সিইসির পদত্যাগের দাবি অব্যাহত, সোমবার দিল্লিতে বড় বিক্ষোভের ঘোষণা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ০৩
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। ২ অক্টোবর ২০২৬। ফাইল ছবি: এএনআই
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। ২ অক্টোবর ২০২৬। ফাইল ছবি: এএনআই

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন আরও জোরদার করতে যাচ্ছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। এ দাবিতে সোমবার দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন জোটের নেতারা। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ওই কর্মসূচিতে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

এর আগে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে গত মঙ্গলবার দিল্লিতে নির্বাচন সদন অভিমুখে মিছিল করেছিলেন বিরোধী জোটের নেতারা। ওই কর্মসূচিতে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী দলের একাধিক নেতা অংশ নেন। পরে গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ জানান জোটের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। এবার আন্দোলনের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে চান তারা।

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল জানিয়েছেন, সোমবার দিল্লিতে বড় পরিসরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে ‘ইন্ডিয়া’। কর্মসূচির বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়া প্রতিনিধিদলের সদস্যরাই এ উদ্যোগে থাকবেন বলে জানা গেছে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) জ্ঞানেশ কুমার ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বেণুগোপাল অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। তার দাবি, এই অবস্থান সরকারের পতনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বেণুগোপাল বলেন, ‘কোনো নেতার পতন আসন্ন হয়ে গেলে তিনি যে ভাবে আচরণ করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদীও তেমনই আচরণ করছেন। তিনি বিরোধী জোটের বিক্ষোভকে ভয় পাচ্ছেন।’ ভোটপ্রক্রিয়া অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেস ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি ওয়াংচুকের

এদিকে, দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরুর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন লাদাখের পরিবেশ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। আগামীকাল রোববারের মধ্যে সবাইকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় ধর্না, অনশন কিংবা মিছিলের মতো কর্মসূচি নিতে পারেন তিনি।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় ওয়াংচুক বলেন, ‘আজ দিল্লিতে বহু ছাত্রনেতা, যুবনেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক, এমনকি সাংসদদেরও আটক করা হয়েছে। গতকাল আমি অনুরোধ করেছিলাম, আজকের কর্মসূচিতে শান্তি বজায় রাখার জন্য। আমি ভেবেছিলাম, বিশ্বের সবেচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অনুমতি তো নিশ্চয়ই দেওয়া হবে। কিন্তু এখন দেখছি যেন একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে গোটা দেশে।’

কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া না হলে তিনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করবেন। ওয়াংচুক বলেন, ‘আমি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করতে বাধ্য হব। হতে পারে তা ধর্না, অনশন বা মিছিল। লেহ্‌তে হতে পারে, দিল্লিতেও হতে পারে। তবে আমার আশা, সরকার আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করবে এবং আমাদের এমন কোনও পদক্ষেপ করতে হবে না।’

এর আগে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের প্রতিবাদে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন ওয়াংচুক। আজ শনিবার সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল সিজেপি। এই কর্মসূচির সঙ্গে এবারও সংহতি জানিয়েছেন ওয়াংচুক। সরাসরি অংশ না নিলেও সিইসির পদত্যাগের দাবিকে সমর্থন করেছেন লাদাখের এই সমাজকর্মী।

গত ২ অক্টোবর মুম্বাই থেকে এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে সিজেপি। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওয়াংচুক বলেছিলেন, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হল একটি স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া। আমি এটিকে পূর্ণ সমর্থন করি।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যন্তর মন্তরে যখন আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন সিজেপি তুলনামূলক ভাবে ছোট ছিল। তখনও আমি ওদের পূর্ণ সমর্থন দিয়েছি। এখন ওদের কণ্ঠস্বর আরও দৃপ্ত হয়েছে। ওদের কণ্ঠস্বর গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেবে বলে আমি মনে করি।’

দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিল এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন পরিবর্তনের দাবিতে সিজেপি যন্তর মন্তরে কর্মসূচি ডাকলেও সেখানে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং আন্দোলনকারীদের আটক করতে অভিযান চালানো হয়।

বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে আটক হন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ বিরোধী দলের একাধিক নেতা। মমতার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন সাংসদকেও আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, সামিরুল ইসলাম ও সাকেত গোখলে।

সিপিআই-এম জানিয়েছে, পিনারাই বিজয়ন ছাড়াও দলটির সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, নেতা এম ভি গোবিন্দন মাস্টার, এ বিজয়রাঘবন, কে কে শৈলজা, জন ব্রিটাস, কে এন বালাগোপাল ও বৃন্দা কারাতকে আটক করেছে পুলিশ।

এ ছাড়া সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরা এবং দলের আইনি উপদেষ্টা আইনজীবী রত্না সিংহসহ কয়েক হাজার মানুষকে আটক করা হয়। আন্দোলনকারীদের যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দিতে দিল্লির বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়। বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যও মোতায়েন করা হয়।

ধ্রুব রাঠি ও তুষার গান্ধীকে আটক

দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার আগে হরিয়ানার গুরুগ্রামে নিজের বাসা থেকে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করে পুলিশ। শনিবার সকালে গুরুগ্রামের সেক্টর-৫৬-এর কেন্দ্রীয় বিহার সোসাইটিতে তার বাসায় যান দিল্লি ও গুরুগ্রাম পুলিশের সদস্যরা। পরে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

হিন্দুস্তান টাইমসকে পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দিতে ধ্রুব রাঠিকে দিল্লি যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। পুলিশের নির্দেশনা না মানায় তাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

অন্যদিকে, সিজেপির কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে মুম্বাইয়ে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার পথে আটক হন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র ও ‘হাম ভারত কে লগ’ সংগঠনের সভাপতি তুষার গান্ধী। শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটায় মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল তার সংগঠন। সেখানে যাওয়ার পথে বান্দ্রা এলাকা থেকে তাকে আটক করে ডিএন নগর থানায় নেওয়া হয়। তার এক সহযোগী ও সংগঠনটির সহসভাপতিকেও আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে কোনো আবেদন জমা পড়েনি। তাই ওই কর্মসূচির অনুমতিও দেওয়া হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তুষার গান্ধী তাকে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান।

আটক নেহা বোরাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ

সিজেপির কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে আটক হওয়া এআইএসএর কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরাকে পরে ছেড়ে দেয় পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, পুলিশ তার ফোন নিয়ে নিয়েছিল, পরে সেটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ময়দান গড়ি থানা থেকে আটক নারীদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

২৯ বছর বয়সী নেহা দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না পাওয়ার পর তিনি দিল্লি হাটে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেখানে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা তাকে রাখা পুলিশ বাসটি ঘিরে অবস্থান নেন।

এ ছাড়া দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদুয়ারা থেকে ৬০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। বিক্ষোভে যোগ দিতে এসে রাতে গুরুদুয়ারায় আশ্রয় নেওয়া এসব ব্যক্তি শনিবার সকালে কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে আটক হন।

সিজেপির আইনি উপদেষ্টা রত্না সিংহকেও আইনজীবীদের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন দলটির নেতা সৌরভ দাস। বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার পথে আইনজীবীদের আটকের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন।

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা রাহুল গান্ধীর

দিল্লিতে বিক্ষোভ ও ধরপাকড়ের ঘটনায় আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। শনিবার চেন্নাইয়ে শিক্ষার্থীদের একটি মতবিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, “সব নেতাকে গ্রেপ্তার করুন। সব তরুণকে গ্রেপ্তার করুন। আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করুন।”

“আমরা আপনাদের ঘিরে ফেলছি, আর পেছনে ফিরব না। আমার কথা মিলিয়ে নেবেন, আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আগেই আমরা পেয়ে গেছি...। ভারতের তরুণ সমাজ, আমি তোমাদের জন্য গর্বিত। প্রতিবাদ চালিয়ে যাও। আমরা তোমাদের পাশে আছি।”

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বাতিল এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন পরিবর্তনের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সোমবারের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন আরও জোরদার করার পরিকল্পনা করছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট।

সূত্র: আনন্দবাজার এবং হিন্দুস্তান টাইমস

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement