ট্রাম্পের অবরোধ, ইরানের নজরদারি জোরদার— ফের হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালি। প্রতীকী ছবি

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ সমুদ্রপথে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন।

শুধু তাই নয়, হরমুজে স্থাপন করা মাইন অপসারণে ন্যাটো সহায়তা করতে আগ্রহী বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এদিকে তার এসব ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে নজরদারি জোরদার করেছে ইরান।

রোববার (১২ এপ্রিল) নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আলোচনায় অনেক বিষয়ে অগ্রগতি হলেও ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো সমঝোতা হয়নি। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচলের একটি চুক্তি হতে পারত, যা ইরানের বাধার কারণে সম্ভব হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যেসব জাহাজ ইরানকে টোল দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করবে, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটকে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যে এই অবৈধ টোল দেবে, সে নিরাপদে চলতে পারবে না।’ পাশাপাশি ইরান যদি কোনো মার্কিন বা অন্য জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি হরমুজ প্রণালি অবরোধ করতে চাই। তবে এতে কিছুটা সময় লাগবে।’

ইরানের ড্রোন নজরদারি, আইআরজিসির পালটা হুঁশিয়ারি

ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই ইরানের বিপ্লবী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে নজরদারির একটি ড্রোন ভিডিও প্রকাশ করেছে।

ভিডিওটির বিবরণে দাবি করা হয়, ‘সব নৌ যান চলাচল ইরানি বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ আইআরজিসির নৌ কমান্ড সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের তৎপরতা চালানো হলে ‘বিপদে পড়তে হবে’ সংশ্লিষ্টদের।

এর আগে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হলে ইসরায়েলসহ অঞ্চলের অন্যান্য দেশে একই ধরনের স্থাপনায় পালটা হামলা চালানো হবে। যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখার বিষয়ে অনড় অবস্থান আগেও জানিয়েছিল ইরান, যা অব্যাহত রয়েছে এখনো।

‘সীমিত প্রভাব’ দেখছেন শিপিং বিশেষজ্ঞরা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান। যুদ্ধ শুরুর ৪০ দিনের মাথায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প, যাতে ইরানও সায় দেয়।

তিন দিন পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুপক্ষ বসেছিল আলোচনায়। কিন্তু সেখানেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইস্যুটি দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শেষমেষ কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয় বহুল প্রতীক্ষিত এ আলোচনা।

ওই ‘ব্যর্থ’ আলোচনার পরদিনই ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন হরমুজ প্রণালি অবরোধের। তাতে সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারা বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।

তবে ট্রাম্পের ঘোষিত এ অবরোধ বাস্তবে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন শিপিং বিশ্লেষকরা। ভেসপুসি মেরিটাইমের প্রধান নির্বাহী লারস জেনসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ পদক্ষেপ (অবরোধ) নেয়, তাহলে ‘খুবই সীমিতসংখ্যক’ জাহাজের ওপরই এর প্রভাব পড়বে।

জেনসেনের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কম জাহাজ চলাচল করছে। তার মধ্যেও খুব অল্পসংখ্যক জাহাজই ইরানকে টোল দেয়। উপরন্তু যারা টোল দেয় তারা আগেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে ছিল।

শিপিং বিশেষজ্ঞ জেনসেন বলেন, বেশির ভাগ শিপিং কোম্পানি আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। যদি কোনো অস্থায়ী সমঝোতা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল বাড়তে পারে। তবে এই নৌ পথ ভবিষ্যতে আর কতটা নিরাপদ থাকবে, তা এখন আর নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

জেনসেনের ভাষায়, ‘শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করে বিশ্বাসের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও তা কতদিন টিকবে, সেটিই আসল প্রশ্ন।’

মাইন অপসারণে ন্যাটোর সহায়তার ইঙ্গিত

এদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে স্থাপন করা মাইন অপসারণে ন্যাটো সহায়তা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে মাইন অপসারণকারী জাহাজ মোতায়েন করছে। যুক্তরাজ্যসহ ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশও এতে অংশ নেবে।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘এটি পরিষ্কার করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। আমরা প্রণালিটি পরিষ্কার করব এবং খুব শিগগিরই এটি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে।’

যুক্তরাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র অবশ্য স্কাই নিউজকে বলেছেন, হরমুজ অবরোধে ট্রাম্পের উদ্যোগে তারা যোগ দেবে না। হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের বিরুদ্ধেও অবস্থান তাদের। যুক্তরাজ্য এখন ফ্রান্সসহ অন্যদের নিয়ে হরমুজে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে একটি জোট গঠন করবে, যে উদ্যোগের কথা আগেও জানিয়েছিল দেশটি।

উত্তেজনা কমার সুযোগ কম

ইরান যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় তা বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে বহু দেশে জ্বালানির দামে বেড়েছে, দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ফের জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে ওঠার আশা দেখা দিয়েছিল। ইসলামাবাদে দুপক্ষ সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় ফের দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্পের অবরোধ ও ইরানের পালটা বাড়তি নজরদারির ঘোষণা স্পষ্টতই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন তারা।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ভিডিও প্রকাশ

নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি। গত মার্চের শুরুর দিকে দেশটির নীতি-নির্ধারণী পরিষদ 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' তাঁকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে।

১৯ ঘণ্টা আগে

ইরানের সঙ্গে বৈরিতার মধ্যেই ২ মুসলিম শক্তিধর দেশকে পাশে পেল সৌদি

চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে ‘তিন দেশের সবার ওপর হামলা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তিন দেশের প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো ‘যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা’ এবং ‘তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব দিক আরও

১ দিন আগে

হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্তের পথে, তবে নৌপথ খুলছে না: ইরান

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতাকে যুদ্ধ বন্ধে বৃহত্তর একটি চুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানি পথ হরমুজ প্রণালিতে ইরান কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

১ দিন আগে

বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ, দীর্ঘ যানজট

শনিবার (৮ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে বিকেল পর্যন্ত বাহাদুরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই অবরোধ চলে।

১ দিন আগে