জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় মৃত বেড়ে ৫৮৯, নিখোঁজ প্রায় ৫০ হাজার

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ২৩: ০৮
জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় শত শত ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় শত শত ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৮০ জন মানুষ। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘ভিটিভি’তে এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।

সরকার পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, এখনো বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের তথ্য সংগ্রহে চালু করা একটি ওয়েবসাইটে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি মানুষের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। ফলে চলমান বিপর্যয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ভূমিকম্পের পর থেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছেন ভেনেজুয়েলার উদ্ধারকর্মীরা। তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মীদের দল যোগ দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানোর পর হতাহত ও নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান সামনে এলো।

এর আগে ১৯৬৭ সালের এক ভূমিকম্পে দেশটিতে ২৪০ জন নিহত হয়েছিলেন। সেটিই এতদিন ভেনেজুয়েলার আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হতো। এবারের দুর্যোগ সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

উদ্ধারকাজে বিদেশি সহায়তা, রাষ্ট্রীয় তৎপরতা নিয়ে ক্ষোভ

প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকার ব্যাপক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের ঘোষণা দিলেও অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরকারি সহায়তার অভাবে তাদের নিজেদের হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজতে হচ্ছে।

রাজধানীর উপকণ্ঠের উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বহুতল আবাসিক ভবনসহ অন্তত ১০০টি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধসে পড়েছে।

সাততলা একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা ১৯ বছর বয়সী ছেলেকে উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা ইয়ামিলেথ হিমেনেজ বলেন, ‘সে (ছেলে) কংক্রিটের নিচে আটকে আছে, কিন্তু তাকে বের করার মতো কোনো ভারী যন্ত্রপাতি নেই।’

ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় লা গুয়াইরায় বিধ্বস্ত একটি ভবনের চিত্র। ছবি: রয়টার্স
ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় লা গুয়াইরায় বিধ্বস্ত একটি ভবনের চিত্র। ছবি: রয়টার্স

তবে শুধু সরকারি সংস্থাই নয়, সাধারণ মানুষও দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। কারাকাস থেকে মোটরসাইকেল বহরে খাদ্য ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী লা গুয়াইরায় পাঠানো হয়েছে। ভ্যালেন্সিয়া শহর থেকেও রাতভর মোটরসাইকেলে করে স্বেচ্ছাসেবীরা খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় পৌঁছেছেন।

এ ছাড়া ৮০টি সুইস উদ্ধারকর্মীদল এবং মেক্সিকোর ত্রাণকর্মীরা উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে। স্পেনের উদ্ধারকর্মীরা এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ, পর্তুগালসহ আরও নানা দেশের উদ্ধাকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছানোর পথে রয়েছে।

কারাকাসে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত জরুরি সেবাকর্মীরা। ছবি: রয়টার্স
কারাকাসে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত জরুরি সেবাকর্মীরা। ছবি: রয়টার্স

উদ্ধারকারী দলগুলো আরও হতাহতদের খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ বলেছেন, ‘মানুষের জীবন বাঁচাতে আমরা অবিরাম কাজ করেছি।’ আন্তর্জাতিক সহায়তা ও উদ্ধারকারী দলের কাজের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বেশকিছু মানুষের জীবন রক্ষা করেছি।’

প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ জানান, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলো ‘লা গুয়াইরা’ রাজ্যে উদ্ধারকাজে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, এ অঞ্চলটিই ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো রাজধানী কারাকাস এবং লা গুয়াইরায় রাতভর অনুসন্ধান চালিয়েছে।

ভেনেজ়ুয়েলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদো জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অনেককে। তাদের বেশিরভাগকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। লা গুয়াইরার এক চিকিৎসক জানান, রাজ্যের প্রধান দুটো হাসপাতাল আহত মানুষে ভরে গেছে। সেখানে চিকিৎসা সরঞ্জামেরও মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।

এর আগে বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পর পর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলা। রিখটার স্কেলে প্রথমটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২, দ্বিতীয়টির ৭ দশমিক ৫। ১২৬ বছরের মধ্যে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প ছিল এটি।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ‘ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত ২১৪টি আফটারশক (পরাঘাত) হয়েছে।’ আতঙ্কে কারাকাস এবং শহরতলির বহু মানুষ খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছেন। বহু জায়গাতেই বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন। স্কুলগুলো আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্কুলের ভবনগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয় শিবির হিসাবে ব্যবহার করছে প্রশাসন।

মানবিক বিপর্যয় চরমে

দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়া ভেনেজুয়েলায় এই ভূমিকম্প মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ৭০ লাখ মানুষ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সংস্থাটি জরুরি আশ্রয় ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ শুরু করেছে।

কারাকাসের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী সুহাইল সারকুইজ বলেন, কয়েক মাস আগেই তিনি চাকরি হারিয়েছেন। এখন ভূমিকম্পে তার বাসভবনও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমার আর কিছুই নেই। আমি আর আমার ছেলে— আমাদের দেশে আর কোনো স্বজনও নেই।’

৬৪ বছর বয়সী আসবাব ব্যবসায়ী পেদ্রো পেরেজ বলেন, ভূমিকম্পে তিনি বাড়ি ও ব্যবসা— দুটিই হারিয়েছেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে রাস্তায় কাটাতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবকিছু হারিয়েছি। এখন শুধু দ্রুত সাহায্য পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’

অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে জানিয়েছে বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলো। একই সঙ্গে কারাকাস স্টক এক্সচেঞ্জ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে সেটিকে ত্রাণ সংগ্রহকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement