ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলকে দুই বছরের মধ্যে স্বাধীন করার ঘোষণা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের

বাসস
১ জানুয়ারি ইয়েমেনের এডেনে একটি সামরিক ট্রাকের ওপর এসটিসির একটি পতাকা উড়তে দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুই বছরের মধ্যে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলকে স্বাধীন করার প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। তবে একই দিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ ইয়েমেনজুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিযানের লাগাম টানতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয় বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে।

একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী সামরিক কর্মকর্তা ও চিকিৎসা সূত্র জানায়, দুটি সামরিক ঘাঁটিতে চালানো বিমান হামলায় ২০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। এসময় একটি বিমানবন্দর ও আরও কয়েকটি স্থাপনাকে লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়।

এই বোমাবর্ষণ ও আকস্মিক স্বাধীনতা ঘোষণার পেছনে রয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চলমান উত্তেজনা। বিশেষ করে, দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)-এর সাম্প্রতিক ভূখণ্ড দখল অভিযানকে কেন্দ্র করেই দুই মিত্র দেশের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে।

১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেন উত্তর ও দক্ষিণ— এই দুই অংশে বিভক্ত ছিল। এসটিসির স্বাধীনতা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দুই বছরের মধ্যেই দেশটি আবার বিভক্ত হতে পারে। নতুন রাষ্ট্রের নাম হবে ‘দক্ষিণ আরবিয়া’।

এসটিসির প্রেসিডেন্ট আইদারোস আলজুবাইদি বলেন, এই রূপান্তরকালীন পর্যায়ে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সংলাপ হবে, যা বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোটেরও আয়োজন করা হবে।

তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো সংলাপ না হয় বা আবার দক্ষিণ ইয়েমেনে হামলা চালানো হয়, তাহলে এসটিসি ‘অবিলম্বে’ স্বাধীনতা ঘোষণা করবে।

টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে আলজুবাইদি বলেন, ‘দক্ষিণ ও উত্তর ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ আয়োজনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে কাউন্সিল।’

গত মাসে এসটিসি বাহিনী তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই সৌদি আরব সীমান্তঘেঁষা সম্পদ সমৃদ্ধ হাদরামাউত প্রদেশের বড় অংশ ও ওমান সীমান্তবর্তী মাহরা প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে এসটিসির সাম্প্রতিক অভিযান রিয়াদকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দুই শক্তিকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করায়।

টানা সতর্কতাবার্তা ও গত সপ্তাহে একটি কথিত ইউএই অস্ত্রবাহী চালানে বিমান হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট শুক্রবার ব্যাপক হামলা শুরু করে।

হাদরামাউত উপত্যকা ও মরুভূমি অঞ্চলে এসটিসির প্রধান মোহাম্মদ আবদুল মালিক বলেন, আল-খাশা সামরিক শিবিরে সাতটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

এ ছাড়া ওই অঞ্চলের অন্যান্য স্থাপনা এবং সাইয়ুন শহরের বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা হয়েছে বলে এসটিসির সামরিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এএফপিকে জানিয়েছে।

আল-খাশার কাছে একটি গ্রামের বাসিন্দা রেয়াদ খামেস বলেন, ‘সৌদি বিমানগুলো এসটিসি যোদ্ধাদের তাড়া করছে। আমরা জানি না যে এগুলো কী ধরনের বিমান। শুধু আগুনের ঝলকানি আর বিস্ফোরণ দেখি। এগুলো চেকপয়েন্টে আঘাত করছে এবং (সৌদি-সমর্থিত) বাহিনীর অগ্রযাত্রার পথ পরিষ্কার করছে।’

এসটিসির অভিযান শুরুর পর এটিই প্রথম সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় প্রাণহানির ঘটনা।

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামরিক মুখপাত্র বলেন, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তারা একটি ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’ জড়িত। তিনি এটিকে উগ্র ইসলামবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেন, আর এই উগ্র ইসলামবাদ দীর্ঘদিন ধরেই ইউএইর একটি প্রধান উদ্বেগ।

এই বিমান হামলাগুলো এমন এক সময়ে চালানো হয়, যখন সৌদি-সমর্থিত বাহিনী হাদরামাউতে সামরিক স্থাপনার ‘শান্তিপূর্ণ’ দখল নিতে অভিযান শুরু করে।

হাদরামাউতের গভর্নর এবং ওই প্রদেশের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর প্রধান সালেম আল-খানবাশি বলেন, ‘এই অভিযান যুদ্ধ ঘোষণা নয়, কিংবা উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো চেষ্টা নয়।’ সাবা নেট সংবাদ সংস্থার বরাতে এ কথা জানানো হয়।

এদিকে, সৌদি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে হামলাগুলো সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটই চালিয়েছে। এই জোট ২০১৫ সালে ইয়েমেনের উত্তরে হুতি বিদ্রোহীদের হটানোর লক্ষ্যে গঠিত হয়। যদিও সেই প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেনি।

সৌদি সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সতর্ক করে জানায়, ‘দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল দুটি প্রদেশ থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত, হামলা বন্ধ করা হবে না।’

ইরান সমর্থিত হুতিদের উৎখাতের লক্ষ্যে গঠিত সামরিক জোটের মূল ভিত্তি ছিল উপসাগরীয় ধনী রাষ্ট্রগুলো। হুতিরা ২০১৪ সালে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের অধিকাংশ জনবহুল এলাকা দখল করে সরকারকে উৎখাত করে। তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পরও হুতিরা ক্ষমতায় টিকে আছে।

অন্যদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেনের এডেনভিত্তিক সরকার বিভিন্ন গোষ্ঠীর জোট, যার মধ্যে এসটিসিও রয়েছে। এরা সবাই হুতি বিদ্রোহীদের বিরোধিতায় একত্রিত হলেও, নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

২০১৯ সালে ইয়েমেন থেকে অধিকাংশ সেনা প্রত্যাহার করে নেয় ইউএই। গত সপ্তাহে মুকাল্লা বন্দরে কথিত অস্ত্রবাহী চালানে জোটের বিমান হামলার পর যদিও ইউএই এই চালানে অস্ত্র থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বাকি সেনাও প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছে দেশটি।

শুক্রবার ইউএই সরকারের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, সব সেনা ইয়েমেন ছেড়ে গেছে। তিনি বলেন, আবুধাবি ‘সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন ও আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শান্তির টেকসই পথ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরানকে সাহায্য করলে রাশিয়া ও চীনের পরিণতি ‘খুব খারাপ’ হবে: ট্রাম্প

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, সম্প্রতি বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে শি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন—চীন বা কোনো চীনা কোম্পানি ইরানকে কোনো অস্ত্র দেবে না। অন্যদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও তাঁকে ইয়েমেন বা ইরানে অস্ত্র বিক্রি না করা

২ ঘণ্টা আগে

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দিলে সৌদির পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে জানান, সৌদির সাথে এই পারমাণবিক সহযোগিতা কেবল বেসামরিক কাজের জন্যই নির্ধারিত। তবে এর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ওপর।

৩ ঘণ্টা আগে

মোদির মন্ত্রিসভা থেকে রাভনীত সিং বিট্টুর পদত্যাগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে বিট্টু লেখেন, ‘ভারত সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দেশকে সেবা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ভারত এবং বিশেষ করে আমার প্রিয় পাঞ্জাবের মানুষের সেবা করা একটি বিরাট সৌভাগ্

৪ ঘণ্টা আগে

লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ

বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে। ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

৪ ঘণ্টা আগে