হুতিদের হামলায় আঞ্চলিক সংঘাতের শঙ্কা, ঠেকাতে সমর্থন বাড়ছে সৌদির পক্ষে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
হুতিদের সমর্থনে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় মিছিল। ছবি: সংগৃহীত
হুতিদের সমর্থনে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় মিছিল। ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত তীব্র হচ্ছে। কেবল সৌদি আরব নয়, আশপাশের অঞ্চলেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় রিয়াদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণাও বাড়ছে।

একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর মিসর সামরিক সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও সৌদি আরবের সঙ্গে পুরনো সমঝোতা কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্য সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষায় টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের কতা জানিয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদির প্রতিরক্ষা জোটও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদও সৌদিকে সামরিক সহায়তার সিদ্ধান্তে সম্মতি দিয়েছে। তবে সেনা মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ নিতে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। এ বিষয়ে ভোট ২৬ অক্টোবর হওয়ার কথা রয়েছে।

কায়রোর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মিসর ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন হুতিবিরোধী জোটকে সমর্থন করলেও পরে সরাসরি সামরিক ভূমিকা সীমিত রাখে। এবার সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূল ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নতুন করে হুমকিতে পড়ায় কায়রোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এর মধ্যে যুক্তরাজ্য মঙ্গলবার জানিয়েছে, সৌদি শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষায় রয়্যাল এয়ার ফোর্সের টাইফুন যুদ্ধবিমান প্রতিরক্ষামূলক মিশনে অংশ নেবে। এসব যুদ্ধবিমান হুতিদের অবস্থানে হামলা চালাবে না। সৌদি বিমান অভিযানে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তাও বাড়াবে লন্ডন।

হামলার পরিধি বাড়ছে

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের হামলার লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বেসামরিক অবকাঠামো। রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে হুতিরা।

এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে হামলার প্রভাব স্পষ্ট— সৌদি বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলনও স্থগিত করতে হয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরপরও হামলা অব্যাহত থাকায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইয়েমেনের ভেতরেও লড়াই তীব্র হয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযান চালাচ্ছে, আর হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়াচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদির সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। আবুধাবি ইয়েমেনের স্থানীয় বাহিনীকে আবার অর্থায়নের মাধ্যমে সংঘাতে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর এসেছে। তবে ইয়েমেন প্রশ্নে সৌদি আরব ও আমিরাতের আগের অবস্থান সবসময় এক ছিল না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো— আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন নতুন বাস্তবতায় গুরুত্ব পাচ্ছে। চুক্তিতে এক পক্ষের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে। তুরস্ক চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা

রিয়াদের ওপর চাপ বাড়ার পেছনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি অবকাঠামোতে হামলার মাধ্যমে হুতিরা শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, সৌদি আরবের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাবকেও চাপের মধ্যে ফেলতে চাইছে।

তবে সৌদিকে সমর্থন বাড়লেও এর অর্থ এখনই একটি অভিন্ন হুতিবিরোধী সামরিক জোট তৈরি হয়ে গেছে— এমন নয়। মিসরের সম্ভাব্য সহায়তা, আমিরাতের ভূমিকা এবং তুরস্ক-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কাঠামো এক ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের সহায়তা মূলত সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ।

তারপরও চলমান পরিস্থিতিতে বার্তাটি স্পষ্ট— হুতিদের হামলা যদি সৌদি শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, তাহলে ইয়েমেনের যুদ্ধ ক্রমেই সীমান্ত ছাড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। আর সেই ঝুঁকি ঠেকাতে সৌদি আরব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা-সমর্থন পাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, গার্ডিয়ান, আরব নিউজ

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad