অবশেষ সমঝোতার পথে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় কী আছে?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ১৯: ০৮
সমঝোতা চুক্তির 'শেষ প্রান্তে' ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: সংগৃহীত

চলমান শান্তি আলোচনায় দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি সমঝোতা চুক্তির একেবারে ‘শেষ প্রান্তে’ পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হবে। এই সময়ে বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি ফের উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং ইরান কোনো বাধা ছাড়াই বিশ্ববাজারে তেল বিক্রি করতে পারবে। একই সঙ্গে এই ৬০ দিনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

রোববার (২৪ মে) হোয়াইট হাউজের একটি মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। অ্যাক্সিওস বলছে, চুক্তিটি বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারের ওপর থেকে এক বিশাল চাপ কমিয়ে দেবে। তবে এই সাময়িক সমঝোতা শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শর্তানুযায়ী একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পারমাণবিক চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

রোববারের মধ্যেই ঘোষণার সম্ভাবনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সব কিছু ঠিক থাকলে আজ রোববারের মধ্যেই এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং যেকোনো মুহূর্তে ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মার্কিন কর্মকর্তা চুক্তির খসড়ার বিস্তারিত রূপরেখা অ্যাক্সিওসের কাছে তুলে ধরেছেন, যার বেশিরভাগ তথ্যই আলোচনার সাথে যুক্ত অন্যান্য একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত করা না হলেও তেহরানও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে।

চুক্তিতে আসলে কী থাকছে?

খসড়া অনুযায়ী, শুরুতেই উভয় পক্ষ একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ) সই করবে, যার মেয়াদ হবে ৬০ দিন। পরবর্তীতে দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই মেয়াদের সময়সীমা আরও বাড়ানো যাবে।

এই ৬০ দিনের মেয়াদ চলাকালে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ টোলমুক্ত ঘোষণা করা হবে। জাহাজ চলাচলের পথ পুরোপুরি নিরাপদ ও উন্মুক্ত করতে প্রণালিতে নিজেদের পুঁতে রাখা সমস্ত মাইন অপসারণ করতে রাজি হয়েছে ইরান। বিনিময়ে, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনী যে কঠোর অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল, তা প্রত্যাহার করবে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি ইরান যাতে অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে, সেজন্য কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হবে।

মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, এই ছাড়ের ফলে নিশ্চিতভাবেই ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতি এক বড় ধরনের সঞ্জীবনী রসদ পাবে; তবে এটি একই সাথে ধুঁকতে থাকা বৈশ্বিক তেলের বাজারেও বিশাল স্বস্তি এনে দেবে। হোয়াইট হাউজের ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইরানিরা যত দ্রুত মাইন অপসারণ করে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে, মার্কিন নৌ অবরোধও তত দ্রুত তুলে নেওয়া হবে।’

ওই কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মূল নীতিই হলো ‘কাজের ভিত্তিতে ছাড়’। ইরান চেয়েছিল চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা সমস্ত তহবিল অবমুক্ত করা হোক এবং স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। কিন্তু মার্কিন পক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে— তেহরানের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও বাস্তবসম্মত অগ্রগতি দেখার পর পরই কেবল তা করা হবে।

পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা বাকি

সমঝোতা স্মারকে ইরানের পক্ষ থেকে এই প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এ ছাড়া তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করা এবং ইতোমধ্যে মজুত করা উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তারা আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং পারমাণবিক উপাদান ত্যাগের বিষয়ে ইরান ঠিক কতটুকু ছাড় দিতে প্রস্তুত, সে সম্পর্কে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনকে একটি মৌখিক আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তেহরান। এর বিপরীতে, এই ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা মার্কিন ডলারের তহবিল ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে এই পদক্ষেপগুলো তখনই কার্যকর করা হবে, যখন একটি চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে এবং তা আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, বিগত মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সেনা ও নৌবহর মোতায়েন করা হয়েছিল, তা এই ৬০ দিন অঞ্চলেই অবস্থান করবে। চূড়ান্ত চুক্তি নিশ্চিত হলেই কেবল মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সেখান থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

নেপথ্যের গুঞ্জন ও নেতানিয়াহুর উদ্বেগ

সমঝোতা স্মারকে এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে এই চুক্তির আওতায় লেবাননে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার চলমান যুদ্ধেরও অবসান ঘটবে। একটি ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, গতকাল শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে এই শর্তটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি চুক্তির আরও কয়েকটি দিক নিয়ে আপত্তি তোলেন।

তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু তার আপত্তিগুলো সম্মান ও নম্রতার সঙ্গেই ট্রাম্পকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি কোনো ‘একপেশে যুদ্ধবিরতি’ হবে না। হিজবুল্লাহ যদি পুনরায় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার বা নতুন করে হামলা চালানোর চেষ্টা করে, তবে ইসরায়েলকে তা প্রতিহত করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হবে। সহজ কথায়— হিজবুল্লাহ শান্ত থাকলে, ইসরায়েলও শান্ত থাকবে।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিবির (নেতানিয়াহু) নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ থাকতে পারে, কিন্তু ট্রাম্পকে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির কথা সবার আগে চিন্তা করতে হচ্ছে।’

যেভাবে সমঝোতার ‘শেষ প্রান্তে’ দুই দেশ

শনিবার এক বিশেষ কনফারেন্স কলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ কয়েকজন আরব ও মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে এই চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আলোচনার সাথে যুক্ত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, কনফারেন্সে অংশ নেওয়া সব নেতাই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদও চুক্তির পক্ষে সায় দিয়েছেন। এ ছাড়া সৌদি আরব, কাতার, মিসর, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারাও এই কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন, যারা প্রত্যেকেই এই দীর্ঘ কূটনৈতিক মধ্যস্থতার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত।

তবে এই সমঝোতার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান। দেশটির সেনাপ্রধাম ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত শুক্র ও শনিবার টানা দুই দিন তেহরানে অবস্থান করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজি করাতে এবং চুক্তিটিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বাস্তবতা হলো, বিগত দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক দোলাচলের মধ্যে ছিলেন। একদিকে তিনি এই চুক্তির পক্ষে কূটনৈতিক আলোচনা চালাচ্ছিলেন, অন্যদিকে ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা চালানোর পরিকল্পনাও করছিলেন। তবে শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ তিনি সামরিক আগ্রাসনের পথ থেকে সরে এসে কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই ঝুঁকে পড়েন।

হোয়াইট হাউজ আশা করছে, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার ছোটখাটো মতবিরোধগুলো দূর হয়ে যাবে এবং আজ রোববারের মধ্যেই একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা আসবে।

অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তারা এ-ও হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বুঝতে পারে ইরান পারমাণবিক আলোচনা নিয়ে নাটক করছে, তবে এই চুক্তি ৬০ দিনও টিকবে না। অন্যদিক, ওয়াশিংটনের বিশ্বাস— ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরানের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। নিজেদের অবরুদ্ধ থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পেতে এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে ইরান শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী চুক্তিতে আসতে বাধ্য হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'ইরান শেষ পর্যন্ত কতটা ছাড় দিতে রাজি হয়, তা দেখা বেশ আকর্ষণীয় হবে। তবে তারা যদি সত্যিই তাদের বর্তমান পথ পরিবর্তন করতে চায়, তবে এই ৬০ দিনের পরবর্তী ধাপটি তাদের রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।'

ট্রাম্পের উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো যদি পুরোপুরি পূরণ হয়, তবে ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করতে দ্বিধা করবেন না। তিনি মনে করেন, ইরানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ‘অভূতপূর্ব’; আর সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে তিনি তেহরানকে সব ধরনের সুযোগ দিতে রাজি।

রাজনীতি/আইআর

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মাদ্রিদে বিক্ষোভ

বিক্ষোভের একপর্যায়ে একদল আন্দোলনকারী প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সরকারি বাসভবন মনক্লোয়া প্যালেস-এর চারপাশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। স্প্যানিশ টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাওয়ার মূল সড়কে মুখোশধারী একদল লোককে পুলিশ বাধা দিচ্ছে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্

৮ ঘণ্টা আগে

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ব্যাপক মিসাইল হামলা

কিয়েভের সামরিক প্রশাসক তৈমুর তাকাচেঙ্কো টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, কিয়েভ বড় মিসাইল হামলার মধ্যে আছে। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেন।

৯ ঘণ্টা আগে

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’: ট্রাম্প

চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, হামলা পুনরায় শুরু করার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েও তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধে তা ‘স্থগিত’ করেছেন।

১০ ঘণ্টা আগে

হোয়াইট হাউজের বাইরে গুলি, সন্দেহভাজন নিহত

এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তিনি হলেন একুশ বছর বয়সী নাসেয়ার বেস্ট।

১০ ঘণ্টা আগে