গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় মার্কিন ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’, সার্বভৌমত্ব থাকছে ডেনমার্কের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ২৯

গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ দেওয়ার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে নতুন নিরাপত্তা চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব বা ডেনমার্কের ভূখণ্ডগত অধিকার হস্তান্তর হচ্ছে না বলে স্পষ্ট করেছে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড। এতে কয়েক মাস ধরে গ্রিনল্যান্ড দখল বা কিনে নেওয়ার হুমকিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে যে কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল, আপাতত তা একটি সামরিক-নিরাপত্তা সমঝোতার মাধ্যমে প্রশমিত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা গ্রিনল্যান্ডে নিরাপত্তা ও ‘অন্যান্য প্রয়োজনে’র ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দেবে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ‘চিরকাল’ গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করার পূর্ণ সক্ষমতা পাবে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোনো খরচ’ হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে একজন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ী প্রবেশাধিকার, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও আকাশপথ ব্যবহারের অধিকার পাবে।

এমনকি নতুন সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ক্ষমতা থাকবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটোর বাইরের কোনো দেশের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনও নিষিদ্ধ করা হবে।

বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি ঠেকানোকে চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য, এসব দেশ গ্রিনল্যান্ডের ‘সংবেদনশীল খাতে’ বিনিয়োগ করতে পারবে না এবং সেখানে সেনা মোতায়েন বা সামরিক ঘাঁটি গড়ার সুযোগও থাকবে না। ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া কোনো মার্কিন প্রতিপক্ষ গ্রিনল্যান্ডে সংবেদনশীল বিনিয়োগও করতে পারবে না।

তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড চুক্তিটিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ও গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, চুক্তি ডেনমার্ক রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। নিলসেনও বলেছেন, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তাদের অবস্থানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

চুক্তিটি আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় সই হওয়ার কথা। এরপর এটি কার্যকর করতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রয়োজনীয় সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণাকে এখনই চূড়ান্ত আইনি বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রয়টার্সও জানিয়েছে, চুক্তির বিস্তারিত, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির পরিমাণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ বা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোনো ক্ষমতা হস্তান্তর হচ্ছে কি না— এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।

চুক্তির গুরুত্ব বুঝতে হলে আগের মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। ১৯৫১ সালের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে সেনা মোতায়েনের ব্যাপক অধিকার রয়েছে। বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের পিতুফিক স্পেস বেসে শতাধিক মার্কিন সেনা ও কর্মী রয়েছে। ঘাঁটিটি ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নতুন চুক্তি এই পুরোনো ব্যবস্থার বাইরে ঠিক কতটা অতিরিক্ত ক্ষমতা দেবে, তা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহের পেছনে সামরিক ও অর্থনৈতিক— দুই ধরনের কারণ রয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে দ্বীপটি উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী কৌশলগত এলাকায় অবস্থিত। একই সঙ্গে এখানে বিপুল পরিমাণ, বিশেষ করে বিরল খনিজের মজুত রয়েছে।

ট্রাম্প এর আগে রাশিয়া ও চীনের সম্ভাব্য উপস্থিতির ঝুঁকি দেখিয়ে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি দ্বীপটিকে নিজের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।

ন্যাটো চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছে। জোটটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, এটি আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। ফলে চুক্তিটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক সম্পর্কের বিষয় নয়, আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে।

তবে গ্রিনল্যান্ডে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। দেশটির এমপি নায়া নাথানিয়েলসেন বলেছেন, চুক্তিটি নিয়ে আশাবাদী হলেও গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক রাজনীতিক আজা কেমনিৎসও চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশয় প্রকাশ করেছেন।

অর্থাৎ, আপাতত ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে নেওয়ার লক্ষ্য অর্জন করেননি। বরং ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেই গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও নিরাপত্তা অধিকার সম্প্রসারণের একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এবং সেটি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সংসদে কীভাবে অনুমোদিত হয়, তার ওপর নির্ভর করবে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার পর হোয়াইট হাউজে ঢুকতে পারেননি সিএনএন-পলিটিকোর সাংবাদিকরা

সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, শনিবার সকাল ৮টার দিকে এমএস নাউয়ের হোয়াইট হাউজ সংবাদদাতা আকাইলা গার্ডনার ও এক ক্যামেরাম্যানকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি হোয়াইট হাউজে। গার্ডনার বলেন, প্রবেশপথে পাস স্ক্যান করার পর তাকে জানানো হয় সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। কেন নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে জানতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী বলেন, বিষয়টি তার

১১ ঘণ্টা আগে

মার্কিন চুক্তির পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলা

লেবাননের কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় চার হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ১২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখের বেশি মানুষ। দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ইসরায়েলি বাহিনী এখনও দেশটির ভূখণ্ডের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

১৩ ঘণ্টা আগে

রিয়াদ বিমানবন্দরের কাছে আগুন-ধোঁয়া, ফ্লাইটে বিঘ্ন

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। শনিবার স্থানীয় সময় সকালে বিমানবন্দরের দিক থেকে বিকট শব্দ শোনার পর আকাশে ধোঁয়া ও আগুন দেখা যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে ঘটনার সঠিক কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

১৮ ঘণ্টা আগে

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ২০৩১ পর্যন্ত বাড়ালেন ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার আইনে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই আইনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের সুযোগও বাড়ানো হয়েছে।

১ দিন আগে
Advertisement