
সপ্তর্ষি বসাক

বুধবার রাত, ঘড়িতে তখন সাড়ে ৮টা বাজতে আর কয়েক মিনিট বাকি। জনতার উপস্থিতিতে যন্তর মন্তর তখন আন্দোলনে মুখর। আন্দোলনস্থলের একটি প্রবেশপথের কাছে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। এরপর যা দেখলাম, তা ছিল অসাধারণ, যদিও তা গত ৭২ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না।
টিয়ার গ্যাসের আঘাতে ছত্রভঙ্গ হওয়া মানুষগুলো কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও বড় সংখ্যায় ফিরে এলো। তারা ঠিক সেই জায়গাতেই বসে পড়ল, যেখানে টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়েছিল। এবং সেখান থেকে সরতে অস্বীকৃতি জানাল। শেষ পর্যন্ত যখন তারা নড়ল, তখন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেল— কেউ মূল আন্দোলনস্থলের দিকে হাঁটতে শুরু করল, কেউ স্লোগান দিতে লাগল, আবার কেউ ঢোলের তালে নাচতে শুরু করল।
২০ জুলাইয়ের দমন-পীড়নের মাধ্যমে যদি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে মানুষকে আন্দোলন থেকে নিরুৎসাহিত করা, তাহলে পরবর্তী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ফল হয়েছে ঠিক উলটো। সোমবার আন্দোলনস্থল খালি করে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যন্তর মন্তরের আন্দোলন আবার গড়ে ওঠে। পরদিনও সেখানে মানুষের অবিরাম ঢল নামে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে ভিড় এতটাই বেড়ে যায় যে অনেক সময় বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের সারি ভেতরের জনসমাগমের প্রায় সমান হয়ে পড়ে। বুধবার সন্ধ্যায় সেই ভিড় আরও বেড়ে যায়। আন্দোলনস্থলে মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে স্বেচ্ছাসেবকেরা মানবশৃঙ্খল গড়ে তোলেন।
শিক্ষা খাতের সংস্কারের দাবিতে স্লোগানের মধ্যেই অপেক্ষমাণ মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছিল নাশতা, জুস ও পানি। লাউডস্পিকারে বাজছিল গান, যেন অপেক্ষার সময়টুকু কিছুটা স্বস্তিতে কাটে। দিল্লি ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সমর্থকেরা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে পুরো খাবারের ব্যবস্থা করে পাঠাচ্ছিলেন। আবার কেউ কেউ নীরবে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করে দিচ্ছিলেন।
এসবই ইঙ্গিত দেয়, আন্দোলনটি এখন নিজস্ব শক্তিতে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি আর শুধু আয়োজকদের ওপর নির্ভর করছে না, বরং হাজারও মানুষ একে নিজেদের আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করেছে। সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করার পর ২৫ দিন পেরিয়ে গেছে। তিনি এখনো হাসপাতালে।
এর মধ্যে আমি অন্তত ছয়বার যন্তর মন্তরে গেছি। এই সময়ে আমি দেখেছি, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি ধাপে ধাপে বড় হয়েছে। শুরুতে অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছিল। ১৮ জুলাই ওয়াংচুককে জোর করে আন্দোলনস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর তা হঠাৎ বেড়ে যায়। আর ২০ জুলাই, যেদিন তিনি ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির ডাক দেন, সেদিন তা বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু ২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, এত বড় আন্দোলনের জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না।
১৯ জুলাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ফোন এসেছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল কোথায় দেখা যাবে তা জানতে নয়, বরং ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি কোথায় হবে, কখন হবে, সঙ্গে কী নেওয়া উচিত— এসব জানতে। ইনস্টাগ্রাম খুললেই মনে হয়, সেখানে আন্দোলনের আপডেট, লাইভস্ট্রিম আর যন্তর মন্তর নিয়ে মিম ছাড়া আর কিছুই নেই।
