হুতিদের ঠেকাতে ফের একজোট সৌদি-আমিরাত, আকাশপথে সুরক্ষার বিনিময়ে অর্থসহায়তা

ইয়েমেনে ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের ঠেকাতে আবারও সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সমঝোতা অনুযায়ী, আমিরাত ইয়েমেনের হুতিবিরোধী দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনীগুলোকে ফের অর্থসহায়তা দিতে শুরু করবে। বিনিময়ে এসব বাহিনীকে আকাশপথে সামরিক সুরক্ষা দেবে সৌদি আরব।
ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, নতুন এই সহযোগিতা দুই উপসাগরীয় মিত্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি এবং সৌদি ভূখণ্ডে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা দুই দেশকেই অবস্থান পুনর্বিবেচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
তবে দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের খবর পাওয়া যায়নি। বরং ইয়েমেনের যুদ্ধে অর্থায়ন ও সামরিক সহায়তা নিয়ে তাদের সমন্বয় পুনরায় জোরদার হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করবে সমঝোতা
সমঝোতার আওতায় আমিরাত ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিবিরোধী বাহিনী, বিশেষ করে জায়ান্ট ব্রিগেডসকে আবার অর্থসহায়তা দেবে। বাহিনীটি আগে আমিরাতের অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিল এবং ইয়েমেনের বিভক্ত হুতিবিরোধী সামরিক জোটের তুলনামূলক কার্যকর অংশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
আমিরাত গত জানুয়ারিতে ইয়েমেনের সামরিক অভিযান থেকে সরে গিয়ে এসব বাহিনীর অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। নতুন সমঝোতার ফলে সেই সহায়তা আবার চালু হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরব এসব বাহিনীকে আকাশপথে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে ইয়েমেনের যুদ্ধে দুই দেশের ভূমিকা আবার কাছাকাছি আসছে। তবে সমঝোতার আওতায় ঠিক কী ধরনের বিমান সহায়তা দেওয়া হবে, কত অর্থ বরাদ্দ করা হবে কিংবা কত সেনা মোতায়েন করা হবে— এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
কেন আবার কাছাকাছি রিয়াদ-আবুধাবি
ইয়েমেন নিয়ে সৌদি আরব ও আমিরাতের যৌথ উদ্যোগ ও বিরোধিতার ইতিহাস রয়েছে। দুই দেশই একসময় হুতিদের বিরুদ্ধে একই সামরিক জোটে অংশ নিলেও ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তাদের অবস্থানে পার্থক্য তৈরি হয়।
সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে। অন্যদিকে আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। এসব গোষ্ঠীর অন্যতম সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)। সংগঠনটি সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানা পুনর্প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এসটিসি দক্ষিণ ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নিলে দুই দেশের বিরোধ তীব্র হয়। ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এসটিসি নেতা এইদারুস আল-জুবাইদি আবুধাবিতে চলে যান। এর জবাবে সৌদি আরব এসটিসির জন্য পাঠানো আমিরাতের অস্ত্রবাহী চালানে বোমা হামলা চালায়। এরপর আমিরাত ইয়েমেনের অভিযান থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়।
এবার হুতিদের অগ্রগতি দুই দেশকে আবার সহযোগিতার পথে আনছে। তবে দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভূমিকা নিয়ে তাদের মতপার্থক্য পুরোপুরি মিটেছে— এমন প্রমাণ নেই।
সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়াচ্ছে হুতিরা
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একাধিক হামলা চালিয়েছে হুতিরা। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তরও হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এসব হামলায় বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
এসব হামলার মধ্যে গত শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরের এক হামলায় তিন বাংলাদেশিসহ অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। এরপরও রিয়াদে একাধিক হামলা হয়েছে, যেখানে বিমানবন্দর ছাড়াও আশপাশের এলাকা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সৌদি জোটের পক্ষ থেকে এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার খবরও এসেছে।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলেও সংঘাত তীব্র হয়েছে। গত সপ্তাহে এডেনে প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত একটি প্রাসাদে হুতিদের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হন। শুক্রবার এডেন বিমানবন্দরের কাছে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তবে ওই ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে হুতিবিরোধী অভিযান চালানোর ঘোষণা দিলেও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। মারিবের কাছে মাজজার এলাকা এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে তাদের অগ্রগতি সীমিত বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়তে পারে
হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— বিমান হামলা চালিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল পুনর্দখল করা কঠিন। এর জন্য স্থলবাহিনীর সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু ইয়েমেনের সরকারপন্থি বাহিনী, দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং অন্যান্য হুতিবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আমিরাতের অর্থসহায়তা ও সৌদি আরবের আকাশপথে সুরক্ষা দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনীগুলোর সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ দূর না হলে সম্মিলিত অভিযান কতটা কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত।
হুতিদের অগ্রগতি ঠেকাতে সৌদি আরব অন্য দেশগুলোর সহযোগিতাও চাইছে। আগস্টে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে সই হওয়া মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা রয়েছে। তবে সেই চুক্তির আওতায় কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে, তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথে হুতিদের প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সৌদি-আমিরাত সহযোগিতা বাড়লেও সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তার প্রভাব উপসাগরীয় নিরাপত্তা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট থেকে নতুন করে তীব্র হওয়া সংঘাতে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফলে সামরিক সমঝোতার পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।






















