পাকিস্তানের পথে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইরান বলছে আলোচনার শর্ত এখনো পূরণ হয়নি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে সোমবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতীকী ছবি

যুদ্ধবিরতির পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনার জন্য পাকিস্তানের পথে রওয়ানা হয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব থাকছে তার কাঁধে, যিনি এ কাজকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব মনে করছেন।

এদিকে ইরান বলছে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি আনতে আলোচনায় বসার জন্য তারা যেসব শর্ত দিয়েছিল, তার দুটি এখনো পূরণ হয়নি। এখনো লেবাননে হামলা বন্ধ করেনি ইসরায়েল, ইরানের জব্দ করা সম্পদও মুক্ত করা হয়নি। আলোচনা শুরুর আগেই এই দুই শর্ত বাস্তবায়ন হতে হবে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত এ আলোচনা নিয়ে আগের দিনেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, দুপক্ষের সঙ্গেই তার কথা হয়েছে। এ আলোচনাকে তিনি ‘বাঁচা-মরার লড়াই’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখান থেকে সর্বোচ্চ ইতিবাচক ফল আনতে আশাবাদী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

বিবিসি ও আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানের পথে রওয়ানা দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। তার সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলে আরও থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

‘এয়ার ফোর্স টু’তে ওঠার আগে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা আলোচনা নিয়ে আশাবাদী। ইরান যদি সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই ইতিবাচক সাড়া দেবে। তবে তারা যদি প্রতারণার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে সাড়া দেবে না।’

শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য থাকবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী কোনো সমাধান নিয়ে আসা। তবে সে রকম কোনো সমাধানে পৌঁছাতে ভ্যান্সকে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কারণ সে সমাধানে একাধারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের শাসকগোষ্ঠী ছাড়াও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সন্তুষ্ট হতে হবে।

ভ্যান্স বলেছেন, ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে বসার পর থেকে এখন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়াকেই সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব মনে হয়েছে তার কাছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনায় বসতে যেসব শর্ত ইরান দিয়েছিল, তার মধ্যে দুটি এখনো পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন, এ কারণে আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

এক্স পোস্টে গালিবাফ লিখেছেন, আলোচনার আগে উভয় পক্ষের সম্মত হওয়া দুটি পদক্ষেপ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি— লেবাননে যুদ্ধবিরতি ও ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা। আলোচনা শুরুর আগে এই দুটি বিষয়ের বাস্তবায়ন হতে হবে।

গত বুধবার ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাব অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওই সময় ইরানসহ মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও বলেছিল, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার বিষয়টি যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ শর্তের কথা অস্বীকার করে। যুদ্ধবিরতির দিনই লেবাননে এবারের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তীব্রতম হামলা চালায় ইসরায়েল। সেসব হামলায় সেদিনই ২৫৪ জনের নিহতের তথ্য নিশ্চিত করে লেবানন। সবশেষ তথ্য বলছে, বুধবারের সে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৫৭।

ইরান বলছে, লেবাননে এ হামলা স্পষ্টতই যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, লেবানন যুদ্ধবিরতির অংশ কোনোভাবেই নয়। এ পরিস্থিতিতে লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে আলোচনা স্থগিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে ইরানের পক্ষ থেকে।

ইরানের স্পিকারের এক্স পোস্টেও সে ইঙ্গিত রয়েছে, যিনি নিজেও এ আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধি দলের অংশ হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার সঙ্গে থাকতে পারেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ অন্যরা। তবে ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাদের রেড জোনে অবস্থিত হোটেল সেরেনায় শনিবার আলোচনায় বসবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এ উপলক্ষ্যে হোটেল সেরেনা ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাদের রেড জোনে অবস্থিত হোটেল সেরেনায় শনিবার আলোচনায় বসবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এ উপলক্ষ্যে হোটেল সেরেনা ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

ইসলামাবাদে কঠোর নিরাপত্তা, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আশাবাদী

পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার ইসলামাবাদের ‘রেড জোনে’ অবস্থিত সেরেনা হোটেলকে বেছে নেওয়া হয়েছে এ আলোচনার জন্য। বুধবার সন্ধ্যা থেকে রোববার পর্যন্ত সময়ের জন্য হোটেলটি সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়া হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ৯ ও ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, পুরো শহরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যে ‘রেড জোনে’ সেরেনা হোটেলটি অবস্থিত, সেখানকার গোটা এলাকা সিল করা হয়েছে, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে প্রবেশপথগুলো।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ঘিরে ঠিক আগের দিনও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা দেখছেন বিশ্লেষকরা, তখন ‘হোস্ট’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন যে আলোচনা সবকিছু ইতিবাচকই দেখছেন তিনি।

আলোচনার আগের দিন শুক্রবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে আমি আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানাই, তারা আমার প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতেই নয়, আমার আমন্ত্রণে শান্তি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে আসতে সম্মত হয়েছেন।

যুদ্ধরত দুই দেশের মধ্যে এ আলোচনা আয়োজনকে শুধু পাকিস্তান নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্যই গর্বের মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন শেহবাজ। এ প্রচেষ্টায় যারা যারা অবদান রেখেছে তাদের সবাইকে ধন্যবাদ দেন তিনি। আলোচনাকে ‘বাঁচা-মরার লড়াই’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যদিও একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়েছে, তবে সংলাপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে একটি কঠিন কাজ।

ইসলামাবাদ থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভাইদ বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট, তিনি নিশ্চিত যে ইসলামাবাদে ইরান ও ‍যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এরই মধ্যে রওয়ানা দিয়েছেন বলে আমরা জেনেছি। ইরান থেকেও দুটি বিমান ছেড়ে এসেছে বলে খবর পাচ্ছি।

দুই দেশের মধ্যে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই তাদের নিজ নিজ দেশের জনগণের মন রক্ষার জন্য নানা ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছে। কিন্তু সমাধান আসুক বা না আসুক, দুই দেশের মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস রয়েছেই।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরানে বিমান বিধ্বংসী ‘অত্যাধুনিক অস্ত্র’ দিচ্ছে চীন

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতার ভূমিকায় থাকার কথা বলেছিল বেইজিং। সেই অবস্থান ধরে রেখেই যদি গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়, তবে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

৩ ঘণ্টা আগে

আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানে বিধ্বংসী হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ট্রাম্পের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন সামরিক শক্তি পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং আগের চেয়ে আরও উন্নত অস্ত্র প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে এসব সক্ষমতা ব্যবহার করা হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

৩ ঘণ্টা আগে

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনীর ১৩ সদস্য নিহত

এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই লেবানন সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার আগে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা অপরিহার্য। একদিকে ইরান একে ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ বলে দাবি করলেও, ইসরায়েল লেবাননকে এই চুক্তির বাইরে রাখায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

৫ ঘণ্টা আগে

স্পিকার গালিবাফের নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছেছে

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলও এই আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তান অভিমুখে রয়েছেন। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই বৈঠকটি বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

৫ ঘণ্টা আগে