সৌদির সঙ্গে এফ-৩৫ চুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে নতুন অস্ত্র চায় ইসরায়েল

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

সৌদি আরবকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও উন্নত অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে চাইবে ইসরায়েল। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর, তেল আবিব এমন কিছু অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেগুলো এর আগে ইসরায়েলকে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ওয়াশিংটন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়ালার বরাতে শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির জেরুজালেম পোস্ট। ওয়ালার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি দেশকে এফ-৩৫ দেওয়ার ফলে আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে। ইসরায়েলি বিমানবাহিনী বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে এফ-৩৫ পরিচালনাকারী একমাত্র বাহিনী, সৌদি আরব এই যুদ্ধবিমান পেলে সেই একচেটিয়া অবস্থান আর থাকবে না।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ওয়ালাকে বলেছেন, সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়া হলেও ইসরায়েলের ‘কোয়ালিটেটিভ অপারেশনাল অ্যাডভান্টেজ’ বা গুণগত সামরিক সুবিধা বজায় থাকবে। তাদের যুক্তি, এ সুবিধা শুধু যুদ্ধবিমানটির ওপর নির্ভর করে না, বরং ইসরায়েলি পাইলটদের ব্যাপক যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা এবং এফ-৩৫-এর সঙ্গে ইসরায়েলি তৈরি অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংযুক্ত করার সক্ষমতাও এর অংশ।

ইসরায়েলের এফ-৩৫ সংস্করণকে বলা হয় ‘আদির’। ওয়ালার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল এমন কিছু নিজস্ব অস্ত্রব্যবস্থা এই যুদ্ধবিমানে সংযুক্ত করার অনুমোদন পেয়েছে, যা অন্যান্য দেশের এফ-৩৫-এ একইভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। ইসরায়েল একটি বিশেষ এফ-৩৫ পরীক্ষামূলক বিমানও পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে উন্নত সামরিক সক্ষমতা তৈরির কাজ করা হয়। একজন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ওয়ালাকে বলেন, তাদের সুবিধা শুধু ‘যন্ত্রে নয়, মূলত মানুষে’।

এফ-৩৫-এর বদলে কী চাইছে ইসরায়েল

ওয়ালার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শুধু আরও এফ-৩৫ বা প্রচলিত অস্ত্র চাইছে না, বরং এমন কিছু প্রযুক্তি ও অস্ত্রব্যবস্থা চাওয়া হচ্ছে, যেগুলো এতদিন ওয়াশিংটন অনুমোদন করেনি।

এর মধ্যে রয়েছে বাংকার ধ্বংসকারী বোমা, পাহাড় বা শক্ত পাথরের গভীরে থাকা স্থাপনায় কাজ করতে সক্ষম ভূগর্ভস্থ যুদ্ধব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় হামলাব্যবস্থা এবং বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সমন্বিত ‘সোয়র্ম’ প্রযুক্তি। পাশাপাশি মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান নিয়েও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অ্যারো-৪ ও অ্যারো-৫-এর উন্নয়ন ও উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ। অর্থাৎ, সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার পর ইসরায়েল শুধু নিজেদের বিদ্যমান সক্ষমতা ধরে রাখতে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাড়তি সহযোগিতা নিতে চাইছে।

ইসরায়েল বর্তমানে তৃতীয় একটি এফ-১৫ স্কোয়াড্রন এবং আরও এফ-৩৫ স্কোয়াড্রন কেনার অর্থ জোগাড় নিয়েও চাপে রয়েছে বলে ওয়ালা জানিয়েছে। ফলে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় সামরিক প্যাকেজ আদায়ের আলোচনা দেশটির জন্য একই সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিষয়।

সৌদির এফ-৩৫ ও ইসরায়েলের ‘গুণগত সামরিক সুবিধা’

গত ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তি অনুমোদন করে। আনুমানিক ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্যাকেজে ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি এফ১৩৫ ইঞ্জিন, যোগাযোগ ও ক্রিপ্টোগ্রাফিক সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তাও রয়েছে। চুক্তিটি এখনো মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বিক্রয় ‘অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করবে না’। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি— মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষগুলোর তুলনায় ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ (কিউএমএ)’ বা গুণগত সামরিক অগ্রগামিতা বজায় রাখতে হবে। টাইমস অব ইসরায়েলও চুক্তিটির প্রতিবেদনে এই বিষয়টিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে।

তবে ইসরায়েলের উদ্বেগ পুরোপুরি এফ-৩৫-এর সংখ্যাকে ঘিরে নয়। জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জিউয়িশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অব আমেরিকার গবেষক জোনাথন রুহে বলেন, সৌদির এফ-৩৫ পাওয়া হলে চুক্তির কাঠামোয় ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তার মতে, সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে কতটা যুক্ত করা যাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় আসা উচিত।

প্রথম এফ-৩৫ পেতে সৌদির সময় লাগবে কয়েক বছর

ওয়ালার প্রতিবেদনে একটি বিষয় ইসরায়েলের উদ্বেগকে কিছুটা কমানোর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন হলেও সৌদি আরব প্রথম এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পেতে প্রায় পাঁচ বছর সময় নিতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের আকাশসীমায় কোনো পরিবর্তন ঘটছে না।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই সময়ের মধ্যে তাদের নিজস্ব এফ-৩৫ সক্ষমতা, অস্ত্রব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। ফলে ওয়ালার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ‘সৌদিকে এফ-৩৫ দেওয়া ঠেকানো’র পরিবর্তে এর বিনিময়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আরও উন্নত করার দিকে বেশি জোর দিচ্ছে।

সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ

এফ-৩৫ চুক্তিটি শুধু সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি নয়, এর সঙ্গে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মার্কিন প্রচেষ্টাও জড়িত। রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে দৃশ্যমান অগ্রগতি চেয়ে আসছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই শর্ত মেনে নিতে এখনো অনিচ্ছুক।

টাইমস অব ইসরায়েল সম্প্রতি জানিয়েছে, সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্নে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতি হামলার কারণে সৌদি আরব আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর সংকটেও পড়েছে এবং মিত্রদের কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছে বলে ওই সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটনের কাছে এফ-৩৫ চুক্তি একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক গভীর করার পদক্ষেপ, অন্যদিকে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কিউএমএ নীতি কীভাবে বজায় রাখা হবে— তারও পরীক্ষা। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখন যে ‘ক্ষতিপূরণ’ চাইছেন, তাতে সেই সমীকরণই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সৌদি আরবকে একই প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান দেওয়ার অনুমতি দেওয়ার পর তেল আবিব ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এমন প্রযুক্তি ও অস্ত্র পেতে চাইছে, যা তার সামরিক সক্ষমতাকে শুধু সৌদির তুলনায় নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সামরিক প্রতিযোগিতাতেও এগিয়ে রাখবে। তবে এসব অস্ত্রের কতগুলো শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পাবে এবং সেগুলোর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী ধরনের শর্ত চাইবে— তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

রিয়াদে সতর্কতা জারির পরপরই হুতিদের হামলা, বিকট বিস্ফোরণ

শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার কিছু আগে রিয়াদের বাসিন্দাদের মুঠোফোনে একটি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, পুরো এলাকা শত্রুপক্ষের বিমান, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করার জন্য জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়।

১ দিন আগে

হোয়াইট হাউজে নিষিদ্ধ সিএনএনসহ ৩ সংবাদমাধ্যম— জানালেন ট্রাম্প

"প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন, তা কার্যকর হলে এটি হবে সেই মৌলিক ও সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত অধিকারের ওপর একটি অবৈধ আক্রমণ," বিবৃতিতে বলা হয়।

১ দিন আগে

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অবস্থান অপরিবর্তনীয়, আইএইএ-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শক্তিশালী বোন কিম ইয়ো জং পৃথক এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের এই পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও দ্বৈত মানদণ্ডের তীব্র অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মূল কারণ হলো আইএইএ-এর এই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ।"

১ দিন আগে

পাকিস্তানে আত্মঘাতী বোমা হামলা: ১৫ পুলিশসহ নিহত ২১

মোট সাতজনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল পুলিশ লাইনস কম্পাউন্ডে অনুপ্রবেশ করে। তারা সিটিডি (কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট) এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার একপর্যায়ে এক আত্মঘাতী হামলাকারী মসজিদের ভেতরে নিজের কাছে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন নিহত হন।

১ দিন আগে
Advertisement