
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককেই নতুন মোড়ে নিয়ে যায়নি, বদলে দিয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির হিসাবও। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, ইরান এখন কার্যত যখন খুশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর সেটিই দেশটির হাতে এমন একটি কৌশলগত অস্ত্র তুলে দিয়েছে, যাকে ‘পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী’ বলে অভিহিত করছেন কোনো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা।
তিনটি গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংঘাত ইরানকে বুঝিয়ে দিয়েছে— হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে অচল করে দিলেই বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বিশাল ধাক্কা দেওয়া সম্ভব। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও ভবিষ্যতের যেকোনো সংকটে এই কৌশল আবারও ব্যবহার করতে পারে তেহরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হয়েছিল ইরান যুদ্ধ। ৪০ দিন পর যে যুদ্ধে বিরতি ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। তবে সে ঘোষণার পরও হামলা-পালটা হামলা থামেনি। ট্রাম্পের নানা হুমকি-ধমকির মধ্যে যুদ্ধের ১০০ দিন পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত রোববার ঘোষণা এসেছে, স্থায়ী একটি যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তির জন্য একমত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সেই বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ওই সমঝোতার অধীনে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা— চুক্তি বর্তমান সংকটের অবসান ঘটাতে পারলেও ভবিষ্যতের ঝুঁকি দূর করতে পারবে না।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, ‘আমরা কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে তুলে দিয়েছি— এটি পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী একটি অস্ত্র।’
সূত্রটির মতে, যুদ্ধ তেহরানের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। আগে হরমুজ বন্ধ করার হুমকি দিলেও এবার ইরান বাস্তবে তা করে দেখিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রয়োজন মনে করলে একই পথ আবারও বেছে নেওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কয়েক সপ্তাহের জন্যও এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় চাপের মুখে পড়ে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ইরান নৌ পথটি বন্ধ করে দিলে ঠিক সেই ঘটনাটিই ঘটে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়ে, ৬৫ ডলার থেকে ১২০ ডলারে পৌঁছে যায় অপরিশোধিত তেলের দাম (ব্রেন্ট ক্রুড)। তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেয় দেশে দেশে। এর প্রভাব গিয়ে পড়ে খাদ্য, পরিবহন থেকে শুরু করে সার্বিক অর্থনীতিতে।

এদিকে মিত্র দেশগুলো ভবিষ্যতে হরমুজে নিরাপত্তা টহল দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেও সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে শুক্রবারের চুক্তির পর খুলে গেলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না।
মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, শুধু হরমুজ নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় লক্ষ্যভিত্তিক হামলাও ইরানের কার্যকর ‘অসমমিত যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে এসব হামলা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল। ফলে ভবিষ্যতে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে না গিয়েও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ তৈরি করতে এই কৌশল ব্যবহার করতে পারে তেহরান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ পুরোপুরি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালাতে হয়েছে। এটিও দেখিয়েছে যে সংকট নিরসনে তেহরানের হাতে এখনও উল্লেখযোগ্য দরকষাকষির ক্ষমতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা ও চুক্তির অন্যান্য শর্ত মেনে চলার ওপরই নির্ভর করবে ইরানের সম্ভাব্য সুবিধা। তিনি বলেন, ইরান যতটা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে, যুক্তরাষ্ট্রও ততটাই ধাপে ধাপে নিজেদের অবরোধ ও সামরিক চাপ কমাবে। তার ভাষায়, ‘ইরান প্রতিশ্রুতি রাখলে তবেই তারা সুবিধা পাবে এবং পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় থাকবে।’
তবে অন্য একটি সূত্র বলেছে, হরমুজ বন্ধ করে ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোকেও অসন্তুষ্ট করেছে। তাই ভবিষ্যতে একই পদক্ষেপ নিলে ইরানকেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, সংঘাতের পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে অক্ষত রয়েছে। তাদের হাতে এখনো বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও শত শত দ্রুতগতির ছোট নৌ যান রয়েছে। এসব নৌ যান দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া, হয়রানি করা কিংবা সমুদ্রে মাইন পাতা সম্ভব।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন আরও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক শিল্প পুনর্গঠন করছে ইরান। শুধু তাই নয়, তারা এরই মধ্যে নতুন করে ড্রোন উৎপাদনও শুরু করেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশগুলোর একটি হলো ইয়েমেনের হুতিদের সম্ভাব্য ভূমিকা। সূত্রগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে ইরান হুথিদের ব্যবহার করে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অচল করার চেষ্টা করতে পারে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট।
একটি সূত্রের ভাষ্য, হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব— এই দুই প্রণালি একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
বর্তমানে হুতিরা মূলত ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে হামলার পরিধি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় জাহাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হলে সেটি হবে নতুন মাত্রার উত্তেজনা। গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেলে এই বিকল্প এখনও ইরানের হাতে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ছিল, হরমুজ বন্ধ করলে ইরানের ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি হবে। একই সঙ্গে তারা বিশ্বাস করেছিল, চীন তার প্রভাব ব্যবহার করে তেহরানকে এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখবে।