এর মানে এই নয় যে ভারত কোনো নতুন রাজনৈতিক জাগরণের সাক্ষী হচ্ছে। বড়-ছোট নানা আন্দোলন আসে, আবার চলে যায়। কিছু আন্দোলন রাষ্ট্রকে দাবিদাওয়া মেনে নিতে বাধ্য করে, আবার অনেক আন্দোলনের পরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না। কিন্তু এই গল্পের মূল বিষয় মানুষ আন্দোলন করেছে— তা নয়। বরং বিষয়টি হলো, যারা সাধারণত ‘রাজনীতি করে না’, তারাই হঠাৎ অংশ নিতে চেয়েছে।
অনেকের কাছে নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস এবং সরকার যেভাবে বিষয়টি সামলেছে, তা ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি ইস্যু। কিন্তু ২০ জুলাইয়ের বিশাল জনসমাগম এবং পুলিশি দমন-পীড়ন দেখার পরও বহু মানুষের আবার যন্তর মন্তরে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত একটি ভিন্ন প্রশ্ন সামনে আনে— কী এমন ঘটল, যার ফলে তারা একজন পর্যবেক্ষক থেকে একজন অংশগ্রহণকারীতে পরিণত হলো?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক তত্ত্ব এমন দুটি কাঠামো দেয়, যা আন্দোলনের এই আকস্মিক গতি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘প্রাইভেট ট্রুথ, পাবলিক লাইস’ গ্রন্থে অর্থনীতিবিদ তিমুর কুরান ‘প্রেফারেন্স ফ্যালসিফিকেশন’ বা ‘পছন্দের ভান’ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তার মতে, মানুষ প্রায়ই নিজের প্রকৃত মতামত প্রকাশ করে না— কখনো প্রতিক্রিয়ার ভয় থেকে, কখনো সামাজিক অবস্থান রক্ষার জন্য, আবার কখনো নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখাতে। কিন্তু কোনো বড় জনসম্মুখের ঘটনা মানুষের সেই ধারণা বদলে দিতে পারে। তখন তারা এতদিন লুকিয়ে রাখা মত প্রকাশে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সে দৃষ্টিকোণ থেকে ২০ জুলাই হয়তো ছিল সেই প্রথম দিন, যেদিন অনেকেই মনে করেছিল, ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ্যে তুলে ধরা এখন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, এমনকি প্রয়োজনীয়ও।
তবে এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কেন অংশগ্রহণ তুষারধসের মতো বাড়তে থাকল। নিজের মত প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত আর বাস্তবে রাস্তায় নেমে আসার সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী মার্ক গ্রানোভেটার তার ‘থ্রেশহোল্ড মডেল অব কালেক্টিভ বিহ্যাবিয়র’ তত্ত্বে বলেন, মানুষ তখনই কোনো সম্মিলিত কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, যখন তার নিজস্ব ‘সীমা’ অতিক্রম হয়। অর্থাৎ, যখন সে দেখে যথেষ্টসংখ্যক মানুষ এরই মধ্যে অংশ নিয়েছে। মানুষ শুধু প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয় না, তারা এটাও বিচার করে, অন্যরা কতটা এগিয়ে এসেছে।
একবার পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ প্রকাশ্যে এগিয়ে এলে, যাদের অংশ নেওয়ার মানসিক সীমা তুলনামূলক বেশি, তারাও যোগ দিতে শুরু করে। এভাবেই একধরনের ধারাবাহিক বিস্তার ঘটে। যারা সাধারণত কেবল দর্শক ছিল, তারা যখন দেখল তাদের মতো অন্যরাও ২০ জুলাইয়ের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন হয়তো তারা মনে করল, অংশগ্রহণের সামাজিক ও ব্যক্তিগত মূল্য এখন অনেক কমে গেছে। এ কারণেই সম্ভবত এই সপ্তাহে যন্তর মন্তরে কেবল কয়েকটি স্বার্থগোষ্ঠী নয়, সমাজের নানা স্তরের মানুষকে দেখা গেছে।
কুরান ও গ্রানোভেটারের তত্ত্ব যদি সঠিক হয়, তাহলে ২০ জুলাই হয়তো সেই দিন, যেদিন আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিজেই সামাজিকভাবে সংক্রামক হয়ে উঠেছিল। সে ক্ষেত্রে সোনম ওয়াংচুক ও সিজেপির গুরুত্ব শুধু তারা কী দাবি তুলেছেন, তাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা এমন এক জনগোষ্ঠীকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছেন, যারা আগে এর বাইরে ছিল।
বুধবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে যখন আমি যন্তর মন্তর ছাড়ি, তখনো স্বেচ্ছাসেবকেরা মানুষকে আসার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। কেউ ক্লান্ত আন্দোলনকারীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন। কেউ আবার চাটাই পেতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ছিল গান গাওয়ার, কথা বলার, সবকিছু নথিবদ্ধ করার, অচেনা মানুষের দিকে হেসে তাকানোর, একসঙ্গে রসিকতা করার এবং চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিকে যেন গা না করার এক অদ্ভুত উদ্দীপনা। সবচেয়ে বড় কথা, তারা সেখানে থাকতে পেরে সত্যিই আনন্দিত বলে মনে হচ্ছিল।
তাহলে ২০ জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এই যে, এই আন্দোলনের ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এতে মানুষের অংশগ্রহণ। এই তরুণেরা হয়তো এক রাতেই কোনো আদর্শিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়নি। কিন্তু অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তারা রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত থাকার অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
লেখক: সাংবাদিক, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

বুধবার রাত, ঘড়িতে তখন সাড়ে ৮টা বাজতে আর কয়েক মিনিট বাকি। জনতার উপস্থিতিতে যন্তর মন্তর তখন আন্দোলনে মুখর। আন্দোলনস্থলের একটি প্রবেশপথের কাছে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। এরপর যা দেখলাম, তা ছিল অসাধারণ, যদিও তা গত ৭২ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না।
টিয়ার গ্যাসের আঘাতে ছত্রভঙ্গ হওয়া মানুষগুলো কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও বড় সংখ্যায় ফিরে এলো। তারা ঠিক সেই জায়গাতেই বসে পড়ল, যেখানে টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়েছিল। এবং সেখান থেকে সরতে অস্বীকৃতি জানাল। শেষ পর্যন্ত যখন তারা নড়ল, তখন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেল— কেউ মূল আন্দোলনস্থলের দিকে হাঁটতে শুরু করল, কেউ স্লোগান দিতে লাগল, আবার কেউ ঢোলের তালে নাচতে শুরু করল।
২০ জুলাইয়ের দমন-পীড়নের মাধ্যমে যদি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে মানুষকে আন্দোলন থেকে নিরুৎসাহিত করা, তাহলে পরবর্তী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ফল হয়েছে ঠিক উলটো। সোমবার আন্দোলনস্থল খালি করে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যন্তর মন্তরের আন্দোলন আবার গড়ে ওঠে। পরদিনও সেখানে মানুষের অবিরাম ঢল নামে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে ভিড় এতটাই বেড়ে যায় যে অনেক সময় বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের সারি ভেতরের জনসমাগমের প্রায় সমান হয়ে পড়ে। বুধবার সন্ধ্যায় সেই ভিড় আরও বেড়ে যায়। আন্দোলনস্থলে মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে স্বেচ্ছাসেবকেরা মানবশৃঙ্খল গড়ে তোলেন।
শিক্ষা খাতের সংস্কারের দাবিতে স্লোগানের মধ্যেই অপেক্ষমাণ মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছিল নাশতা, জুস ও পানি। লাউডস্পিকারে বাজছিল গান, যেন অপেক্ষার সময়টুকু কিছুটা স্বস্তিতে কাটে। দিল্লি ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সমর্থকেরা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে পুরো খাবারের ব্যবস্থা করে পাঠাচ্ছিলেন। আবার কেউ কেউ নীরবে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করে দিচ্ছিলেন।
এসবই ইঙ্গিত দেয়, আন্দোলনটি এখন নিজস্ব শক্তিতে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি আর শুধু আয়োজকদের ওপর নির্ভর করছে না, বরং হাজারও মানুষ একে নিজেদের আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করেছে। সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করার পর ২৫ দিন পেরিয়ে গেছে। তিনি এখনো হাসপাতালে।
