ব্রাজিলের আটলান্টিকে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বন উজাড়, তবু শঙ্কা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ১৮: ৪৬
ব্রাজিলের উত্তরপূর্ব জীববৈচিত্র্য অঞ্চলে অবস্থিত বনাঞ্চলের মাত্র ২০ শতাংশ এখন অবশিষ্ট রয়েছে। সেই অবশিষ্ট বনাঞ্চলের অধিকাংশই ১০০ হেক্টরের কম আয়তনের, যেগুলোর চারদিক আখের বাগানে ঘেরা। ছবি: আদ্রিয়ানো গাম্বারিনি

ব্রাজিলের সবচেয়ে হুমকির মুখে থাকা জীববৈচিত্র্য অঞ্চল ‘আটলান্টিক বনাঞ্চলে’ ২০২৫ সালে আট হাজার ৬৫৮ হেক্টর বন উজাড় হয়েছে। বন উজাড়ের এ পরিমাণ গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শুধু তাই নয়, ১৯৮৫ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের কোনো বছরে বন উজাড়ের পরিমাণ ১০ হাজার হেক্টরের নিচে নেমে এসেছে।

পরিবেশবাদীরা এই অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আটলান্টিক বনাঞ্চলে ‘শূন্য বন উজাড়’ অর্জন সম্ভব হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা এমন আশঙ্কাও করছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও আইনি পরিবর্তন এই অগ্রগতিকে উলটে দিতে পারে।

প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের এই বনাঞ্চল দেশটির সবচেয়ে জনবহুল জীবমণ্ডল। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এই অঞ্চলে বাস করে। এ ছাড়া রিও ডি জেনিরো ও সাও পাওলোর মতো বড় শহরও এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে পরিবেশবাদীদের মধ্যে বিশেষ করে ব্রাজিলের কংগ্রেসে সম্প্রতি অনুমোদিত তথাকথিত ‘ডেভাস্টেশন বিল’ ইস্যুতে উদ্বেগ বেড়েছে। পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, এই আইন পরিবেশ সুরক্ষার বিদ্যমান কাঠামোকে দুর্বল করে দেবে। পাশাপাশি আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থিদের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনাও নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা পুনর্নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। জনমত জরিপের তথ্য বলছে, তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসোনারোর ছেলে সিনেটর ফ্ল্যাভিও বলসোনারো, যাকে নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন পরিবেশ অধিকার কর্মীরা।

পরিবেশবাদী সংগঠন এসওএস মাতা আটলান্টিকার নির্বাহী পরিচালক লুইস ফার্নান্দো গেদেস পিন্টো বলেন, পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। কারণ ফ্ল্যাভিও বলসোনারো নির্বাচনে জয়ী হলে ব্রাজিল বৈশ্বিক পরিবেশ নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হারাতে পারে।

পিন্টো আরও বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে বন উজাড় মোকাবিলার নীতি আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু ফ্ল্যাভিও জিতলে সব জীবমণ্ডলেই বন উজাড় বেড়ে যাওয়ার পথে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ তিনি যে রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ধারণ করেন, সেটি তার বাবা জায়ার বলসোনারোর একই রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী বিজ্ঞানবিরোধী, জলবায়ুবিজ্ঞান অস্বীকার করে এবং প্রকৃতি ও বনকে উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে দেখে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসোনারোর ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের শাসনামলে বন উজাড় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ওই সময় আদিবাসী এলাকাগুলোতে অবৈধ স্বর্ণখনির বিস্তারও ঘটে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তার ছেলের নেতৃত্বে আবারও সেই পরিবেশ ধ্বংসাত্মক নীতিতে ফিরে যেতে পারে ব্রাজিল।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দুটি আলাদা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বন উজাড় কমার তথ্য উঠে এসেছে। চার দশক ধরে পরিচালিত একটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৪ হাজার ৩৬৬ হেক্টর থেকে ২০২৫ সালে বন উজাড় ৪০ শতাংশ কমে আট হাজার ৬৫৮ হেক্টরে নেমে এসেছে। বলসোনারোর প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরের প্রতি বছর ২০ হাজার হেক্টরের বেশি বন উজাড় হয়েছিল।

অন্য এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ২৮ শতাংশ বন উজাড় কমে যাওয়াত তথ্য উঠে এসেছে। এ পর্যবেক্ষণে বন উজাড়ের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৩০৩ হেক্টর থেকে কমে ৩৮ হাজার ৩৮৫ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০২২ সালে। এতেও গত বছরই সবচেয়ে কম বন উজাড় হয়েছে বলে উঠে এসেছে।

এসওএস মাতা আটলান্টিকা বলছে, দুটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার পরিসংখ্যানের পার্থক্যের কারণ হলো ব্যবহৃত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। নতুন ব্যবস্থাটি বেশি নির্ভুল, আর পুরোনোটি দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণে কার্যকর।

তবে বন উজাড় কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ নয় বলে সতর্ক করেছেন পিন্টো। তিনি বলেন, ‘বন উজাড় এখনো অনেক বেশি। আটলান্টিক বনাঞ্চলে হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি বনখণ্ডই বিশাল পার্থক্য তৈরি করে।’

আয়তনের দিক থেকে আটলান্টিক বনাঞ্চল ব্রাজিলের তৃতীয় বৃহত্তম জীবমণ্ডল। অ্যামাজন রেইনফরেস্ট ও সেরাদোর পরেই এর অবস্থান। তবে এটিই সবচেয়ে বেশি নগরায়িত ও ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল। বর্তমানে আটলান্টিক বনাঞ্চলের মাত্র ২৪ শতাংশ মূল বনভূমি অবশিষ্ট আছে। তুলনায় অ্যামাজনের প্রায় ৮০ শতাংশ ও সেরাদোর প্রায় ৫০ শতাংশ বনভূমি এখনো টিকে আছে।

পিন্টোর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো জনচাপ, নাগরিক সমাজের আন্দোলন, পরিবেশনীতি ও আইন প্রয়োগ অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যেই ‘শূন্য বন উজাড়’ অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।

তবে সেই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন পরিবেশ আইন। সমালোচকদের মতে, গত শতকের আশির দশকে পরিবেশগত অনুমোদন বাধ্যতামূলক হওয়ার পর এটি ব্রাজিলের পরিবেশ আইনের সবচেয়ে বড় পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্ট লুলা আইনের কিছু অংশে ভেটো দিলেও ২০২৫ সালের শেষ দিকে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ রক্ষণশীল আইনপ্রণেতারা সেই ভেটো বাতিল করে দেন।

নতুন আইনে বন উজাড়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফেডারেল পরিবেশ সংস্থার পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষই এখন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

এসওএস মাতা আয়লান্টিকার জননীতি পরিচালক মালু রিবেইরো বলেন, এই আইন একটি ‘বিকৃত সিদ্ধান্ত’, যা ব্রাজিলকে প্যারিস চুক্তির (২০১৫ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে কপ২১- এ গৃহীত এবং ২০১৬ সালের ৪ নভেম্বর কার্যকর) লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেবে এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

রিবেইরো ভাষায়, ‘এখন সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো দুর্বল করে দেওয়া মানে বহু বছর ধরে গড়ে তোলা সব অর্জনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।’

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

চীনে এনভিডিয়ার এইচ-২০০ চিপ বিক্রির অনুমোদন দিল যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠানকে এনভিডিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এআই চিপ এইচ-২০০ কেনার অনুমোদন দিয়েছে। তবে অনুমোদন মিললেও এখন পর্যন্ত একটি চিপও সরবরাহ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি। ফলে বহুল আলোচিত এই প্রযুক্তি চুক্তি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে।

৫ ঘণ্টা আগে

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠককে ‘চমৎকার’ বললেন ট্রাম্প

ট্রাম্পের সঙ্গে এই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা, যাদের মধ্যে টেসলার ইলন মাস্ক ও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং রয়েছেন।

৬ ঘণ্টা আগে

পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে গরুসহ সব ধরনের পশু জবাই নিষিদ্ধ

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার নতুন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অনুমোদিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারি পশু চিকিৎসকের দেওয়া ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো পশু জবাই করা যাবে না। এই নিয়ম গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর, পুরুষ ও স্ত্রী মহিষ, মহিষের বাছুর এবং খোজা মহ

৬ ঘণ্টা আগে

উত্তর প্রদেশে ঝড় ও বজ্রপাতে ৫৬ প্রাণহানি

বিভিন্ন জেলার তথ্য অনুযায়ী, প্রয়াগরাজে ১৭ জন, ভাদোহিতে ১৬ জন, ফতেহপুরে ৯ জন, বড়াউনে ৫ জন, প্রতাপগড়ে ৪ জন, চন্দৌলি ও কুশীনগরে ২ জন করে এবং সোনভদ্র জেলায় ১ জন মারা গেছেন।

৮ ঘণ্টা আগে