেয়েও পাননি। ফলে এবারে তার ন্যাটোবিরোধী অবস্থান আগের চেয়ে জোরালো হয়েছে। ইরান যুদ্ধ এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অগ্রাধিকার এখন আর আগের মতো এক নয়।

ইউরোপীয় নেতারাও এখন ন্যাটো ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে সরাসরি মুখ খুলতে শুরু করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়া সফরে গিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ যেমন গত বৃহস্পতিবারই বলেছেন, ‘ন্যাটোর মতো জোট আসলে নির্ভর করে অঘোষিত আস্থার ওপর। আপনি যদি প্রতিদিন নিজের অঙ্গীকার নিয়েই সন্দেহ তৈরি করেন, তাহলে সেই আস্থার ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়।’

সার্বিক পরিস্থিতিতে এ প্রশ্ন ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছে— ৭৭ বছর ধরে টিকে থাকা ন্যাটো কি এবার যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে রাখতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে গেলে এই জোটের শক্তিমত্তাই বা কতটা টিকে থাকবে?

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

অবশেষ সমঝোতার পথে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় কী আছে?

এই চুক্তির আওতায় লেবাননে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার চলমান যুদ্ধেরও অবসান ঘটবে। একটি ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, গতকাল শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে এই শর্তটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

১ দিন আগে

পাকিস্তানে শাটল ট্রেনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ২৪

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের বরাতে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস পাকিস্তান (এপিপি) জানিয়েছে, শাটল ট্রেনটি কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট থেকে রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাচ্ছিল। সকাল ৮টার কিছুক্ষণ পর চামান ফটকের কাছে বিস্ফোরণটি ঘটে। এতে ট্রেনের কয়েকটি বগি, আশপাশের বাড়িঘর ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘটনাস্থলে

১ দিন আগে

ইসরায়েলি নিরাপত্তামন্ত্রীর ওপর ফরাসি নিষেধাজ্ঞা

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-নোয়েল ব্যারো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, 'আজ থেকে ইতামার বেন-গভিরকে ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো।' তিনি অভিযোগ করেন, ওই ভিডিওতে ফরাসি ও ইউরোপীয় নাগরিকদের প্রতি তার 'নিন্দনীয় আচরণ' দেখা গেছে, যারা ওই ত্রাণবাহী ফ্লোটিলার অংশ ছিলেন।

১ দিন আগে

৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল তুরস্কের মধ্যাঞ্চল

ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় একাধিক ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থান করায় তুরস্কে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়ে থাকে। দেশটি এখনো ২০২৩ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষত সামলাচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ তুরস্ক ও উত্তর সিরিয়ায় ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

১ দিন আগে