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলাকে অগ্রাধিকার দেয়, কিন্তু হরমুজ প্রণালি রক্ষায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়।
যুদ্ধ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্রের মন্তব্য, ‘হরমুজের নিয়ন্ত্রণ হারানোই এই সময়ের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল। কারণ এটি এমন একটি ট্রাম্পকার্ড, যার কার্যকর জবাব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। এখন এটি ফিরিয়ে আনতে হলে বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন ছাড়া উপায় নেই।’
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্য উল্লেখ করেন, তখন তেহরান এটিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। এরপরই তারা পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
একটি সূত্রের ভাষায়, ইরান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি; বরং কয়েক দিন অপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে তারপর পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি এরই মধ্যে আংশিকভাবে খুলে গেছে এবং শুক্রবার এটি পুরোপুরি চালু হবে। তার দাবি, ইরানের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতা হয়েছে, যেন প্রণালিটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং কোনো টোলও নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবি, ইরান বুঝতে পেরেছে যে হরমুজ ইস্যুতে তাদের প্রভাব কমে যাচ্ছে বলেই তারা আলোচনায় এসেছে।
তবে গোয়েন্দা মূল্যায়ন ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— ইরান এখন শুধু হরমুজ বন্ধ করার হুমকি দেয় না, বাস্তবেও তা কার্যকর করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছায়নি। তবে একাধিক সূত্রের মতে, ইরান খুব কম সামরিক সক্ষমতা ব্যয় করেই হরমুজ বন্ধ ও উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। এতে তেহরান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এ কারণেই ভবিষ্যতের যেকোনো আঞ্চলিক সংঘাতে হরমুজ প্রণালি আবারও ইরানের সবচেয়ে কার্যকর চাপ তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য সমঝোতা বর্তমান সংকট প্রশমিত করলেও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন স্পষ্ট করে দিচ্ছে— মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হতে পারে ইরানের নতুন অর্জিত কৌশলগত সক্ষমতা। হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এই নজির শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককেই নতুন মোড়ে নিয়ে যায়নি, বদলে দিয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির হিসাবও। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, ইরান এখন কার্যত যখন খুশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর সেটিই দেশটির হাতে এমন একটি কৌশলগত অস্ত্র তুলে দিয়েছে, যাকে ‘পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী’ বলে অভিহিত করছেন কোনো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা।
তিনটি গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংঘাত ইরানকে বুঝিয়ে দিয়েছে— হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে অচল করে দিলেই বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বিশাল ধাক্কা দেওয়া সম্ভব। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও ভবিষ্যতের যেকোনো সংকটে এই কৌশল আবারও ব্যবহার করতে পারে তেহরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হয়েছিল ইরান যুদ্ধ। ৪০ দিন পর যে যুদ্ধে বিরতি ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। তবে সে ঘোষণার পরও হামলা-পালটা হামলা থামেনি। ট্রাম্পের নানা হুমকি-ধমকির মধ্যে যুদ্ধের ১০০ দিন পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত রোববার ঘোষণা এসেছে, স্থায়ী একটি যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তির জন্য একমত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সেই বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ওই সমঝোতার অধীনে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা— চুক্তি বর্তমান সংকটের অবসান ঘটাতে পারলেও ভবিষ্যতের ঝুঁকি দূর করতে পারবে না।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, ‘আমরা কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে তুলে দিয়েছি— এটি পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী একটি অস্ত্র।’
সূত্রটির মতে, যুদ্ধ তেহরানের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। আগে হরমুজ বন্ধ করার হুমকি দিলেও এবার ইরান বাস্তবে তা করে দেখিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রয়োজন মনে করলে একই পথ আবারও বেছে নেওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কয়েক সপ্তাহের জন্যও এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় চাপের মুখে পড়ে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ইরান নৌ পথটি বন্ধ করে দিলে ঠিক সেই ঘটনাটিই ঘটে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়ে, ৬৫ ডলার থেকে ১২০ ডলারে পৌঁছে যায় অপরিশোধিত তেলের দাম (ব্রেন্ট ক্রুড)। তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেয় দেশে দেশে। এর প্রভাব গিয়ে পড়ে খাদ্য, পরিবহন থেকে শুরু করে সার্বিক অর্থনীতিতে।

এদিকে মিত্র দেশগুলো ভবিষ্যতে হরমুজে নিরাপত্তা টহল দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেও সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে শুক্রবারের চুক্তির পর খুলে গেলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না।
মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, শুধু হরমুজ নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় লক্ষ্যভিত্তিক হামলাও ইরানের কার্যকর ‘অসমমিত যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে এসব হামলা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল। ফলে ভবিষ্যতে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে না গিয়েও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ তৈরি করতে এই কৌশল ব্যবহার করতে পারে তেহরান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ পুরোপুরি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালাতে হয়েছে। এটিও দেখিয়েছে যে সংকট নিরসনে তেহরানের হাতে এখনও উল্লেখযোগ্য দরকষাকষির ক্ষমতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা ও চুক্তির অন্যান্য শর্ত মেনে চলার ওপরই নির্ভর করবে ইরানের সম্ভাব্য সুবিধা। তিনি বলেন, ইরান যতটা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে, যুক্তরাষ্ট্রও ততটাই ধাপে ধাপে নিজেদের অবরোধ ও সামরিক চাপ কমাবে। তার ভাষায়, ‘ইরান প্রতিশ্রুতি রাখলে তবেই তারা সুবিধা পাবে এবং পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় থাকবে।’
