ইরানে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলার অভিযোগ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ইরানের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি দেশটির বেসামরিক ও গবেষণা অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েল-এর বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের অন্তত ৩০টি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এর মধ্যে রাজধানী তেহরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি-তে চালানো হামলাটি সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে। ইরানের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সোমবারের হামলায় একাধিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্র বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কেন্দ্রটিতে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ ডেটাবেইস এবং প্রায় দুই বছরের গবেষণার ফলাফল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মাসুদ তাজরিয়ি এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “শত্রুরা ইরানের মেধা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে ভয় পায়। আমাদের এআই সক্ষমতা থামিয়ে দিতেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।”

শুধু শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের উচ্চশিক্ষা খাতের ওপর পদ্ধতিগত আক্রমণ চালানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে—

পাস্তুর ইনস্টিটিউট: শতবর্ষ প্রাচীন এই চিকিৎসা গবেষণাকেন্দ্রেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়: এখানকার একটি ফটোনিক্স ল্যাবরেটরি ধ্বংস করা হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: এই প্রতিষ্ঠানের একটি স্যাটেলাইট উন্নয়ন ল্যাবরেটরি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হোসেন সিমাই সারাফ জানিয়েছেন, এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়, বরং একটি পুরো সভ্যতার মেধা ধ্বংসের চেষ্টা।

শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপের সামনে কর্তৃপক্ষ একটি ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়েছে যাতে লেখা—‘ট্রাম্পের সাহায্য পৌঁছে গেছে’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার দাবি করে আসছিলেন যে তারা ইরানি জনগণকে “সাহায্য” করতে চান। কিন্তু বেসামরিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেললাইন, সেতু এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোমা বর্ষণ করে তারা ইরানের ৯ কোটি মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছেন।’

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি—‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মরে যাবে’—ইরানিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও একতাবোধ তৈরি করে। ইরানি বেসামরিক অবকাঠামোর সামনে গিয়ে মানববন্ধন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস নেওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের প্রাণহানি এড়ানো গেলেও, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। স্টিল ফ্যাক্টরি ও পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টগুলো ধ্বংস হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। তেহরানের এক শিক্ষার্থী আল জাজিরাকে বলেন, ‘আপনি যদি একটি দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু আর বিজ্ঞান গবেষণাগারে হামলা চালানোকে জায়েজ মনে করেন, তবে আপনি যেকোনো অপরাধই করতে পারেন। আমাদের ভবিষ্যৎ চুরি করা হচ্ছে।’

বেসামরিক অবকাঠামোতে এই নির্বিচার হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করে। যদিও তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানসহ ১৫ জন শীর্ষ শিক্ষাবিদ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে বিবেচনা করে হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু ক্রমাগত ধ্বংসযজ্ঞের মুখে তাঁরাও পাল্টা প্রতিশোধের দাবি তোলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দম্ভ করে বলেছেন, ওয়াশিংটন আজ যুদ্ধ বন্ধ করলেও ইরানের পুনর্গঠনে ২০ বছর সময় লাগবে। আর যদি যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে ইরানকে আগের অবস্থায় ফিরতে ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বেসামরিক স্থাপনায় এই হামলাকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য করছে।

ইরানজুড়ে এখন কেবলই ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের গন্ধ। ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাধারণ ইরানিরা এখন কেবল বেঁচে থাকার এবং তাদের লুণ্ঠিত ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি হুথিদের

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের প্রতিবাদে এমন হুমকি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।

১৮ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি, তবে চুক্তি বহুদূর: ইরান

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধ শেষ করার লক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনায় তেহরানের অন্যতম আলোচক গালিবাফ বলেন, ‘আমরা এখনও চূড়ান্ত আলোচনা থেকে অনেক দূরে’।

১৮ ঘণ্টা আগে

হরমুজ প্রণালি এবার পুরোপুরি বন্ধের ঘোষণা ইরানের

আইআরজিসি জানিয়েছে, আগে নিরাপদ চলাচলের জন্য যে করিডোরটি নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, তার ওপরও এখন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। ইরানের বন্দর ও জাহাজগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।

২০ ঘণ্টা আগে

যেকোনো মুহূর্তে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে: ইরান

‘ওয়াশিংটন যেকোনো মুহূর্তে আবারও হামলা চালাতে পারে। তবে তা মোকাবিলায় মাঠে প্রস্তুত আছে ইরানের সেনারা।’ এসময় তিনি হরমুজ প্রণালি অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে বোকামি ও মূর্খতার সামিল বলেও মন্তব্য করেন।

২১ ঘণ্টা আগে