৫ আগস্ট: ইতিহাস নির্মাণের গণঅভ্যুত্থান দিবস

এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৩১

ইতিহাস বদলে দিয়ে ইতিহাস নির্মাণের গণঅভ্যুত্থান দিবস ৫ আগস্ট। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের এই দিনে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন সরকারপ্রধান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার সম্মিলিত আন্দোলনে শাসকের মোড়কে জড়িয়ে থাকা এক স্বৈরাচারের পতন হয়। দীর্ঘ শাসনে সবাইকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিলেন শেখ হাসিনা। তার সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। আর রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের বাইরে অন্য সব দল সরকারবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।

ছাত্র-জনতা ও মেহনতি মানুষের অভ্যুত্থানের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এ বছর এর দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের স্বৈরাচারী-ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয় এই দিনে। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঐতিহাসিক এই পটপরিবর্তনের দগদগে স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বাস্তবে কার্যত একটি নির্বাচনের ছদ্মাবরণে ‘একনায়কতান্ত্রিক’ সরকারে পরিণত হয়েছিল। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে বাস্তবিক অর্থে আর কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। এই সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের দুটি হয়েছে অনেকটা একতরফাভাবে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচনের আগের রাতে প্রশাসন ও সরকারি দলের কর্মীবাহিনী ভোট কেটে নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষাকে কবর দিয়েছিল।

আর ২০২৪ সালের নির্বাচনটি ছিল একেবারেই ‘আমি-তুমি-ডামি’ নির্বাচন। জনগণের ভোটাধিকাররের কফিনে শেষ পেরেক মারা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের সময়টাতে মানুষ আসলে ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার বা মতামত জানানোর কোনো অধিকার পায়নি। দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আওয়ামী লীগ যেটা করেছে, জোরজবরদস্তি করে একটা কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করল। জনগণের কোনো রায় তারা নেয়নি। ফলে জনগণের সমর্থনও ছিল না তাদের পেছনে। প্রশাসনকে ব্যবহার করে জবরদস্তি করে ভুয়া নির্বাচন করে তারা ক্ষমতায় ছিল।”

১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকার শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, বিরোধী গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভিন্নমত কঠোর হাতে দমন করেছে। বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, দখলে নেওয়া হয়েছে অথবা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনা বা শেখ মুজিববিরোধী বক্তব্য পোস্ট করার জেরে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই দমনের জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো আইন করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, শেখ হাসিনার সরকার ও পুলিশ বাহিনী মিলে পুরো দেশকে একটি ‘মাফিয়া স্টেটে’ পরিণত করেছিল। আর এসবের জন্য সবসময়ই সরকারি প্রশাসনযন্ত্র, পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা বাহিনী, এমনকি বিচার বিভাগকেও ব্যবহার করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত দেশবাসীর মতো আমার মতো কোটি মানুষকে দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয়েছিল। নিজে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সরকারি বাহিনী ও সরকারি দলের সমর্থকদের হুমকির মুখে ছিলাম। ঠিক তেমনই একজন পিতা হিসেবেও সর্বক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত পার করতে হয়েছে। জ্যেষ্ঠ পুত্র মাহিন ও একমাত্র কন্যা মাহিমা— দুজনই ছাত্র-অভ্যুত্থানের সমর্থক হিসেবে মাঠে অবস্থান করছিল। তাদের সহকর্মী রাহুল, প্রিয়তাকে সঙ্গে নিয়ে বন্ধুদের একটি গ্রুপ প্রতিনিয়ত রাজপথের আন্দোলনে সোচ্চার ছিল। রামপুরা থেকে বনশ্রী পর্যন্ত তখন চলছিল সরকারি বাহিনী ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণ। নির্বিচারে হামলায় আহত হচ্ছিল আমার সন্তানের মতো আরও অনেক সন্তান। সে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।

একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা, আর এরই মধ্যে অন্য বাবা-মায়েদের মতো নিজের সন্তানদের জন্য উদ্বিগ্ন থাকা— সব মিলিয়ে সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তখন পরিস্থিতি এমনই ছিল যে, নিজের সন্তানদেরও আন্দোলনে যেতে বাধা দেওয়ার মতো নৈতিক অবস্থান কোনো বাবা-মায়েরই ছিল না। মাহিন-মাহিমার প্রশ্ন ছিল, “বাবা, আমার ভাই-বোন, সহযোদ্ধারা মাঠে; আমরা তো ঘরে থাকতে পারি না।” একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার সন্তানদের আন্দোলনের মাঠে যেতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। যদিও আন্দোলন-পরবর্তী বিজয়ের পর জুলাই-আগস্টের চেতনাকে নিয়ে কোনো ব্যবসা বা সুবিধা নেওয়ার প্রয়োজন তারা বোধ করেনি। এটাই আমার সন্তুষ্টি।

৪ আগস্ট গভীর রাতে কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানির সঙ্গে। তিনি অনেকটা নিশ্চিন্তভাবেই বললেন, সরকারের পতন অনিবার্য। এই ফ্যাসিবাদী সরকার তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে পারবে না। তিনি কারাবন্দি এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, সিনিয়র সহকারী সদস্যসচিব এবিএম খালিদ হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদাসহ বিরোধী দলের নেতাদের খোঁজখবর নেন।

৫ আগস্ট সকালেও সরকারের পেটোয়া বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হামলা অব্যাহত রাখে। এ সময় খবর আসে, আমার ছেলে ছররা গুলিতে আহত। খুব চিন্তিত হয়ে যখন চোখ দিয়ে অশ্রু বের হচ্ছে, ঠিক তখনই খবর আসে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করছেন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ঢেউয়ে রাজপথ যেন জনতার স্রোতে পরিণত হয়। সবার চোখেমুখে সে কী আনন্দ! আমার চোখের অশ্রু তখন আনন্দের, নাকি বেদনার— বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ ছেলের কল মোবাইলে। “বাবা, আমরা বিজয়ী হয়েছি। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছে, পালিয়ে যাচ্ছে।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি এবং আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাসীদের হামলা ও গুলিতে শহিদ হয়েছেন আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ বহু শিক্ষার্থী এবং নানা পেশার প্রায় হাজারেরও বেশি মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে চোখের আলো নিভে গেছে ৪০০ জনের। মারাত্মক জখম ও আহত হয়েছেন ২৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে অনেককেই। এখনো শরীরে বুলেটের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন হাজারো মানুষ। এত ত্যাগের বিনিময়েই বিজয় এনে দিয়েছে আমাদের সন্তানরা।

স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও এই নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ নানা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছে। তারা হয়তো এটা উপলব্ধি করতে পারছে না, এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে তাদের আন্দোলন ও অর্জন— সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। এই পরিবর্তনের ফলে দেশের প্রাপ্তির খাতায় যুক্ত হয়েছে বাকস্বাধীনতা, ভয়ের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এক নতুন সুযোগ।

০৩. ইতিহাসে লেখা হলো, ৫ আগস্ট ২০২৪— শেখ হাসিনার পতন। সঙ্গে একটি নতুন বাংলাদেশের সূচনা। অনেকের জন্য এটা ছিল নতুন আশা, নতুন শুরু আর পুনর্গঠনের সুযোগ। তবে দিনটি একই সঙ্গে অন্য কিছুরও সূচনা করেছিল— বিশৃঙ্খলা। প্রতিটি সূচনার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজস্ব একটি ঝড় আসে। অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার জয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও হাসিনা ও তার পরিবার পিছিয়ে থাকতে রাজি হননি। পুরো শেখ পরিবার দেশ ছাড়লেও বারবার হয়েছেন সংবাদের শিরোনাম। এখনো মাঝেমধ্যেই শিরোনাম হন। দেশের বাইরে থেকেও বিশৃঙ্খলার ঘূর্ণিঝড় তৈরি করার চেষ্টা করছেন। রহস্যময় ফোনকল, উদ্ভট অভিযোগ, রাজনৈতিক নাটকীয়তা এবং ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা— কী ছিল না গত দুই বছরে?

একসময় শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। আর সেখানে তিনি পৌঁছেছিলেন ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই। ইতিহাসে এ রকম দৃষ্টান্ত বিরল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এমন পরিবর্তন হলো, যেটা অনেকেই ভাবতে পারেননি। শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা একেবারেই শূন্যের কোটায় চলে আসে। ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো পাঁচ দশক পরে— ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। মোসাহেব ও মৌ-লোভীদের দ্বারা ঘেরা শেখ হাসিনা ভেবেছিলেন, দিন এভাবেই যাবে। কিন্তু মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কী ঘটিয়ে দিতে পারে, সেটা সম্ভবত ২৪ ঘণ্টা আগেও তিনি অনুধাবন করতে পারেননি।

শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ থেকে গণঅভ্যুত্থানে জুলাই মাস জুড়ে আন্দোলন ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। রাজপথ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। আমাদের সন্তানদের মুখে ছিল— ‘জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকে গুলি করে’, ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইকে ফিরিয়ে দে’, ‘লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’, ‘চেয়ে দেখ এই চোখের আগুন, এই ফাল্গুনেই হবে দ্বিগুণ’, ‘আমি কে, তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’। অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে প্রবল জনরোষের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ভারতের দিল্লিতে পালিয়ে যান।

তার পতনের দিন ঢাকাসহ সারা দেশে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং আনন্দ প্রকাশ করে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদেরই কেউ কেউ মনে করছেন, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে নিজের এত দিনের রাজনৈতিক অর্জন ধ্বংস করলেন। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলেছেন। ৫ আগস্ট এটাই প্রমাণ করেছে যে, কোনো স্বৈরাচারী শাসনই শেষ পর্যন্ত জনগণের ইচ্ছার কাছে পরাজিত হয়, হতে বাধ্য হয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন রূপ নেয় একটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে, যা দীর্ঘদিনের একটি স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। যদিও আন্দোলনের পথ রক্তাক্ত ছিল, তবুও এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করেছে।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, অপহরণ, ভোটাধিকার হরণসহ সব ধরনের অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম ও আপামর জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই বৈষম্যমূলক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করাই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য। একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন করে জুলাই-আগস্টের চেতনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন অবশ্যই করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা যদি ছিনতাই হয়ে যায়, তাহলে আবারও দেশে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের জন্ম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই চেতনার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একটি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ। আজকের এই দিনে এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা— সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে।

লেখক: কলাম লেখক, রাজনৈতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

শিক্ষায় সংকট, বেকারত্বের হতাশা— জিডিপি বাড়লেও ফুঁসছে ভারতের তরুণরা

দুপুর অনেক আগেই গড়িয়ে গেছে। দিল্লির ঝাপসা রোদের নিচে হাজারো তরুণ-তরুণী বসে আছেন আন্দোলনের মঞ্চে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন গতকাল শুক্রবার নতুন গতি পায়, যখন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরকারকে চাপে ফেলতে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেয়।

১১ দিন আগে

রাষ্ট্রপতির বিদায় রাজনৈতিক কৌশলেরই পরিণতি

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সূচনা। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন, এরপর নির্ধারিত ৯০ দিন সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন

১১ দিন আগে

মুসলিম উম্মাহ: অতীতের গৌরব, বর্তমানের সংকট ও পুনর্জাগরণ

কেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় মুসলিম বিশ্বের উপস্থিতি সীমিত? কেন এত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বহু মুসলিম দেশ প্রযুক্তির ক্রেতা, উদ্ভাবক নয়? কেন রাজনৈতিক বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাইরের শক্তির জন্য হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে?

১২ দিন আগে

শুধু দাবিদাওয়ার আন্দোলন নয়, রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের গল্প

২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বী

১২ দিন আগে