ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে নাকচ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ১৩: ৩৮
মার্কিন কংগ্রেস ভবন। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধে নিয়োজিত মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ডেমোক্র্যাটদের আনা একটি প্রস্তাব দেশটির সিনেটে নাকচ হয়ে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক ভোটে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। এমন এক সময়ে প্রস্তাবটি বাতিল হলো, যার পরদিন আজ শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার ওপর একটি আইনি বাধ্যবাধকতার সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছে।

শুক্রবার (১ মে) মার্কিন সাময়িকী টাইমের খবরে বলা হয়েছে, সিনেটে প্রস্তাবটি ৪৭-৫০ ব্যবধানে পরাজিত হয়। ফলে আট সপ্তাহে গড়িয়ে যাওয়া ইরান যুদ্ধের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আরও একটি সুযোগ হারাল কংগ্রেস।

রিপাবলিকান পার্টির মাত্র দুজন সদস্য— মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর সুসান কলিন্স ও কেন্টাকির র‍্যান্ড পল দলীয় অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ ধরনের প্রস্তাবে রিপাবলিকানদের সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে কলিন্সই প্রথম। অন্যদিকে, পেনসিলভানিয়ার জন ফেটারম্যান একমাত্র ডেমোক্র্যাট হিসেবে প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজ্যুলেশন’ অনুযায়ী, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ১ মে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা এবং বিশেষ আইনি গুরুত্ব বহন করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক সিদ্ধান্ত সীমিত করতে এই আইন প্রণয়ন করা হয়। আইন অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট যদি মার্কিন বাহিনীকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিয়োজিত করেন, তবে কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা বা সামরিক ব্যবহারের অনুমোদন না দিলে ৬০ দিনের মধ্যে সেই অভিযান বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে নিরাপদে সেনা প্রত্যাহারের খাতিরে সর্বোচ্চ ৩০ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন ২ মার্চ কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক অভিযানের বিষয়ে অবহিত করে, সেই হিসেবে আজ শুক্রবার ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। কংগ্রেসের অনুমোদন বা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কোনো প্রত্যয়ন না থাকলে, অনেক আইনপ্রণেতা ও বিশেষজ্ঞ মনে করছেন— আজকের পর কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ফেডারেল আইন লঙ্ঘনের শামিল হবে।

ভোটের পর এক বিবৃতিতে সিনেটর কলিন্স বলেন, ‘সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতারও সীমা রয়েছে। সংবিধান যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে কংগ্রেসকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছে, এবং ওয়ার পাওয়ার্স আইন ৬০ দিনের একটি স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। এটি কোনো পরামর্শ নয়, এটি আইনি বাধ্যবাধকতা।’

তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ‘স্পষ্ট লক্ষ্য, অর্জনযোগ্য উদ্দেশ্য এবং সংঘাতের সমাপ্তির কৌশল’ থাকা প্রয়োজন। সেই যুক্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিপক্ষে তিনি ভোট দিয়েছেন।

তবে সিনেটের এই ভোটে স্পষ্ট হয়েছে, আইনপ্রণেতারা এখনো এমন পদক্ষেপ নিতে অনাগ্রহী। গত দুই মাসে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনকে যুদ্ধ বন্ধ বা অনুমোদন নিতে বাধ্য করতে একাধিক প্রস্তাব তুললেও সবকটিই ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের মধ্যে নিজ দলের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতা কম দেখা যাচ্ছে।

এদিকে সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় কংগ্রেসে আলোচনার ধরণ কিছুটা বদলাচ্ছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে কয়েকজন এই ৬০ দিনের সময়সীমাকে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন এবং প্রশাসনের কাছ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাখ্যা আশা করছেন।

ডেমোক্র্যাটদের আনা প্রস্তাবে সমর্থন দিতে অনেক রিপাবলিকান অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে সীমিত অনুমোদন বা স্থলবাহিনীর ওপর বিধিনিষেধের কথা বলছেন, আবার কেউ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০ দিনের অতিরিক্ত সময় নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন।

অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তারা এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেট শুনানিতে বলেন, ‘বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চলছে, এবং আমাদের বোঝাপড়া অনুযায়ী, এই সময়ে ৬০ দিনের সময়সীমা স্থগিত থাকে।’

তবে ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে বলেন, ‘আইন এমনটা সমর্থন করে না। ৬০ দিনের সময়সীমা আগামীকাল (শুক্রবার) শেষ হচ্ছে, যা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তৈরি করবে।’

আইনগতভাবে পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটরা এখন আরও কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনা করছেন। কয়েকজন আইনপ্রণেতা সময়সীমা পেরিয়েও সামরিক অভিযান চললে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন, যা ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে সাংবিধানিক সংঘাত তৈরি করতে পারে।

কনেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেন, ‘আইনি পদক্ষেপ বিবেচনা করতেই হবে।’ তবে অনেকে সতর্ক করে বলেছেন, আদালত এ ধরনের বিষয়ে হস্তক্ষেপে অনীহা দেখাতে পারে। তবুও ডেমোক্র্যাটদের একাংশ মনে করছেন, কোনো পদক্ষেপ না নিলে এই আইন কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

উল্লেখ্য, ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে প্রণীত এই আইন এখনো পর্যন্ত কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সামরিক অভিযান বন্ধে বাধ্য করতে পারেনি। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস বারবার ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে— যা আবারও স্পষ্ট হলো সাম্প্রতিক এই ভোটে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বেইজিংয়ে ড্রোন বিক্রি-ওড়ানোয় কঠোর বিধিনিষেধ, আজ থেকে কার্যকর

চীন সরকার ড্রোন এবং ‘ফ্লাইং ট্যাক্সি’ প্রযুক্তিকে তাদের কৌশলগত ‘লো-অল্টিটিউড ইকোনমি’ বা নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতি এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাত থেকে দুই ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ২৯০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও রয়েছে দেশটির।

৫ ঘণ্টা আগে

ফের শুরু হতে পারে ইরান যুদ্ধ

কয়েকদিন ধরে যুদ্ধবিরতি, শান্তি আলোচনা আর চুক্তি নিয়ে কথা বলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের ইরানে যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। চুপ থাকেনি ইরানও। বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে পালটা আঘাত করতে পিছপা হবে না তারা।

৬ ঘণ্টা আগে

ইরানে ‘স্বল্পমেয়াদি কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার পরিকল্পনা, ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষা

ইরানে ‘স্বল্পমেয়াদি কিন্তু শক্তিশালী’ একগুচ্ছ হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি এবং হরমুজ প্রণালি আংশিক খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের তিন স্তরের শান্তি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করার পর এ হামলার পরিকল্পনাটি সামনে এনেছে সেন্টকম।

১৯ ঘণ্টা আগে

পারস্য উপসাগর ও হরমুজে নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে: মোজতবা খামেনি

ইরানের সঙ্গে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।

২০ ঘণ্টা আগে