
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

চলতি মে মাসের শুরুর দিকের এক ঘটনা। মস্কোর কেন্দ্রস্থলে একটি হোটেলের সামনে থামল রাশিয়ায় তৈরি এক এসইউভি জিপ। গাড়িটি থেকে জিন্স আর হালকা জ্যাকেট পরা ছিমছাম পোশাকে নেমে এলেন ভ্লাদিমির পুতিন। হাতে এক তোড়া ফুল।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পুতিন হেঁটে ঢুকলেন হোটেলের লবিতে এবং জড়িয়ে ধরলেন সাবেক স্কুলশিক্ষিকা ভেরা গুরেভিচকে। শিক্ষিকাও তার দুই গালে চুমু খেয়ে স্নেহের পরশ দিলেন। এরপর পুতিন নিজেই গুরেভিচকে পরম যত্নে গাড়িতে তুলে ক্রেমলিনে নৈশভোজের জন্য নিয়ে যান। দেশটির টেলিভিশনে ঘটা করে প্রচারিত হয় এ ঘটনা।
ঠিক এর আগের দিনই ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বেশ কয়েকটি পশ্চিমা গণমাধ্যম দাবি করেছিল, হত্যাকাণ্ড বা আকস্মিক অভ্যুত্থানের ভয়ে পুতিন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ভূগর্ভস্থ বাংকারে লুকিয়ে আছেন।
স্কুলশিক্ষিকার সঙ্গে পুতিনের সেই সৌজন্য সাক্ষাতের দৃশ্যটি মূলত পশ্চিমা গণমাধ্যমের সেই দাবিকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্যই সুনিপুণভাবে সাজানো হয়েছিল। গত ২৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রুশ নেতা নিজের যে ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, এটি ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ— একজন আত্মবিশ্বাসী, সাধারণ মানুষের কাছের রাষ্ট্রনেতা, যিনি ব্যস্ততার মাঝেও পুরনো শিক্ষিকার খোঁজ নিতে ভুল করেন না।
পুতিনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা এ মুহূর্তে কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হলেও এতে কোনো সন্দেহ নেই, তিনি তার দীর্ঘ শাসনকালের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বা কঠিন সময়ে পদার্পণ করেছেন।
রুশ প্রেসিডেন্টের আস্থাভাজন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, রাশিয়ার ব্যবসায়ী নেতা ও পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন একটি চিত্র পাওয়া গেছে, যেখানে পুতিন একাকী ও সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। তার চারপাশে থাকা রাশিয়ার উচ্চাভিলাষী প্রভাবশালী গোষ্ঠী এখন ইউক্রেনের স্থবির হয়ে পড়া যুদ্ধ ও দেশের অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে দ্রুতই মোহভঙ্গ ও হতাশ হয়ে পড়ছে।
ক্রেমলিনের উচ্চমহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা রাশিয়ার এক শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘চলতি বছর এলিটদের মানসিকতায় নিশ্চিতভাবেই একটি বড় পরিবর্তন এসেছে... পুতিনের প্রতি তাদের গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। চারপাশে এখন এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে যে সামনে কোনো বড় বিপর্যয় ধেয়ে আসছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কেউ বিশ্বাস করে না যে আগামীকালই সবকিছু হঠাৎ ভেঙে পড়বে। তবে একের পর এক আত্মঘাতী ও অর্থহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে— সবার মনে এ ধারণা এখন গেড়ে বসছে। যারা একসময় পুতিনের অন্ধ সমর্থক ছিলেন, তারাও এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মনের সব আশা যেন ভোজবাজির মতো উবে গেছে।’
বাস্তবতা হলো— রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তার রেটিং দিন দিন কমছে, অর্থনীতিও মারাত্মক চাপের মুখে। এমনকি ক্রেমলিনপন্থি কট্টরপন্থি ব্লগারদের যারা এর আগে কখনোই প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেননি, তারাও এখন প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
দেশের অভ্যন্তরে এমন ফাটল দেখা দিলেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পুতিনের সমীকরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পুতিনের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত একাধিক ব্যক্তি এবং ইউরোপ ও ইউক্রেনের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, পুতিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
প্রেসিডেন্টের দপ্তরে যাতায়াত রয়েছে— এমন দুটি সূত্র জানিয়েছে, পুতিন তার আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট করেছেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ মস্কো পুরো দনবাস অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাদের একজন বলেন, ‘পুতিনের পুরো মনোযোগ এখন দনবাসের ওপর এবং সেটি পুরোপুরি কবজা করার আগে তিনি থামবেন না।’
গত ৯ মে রাশিয়ার বিজয় দিবসের প্যারেডের পর পুতিন একটি মন্তব্য করে অনেককেই চমকে দিয়েছিলেন। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় এবারের প্যারেডের পরিধি বেশ ছোট করা হয়েছিল। সেখানে পুতিন ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধটি ‘শেষের দিকে’ চলে এসেছে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ ঘটা করে প্রচারিত হলেও পুতিনের ঘনিষ্ঠরা সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে পুতিন কোনো সমঝোতা বা আপসে রাজি হচ্ছেন। বরং পুতিন বিশ্বাস করছেন, রণক্ষেত্রে রাশিয়ার একটি বিশাল ও চূড়ান্ত সামরিক বিজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তবে ইউক্রেনের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রুশ জেনারেলরাই মূলত পুতিনকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে বছরের শেষ নাগাদ দনবাস রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আসবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সামরিক চেইন অব কমান্ডের ওপরের স্তরে মূলত সাজানো ও মনগড়া যুদ্ধ প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে রাশিয়ার বিজয় একদম সন্নিকটে।’
তবে রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র এই বীরত্বের দাবির সঙ্গে মিলছে না। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে রুশ বাহিনী যেভাবে ধীরগতিতে এগোচ্ছে, তাতে পুরো দনবাস অঞ্চল দখল করতে রাশিয়ার আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
রাশিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পুতিনের সামনে মাঠপর্যায়ের আসল চিত্র আড়াল করে কেবলই আশাব্যঞ্জক কোনো চিত্র তুলে ধরছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইউরোপের একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘তার চারপাশের মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি বুঝলেও খোদ পুতিন আসলে কী বুঝছেন বা জানছেন, সেটিই সবচেয়ে বড় রহস্য এবং সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা।’
রুশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অবশ্যই আমলারা ও সামরিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টের সামনে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেন। তারা তার কাছে মিথ্যা বলেন। পুতিন নিজে যে শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছেন, তা এভাবেই কাজ করে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো— মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তিনি আস্থা হারিয়েছেন। পুতিন ও পর্দার আড়ালের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত দুটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প যে চাপ দিয়ে ইউক্রেনকে তাদের ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে পারবেন, রুশ প্রসিডেন্ট এখন আর তা বিশ্বাস করেন না।
পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর মস্কোয় এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে তিনি হয়তো দনবাস অঞ্চল রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সেই আশা এখন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।
ট্রাম্প অবশ্য সম্প্রতি বারবার দাবি করছেন, মার্কিন সহায়তায় ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের দিকে। তবে রুশ নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো বিশেষ তাৎপর্য দেখছে না। ইউক্রেন অবশ্য স্বীকার করেছে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ একাধিক বৈঠকে ইউক্রেনকে তাদের নিয়ন্ত্রিত কিছু অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন।
কিন্তু কিয়েভ এখন ওয়াশিংটনের ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে এবং নিজেদের সামরিক উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর এক বিশাল ঋণ অনুমোদন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সম্পর্ক গভীর হওয়ায় ইউক্রেনের ওপর আমেরিকার প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা গ্যারান্টি না পাওয়া পর্যন্ত কিয়েভ কোনোভাবেই নিজেদের ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয়।
আপাতত মস্কোর মূল লক্ষ্য দনবাস জয় করা। রুশ মধ্যস্থতাকারীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই লক্ষ্য অজর্নের পরে মস্কো সমঝোতার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। তবে পুতিনের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ইউক্রেন যদি কোনো কারণে ভেঙে পড়তে শুরু করে, তাহলে পুতিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আবারও বেড়ে যেতে পারে। তখন তিনি দিনিপ্রো নদী পার হয়ে ২০২২ সালে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা সেই চার অঞ্চলের বাকি অংশও পুরোপুরি দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠবেন, যা এখনো রাশিয়ার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
পুতিনের মানসিকতা ব্যাখ্যা করে তার এক ঘনিষ্ট সূ্ত্র জানায়, ‘তিনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো কৌশলবিদ নন। তার চরিত্রটি এমন— খেতে বসলে যার ক্ষুধা আরও বাড়ে।’
২০২৬ সালের শুরুর দিকেই রাশিয়ার সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষের প্রথম ঢেউ দৃশ্যমান হতে শুরু করে। তখন ক্রেমলিন দেশের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে প্রায় সব জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ নিষিদ্ধ বা সীমিত করে দেয় এবং কেবল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত একটি বিকল্প অ্যাপ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
বর্তমানে মস্কোসহ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই মোবাইল ইন্টারনেট সাময়িকভাবে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে শত শত কোটি রুবলের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
ইন্টারনেট বন্ধের এ ঘটনা নিয়ে মস্কোর এলিটদের মধ্যে এখন ‘ডার্ক হিউমার’ চলছে। ক্রেমলিনের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, ‘খাবার টেবিলে এখন সবাই শুধু ইন্টারনেট নিয়ে কথা বলে। আমরা এখন উত্তর কোরিয়ার খুব কাছাকাছি চলে গেছি।’

একসময় চীনে ইন্টারনেটের কঠোর সেন্সরশিপ নিয়ে যে রাশিয়ানরা হাসাহাসি করতেন, তারাই এখন চীনের ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঈর্ষান্বিত।
ইন্টারনেট বন্ধের এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে রাশিয়ার শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির ‘সেকেন্ড সার্ভিস’। এই কুখ্যাত বিভাগটিই একসময় রাশিয়ার প্রয়াত বিরোধী দলীয় নেতা আলেক্সি নাভালনিকে বিষপ্রয়োগের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ও প্রথম ডেপুটি চিফ অব স্টাফ সের্গেই কিরিয়েনকোসহ রাশিয়ার রাজনৈতিক প্রভাবশালী কয়েকজন গোপনে পুতিনকে এই কঠোর ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ক্রেমলিনের একটি সূত্র জানায়, যতদিন যুদ্ধ চলবে, পুতিন আমলাদের চেয়ে গোয়েন্দা সংস্থাকেই বেশি প্রাধান্য দেবেন।
পুতিনের সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টার মেয়ে এবং রাশিয়ার প্রভাবশালী সাংবাদিক কসেনিয়া সোবচাক এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে গার্ডিয়ানকে বলেন, ইন্টারনেটের বিষয়টি রুশ সমাজের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। আর এটি দেশ জুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ পুঞ্জীভূত করছে।
সোবচাক মনে করেন, রুশ কর্তৃপক্ষ আগামী বছরের মধ্যেই সমস্ত পশ্চিমা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম চিরতরে ব্লক করে দেবে এবং মানুষকে দেশীয় বিকল্প ব্যবহারে বাধ্য করবে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এই সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে।’
সাধারণ রাশিয়ানদের জন্য চলতি বছরটি উচ্চ কর ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির এক দুঃসহ বার্তা নিয়ে এসেছে। ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির কারণে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ও ইউটিলিটি বিল আকাশচুম্বী হয়েছে।
সব মিলিয়ে পুতিন ইউক্রেন আক্রমণের শুরুতে জনগণের সঙ্গে অলিখিত যে সামাজিক চুক্তি করেছিলেন, তা তিনি নিজেই ভেঙে ফেলেছেন। চুক্তিটি ছিল— যতদিন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন স্থিতিশীল থাকবে, ততদিন তারা সরকারের এই যুদ্ধ নিয়ে কোনো মাথা ঘামাবে না। কিন্তু এখন আর জীবন স্থিতিশীল নেই।
রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের ভিডিওগুলো হু হু করে ভাইরাল হচ্ছে। কোথাও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাড়তি করের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, কোথাও বাসিন্দারা বারবার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের অভিযোগ করছেন। সাইবেরিয়ার কৃষকরাও ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। কারণ সরকারি নির্দেশে তাদের হাজার হাজার গবাদিপশু জোরপূর্বক মেরে ফেলা হচ্ছে।
রাশিয়ার একটি রাষ্ট্রীয় জরিপ সংস্থার মতে, গত এপ্রিলে দেশের মানুষের ‘সুখ সূচক’ বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একাধিক জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পুতিনের জনপ্রিয়তার রেটিং এখন সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে।
রাশিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া রেডিও স্টেশন ‘ইকো অব মস্কো’র সাবেক সম্পাদক আলেক্সি ভেনেডিক্টভ বলেন, ‘পুতিন নিজের জনপ্রিয়তার সূচক খুব কড়াভাবে নজরে রাখেন। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি এই জরিপগুলোর ওপর এক প্রকার আচ্ছন্ন।’ ভেনেডিক্টভ মনে করেন, পুতিনের রাজত্বে সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ অবহেলা করার মতো নয়।
সাধারণ জনগণ ও কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষ বাড়লেও বিশ্লেষকদের ধারণা, পুতিন সরকারের জন্য যদি সত্যি কোনো হুমকি তৈরি হয়, তবে তা রাজপথের আন্দোলন থেকে আসবে না, আসবে তার বিশ্বস্ত পরিমণ্ডল থেকে।
চলতি মাসের শুরুতে ইউরোপীয় একটি দেশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে একটি বড় দাবি করা হয়েছিল, রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু পুতিনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। তবে ক্রেমলিনের সমর্থক ও বিরোধী উভয় পক্ষই এই মুহূর্তে কোনো অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে অবাস্তব বলে মনে করেন।
প্রকৃতপক্ষে পুতিনের সবুজ সংকেত নিয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী এরই মধ্যে শোইগুর বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে। ফলে একসময়ের ক্ষমতাধর এই সাবেক মন্ত্রী এখন পুরোপুরি একাকী ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

শোইগুর পরিচিত সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে শোইগুর কোনো জনপ্রিয়তা নেই এবং তাকে সমর্থন করে— এমন কোনো নিজস্ব সমর্থনগোষ্ঠীও নেই। তিনি কখনোই পুতিনের বিরুদ্ধে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাবেন না।’
রাশিয়ার ধনকুবেরদের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিরোধের সম্ভাবনা নেই। রাশিয়ার এক শীর্ষ ব্যবসায়ী জানান, অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ, কিন্তু তারা ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছে এবং রাশিয়ার একটি বড় কৃষি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ভাদিম মোশকোভিচকে গ্রেপ্তারের পর এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করা ওলগ টিনকভ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, রাশিয়ার ব্যবসায়ী সমাজ এখন এক ধরনের ‘রাশিয়ান রুলেট’ খেলছে। তারা মনে মনে আশা করছেন যেন পাশের জন বিপদে পড়লেও তারা নিজেরা বেঁচে যায়। কারই বা ঠেকা পড়েছে পুতিনের বিরুদ্ধে যাওয়ার? সবাই শুধু চুপচাপ অপেক্ষা করছে, কখন তার পতন বা স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে।
এদিকে নিজের নিরাপত্তা ও ‘মানসিক বিভ্রান্তি বা বাংকারে লুকিয়ে থাকা’র সমস্ত জল্পনা-কল্পনা নস্যাৎ করতে পুতিন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশ-বিদেশে তার সফরের সূচি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। ক্রেমলিনের এক কর্মকর্তা বলেন, পুতিন সবসময়ই তার নিরাপত্তা নিয়ে অতি সচেতন, কিন্তু তিনি বাংকারে লুকিয়ে আছেন— এমন দাবি সম্পূর্ণ ভুল।
ইউরোপের সেই জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, রাশিয়ার শীর্ষ মহলের কর্মকর্তারা এখন এক ধরনের ‘বাস্তবতা মেনে নেওয়া’র প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। রণক্ষেত্র ও দেশের অর্থনীতি— উভয় জায়গাতেই যে একের পর এক সমস্যা জমছে, তা তারা বুঝতে পারছেন। তবে এই পতন রুখতে তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
তার ভাষায়, “তারা সবাই বুঝতে পারছেন যে গ্রাফটা এখন নিচের দিকে নামছে। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত তাদের কাউকেই প্রশ্ন তুলতে শুনিনি— ‘তাহলে এখন আমাদের কী করা উচিত?’”
[প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানের রাশিয়াবিষয়ক প্রতিবেদক পিওতর সাওয়ের এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপবিষয়ক প্রতিনিধি শন ওয়াকারের বিশেষ প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন ইমাম রাকিব]

চলতি মে মাসের শুরুর দিকের এক ঘটনা। মস্কোর কেন্দ্রস্থলে একটি হোটেলের সামনে থামল রাশিয়ায় তৈরি এক এসইউভি জিপ। গাড়িটি থেকে জিন্স আর হালকা জ্যাকেট পরা ছিমছাম পোশাকে নেমে এলেন ভ্লাদিমির পুতিন। হাতে এক তোড়া ফুল।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পুতিন হেঁটে ঢুকলেন হোটেলের লবিতে এবং জড়িয়ে ধরলেন সাবেক স্কুলশিক্ষিকা ভেরা গুরেভিচকে। শিক্ষিকাও তার দুই গালে চুমু খেয়ে স্নেহের পরশ দিলেন। এরপর পুতিন নিজেই গুরেভিচকে পরম যত্নে গাড়িতে তুলে ক্রেমলিনে নৈশভোজের জন্য নিয়ে যান। দেশটির টেলিভিশনে ঘটা করে প্রচারিত হয় এ ঘটনা।
ঠিক এর আগের দিনই ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বেশ কয়েকটি পশ্চিমা গণমাধ্যম দাবি করেছিল, হত্যাকাণ্ড বা আকস্মিক অভ্যুত্থানের ভয়ে পুতিন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ভূগর্ভস্থ বাংকারে লুকিয়ে আছেন।
স্কুলশিক্ষিকার সঙ্গে পুতিনের সেই সৌজন্য সাক্ষাতের দৃশ্যটি মূলত পশ্চিমা গণমাধ্যমের সেই দাবিকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্যই সুনিপুণভাবে সাজানো হয়েছিল। গত ২৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রুশ নেতা নিজের যে ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, এটি ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ— একজন আত্মবিশ্বাসী, সাধারণ মানুষের কাছের রাষ্ট্রনেতা, যিনি ব্যস্ততার মাঝেও পুরনো শিক্ষিকার খোঁজ নিতে ভুল করেন না।
পুতিনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা এ মুহূর্তে কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হলেও এতে কোনো সন্দেহ নেই, তিনি তার দীর্ঘ শাসনকালের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বা কঠিন সময়ে পদার্পণ করেছেন।
রুশ প্রেসিডেন্টের আস্থাভাজন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, রাশিয়ার ব্যবসায়ী নেতা ও পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন একটি চিত্র পাওয়া গেছে, যেখানে পুতিন একাকী ও সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। তার চারপাশে থাকা রাশিয়ার উচ্চাভিলাষী প্রভাবশালী গোষ্ঠী এখন ইউক্রেনের স্থবির হয়ে পড়া যুদ্ধ ও দেশের অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে দ্রুতই মোহভঙ্গ ও হতাশ হয়ে পড়ছে।
ক্রেমলিনের উচ্চমহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা রাশিয়ার এক শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘চলতি বছর এলিটদের মানসিকতায় নিশ্চিতভাবেই একটি বড় পরিবর্তন এসেছে... পুতিনের প্রতি তাদের গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। চারপাশে এখন এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে যে সামনে কোনো বড় বিপর্যয় ধেয়ে আসছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কেউ বিশ্বাস করে না যে আগামীকালই সবকিছু হঠাৎ ভেঙে পড়বে। তবে একের পর এক আত্মঘাতী ও অর্থহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে— সবার মনে এ ধারণা এখন গেড়ে বসছে। যারা একসময় পুতিনের অন্ধ সমর্থক ছিলেন, তারাও এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মনের সব আশা যেন ভোজবাজির মতো উবে গেছে।’
বাস্তবতা হলো— রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তার রেটিং দিন দিন কমছে, অর্থনীতিও মারাত্মক চাপের মুখে। এমনকি ক্রেমলিনপন্থি কট্টরপন্থি ব্লগারদের যারা এর আগে কখনোই প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেননি, তারাও এখন প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
দেশের অভ্যন্তরে এমন ফাটল দেখা দিলেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পুতিনের সমীকরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পুতিনের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত একাধিক ব্যক্তি এবং ইউরোপ ও ইউক্রেনের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, পুতিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
প্রেসিডেন্টের দপ্তরে যাতায়াত রয়েছে— এমন দুটি সূত্র জানিয়েছে, পুতিন তার আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট করেছেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ মস্কো পুরো দনবাস অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাদের একজন বলেন, ‘পুতিনের পুরো মনোযোগ এখন দনবাসের ওপর এবং সেটি পুরোপুরি কবজা করার আগে তিনি থামবেন না।’
গত ৯ মে রাশিয়ার বিজয় দিবসের প্যারেডের পর পুতিন একটি মন্তব্য করে অনেককেই চমকে দিয়েছিলেন। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় এবারের প্যারেডের পরিধি বেশ ছোট করা হয়েছিল। সেখানে পুতিন ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধটি ‘শেষের দিকে’ চলে এসেছে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ ঘটা করে প্রচারিত হলেও পুতিনের ঘনিষ্ঠরা সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে পুতিন কোনো সমঝোতা বা আপসে রাজি হচ্ছেন। বরং পুতিন বিশ্বাস করছেন, রণক্ষেত্রে রাশিয়ার একটি বিশাল ও চূড়ান্ত সামরিক বিজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তবে ইউক্রেনের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রুশ জেনারেলরাই মূলত পুতিনকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে বছরের শেষ নাগাদ দনবাস রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আসবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সামরিক চেইন অব কমান্ডের ওপরের স্তরে মূলত সাজানো ও মনগড়া যুদ্ধ প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে রাশিয়ার বিজয় একদম সন্নিকটে।’
তবে রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র এই বীরত্বের দাবির সঙ্গে মিলছে না। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে রুশ বাহিনী যেভাবে ধীরগতিতে এগোচ্ছে, তাতে পুরো দনবাস অঞ্চল দখল করতে রাশিয়ার আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
রাশিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পুতিনের সামনে মাঠপর্যায়ের আসল চিত্র আড়াল করে কেবলই আশাব্যঞ্জক কোনো চিত্র তুলে ধরছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইউরোপের একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘তার চারপাশের মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি বুঝলেও খোদ পুতিন আসলে কী বুঝছেন বা জানছেন, সেটিই সবচেয়ে বড় রহস্য এবং সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা।’
রুশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অবশ্যই আমলারা ও সামরিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টের সামনে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেন। তারা তার কাছে মিথ্যা বলেন। পুতিন নিজে যে শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছেন, তা এভাবেই কাজ করে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো— মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তিনি আস্থা হারিয়েছেন। পুতিন ও পর্দার আড়ালের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত দুটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প যে চাপ দিয়ে ইউক্রেনকে তাদের ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে পারবেন, রুশ প্রসিডেন্ট এখন আর তা বিশ্বাস করেন না।
পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর মস্কোয় এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে তিনি হয়তো দনবাস অঞ্চল রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সেই আশা এখন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।
ট্রাম্প অবশ্য সম্প্রতি বারবার দাবি করছেন, মার্কিন সহায়তায় ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের দিকে। তবে রুশ নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো বিশেষ তাৎপর্য দেখছে না। ইউক্রেন অবশ্য স্বীকার করেছে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ একাধিক বৈঠকে ইউক্রেনকে তাদের নিয়ন্ত্রিত কিছু অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন।
কিন্তু কিয়েভ এখন ওয়াশিংটনের ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে এবং নিজেদের সামরিক উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর এক বিশাল ঋণ অনুমোদন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সম্পর্ক গভীর হওয়ায় ইউক্রেনের ওপর আমেরিকার প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা গ্যারান্টি না পাওয়া পর্যন্ত কিয়েভ কোনোভাবেই নিজেদের ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয়।
আপাতত মস্কোর মূল লক্ষ্য দনবাস জয় করা। রুশ মধ্যস্থতাকারীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই লক্ষ্য অজর্নের পরে মস্কো সমঝোতার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। তবে পুতিনের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ইউক্রেন যদি কোনো কারণে ভেঙে পড়তে শুরু করে, তাহলে পুতিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আবারও বেড়ে যেতে পারে। তখন তিনি দিনিপ্রো নদী পার হয়ে ২০২২ সালে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা সেই চার অঞ্চলের বাকি অংশও পুরোপুরি দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠবেন, যা এখনো রাশিয়ার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
পুতিনের মানসিকতা ব্যাখ্যা করে তার এক ঘনিষ্ট সূ্ত্র জানায়, ‘তিনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো কৌশলবিদ নন। তার চরিত্রটি এমন— খেতে বসলে যার ক্ষুধা আরও বাড়ে।’
২০২৬ সালের শুরুর দিকেই রাশিয়ার সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষের প্রথম ঢেউ দৃশ্যমান হতে শুরু করে। তখন ক্রেমলিন দেশের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে প্রায় সব জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ নিষিদ্ধ বা সীমিত করে দেয় এবং কেবল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত একটি বিকল্প অ্যাপ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
বর্তমানে মস্কোসহ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই মোবাইল ইন্টারনেট সাময়িকভাবে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে শত শত কোটি রুবলের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
ইন্টারনেট বন্ধের এ ঘটনা নিয়ে মস্কোর এলিটদের মধ্যে এখন ‘ডার্ক হিউমার’ চলছে। ক্রেমলিনের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, ‘খাবার টেবিলে এখন সবাই শুধু ইন্টারনেট নিয়ে কথা বলে। আমরা এখন উত্তর কোরিয়ার খুব কাছাকাছি চলে গেছি।’

একসময় চীনে ইন্টারনেটের কঠোর সেন্সরশিপ নিয়ে যে রাশিয়ানরা হাসাহাসি করতেন, তারাই এখন চীনের ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঈর্ষান্বিত।
ইন্টারনেট বন্ধের এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে রাশিয়ার শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির ‘সেকেন্ড সার্ভিস’। এই কুখ্যাত বিভাগটিই একসময় রাশিয়ার প্রয়াত বিরোধী দলীয় নেতা আলেক্সি নাভালনিকে বিষপ্রয়োগের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ও প্রথম ডেপুটি চিফ অব স্টাফ সের্গেই কিরিয়েনকোসহ রাশিয়ার রাজনৈতিক প্রভাবশালী কয়েকজন গোপনে পুতিনকে এই কঠোর ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ক্রেমলিনের একটি সূত্র জানায়, যতদিন যুদ্ধ চলবে, পুতিন আমলাদের চেয়ে গোয়েন্দা সংস্থাকেই বেশি প্রাধান্য দেবেন।
পুতিনের সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টার মেয়ে এবং রাশিয়ার প্রভাবশালী সাংবাদিক কসেনিয়া সোবচাক এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে গার্ডিয়ানকে বলেন, ইন্টারনেটের বিষয়টি রুশ সমাজের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। আর এটি দেশ জুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ পুঞ্জীভূত করছে।
সোবচাক মনে করেন, রুশ কর্তৃপক্ষ আগামী বছরের মধ্যেই সমস্ত পশ্চিমা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম চিরতরে ব্লক করে দেবে এবং মানুষকে দেশীয় বিকল্প ব্যবহারে বাধ্য করবে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এই সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে।’
সাধারণ রাশিয়ানদের জন্য চলতি বছরটি উচ্চ কর ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির এক দুঃসহ বার্তা নিয়ে এসেছে। ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির কারণে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ও ইউটিলিটি বিল আকাশচুম্বী হয়েছে।
সব মিলিয়ে পুতিন ইউক্রেন আক্রমণের শুরুতে জনগণের সঙ্গে অলিখিত যে সামাজিক চুক্তি করেছিলেন, তা তিনি নিজেই ভেঙে ফেলেছেন। চুক্তিটি ছিল— যতদিন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন স্থিতিশীল থাকবে, ততদিন তারা সরকারের এই যুদ্ধ নিয়ে কোনো মাথা ঘামাবে না। কিন্তু এখন আর জীবন স্থিতিশীল নেই।
রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের ভিডিওগুলো হু হু করে ভাইরাল হচ্ছে। কোথাও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাড়তি করের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, কোথাও বাসিন্দারা বারবার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের অভিযোগ করছেন। সাইবেরিয়ার কৃষকরাও ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। কারণ সরকারি নির্দেশে তাদের হাজার হাজার গবাদিপশু জোরপূর্বক মেরে ফেলা হচ্ছে।
রাশিয়ার একটি রাষ্ট্রীয় জরিপ সংস্থার মতে, গত এপ্রিলে দেশের মানুষের ‘সুখ সূচক’ বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একাধিক জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পুতিনের জনপ্রিয়তার রেটিং এখন সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে।
রাশিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া রেডিও স্টেশন ‘ইকো অব মস্কো’র সাবেক সম্পাদক আলেক্সি ভেনেডিক্টভ বলেন, ‘পুতিন নিজের জনপ্রিয়তার সূচক খুব কড়াভাবে নজরে রাখেন। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি এই জরিপগুলোর ওপর এক প্রকার আচ্ছন্ন।’ ভেনেডিক্টভ মনে করেন, পুতিনের রাজত্বে সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ অবহেলা করার মতো নয়।
সাধারণ জনগণ ও কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষ বাড়লেও বিশ্লেষকদের ধারণা, পুতিন সরকারের জন্য যদি সত্যি কোনো হুমকি তৈরি হয়, তবে তা রাজপথের আন্দোলন থেকে আসবে না, আসবে তার বিশ্বস্ত পরিমণ্ডল থেকে।
চলতি মাসের শুরুতে ইউরোপীয় একটি দেশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে একটি বড় দাবি করা হয়েছিল, রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু পুতিনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। তবে ক্রেমলিনের সমর্থক ও বিরোধী উভয় পক্ষই এই মুহূর্তে কোনো অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে অবাস্তব বলে মনে করেন।
প্রকৃতপক্ষে পুতিনের সবুজ সংকেত নিয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী এরই মধ্যে শোইগুর বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে। ফলে একসময়ের ক্ষমতাধর এই সাবেক মন্ত্রী এখন পুরোপুরি একাকী ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

শোইগুর পরিচিত সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে শোইগুর কোনো জনপ্রিয়তা নেই এবং তাকে সমর্থন করে— এমন কোনো নিজস্ব সমর্থনগোষ্ঠীও নেই। তিনি কখনোই পুতিনের বিরুদ্ধে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাবেন না।’
রাশিয়ার ধনকুবেরদের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিরোধের সম্ভাবনা নেই। রাশিয়ার এক শীর্ষ ব্যবসায়ী জানান, অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ, কিন্তু তারা ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছে এবং রাশিয়ার একটি বড় কৃষি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ভাদিম মোশকোভিচকে গ্রেপ্তারের পর এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করা ওলগ টিনকভ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, রাশিয়ার ব্যবসায়ী সমাজ এখন এক ধরনের ‘রাশিয়ান রুলেট’ খেলছে। তারা মনে মনে আশা করছেন যেন পাশের জন বিপদে পড়লেও তারা নিজেরা বেঁচে যায়। কারই বা ঠেকা পড়েছে পুতিনের বিরুদ্ধে যাওয়ার? সবাই শুধু চুপচাপ অপেক্ষা করছে, কখন তার পতন বা স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে।
এদিকে নিজের নিরাপত্তা ও ‘মানসিক বিভ্রান্তি বা বাংকারে লুকিয়ে থাকা’র সমস্ত জল্পনা-কল্পনা নস্যাৎ করতে পুতিন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশ-বিদেশে তার সফরের সূচি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। ক্রেমলিনের এক কর্মকর্তা বলেন, পুতিন সবসময়ই তার নিরাপত্তা নিয়ে অতি সচেতন, কিন্তু তিনি বাংকারে লুকিয়ে আছেন— এমন দাবি সম্পূর্ণ ভুল।
ইউরোপের সেই জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, রাশিয়ার শীর্ষ মহলের কর্মকর্তারা এখন এক ধরনের ‘বাস্তবতা মেনে নেওয়া’র প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। রণক্ষেত্র ও দেশের অর্থনীতি— উভয় জায়গাতেই যে একের পর এক সমস্যা জমছে, তা তারা বুঝতে পারছেন। তবে এই পতন রুখতে তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
তার ভাষায়, “তারা সবাই বুঝতে পারছেন যে গ্রাফটা এখন নিচের দিকে নামছে। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত তাদের কাউকেই প্রশ্ন তুলতে শুনিনি— ‘তাহলে এখন আমাদের কী করা উচিত?’”
[প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানের রাশিয়াবিষয়ক প্রতিবেদক পিওতর সাওয়ের এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপবিষয়ক প্রতিনিধি শন ওয়াকারের বিশেষ প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন ইমাম রাকিব]

ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় একাধিক ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থান করায় তুরস্কে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়ে থাকে। দেশটি এখনো ২০২৩ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষত সামলাচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ তুরস্ক ও উত্তর সিরিয়ায় ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
১১ ঘণ্টা আগে
বিক্ষোভের একপর্যায়ে একদল আন্দোলনকারী প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সরকারি বাসভবন মনক্লোয়া প্যালেস-এর চারপাশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। স্প্যানিশ টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাওয়ার মূল সড়কে মুখোশধারী একদল লোককে পুলিশ বাধা দিচ্ছে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্
১২ ঘণ্টা আগে
কিয়েভের সামরিক প্রশাসক তৈমুর তাকাচেঙ্কো টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, কিয়েভ বড় মিসাইল হামলার মধ্যে আছে। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেন।
১৩ ঘণ্টা আগে
চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, হামলা পুনরায় শুরু করার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েও তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধে তা ‘স্থগিত’ করেছেন।
১৩ ঘণ্টা আগে