এর মধ্যে আমি অন্তত ছয়বার যন্তর মন্তরে গেছি। এই সময়ে আমি দেখেছি, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি ধাপে ধাপে বড় হয়েছে। শুরুতে অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছিল। ১৮ জুলাই ওয়াংচুককে জোর করে আন্দোলনস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর তা হঠাৎ বেড়ে যায়। আর ২০ জুলাই, যেদিন তিনি ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির ডাক দেন, সেদিন তা বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু ২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, এত বড় আন্দোলনের জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না।
১৯ জুলাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ফোন এসেছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল কোথায় দেখা যাবে তা জানতে নয়, বরং ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি কোথায় হবে, কখন হবে, সঙ্গে কী নেওয়া উচিত— এসব জানতে। ইনস্টাগ্রাম খুললেই মনে হয়, সেখানে আন্দোলনের আপডেট, লাইভস্ট্রিম আর যন্তর মন্তর নিয়ে মিম ছাড়া আর কিছুই নেই।
এর মানে এই নয় যে ভারত কোনো নতুন রাজনৈতিক জাগরণের সাক্ষী হচ্ছে। বড়-ছোট নানা আন্দোলন আসে, আবার চলে যায়। কিছু আন্দোলন রাষ্ট্রকে দাবিদাওয়া মেনে নিতে বাধ্য করে, আবার অনেক আন্দোলনের পরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না। কিন্তু এই গল্পের মূল বিষয় মানুষ আন্দোলন করেছে— তা নয়। বরং বিষয়টি হলো, যারা সাধারণত ‘রাজনীতি করে না’, তারাই হঠাৎ অংশ নিতে চেয়েছে।
অনেকের কাছে নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস এবং সরকার যেভাবে বিষয়টি সামলেছে, তা ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি ইস্যু। কিন্তু ২০ জুলাইয়ের বিশাল জনসমাগম এবং পুলিশি দমন-পীড়ন দেখার পরও বহু মানুষের আবার যন্তর মন্তরে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত একটি ভিন্ন প্রশ্ন সামনে আনে— কী এমন ঘটল, যার ফলে তারা একজন পর্যবেক্ষক থেকে একজন অংশগ্রহণকারীতে পরিণত হলো?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক তত্ত্ব এমন দুটি কাঠামো দেয়, যা আন্দোলনের এই আকস্মিক গতি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘প্রাইভেট ট্রুথ, পাবলিক লাইস’ গ্রন্থে অর্থনীতিবিদ তিমুর কুরান ‘প্রেফারেন্স ফ্যালসিফিকেশন’ বা ‘পছন্দের ভান’ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তার মতে, মানুষ প্রায়ই নিজের প্রকৃত মতামত প্রকাশ করে না— কখনো প্রতিক্রিয়ার ভয় থেকে, কখনো সামাজিক অবস্থান রক্ষার জন্য, আবার কখনো নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখাতে। কিন্তু কোনো বড় জনসম্মুখের ঘটনা মানুষের সেই ধারণা বদলে দিতে পারে। তখন তারা এতদিন লুকিয়ে রাখা মত প্রকাশে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সে দৃষ্টিকোণ থেকে ২০ জুলাই হয়তো ছিল সেই প্রথম দিন, যেদিন অনেকেই মনে করেছিল, ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ্যে তুলে ধরা এখন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, এমনকি প্রয়োজনীয়ও।
তবে এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কেন অংশগ্রহণ তুষারধসের মতো বাড়তে থাকল। নিজের মত প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত আর বাস্তবে রাস্তায় নেমে আসার সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী মার্ক গ্রানোভেটার তার ‘থ্রেশহোল্ড মডেল অব কালেক্টিভ বিহ্যাবিয়র’ তত্ত্বে বলেন, মানুষ তখনই কোনো সম্মিলিত কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, যখন তার নিজস্ব ‘সীমা’ অতিক্রম হয়। অর্থাৎ, যখন সে দেখে যথেষ্টসংখ্যক মানুষ এরই মধ্যে অংশ নিয়েছে। মানুষ শুধু প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয় না, তারা এটাও বিচার করে, অন্যরা কতটা এগিয়ে এসেছে।
একবার পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ প্রকাশ্যে এগিয়ে এলে, যাদের অংশ নেওয়ার মানসিক সীমা তুলনামূলক বেশি, তারাও যোগ দিতে শুরু করে। এভাবেই একধরনের ধারাবাহিক বিস্তার ঘটে। যারা সাধারণত কেবল দর্শক ছিল, তারা যখন দেখল তাদের মতো অন্যরাও ২০ জুলাইয়ের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন হয়তো তারা মনে করল, অংশগ্রহণের সামাজিক ও ব্যক্তিগত মূল্য এখন অনেক কমে গেছে। এ কারণেই সম্ভবত এই সপ্তাহে যন্তর মন্তরে কেবল কয়েকটি স্বার্থগোষ্ঠী নয়, সমাজের নানা স্তরের মানুষকে দেখা গেছে।
কুরান ও গ্রানোভেটারের তত্ত্ব যদি সঠিক হয়, তাহলে ২০ জুলাই হয়তো সেই দিন, যেদিন আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিজেই সামাজিকভাবে সংক্রামক হয়ে উঠেছিল। সে ক্ষেত্রে সোনম ওয়াংচুক ও সিজেপির গুরুত্ব শুধু তারা কী দাবি তুলেছেন, তাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা এমন এক জনগোষ্ঠীকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছেন, যারা আগে এর বাইরে ছিল।
বুধবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে যখন আমি যন্তর মন্তর ছাড়ি, তখনো স্বেচ্ছাসেবকেরা মানুষকে আসার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। কেউ ক্লান্ত আন্দোলনকারীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন। কেউ আবার চাটাই পেতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ছিল গান গাওয়ার, কথা বলার, সবকিছু নথিবদ্ধ করার, অচেনা মানুষের দিকে হেসে তাকানোর, একসঙ্গে রসিকতা করার এবং চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিকে যেন গা না করার এক অদ্ভুত উদ্দীপনা। সবচেয়ে বড় কথা, তারা সেখানে থাকতে পেরে সত্যিই আনন্দিত বলে মনে হচ্ছিল।
তাহলে ২০ জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এই যে, এই আন্দোলনের ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এতে মানুষের অংশগ্রহণ। এই তরুণেরা হয়তো এক রাতেই কোনো আদর্শিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়নি। কিন্তু অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তারা রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত থাকার অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
লেখক: সাংবাদিক, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

ছোটবেলা থেকেই জাম্বুরা দিয়ে কিংবা খড়ের বল বানিয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেছি এবং তা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে গেছি অনার্স পরীক্ষার প্রায় তিন মাস আগ পর্যন্ত। ফুটবল ছাড়া ক্রিকেট, হকি ও দৌড় প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব প্রদর্শন না করতে পারলেও পাকিস্তান অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম।
৬ দিন আগে
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কোনো স্বয়ংক্রিয় অর্জন নয়। এটি অর্জন করতে হয় সুশাসন, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের ইতিবাচক শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সামনে এখনও সেই সুযোগ রয়েছে। এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
৬ দিন আগে
কী আছে চাকমা ভাষা ও হরফে রচিত পাঠ্যবইগুলোতে? বইগুলো পর্যালোচনায় অসংখ্য ভুল, অসঙ্গতি ও মানহীন রচনা পাওয়া গেছে। রয়েছে ভুলে ভরা বানান, শব্দের অপপ্রয়োগ, দুর্বল লিখনশৈলী ও ধারাবাহিকতার অভাব। পেশাদারিত্বের বিশাল অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ভিনভাষার ছড়াকে অনুকরণ করে চাকমারূপ দেওয়া হয়েছে। এখানে কিছু অসঙ
১২ দিন আগে
অশালীন ভাষার এই বিস্তার কেবল আবেগের বহির্প্রকাশ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। যখন কোনো গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ককে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে অপমান, কুরুচি ও যৌন ইঙ্গিতের দিকে নিয়ে যায়, তখন প্রকৃত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়। নীতির আলোচনা হারিয়ে যায়, জবাবদিহি দুর্বল হয়, আর জনপরিসর
১৫ দিন আগে