রাখাইনের বিভিন্ন শহরের নাম বদলের প্রস্তুতি আরাকান আর্মির

ক্রীড়া ডেস্ক
পাউকতাও ও মিনব্যা শহরের নতুন নামকরণ উপলক্ষ্যে ১ জুলাই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়। ছবি: আরাকান প্রিন্সেস মিডিয়া
পাউকতাও ও মিনব্যা শহরের নতুন নামকরণ উপলক্ষ্যে ১ জুলাই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়। ছবি: আরাকান প্রিন্সেস মিডিয়া

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের (শহর) মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণে থাকা জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) কয়েকটি শহরের নাম পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ সোমবার দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবদির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনের পরিচয় ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার উদ্যোগের অংশ হিসেবে পকতাও (Pauktaw) ও মিনব্যা (Minbya) শহরের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে আসা পকতাওয়ের নতুন নাম রাখা হচ্ছে ভীরট্টানি (Vīraṭṭhānī), যার অর্থ ‘বীরদের আবাস’। আর আগামী মাসে মিনব্যার নাম পরিবর্তন করে রাখা হবে অঞ্জনাপুরা (Añjanapura), অর্থাৎ ‘অঞ্জনার শহর’।

রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেমিও নদী প্রাচীনকালে অঞ্জনা নামে পরিচিত ছিল। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য দক্ষিণ চিন থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নদীটি বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। সাগরে পৌঁছানোর আগে এটি কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে।

আরাকান আর্মির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দ্য ইরাবদিকে জানিয়েছে, মংডু ও সিত্তে জেলার আরও কয়েকটি শহরের নামও পরিবর্তন করা হতে পারে। তবে সেগুলোর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

নতুন নামকরণ উপলক্ষ্যে ১ জুলাই পাউকতাও ও মিনব্যায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। ছবি: আরাকান প্রিন্সেস মিডিয়া
নতুন নামকরণ উপলক্ষ্যে ১ জুলাই পাউকতাও ও মিনব্যায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। ছবি: আরাকান প্রিন্সেস মিডিয়া

একটি সূত্র বলেছে, ‘আমরা শুনেছি, তারা অনেক শহরের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। আপাতত পকতাও ও মিনব্যা দিয়ে শুরু হচ্ছে। পরে আরও শহরের নাম বদলানো হতে পারে।’

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত চারটি প্রধান রাজবংশ— ধান্যাওয়াদি, ভেসালি, ল্যাংম্রো ও ম্রাউক-ইউ— এর শাসনে আরাকান (রাখাইন) রাজ্য সমৃদ্ধি লাভ করে। সে সময় রাজ্যটিতে ১৭টি রাজধানী এবং অসংখ্য শহর ছিল। প্রায় ২৪০ বছরেরও বেশি আগে বার্মিজদের কাছে এই রাজ্যের পতন ঘটে।

মিনব্যার সত্তরোর্ধ্ব এক বাসিন্দা বলেন, ‘এই নামগুলো ইতিহাস থেকে নেওয়া হয়েছে। ল্যাংম্রো ও ম্রাউক-ইউ যুগে মিনব্যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গনগর।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাম পরিবর্তনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ), গ্রিন আরাখা প্রকল্প এবং স্থানীয় তরুণরা পকতাও ও মিনব্যার সড়কের পাশে গাছ লাগানোর কর্মসূচি চালাচ্ছেন।

ইউএলএর অধীনে আরাকান আর্মি ইতোমধ্যে একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। এর অধীনে প্রশাসন, বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পৃথক বিভাগ রয়েছে।

সংগঠনটির শিক্ষা বিভাগ রাখাইন ভাষায় নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়নের কাজ করছে। এর মধ্যে দ্বাদশ শ্রেণির বার্মিজ ভাষার পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে রাখাইন ভাষার পাঠ্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, দ্বাদশ শ্রেণির রাখাইন ভাষার পাঠ্যক্রম ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। একজন শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘এ বছর এটি চালু হবে না। তবে সম্ভবত আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বাস্তবায়ন করা হবে।’

২০২৫ সালে আরাকান আর্মি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাখাইনের ১৪টি টাউনশিপ এবং পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের পালেতওয়া টাউনশিপকে পুনর্গঠন করে আটটি জেলায় ভাগ করেছে।

আরাকান আর্মির প্রধান তুন মিয়াত নাইং ২০২৭ সালের মধ্যে বাকি তিনটি টাউনশিপ— সিত্তে, কিয়াউকফিউ ও মানাউং দখলের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সিত্তে ও কিয়াউকফিউ এলাকায় এখনো সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ের শহরগুলোর সঙ্গে রাখাইন রাজ্যগুলোর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে যুক্ত করাই আরাকান আর্মির লক্ষ্য। একই সঙ্গে তারা রাখাইনের ইতিহাস পুনরুদ্ধার করে তা সমসাময়িক প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

রাখাইনের এক তরুণ দ্য ইরাবদিকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে তারা পুরোনো নাম ও ঐতিহাসিক পরিচয়গুলো ফিরিয়ে আনতে চায়। তবে আমাদের দৃষ্টিতে নাম বদলানোর চেয়ে মানুষকে সুশাসন ও নিরাপত্তা দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

আরাকান আর্মির এই উদ্যোগ মিয়ানমারের সামরিক সরকারের আগের কিছু পদক্ষেপের সঙ্গে মিল রয়েছে। ১৯৮৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এবং পরে থান শ্বের শাসনামলে দেশটির বিভিন্ন শহর ও সড়কের নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।

সে সময় রাজধানী নেপিদোর বিভিন্ন টাউনশিপের জন্য পালি ভাষার নাম বেছে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল ওত্তারাথিরি (উত্তরের সমৃদ্ধি), দাকখিনাথিরি (দক্ষিণের সমৃদ্ধি) এবং জেয়াথিরি (বিজয়ের সমৃদ্ধি)।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement