
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য পার হয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন বাস্তবতার পথে পা বাড়াতে যাচ্ছে ইরান। এই বাস্তবতা হলো— দেশটির আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির ১০ শতাংশ সংকোচন, তীব্র বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং সরকারের নজিরবিহীন ভিন্নমত দমনের বিরুদ্ধে ওঠা তীব্র জনরোষের এক অগ্নিপরীক্ষা। যুদ্ধ শেষ হলে এই কঠিন সময়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখবেন— তা নিয়েই এখন দেশটির ভেতরে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
শনিবার (৬ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, যদিও চূড়ান্ত শান্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি, তবুও যুদ্ধোত্তর ইরানের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ‘আজাদে’র মতো বিকল্প ধারার গণমাধ্যমগুলোতে এখন দেশের ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা চলছে।
কেউ কেউ অর্থনীতি ও রাজনীতিকে উন্মুক্ত করার পক্ষে কথা বলছেন; আবার ইরানের আলোচনা দলের ঘনিষ্ঠ সাঈদ আজরলুর মতো কট্টরপন্থিদের মতে, পশ্চিমাদের মনে ‘দুর্বল ইরানে’র যে মিথ ছিল তা ভেঙে গেছে। তাই এখন স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। অবশ্য অনেক কিছুই নির্ভর করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের মতো সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যাহার করবেন কি না তার ওপর।
তবে ইরানি অর্থনীতিবিদদের মতে, নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নেওয়া হলেও তা ইরানের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মতো হবে। চলমান যুদ্ধে ইরানের অবকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ খাত, ইস্পাত কারখানা ও আবাসন খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার (২০০ বিলিয়ন পাউন্ড)।
কুর্দিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফুয়াদ হাবিবির মতো ইরানি বিশ্লেষকরা এখনই একে ‘সামাজিক পতন’ বলতে নারাজ। তবে তারা স্বীকার করছেন যে, গত জানুয়ারির রক্তাক্ত বিক্ষোভের পেছনের মূল কারণগুলোর কোনো সমাধান তো হয়ইনি, উলটো যুদ্ধের কারণে তা আরও প্রকট হয়েছে।
অধ্যাপক ফুয়াদি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ছাড়াই বলা যায়, অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। নৌ অবরোধ এবং যুদ্ধের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্লকেডের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল বা ট্রেড ইউনিয়নের মতো প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ নেই, তাই যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি বিস্ফোরণমুখো হয়ে শাসকগোষ্ঠীকে চমকে দিতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ একতার মূল কারণ ছিল বাইরের শত্রু। যখন মাথার ওপর বোমা আর ধ্বংসযজ্ঞ চলে, তখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের জাতীয় সংহতি তৈরি হয়। কিন্তু জার্মান দার্শনিক হেগেলের তত্ত্ব মেনে, ফ্রন্ট যখনই বিজয়ী হয়, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই ঘরের ভেতরের ফাটলগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
গার্ডিয়ান বলছে, যদি যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি সফলও হয়, তবুও ইরানকে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ খাদ্য মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হতে হবে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বার্ষিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ১৩০ শতাংশে। এর মধ্যে মাংস ও মুরগির বাজারে মূল্যস্ফীতি ১৭৬ শতাংশ ছুঁয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে দুগ্ধজাত পণ্য বাদ পড়ে যাওয়ায় দেশে পুষ্টিহীনতা, হাড়ের ক্ষয় রোগ এবং শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাওয়ার মতো সমস্যা মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
ইরানের সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ আজারি জাহরোমি নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর পরবর্তী বোমাটি হয়তো বারুদের হবে না; সেটি হতে পারে মূল্যস্ফীতি। এবারের যুদ্ধক্ষেত্র হলো সাধারণ মানুষের খাবার টেবিল আর ঘরের ভাড়া। কর্তাব্যক্তিরা কি এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের খবর রাখেন? দেশের অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি প্রস্তুত, নাকি আবারও আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে যাব?’
দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অবশ্য ঘরোয়া প্রশাসনকে সচল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তিনি বারবার দেশবাসীকে সতর্ক করে বলছেন যে, সামনে আরও কঠিন সময় আসছে এবং এই মুহূর্তে সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা জরুরি।
অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতির পরও ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় আগামী মাস থেকে পরিকল্পিত ‘দুই ঘণ্টার লোডশেডিং’ শুরুর খবরটি প্রথমে অস্বীকার করেছিল। তবে ইরানের চেম্বার অব কমার্সের জ্বালানি কমিশনের প্রধান আরশ নাজাফি চলতি সপ্তাহে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘উৎপাদন সচল রাখতে সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে যারা ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে, তাদের বিলে ৩০ শতাংশ ছাড়ের মতো প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন পর দেশটির ইন্টারনেট সেন্সরশিপ বা নিষেধাজ্ঞা যখন ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হচ্ছে, তখনই ইরানিদের এই চরম দুর্দশার চিত্রগুলো সামনে আসতে শুরু করেছে। ইন্টারনেট উন্মুক্ত করার এই সিদ্ধান্তটি দেশটির কট্টরপন্থিদের এতটাই ক্ষুব্ধ করেছে যে, তারা সংসদে যোগাযোগমন্ত্রীকে অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) চেষ্টা চালাচ্ছেন।
রাজনৈতিক কর্মী রাহিম ঘামেইশি চলতি সপ্তাহে লিখেছেন, ‘আমাদের যেন একটি ভাঙা নৌকা থেকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। রক্তপিপাসু হাঙর আর উত্তাল তরঙ্গের ভয় আমাদের গ্রাস করেছিল। এখন আমরা নৌকায় ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু শুধু বেঁচে গেছি বলেই শান্ত থাকা যায় না। এ দেশে দারিদ্র্য কোনো স্বাভাবিক বিষয় হওয়ার কথা ছিল না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফাঁসির খবর শোনার কথা ছিল না। দেশের মানুষের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার থাকবে না এবং জীবনধারণের একমাত্র চিন্তা হবে পেট চালানো— এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।’
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা ঠিক হবে কি না, কিংবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার কতদিনের জন্য স্থগিত রাখা হবে— এমন সব তাত্ত্বিক বিষয়। তবে সাধারণ মানুষের কাছে আসল যুদ্ধ হলো এই অর্থনৈতিক বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া। কিন্তু চুক্তি হলেও রাতারাতি যে বিলিয়ন ডলারের জোয়ার বয়ে যাবে, বিষয়টি তেমন নয়।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অ্যালবার্ট বাগজিয়ান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইরানের মতো বিশাল অর্থনীতিতে, যেখানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চরম অদক্ষতা রয়েছে, সেখানে ১২ বা ২৪ বিলিয়ন ডলারের আগমন বড় কোনো পরিবর্তন আনবে ভাবা ভুল। অতীতে এর চেয়েও বড় অংকের অর্থ এই অর্থনীতিতে এসেছে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা অপচয় হয়েছে এবং আজ আমাদের এই দশা হয়েছে।’
অর্থনীতি পুনর্গঠন ও দুর্নীতি দমনের এই আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে দেশটির শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ক্ষমতার দেয়ালে। প্রবীণ ইরানি অর্থনীতিবিদ মুসা ঘানি নেজাদ বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতির মূল সমস্যা হলো নিয়মতান্ত্রিক শাসনের ওপর আদেশভিত্তিক শাসনের আধিপত্য। অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ নিয়মের ভিত্তিতে না হয়ে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা ও বিবেচনার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়।’
গার্ডিয়ান বলছে, গত জানুয়ারির বিক্ষোভের পর থেকে ইরানে দমনপীড়ন আরও কঠোর হয়েছে। নতুন গুপ্তচরবৃত্তি আইন, ভিন্নমতালম্বীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রতি রাতে বিরোধীদের কঠোর সমালোচনা এর প্রমাণ। এমনকি দেশটির জাতীয় সংসদকেও এখনো সশরীরে বৈঠকে বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে দেশটির অন্যতম প্রধান সংস্কারপন্থি দল ইসলামিক ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো একটি গোপন চিঠি প্রকাশ করেছে। চিঠিতে তারা অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘এই ফাঁসিগুলো অভ্যন্তরীণ বিভেদ বাড়াচ্ছে, সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড পূরণ করছে না এবং যুদ্ধের সময়ে ইরান যে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল, তা ক্ষুণ্ণ করছে।’ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ২২ জন রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সহাবস্থান করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে তিনি জানান, ইরান সমর্থিত লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে তার একটি ‘ভালো ফোনালাপ’ হয়েছে এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে দেখা করতে পারলে তিনি সম্মানিত বোধ করবেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘কিছু মহলে তার (মোজতবা) বেশ ভালো সুনাম রয়েছে।’
২০২৫ সালের ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পুনরুজ্জীবিত যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে আইআরজিসি এবং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখিয়েছিল যে তারা যুদ্ধের জন্য দ্রুত প্রস্তুত হতে পারে। তবে এখন আসল পরীক্ষা— তারা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো সমাধান করে শান্তির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে কি না।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যদি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ বহাল থাকে এবং পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিদেশি পুঁজি, প্রযুক্তি ও কাঁচামাল আসার পথ তৈরি না হয়, তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ সাময়িক কোনো ক্ষত থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে ইরানিদের দৈনন্দিন জীবনের স্থায়ী বাস্তবতা। সাময়িক যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি তখন রূপ নেবে এক স্থায়ী সামাজিক সংকটে— যেখানে অভাব, ক্লান্তি আর চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেই বেঁচে থাকতে বাধ্য হবে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।
রাজনীতি/আইআর

যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য পার হয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন বাস্তবতার পথে পা বাড়াতে যাচ্ছে ইরান। এই বাস্তবতা হলো— দেশটির আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির ১০ শতাংশ সংকোচন, তীব্র বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং সরকারের নজিরবিহীন ভিন্নমত দমনের বিরুদ্ধে ওঠা তীব্র জনরোষের এক অগ্নিপরীক্ষা। যুদ্ধ শেষ হলে এই কঠিন সময়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখবেন— তা নিয়েই এখন দেশটির ভেতরে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
শনিবার (৬ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, যদিও চূড়ান্ত শান্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি, তবুও যুদ্ধোত্তর ইরানের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ‘আজাদে’র মতো বিকল্প ধারার গণমাধ্যমগুলোতে এখন দেশের ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা চলছে।
কেউ কেউ অর্থনীতি ও রাজনীতিকে উন্মুক্ত করার পক্ষে কথা বলছেন; আবার ইরানের আলোচনা দলের ঘনিষ্ঠ সাঈদ আজরলুর মতো কট্টরপন্থিদের মতে, পশ্চিমাদের মনে ‘দুর্বল ইরানে’র যে মিথ ছিল তা ভেঙে গেছে। তাই এখন স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। অবশ্য অনেক কিছুই নির্ভর করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের মতো সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যাহার করবেন কি না তার ওপর।
তবে ইরানি অর্থনীতিবিদদের মতে, নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নেওয়া হলেও তা ইরানের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মতো হবে। চলমান যুদ্ধে ইরানের অবকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ খাত, ইস্পাত কারখানা ও আবাসন খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার (২০০ বিলিয়ন পাউন্ড)।
কুর্দিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফুয়াদ হাবিবির মতো ইরানি বিশ্লেষকরা এখনই একে ‘সামাজিক পতন’ বলতে নারাজ। তবে তারা স্বীকার করছেন যে, গত জানুয়ারির রক্তাক্ত বিক্ষোভের পেছনের মূল কারণগুলোর কোনো সমাধান তো হয়ইনি, উলটো যুদ্ধের কারণে তা আরও প্রকট হয়েছে।
অধ্যাপক ফুয়াদি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ছাড়াই বলা যায়, অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। নৌ অবরোধ এবং যুদ্ধের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্লকেডের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল বা ট্রেড ইউনিয়নের মতো প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ নেই, তাই যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি বিস্ফোরণমুখো হয়ে শাসকগোষ্ঠীকে চমকে দিতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ একতার মূল কারণ ছিল বাইরের শত্রু। যখন মাথার ওপর বোমা আর ধ্বংসযজ্ঞ চলে, তখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের জাতীয় সংহতি তৈরি হয়। কিন্তু জার্মান দার্শনিক হেগেলের তত্ত্ব মেনে, ফ্রন্ট যখনই বিজয়ী হয়, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই ঘরের ভেতরের ফাটলগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
গার্ডিয়ান বলছে, যদি যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি সফলও হয়, তবুও ইরানকে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ খাদ্য মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হতে হবে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বার্ষিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ১৩০ শতাংশে। এর মধ্যে মাংস ও মুরগির বাজারে মূল্যস্ফীতি ১৭৬ শতাংশ ছুঁয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে দুগ্ধজাত পণ্য বাদ পড়ে যাওয়ায় দেশে পুষ্টিহীনতা, হাড়ের ক্ষয় রোগ এবং শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাওয়ার মতো সমস্যা মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
ইরানের সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ আজারি জাহরোমি নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর পরবর্তী বোমাটি হয়তো বারুদের হবে না; সেটি হতে পারে মূল্যস্ফীতি। এবারের যুদ্ধক্ষেত্র হলো সাধারণ মানুষের খাবার টেবিল আর ঘরের ভাড়া। কর্তাব্যক্তিরা কি এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের খবর রাখেন? দেশের অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি প্রস্তুত, নাকি আবারও আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে যাব?’
দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অবশ্য ঘরোয়া প্রশাসনকে সচল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তিনি বারবার দেশবাসীকে সতর্ক করে বলছেন যে, সামনে আরও কঠিন সময় আসছে এবং এই মুহূর্তে সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা জরুরি।
অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতির পরও ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় আগামী মাস থেকে পরিকল্পিত ‘দুই ঘণ্টার লোডশেডিং’ শুরুর খবরটি প্রথমে অস্বীকার করেছিল। তবে ইরানের চেম্বার অব কমার্সের জ্বালানি কমিশনের প্রধান আরশ নাজাফি চলতি সপ্তাহে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘উৎপাদন সচল রাখতে সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে যারা ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে, তাদের বিলে ৩০ শতাংশ ছাড়ের মতো প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন পর দেশটির ইন্টারনেট সেন্সরশিপ বা নিষেধাজ্ঞা যখন ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হচ্ছে, তখনই ইরানিদের এই চরম দুর্দশার চিত্রগুলো সামনে আসতে শুরু করেছে। ইন্টারনেট উন্মুক্ত করার এই সিদ্ধান্তটি দেশটির কট্টরপন্থিদের এতটাই ক্ষুব্ধ করেছে যে, তারা সংসদে যোগাযোগমন্ত্রীকে অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) চেষ্টা চালাচ্ছেন।
রাজনৈতিক কর্মী রাহিম ঘামেইশি চলতি সপ্তাহে লিখেছেন, ‘আমাদের যেন একটি ভাঙা নৌকা থেকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। রক্তপিপাসু হাঙর আর উত্তাল তরঙ্গের ভয় আমাদের গ্রাস করেছিল। এখন আমরা নৌকায় ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু শুধু বেঁচে গেছি বলেই শান্ত থাকা যায় না। এ দেশে দারিদ্র্য কোনো স্বাভাবিক বিষয় হওয়ার কথা ছিল না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফাঁসির খবর শোনার কথা ছিল না। দেশের মানুষের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার থাকবে না এবং জীবনধারণের একমাত্র চিন্তা হবে পেট চালানো— এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।’
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা ঠিক হবে কি না, কিংবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার কতদিনের জন্য স্থগিত রাখা হবে— এমন সব তাত্ত্বিক বিষয়। তবে সাধারণ মানুষের কাছে আসল যুদ্ধ হলো এই অর্থনৈতিক বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া। কিন্তু চুক্তি হলেও রাতারাতি যে বিলিয়ন ডলারের জোয়ার বয়ে যাবে, বিষয়টি তেমন নয়।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অ্যালবার্ট বাগজিয়ান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইরানের মতো বিশাল অর্থনীতিতে, যেখানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চরম অদক্ষতা রয়েছে, সেখানে ১২ বা ২৪ বিলিয়ন ডলারের আগমন বড় কোনো পরিবর্তন আনবে ভাবা ভুল। অতীতে এর চেয়েও বড় অংকের অর্থ এই অর্থনীতিতে এসেছে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা অপচয় হয়েছে এবং আজ আমাদের এই দশা হয়েছে।’
অর্থনীতি পুনর্গঠন ও দুর্নীতি দমনের এই আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে দেশটির শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ক্ষমতার দেয়ালে। প্রবীণ ইরানি অর্থনীতিবিদ মুসা ঘানি নেজাদ বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতির মূল সমস্যা হলো নিয়মতান্ত্রিক শাসনের ওপর আদেশভিত্তিক শাসনের আধিপত্য। অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ নিয়মের ভিত্তিতে না হয়ে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা ও বিবেচনার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়।’
গার্ডিয়ান বলছে, গত জানুয়ারির বিক্ষোভের পর থেকে ইরানে দমনপীড়ন আরও কঠোর হয়েছে। নতুন গুপ্তচরবৃত্তি আইন, ভিন্নমতালম্বীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রতি রাতে বিরোধীদের কঠোর সমালোচনা এর প্রমাণ। এমনকি দেশটির জাতীয় সংসদকেও এখনো সশরীরে বৈঠকে বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে দেশটির অন্যতম প্রধান সংস্কারপন্থি দল ইসলামিক ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো একটি গোপন চিঠি প্রকাশ করেছে। চিঠিতে তারা অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘এই ফাঁসিগুলো অভ্যন্তরীণ বিভেদ বাড়াচ্ছে, সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড পূরণ করছে না এবং যুদ্ধের সময়ে ইরান যে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল, তা ক্ষুণ্ণ করছে।’ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ২২ জন রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সহাবস্থান করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে তিনি জানান, ইরান সমর্থিত লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে তার একটি ‘ভালো ফোনালাপ’ হয়েছে এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে দেখা করতে পারলে তিনি সম্মানিত বোধ করবেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘কিছু মহলে তার (মোজতবা) বেশ ভালো সুনাম রয়েছে।’
২০২৫ সালের ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পুনরুজ্জীবিত যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে আইআরজিসি এবং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখিয়েছিল যে তারা যুদ্ধের জন্য দ্রুত প্রস্তুত হতে পারে। তবে এখন আসল পরীক্ষা— তারা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো সমাধান করে শান্তির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে কি না।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যদি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ বহাল থাকে এবং পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিদেশি পুঁজি, প্রযুক্তি ও কাঁচামাল আসার পথ তৈরি না হয়, তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ সাময়িক কোনো ক্ষত থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে ইরানিদের দৈনন্দিন জীবনের স্থায়ী বাস্তবতা। সাময়িক যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি তখন রূপ নেবে এক স্থায়ী সামাজিক সংকটে— যেখানে অভাব, ক্লান্তি আর চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেই বেঁচে থাকতে বাধ্য হবে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।
রাজনীতি/আইআর

এই ঘটনায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত বা বাহরাইনের পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি উল্লেখ করে সেন্টকম জানায়, পর্দার আড়ালে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও সাম্প্রতিক এই মুখোমুখি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আবারও চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
৮ ঘণ্টা আগে
মার্কিন সূত্র জানায়, ওই ড্রোনগুলো আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজরদারির উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো। বর্তমানে অঞ্চলটিতে উত্তেজনার কারণে প্রণালির স্বাভাব
৮ ঘণ্টা আগে
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উদ্দেশে লেখা এই চিঠিতে জেলেনস্কি পুতিনকে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এই খোলা চিঠি নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
১৮ ঘণ্টা আগে
নাইজারের উত্তরাঞ্চলে সাহারা মরুভূমির এক প্রত্যন্ত এলাকায় একটি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ার পর তীব্র তৃষ্ণা ও পানিশূন্যতায় অন্তত ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে আটকা পড়া যাত্রীদের মধ্যে মাত্র দুইজন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন।
১৯ ঘণ্টা আগে