হরমুজে ফি বসানোর আলোচনা ইউরোপে, মালাক্কা মডেল চায় ওমান

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ১৩: ১৩
মালাক্কা প্রণালিতে চলাচলরত এলএনজি ট্যাংকার। হরমুজ প্রণালিতেও মালাক্কা মডেল অনুসরণের একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে তৈরি করেছে ওমান। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
মালাক্কা প্রণালিতে চলাচলরত এলএনজি ট্যাংকার। হরমুজ প্রণালিতেও মালাক্কা মডেল অনুসরণের একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে তৈরি করেছে ওমান। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানকে অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য চাপ দিচ্ছে, ঠিক তখনই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের জন্য ফি আরোপের আলোচনা শুরু করেছে ইউরোপ। একই সময়ে ওমানও মালাক্কা প্রণালির নীতিমালা অনুসরণ করে হরমুজের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যা ব্যাখ্যা করতে তেহরানে আইন বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে।

শনিবার (১১ জুলাই) দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, ইউরোপের আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের জন্য অর্থ নেওয়া যেতে পারে। তবে এ অর্থ পরিশোধ বাধ্যতামূলক হবে না এবং সমুদ্র পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী জাতিসংঘের সংস্থার সমর্থন থাকতে হবে।

ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, বাধ্যতামূলকভাবে কোনো ধরনের টোল আরোপ করা হলে তা হবে ‘বিপর্যয়কর’। তবে তার মন্ত্রিসভার কয়েকজন সহকর্মীর মতে, নির্দিষ্ট নৌ-চলাচল সহায়তা সেবার জন্য অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলপথে আগে থেকেই রয়েছে। মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেল তার উদাহরণ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এ নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর আর কোনো হামলা হবে না। তাদের দাবি, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণেই সমঝোতায় পৌঁছানো এবং তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার ওমান সফর করবেন। সেখানে হরমুজ প্রণালি ও নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হবে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, গত এক-দুই মাস ধরে ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনারই ধারাবাহিকতায় এ সফর হচ্ছে।

অন্যদিকে গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তার দৃষ্টিতে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি ‘শেষ হয়ে গেছে’। তবে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।

এর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি তাকে হত্যার চেষ্টা করে, তাহলে ‘ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে লক্ষ্য করে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রয়েছে।’

হরমুজ প্রণালির চলাচলযোগ্য জলসীমার বেশির ভাগই ওমানের নিয়ন্ত্রণে এবং দেশটি বাধ্যতামূলক টোলের বাইরে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের পরিপন্থিভাবে ইরানকে প্রণালিটির ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ দেওয়া মানে হবে, যে কোনো সময় এটি দখল করতে চাওয়া উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর কাছে সবাইকে কার্যত জিম্মি করে দেওয়া।

তবে ওমানের বিকল্প পরিকল্পনার পরিধি হয়ত ইরানের, বিশেষ করে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এক কূটনীতিক বলেন, আইআরজিসির একটি অংশ মনে করে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর অবৈধ হামলা চালিয়েছে। তাই তাদের প্রশ্ন, সমুদ্রবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার প্রয়োজন কী? আবার অন্য একটি অংশ সহযোগিতা করতে চায়। অর্থাৎ তেহরানের ভেতরে এ বিষয়ে বিভক্তি রয়েছে।

এদিকে প্রস্তাবিত ফি বাস্তবে বাধ্যতামূলক হবে কি না, তা স্পষ্ট করতে আঞ্চলিক দেশগুলোও ইরানের ওপর চাপ দিচ্ছে।

লন্ডনে ইরানের দূতাবাস জানিয়েছে, স্বাধীনভাবে প্রস্তুত করা এনার্জি পলিসি রিসার্চ গ্রুপের প্রস্তাবগুলোতে তাদের আগ্রহ রয়েছে।

ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে স্বচ্ছ সেবা ফি চালু করা হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সহযোগিতায় উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে এতে বলা হয়, এটি এমন কোনো সাধারণ টোল নয়, যা শুধু প্রণালি দিয়ে যাওয়ার কারণে জাহাজগুলোর ওপর আরোপ করা হবে।

বৃহস্পতিবার লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিলের বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত প্রণালিগুলো দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচলের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপের কোনো ভিত্তি নেই।

তবে তিনি বলেন, ওমান স্বেচ্ছাভিত্তিক এমন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী, যা নৌ-চলাচল সহায়তা সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত হবে এবং এর মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা, দূষণের ঝুঁকি কমানো এবং জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারে সংঘর্ষ কিংবা অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী মালাক্কা প্রণালির পরিচালনা কাঠামো নিয়ে ওমানের বিস্তারিত গবেষণা। মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালির সহযোগিতা ব্যবস্থার ওপর আইএমও কাউন্সিলে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর এক লাখ ২০ হাজারের বেশি জাহাজ ওই প্রণালি অতিক্রম করে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই সহযোগিতা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে এমন একটি সুসংগঠিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রণালিতে উদ্ভূত নতুন ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং পরিবেশগত অগ্রাধিকারগুলো যৌথভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে জাপানের স্বেচ্ছা অনুদান এই ব্যবস্থাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

লন্ডনের ওই বৈঠকে উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের জোট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার জন্য ইরানের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব আনে। তবে রাশিয়া ও চীন সেটির সমর্থন দেয়নি।

রাশিয়ার বক্তব্য, এই মুখোমুখি অবস্থান তৈরির প্রস্তাবে সংকটের মূল কারণ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে চীন বলেছে, প্রস্তাবটি একপেশে এবং এটি আইএমওর দায়িত্বসীমারও বাইরে চলে গেছে।

এই প্রস্তাব আসে এমন এক সপ্তাহে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ১৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের দাবি, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌযানের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে হয়রানি করার ইরানের সক্ষমতা ধ্বংস করতেই এসব হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়।

এক কূটনীতিকের মতে, নতুন করে সংঘাত শুরুর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো, প্রণালি পুনরায় চালুর সময় সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ। অন্যটি দীর্ঘমেয়াদে এই নৌপথ কীভাবে পরিচালিত হবে এবং মালাক্কা প্রণালির মডেল ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না।

গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির আলোচনার রোডম্যাপ হিসেবে ব্যবহৃত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পঞ্চম ধারায় বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং ৬০ দিন পর্যন্ত কোনো ধরনের অর্থ নেবে না।

এতে আরও বলা হয়, কারিগরি ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই সমঝোতা স্মারকের অর্থ এই নয় যে, ইরানের অনুমতি কিংবা তেহরান নির্ধারিত পথ ব্যবহার করেই কেবল জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে।

এ ছাড়া সমঝোতা স্মারকে ওমানকে সঙ্গে নিয়ে হরমুজ প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসার প্রতিশ্রুতিও দেয় ইরান।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌবাহিনী দাবি করে, তারা তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করেছে।

আইএমওর মহাসচিব আর্সেনিও ডমিনগেজ মনে করেছিলেন, দক্ষিণ দিকের নৌপথ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি ইরানের সম্মতি পেয়েছেন। এর ফলে প্রণালিতে আটকে থাকা হাজারো নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু যদি এমন কোনো সম্মতি থেকেও থাকে, পরে তেহরান তা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে জাতিসংঘের সংস্থাটি তাদের পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে দক্ষিণ দিকের নৌপথ ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ দিয়ে ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের নিরাপদ যাতায়াতে সহায়তা করেছে।

আইআরজিসির নৌবাহিনী বলেছে, ‘আমরা আবারও জানিয়ে দিচ্ছি, এই ভূখণ্ড বা হরমুজ প্রণালিতে বিদেশিদের কোনো ভূমিকা নেই।’

এখন কূটনীতিকরা খতিয়ে দেখছেন, তেহরান কি জাহাজের জট কমাতে সব জাহাজকে ইরানের কাছাকাছি উত্তর দিকের নৌপথ ব্যবহার করতে বাধ্য করছে, নাকি দক্ষিণ দিকের নৌপথ ব্যবহারের আগে সব জাহাজকে ইরান ও তাদের পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে বলছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement