ইউক্রেনকে সহায়তা, রাশিয়ায় নিষেধাজ্ঞা— কংগ্রেসে বিল পাসে ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার হামলায় বিধ্বস্ত একটি বহুতল ভবন। ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেনকে নতুন করে সহায়তা করা ও রাশিয়ার ওপর বাড়তি নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল পাস হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব নীতি ও দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে পাস হওয়া এ বিল তার দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেকার বিরোধকে আরও স্পষ্ট করেছে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিল পাস হওয়ার পর রাশিয়া-ইউক্রেন সম্পর্কিত এ বিলের পাস হওয়াকে ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খরবে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (৪ জুন) মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এ বিল পাস হয়। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— কিছু রিপাবলিকান সদস্য খোদ দলীয় নেতৃত্বকে অমান্য করে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও দ্বিধা করছেন না।

কয়েক মাস ধরে ‘ইউক্রেন সাপোর্ট অ্যাক্ট’ নামের এই বিলটি পাসের অপেক্ষায় ঝুলে ছিল। সাধারণত প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকারের অনুমতি ছাড়া কোনো বিল ভোটাভুটির জন্য তোলা যায় না। তবে এবার এক অভিনব পন্থায় কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে একটি বিশেষ আবেদনে (ডিসচার্জ পিটিশন) সই করলে বিলটি ভোটাভুটির জন্য উত্থাপন করা সম্ভব হয়। এ সময় বিলটি ২২৬-১৯৫ ভোটে পাস হয়।

রয়টার্স বলছে, বৃহস্পতিবারের এই ভোটাভুটিতে ১৮ জন রিপাবলিকান ও একজন স্বতন্ত্র সদস্য (যিনি সাধারণত রিপাবলিকানদের পক্ষেই ভোট দেন) ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে গিয়ে বিলটির পক্ষে ভোট দেন। এর আগে ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির পেছনে তার দলের প্রতিনিধিদের যে একচেটিয়া সমর্থন ছিল, এ বিল তাতে বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষণকরা।

এর ঠিক একদিন আগেই ইরান যুদ্ধ সম্পর্কিত একটি বিল পাস হয় মার্কিন কংগ্রেসে। ওই বিল পাসের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা বিরোধী শিবির ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুক্তক হয়ে ভোট দেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী— কংগ্রেস যদি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করে বা সামরিক বলপ্রয়োগের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ না দেয়, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরান সংঘাত থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য থাকবেন। সে রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ইউক্রেন ইস্যুতেও ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওলহা স্টেফানিশিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে এ বিলকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উভয় দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) অব্যাহত সমর্থনের প্রতিফলন।

রাশিয়ার হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ইউক্রেনের দুই নাগরিক। ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়ার হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ইউক্রেনের দুই নাগরিক। ছবি: সংগৃহীত

বিলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে পাস হলেও ‘ইউক্রেন সাপোর্ট অ্যাক্টে’র চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত। বিলটি আইনে পরিণত হতে হলে মার্কিন সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেটেও এটি পাস হতে হবে। কিন্তু রাশিয়া সংক্রান্ত বিলের প্রতি উভয় দলের ব্যাপক সমর্থন থাকলেও সিনেটের রিপাবলিকান নেতারা এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো বিলের ওপর ভোটাভুটির অনুমতি দেননি। সিনেট নেতারা সাফ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন।

এদিকে সিনেটে পাস হয়ে গেলেও এ বিল কার্যকরের নিশ্চয়তা নেই। কেননা কোনোভাবে বিলটি সিনেটে পাস হয়ে গেলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে এর বিরুদ্ধে ভেটো প্রয়োগ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে কংগ্রেসে পাস হয়ে এলেও বিলটির কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যাবে।

এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর প্রথম কয়েক বছর মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলই ইউক্রেনকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর থেকে কিয়েভের প্রতি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান মিত্রদেরমনোভাব অনেকটাই শীতল হতে শুরু করেছে।

তথ্য বলছে, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই এখন ইউক্রেন ইস্যুতে আগের মতো সরব ও সহানুভূতিশীল নন। পাশাপাশি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের হাত থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সরাসরি হোয়াইট হাউজ থেকে পরিচালনা করছেন। ফলে তাকে উপেক্ষা করে এ বিল পাস ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হয়েই এসেছে।

কিয়েভ বলছে, রাশিয়ার হামলায় বেসরকারি স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। ছবি: সংগৃহীত
কিয়েভ বলছে, রাশিয়ার হামলায় বেসরকারি স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। ছবি: সংগৃহীত

কী রয়েছে বিলে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অন্যের ওপর প্রতিনিয়ত ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও কামান দিয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই কিয়েভ সরকারের জন্য মার্কিন সহায়তা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনাও সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন যেসব অঞ্চল সফলভাবে রক্ষা করে আসছে, তা রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে হবে। তবে ইউক্রেন পুতিনের এই শর্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

এমন এক জটিল মুহূর্তে পাস হওয়া এই ‘ইউক্রেন সাপোর্ট অ্যাক্টে’র অধীনে যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেন পুনর্গঠনে বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। বিলটিতে কিয়েভের জন্য সরাসরি ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি সহায়তা এবং সরাসরি ঋণের মাধ্যমে আরও ৮০০ কোটি ডলার পর্যন্ত আর্থিক সহযোগিতার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে এ বিলের আওতায় রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তেল ও খনি খাত এবং শীর্ষ রুশ কর্মকর্তাদের এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এই বিল পাসের ঠিক একই সপ্তাহে ইউক্রেনের আরেক বড় মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কিয়েভের সঙ্গে তাদের জোটে অন্তর্ভুক্তির (মেম্বারশিপ) আলোচনার প্রথম ধাপ শুরু করতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ইইউর পক্ষ থেকে ৯ হাজার কোটি ইউরোর একটি বিশাল ঋণ বিতরণের চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

রাজনীতি/আইআর/টিআর

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

গ্রেফতারি পরোয়ানা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র সফরে নেতানিয়াহু

সফরকালে দুই নেতা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি সহ উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে আলোচনা করবেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হতে যাচ্ছে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সপ্তম বৈঠক। ট্রাম্পের চলতি মেয়াদে অন্

২১ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্পের ক্ষমার পর দেশে ফিরলেন হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হার্নান্দেজ

২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন হার্নান্দেজ। ২০২২ সালের এপ্রিলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং ২০২৪ সালে মার্কিন আদালত তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে শুরু থেকেই তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। পরবর্তীতে ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করেন।

১ দিন আগে

ইসরায়েলি মদদে পশ্চিমতীরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের ভয়াবহ তাণ্ডব

নাবলুসের নিকটবর্তী তাল শহরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের অবৈধ প্রবেশের পর ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে চার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় সংঘর্ষে দুই ইসরায়েলি নিহত হলে পুরো পশ্চিম তীরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

১ দিন আগে

দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী সহিংসতা চরমে, ঘরছাড়া হাজারও মানুষ

গত ২৯ জুন কয়েকজন ব্যক্তি ৬০ বছর বয়সী মালাউই নাগরিক ইব্রাহিম হুসেইনের বাড়িতে ঢুকে তাকে মারধর করে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নেয়। তিনি ২০০০ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছেন।

১ দিন আগে