তবে অন্য একটি সূত্র বলেছে, হরমুজ বন্ধ করে ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোকেও অসন্তুষ্ট করেছে। তাই ভবিষ্যতে একই পদক্ষেপ নিলে ইরানকেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, সংঘাতের পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে অক্ষত রয়েছে। তাদের হাতে এখনো বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও শত শত দ্রুতগতির ছোট নৌ যান রয়েছে। এসব নৌ যান দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া, হয়রানি করা কিংবা সমুদ্রে মাইন পাতা সম্ভব।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন আরও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক শিল্প পুনর্গঠন করছে ইরান। শুধু তাই নয়, তারা এরই মধ্যে নতুন করে ড্রোন উৎপাদনও শুরু করেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশগুলোর একটি হলো ইয়েমেনের হুতিদের সম্ভাব্য ভূমিকা। সূত্রগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে ইরান হুথিদের ব্যবহার করে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অচল করার চেষ্টা করতে পারে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট।
একটি সূত্রের ভাষ্য, হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব— এই দুই প্রণালি একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
বর্তমানে হুতিরা মূলত ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে হামলার পরিধি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় জাহাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হলে সেটি হবে নতুন মাত্রার উত্তেজনা। গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেলে এই বিকল্প এখনও ইরানের হাতে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ছিল, হরমুজ বন্ধ করলে ইরানের ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি হবে। একই সঙ্গে তারা বিশ্বাস করেছিল, চীন তার প্রভাব ব্যবহার করে তেহরানকে এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখবে।
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলাকে অগ্রাধিকার দেয়, কিন্তু হরমুজ প্রণালি রক্ষায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়।
যুদ্ধ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্রের মন্তব্য, ‘হরমুজের নিয়ন্ত্রণ হারানোই এই সময়ের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল। কারণ এটি এমন একটি ট্রাম্পকার্ড, যার কার্যকর জবাব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। এখন এটি ফিরিয়ে আনতে হলে বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন ছাড়া উপায় নেই।’
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্য উল্লেখ করেন, তখন তেহরান এটিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। এরপরই তারা পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
একটি সূত্রের ভাষায়, ইরান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি; বরং কয়েক দিন অপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে তারপর পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি এরই মধ্যে আংশিকভাবে খুলে গেছে এবং শুক্রবার এটি পুরোপুরি চালু হবে। তার দাবি, ইরানের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতা হয়েছে, যেন প্রণালিটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং কোনো টোলও নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবি, ইরান বুঝতে পেরেছে যে হরমুজ ইস্যুতে তাদের প্রভাব কমে যাচ্ছে বলেই তারা আলোচনায় এসেছে।
তবে গোয়েন্দা মূল্যায়ন ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— ইরান এখন শুধু হরমুজ বন্ধ করার হুমকি দেয় না, বাস্তবেও তা কার্যকর করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছায়নি। তবে একাধিক সূত্রের মতে, ইরান খুব কম সামরিক সক্ষমতা ব্যয় করেই হরমুজ বন্ধ ও উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। এতে তেহরান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এ কারণেই ভবিষ্যতের যেকোনো আঞ্চলিক সংঘাতে হরমুজ প্রণালি আবারও ইরানের সবচেয়ে কার্যকর চাপ তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য সমঝোতা বর্তমান সংকট প্রশমিত করলেও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন স্পষ্ট করে দিচ্ছে— মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হতে পারে ইরানের নতুন অর্জিত কৌশলগত সক্ষমতা। হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এই নজির শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুক্তিটি দ্রুত ও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা। তিনি হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল ছাড়া অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান।
২০ ঘণ্টা আগে
এডওয়ার্ডস এয়ারফোর্স বেইসের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “রুটিন টেস্ট মিশনের অংশ হিসেবে বিমান বাহিনীর একটি বি-৫২ বম্বার এডওয়ার্ড বিমান ঘাঁটির রানওয়ে থেকে বেলা ১১টা ২০ মিনিটে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানটিতে চালকসহ মোট ৮ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের কেউই বেঁচে নেই।”
২০ ঘণ্টা আগে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি মানতে ইসরায়েল বাধ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গাভির। ওই চুক্তিতে লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধের শর্ত থাকলেও ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি এই নেতা হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া পর্যন্ত আরও তীব্র হামলা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে
১ দিন আগে
লেবাননের প্রেসিডেন্ট বলেন, এই সমঝোতা যেন কেবল কূটনৈতিক নথিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত হয়। এই সমঝোতায় যেন সহিংসতার চক্র শেষ হয়ে দেশটিতে শান্তি, নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
১ দিন আগে